‘কল্পনা করলাম বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করেনি’ -হাসান মতিউর রহমান

একটি মাত্র গান ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ দিয়ে সহজেই তাকে চেনা যায়। গান লেখা জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি সৃষ্টি। এই গানটি ছাড়া অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন গীতিকবি হাসান মতিউর রহমান। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গানের কথা হলো মুজিব পরদেশীর ‘আমি বন্দি কারাগারে’, ‘কেবল ভালোবাসা জানতাম না’, আশরাফ উদাসের ‘আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা আসো যদি বাঁশবাগানে আবার হবে দেখা, পুকুরেতে পানি নাই পাতা কেন ভাসে’, মমতাজের গাওয়া ‘এবার না আসিলে বাড়িতে’, ঝুমু খানের কণ্ঠে ‘পান খাইতে চুন লাগে ভালোবাসতে গুণ লাগে’, রবি চৌধুরীর ‘বন্ধু হইলা না আমার’। গান লেখার জীবন নিয়ে অন্তরঙ্গ অনেক কথা বলেছেন।

আনন্দধারা : ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ গানটির কথা কীভাবে লেখা হলো, সেটার পেছনের গল্পটা জানতে চাই। গানটা কীভাবে সবার হয়ে উঠল?

হাসান মতিউর রহমান : এই গানটা ১৯৯০ সালে লেখা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্রান্সে একটি আওয়ামী লীগ সম্মেলন ছিল, সেখানে শিল্পী ছিলেন মলয় কুমার গাঙ্গুলী। তাকে বলা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা এবং শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটা গান করতে। তখন ক্যাসেটের জন্য গান লিখি এবং শ্রোতারা সেগুলো ভালোই গ্রহণ করেছিল। মলয় কুমার গাঙ্গুলী গানগুলো লেখার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন। প্রথমে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান লেখার জন্য রাজি হচ্ছিলাম না। কারণ তিনি অনেক বড়মাপের একজন নেতা ও জাতির জনক। তাকে নিয়ে গান লেখা মুখের কথা না। তারপরও যখন আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো, গানগুলো লেখার জন্য দু’দিন সময় দেয়া হয়েছিল। আমাকে বলার পর সেদিন রাতেই লিখতে বসি। শুরুতে কিছুই মাথায় আসছিল না। আর যে কথাগুলো আসছিল মনে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথাগুলো যায় না। শেষ রাতের দিকে মনে হলো কথাগুলো কীভাবে যেন আমার ভেতর চলে আসছে। ফজরের আজানের সময় বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছিল। তখন কল্পনা করলাম বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করেননি, এত বড় একজন নেতা কখনো মরতে পারেন না। কোথাও আটকে রাখা হয়েছে তাকে। আমরা তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসব। তখন লিখলাম, যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই, যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই।

আনন্দধারা : শ্রোতাপ্রিয় এই গানটির রেকর্ডিং কোথায় হয়েছিল?

হাসান মতিউর রহমান : তখনকার ঝংকার স্টুডিওতে গানটার রেকর্ডিং হয়েছিল। আলমাস আলী বেহালা বাজাতেন। তার কম্পোজিশনে মলয় কুমার গানটি গাইলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় আরো কিছু গান একত্রে করে আমরা একটা ক্যাসেট তৈরি করি। গানগুলো যখন বাজালাম, তখন মানুষ সেগুলো লুফে নিল। গানগুলো আওয়ামী লীগের জনসভায়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে রিকশায় করে বাজানো হতো। এভাবে গানগুলো খুব দ্রুত ছড়িয়ে গেল। এটার লাখ লাখ কপি ক্যাসেট বিক্রি হলো।

আনন্দধারা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গানটি শোনার পর কী বলেছিলেন?

হাসান মতিউর রহমান : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বাসায় ডেকেছিলেন এবং বললেন তোমার লেখা গান অনেক ভালো লাগে। ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত’ এটি তোমার অসাধারণ একটি সৃষ্টি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে এটিই সেরা গান বলে আমার কাছে মনে হয়। তার বাসায় সকাল ৭টায় গিয়েছিলাম। সেখানে ডিম পোজ দিয়ে নাশতা করেছি। এটা আমার জীবনে চিরসরণীয় হয়ে থাকবে। এটা কোনোদিন ভুলতে পারব না।

আনন্দধারা : গানটি নিয়ে আরো কোন স্মৃতি থাকলে ভাগাভাগি করেন পাঠকদের সঙ্গে?

হাসান মতিউর রহমান : এই গানটির জন্য আমার বিশাল পরিচিতি তৈরি হয়েছে। যেখানেই যাই সবাই এই গানটির কথা বলে। দলমত নির্বিশেষে যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তারা আমাকে এই গানটির জন্য অনেক সম্মান এবং উৎসাহ প্রদান করেