থিয়েটার করব বলে কখনো চাকরি করিনি : ফয়েজ জহির

প্রায় চার দশক ধরে থিয়েটারের সঙ্গে সফলভাবে নিজেকে যুক্ত করে রেখেছেন ফয়েজ জহির। মঞ্চ পরিকল্পনা এবং নির্দেশনা উভয় ক্ষেত্রেই অনবদ্য তিনি। একাগ্রচিত্তে দীর্ঘ এ পথচলায় নিজ কাজ দিয়ে মঞ্চাঙ্গনে দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। থিয়েটারে নিজের পথচলার গল্পের পাশাপাশি অন্য আরো বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : থিয়েটারে আপনার পথচলা শুরু হয় কীভাবে?

ফয়েজ জহির : ছোটবেলা থেকেই স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অভিনয় করতাম। তবে সে সময় নাটক সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমাদের এলাকায় দুর্গাপূজার সময় যখন পাড়ায় পাড়ায় নাটক হতো, তখন বাবা আমাকে নাটক দেখাতে নিয়ে যেতেন। পরবর্তী সময়ে যখন আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে লেখাপড়া করি, তখন শান্তনু কায়সার স্যারের ‘ঋত্বিক’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। একবার এক অনুষ্ঠানে ডা. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং মামুনুর রশিদ অতিথি হিসেবে আসেন। এই দু’জন অতিথির দেখভালের দায়িত্ব সংগঠন থেকে আমার ওপর পড়ে। তখন থেকেই মামুন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সেই সূত্র ধরে ঢাকায় এসে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে আরণ্যকের সঙ্গে যুক্ত হই।

আনন্দধারা : অন্য আরো মাধ্যম থাকতে থিয়েটারের সঙ্গে কেন নিজেকে যুক্ত করলেন?

ফয়েজ জহির : আমি থিয়েটার করব বলে কখনো চাকরি করিনি। ছোটবেলা থেকে অভিনয় করার কারণে অভিনয়ের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। আসলে আমিও চেয়েছি অভিনয়ই করব। এজন্য মূলত থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। তবে থিয়েটারে যদিও অভিনয় একটা বড় অংশ কিন্তু অভিনয়ের বাইরেও নিজেকে প্রমাণ করার জন্য থিয়েটারে সৃজনশীল অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তখন আমার কাছে মনে হলো নির্দেশনা এবং ডিজাইনের কাজটা খুব চমকপ্রদ। সৈয়দ জামিল আহমেদের সঙ্গে গিনিপিগ নাটকের সেটে প্রথম সহকারী হিসেবে যুক্ত হই। তখন থেকেই সেট ডিজাইনের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। বর্তমানে আমি ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে মঞ্চ পরিকল্পনা, আলোক পরিকল্পনা, পোশাক এবং নির্দেশনা নিয়ে বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করি।

আনন্দধারা : নাটকের গল্পের সঙ্গে মঞ্চ পরিকল্পনার ভাবনাটা কীভাবে কাজ করে?

ফয়েজ জহির : আমাদের দেশের ডিজাইন খুব অবহেলিত। ডিজাইন নিয়ে এখন ভাবলেও আগে তেমন ভাবনা ছিল না।

আমাদের একটা সংকট আছে। আমাদের নির্দেশকরা যখন একটা নাটকের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ করেন, তখন মঞ্চ পরিকল্পনাকারীর শরণাপন্ন হন। কিন্তু ততক্ষণে নির্দেশক নাটকটি নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যান। নির্দেশক তখন স্পেসটা ভাগ করে ফেলেন। যদিও এটা নিয়েও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো যায় কিন্তু পরবর্তী সময়ে কাজটা করার পর যখন অভিনেতা বিপাকে পড়েন, তাদের কম্পোজিশন, ব্লকিং সবকিছু বদলে যায়। তখন তাদের আবার নতুন করে কাজ করতে হয়। দু-একটা কারিগরি মঞ্চায়ন করে সেটা ঠিক করা সম্ভব না। নাটকের শুরু থেকেই নির্দেশকের ডিজাইনের সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। আমাকে এখন কেউ বললে আমি বলি শুরু থেকে কাজ করব, তা না হলে কাজ করব না। তবে সেট নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমত নাটকের পা-ুলিপি পাঠ করে বুঝতে হয় যে, পাণ্ডুলিপির মধ্যে নাট্যকার কী বলতে চেয়েছেন এবং নির্দেশক নাট্যকারের কোন ভাবনা নিয়ে কাজ করতে চাইছেন। নির্দেশকের একটা পরিকল্পনা থাকে। পুরো জিনিসটাই তিনি চোখ বন্ধ করে দেখতে পারেন। নির্দেশকের সেই ভাবনাটা কি বাস্তবিক, প্রতীকী নাকি অন্য কোনো ধারা। সবকিছু চিন্তা করেই কীভাবে সেটা মঞ্চে নিয়ে আসা যায়, সেভাবেই কাজ করি।

আনন্দধারা : আমাদের মঞ্চে দর্শক সংকটের কারণ কী বলে মনে হয় আপনার?

ফয়েজ জহির : বর্তমানে আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি। আমরা বলছি, নাটকের দর্শক কমে যাচ্ছে! সেটার পেছনে কারণটা কী? কারণই হচ্ছে ভালো নাটক হচ্ছে না। ভালো নাটকে কিন্তু দর্শক সংকট হয় না। ভালো ফিল্ম দেখে যেমন দর্শক নতুন দর্শক তৈরি করে, তেমনি একটি ভালো নাটকের দর্শক কিন্তু নতুন দর্শক তৈরি করে। একজন সংগঠক কিংবা নির্দেশক হিসেবে আমি কতটা ভালো বা সৃজনশীল কাজ করতে পারছি, এটা ভাবার বিষয়। আমাদের মধ্যে অনেক সংকট রয়েছে।

আমি একটি প্রযোজনা করলাম এবং আপাতদৃষ্টিতে আমার কাছে এটি ভালো মনে হতেই পারে কিন্তু দর্শক বা অন্য নাট্যকর্মীদের কাছে এটা ভালো না-ও লাগতে পারে। কিন্তু এই বিষয়টা মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা ঘাটতি আছে। আমরা সবাই প্রত্যাশা করি, সবাই আমাদের শুধু প্রশংসা করবে। আমি নিজেই এ রকম সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছি। যখন দেখি একটি নাটক করার পর আমার সামনে প্রশংসা করছে এবং পেছনে গিয়ে অন্য কথা বলছে। এ বিষয়গুলো আমার ভালো লাগেনি। কারণ এ বিষয়গুলো আমার সামনে বলাই ভালো। যাতে করে পরবর্তী প্রয়োজনায় সংশোধন করে নেয়া যায়। আমাদের নাট্য সমালোচনা যেভাবে হওয়া উচিত, সেটা পরিপূর্ণভাবে তৈরি হয়নি। দর্শকদের আমি দোষ দিতে চাই না। কারণ দর্শক সারাদিন কর্মব্যস্ততা শেষে একটু আনন্দ উপভোগ করার জন্যই নাটক দেখতে আসে। এখন দর্শক আনন্দ কীভাবে পাবে, সেটা একটা বিষয়। দর্শকদের আনন্দ দেয়ার জন্য কি আমরা স্থূল নাটক করব! দর্শক কিন্তু একটি সিরিয়াস কিংবা বিয়োগান্ত নাটক থেকেও আনন্দ পেতে পারে, যদি সে নাটকটি দর্শককে আন্দোলিত করতে পারে। এই কাজগুলো আসলে আমরা করতে পারছি কিনা সেটা হচ্ছে বিষয়!

আনন্দধারা : তাহলে মঞ্চে সে ধরনের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে না কেন?

ফয়েজ জহির : বর্তমান সময়ে সবাই অর্থের পেছনে ছুটছে। আমি নাটকের পেছনে যে সময় ব্যয় করি, আমার কর্মঘণ্টা হিসাব করে যে অর্থ পাওয়ার কথা সেটা কিন্তু পাচ্ছি না। মঞ্চে কিংবা নেপথ্যে যারা কাজ করছেন তাদের কাউকেই কিন্তু আমরা অর্থ দিতে পারছি না। অনেক সময় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে নাটক মঞ্চায়ন করতে হয়। একটি শব্দ থেকে একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি করা সম্ভব। কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপিটা অভিনেতাদের দিয়ে কাজে লাগিয়ে কাজটা করতে হবে। থিয়েটারে অভিনয়টাই প্রধান, অন্য অনুষঙ্গগুলো দিয়ে আমরা প্রযোজনাটি আরো শক্তিশালী করে তুলি। যাতে করে প্রযোজনাটি মানুষের মনে দাগ কাটে। কিন্তু আমাদের এখানে অভিনয়ের জায়গাটা ভীষণ দুর্বল। এখনকার অভিনেতারা পরিশ্রম করে নিজেকে তৈরি করতে চায় না। ফলে নির্দেশক কোরিওগ্রাফি, লাইট, সেটের ওপর জোর দিয়ে কাজটি করে থাকেন। যার ফলে অভিনয়টা হারিয়ে যায়। আমিও অনেক গুণী নির্দেশকের নাটক দেখেছি, তাদের ডিজাইন আমাকে যেভাবে চমকপ্রদ করেছে কিন্তু সেই অর্থে অভিনয়টা নেই। যদি অভিনয়টা ভালো হতো, তাহলে বিষয়টা অন্য জায়গায় চলে যেত। সর্বোপরি দিনশেষে দর্শক কিন্তু অভিনয় দেখতে আসে।

আনন্দধারা : তরুণদের অনাগ্রহের কারণ কী?

ফয়েজ জহির : এখনকার তরুণরা পরিশ্রমবিমুখ। আমরা শুরু থেকে যেভাবে সময় দিয়েছি, এখনকার ছেলেরা এভাবে সময় দিচ্ছে না। নিজেকে তৈরি করার জন্য একা একাও একটা সময় দেয়ার বিষয় রয়েছে, সেটাও কিন্তু তারা করছে না। এখন মিডিয়ার কল্যাণে খুব দ্রুত তারকা বনে যাওয়া যায়। নাটকে চরিত্র পাওয়ার পর মহড়া কক্ষে উপস্থিতিতে তাদের খামখেয়ালি লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া একটা চরিত্র পাওয়ার পর তা নিয়ে সারাদিন কোনো ভাবনা থাকে না তাদের। একটা কাজ কিন্তু ফাঁকি দিয়ে হয় না। ফাঁকি দিয়ে জীবনে বড় কাজ করা যায় না। কিন্তু এখনকার সবাই সেই ফাঁকির মধ্য দিয়েই কাজ করে যাচ্ছে।

আনন্দধারা : নির্দেশক নাকি স্ক্রিপ্ট- মঞ্চে মূলত কোনটার সংকট বেশি বলে মনে হয় আপনার?

ফয়েজ জহির : মঞ্চে স্ক্রিপ্টের একটা সংকট রয়েছে। তবে অনেক ভালো নির্দেশক আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা আসছেন, তাদের বাইরেও অনেকে ভালো কাজ করছেন। তবে যেকোনো পা-ুলিপি নিয়ে কিন্তু নতুনভাবে কাজ করা যায়। যদি আমরা হ্যামলেট নাটকের কথা বলি, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীতে যত জায়গায় এই নাটকটি মঞ্চায়িত হয়েছে বা হচ্ছে, একেকটা কিন্তু একেকরকম হচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে নির্দেশকের মুন্সিয়ানা। নির্দেশকদের একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে পড়ে থাকলে হবে না। কিন্তু দেখা গেছে আমাদের নির্দেশকরা সবাই একটা গ-ির মধ্যে আটকা পড়ে আছে। যদি এমটা না হতো, তাহলে পাণ্ডুলিপির যে সংকট সেটাকে আমার সংকট মনে হতো না।

আনন্দধারা : থিয়েটারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন মনে হয় আপনার?

ফয়েজ জহির : একসময় আমাদের মহিলা সমিতি, গাইড হাউজ এমনকি ব্রিটিশ কাউন্সিলে নাটক হতো। পরবর্তী সময়ে আমাদের শিল্পকলা একাডেমি হয়েছে। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমি হওয়ার পর এখন সবাই শিল্পকলামুখী হয়ে গেছে। এখন মহিলা সমিতিতে নাটক করতে গেলে দর্শক কম হচ্ছে। কারণ আমাদের ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা একটা বড় সমস্যা। দর্শক আসলে নাটক দেখে আরামদায়কভাবে বাড়ি ফিরতে চায়। তাছাড়া আমাদের অনেক অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা আছে। ধনীরা কিন্তু নাটক দেখতে আসে না। নাটক দেখতে আসে মধ্যবিত্তরা। যদিও শিল্পকলার বাজেট, কর্মপরিধি বেড়েছে কিন্তু এখনো আমাদের লাইট বাইরে থেকে ভাড়া করে আনতে হয়। আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো বরাদ্দ। যারা ভালো কাজ করছে তাদের কথা চিন্তা করা হয় না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই সময়ের যে রাজনীতি সেটা আমাদের থিয়েটারের মধ্যে ঢুকে গেছে। আমরা নাটকের লোকেরা অনেক কিছু পাশ কাটিয়ে যাই। এটা আমাদের ও নাটকের জন্য ক্ষতিকর। গ্রুপ থিয়েটারের যে চর্চা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, সেটা থেকেও তারা বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে অনেকে আছে যে থিয়েটার করবে না কিন্তু ফেডারেশনের একজন হয়ে থাকবে। এ সবকিছু মিলিয়ে থিয়েটারের ভবিষ্যৎ আমার কাছে অস্থির মনে হয়।

আনন্দধারা : থিয়েটার পেশাদারিত্ব আসবে বলে কী মনে হয় আপনার?

ফয়েজ জহির : এই বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। পাশের দেশ ভারতবর্ষে গ্র্যান্ড প্রথা আছে তবে সেটাও এখন বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি। কিন্তু অন্যান্য দেশে প্রফেশনাল থিয়েটার বলে যে বিষয়টা আছে সেটা কিন্তু আসলে সেই রাষ্ট্রই দেখে। সেখানে সবাই কিন্তু বেতনভুক্ত এবং দেখা যায় তাদের নাটকে দর্শকের কোনো ঘাটতি থাকে না। শিল্পের যে কোনো মাধ্যমে ব্যয় অনেক বেশি, তবে একটা রাষ্ট্র বা একটা সিটি যখন তার সংস্কৃতিকে লালন করে তখন শিল্পচর্চাটা আরো সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল থিয়েটারে কিন্তু রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। ইংল্যান্ডের রানী নিজেই তার আয়ের একটা অংশ থিয়েটারে দিয়ে থাকেন। ডেনমার্কের রানী নিজেই একটা থিয়েটার করেছেন। এই যে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের এগিয়ে আসা সেটা কিন্তু আমাদের নেই। আমরা বলি, আমাদের হল নেই। আমার মনে হয় না শুধু হল করে দিলেই থিয়েটার হয়। এর জন্য পুরোপুরিভাবে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। তাহলে পেশাদারিত্ব বা অন্যান্য সংকট মোকাবেলা করে আমাদের থিয়েটার শিল্পটা তার আপন চিত্তে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।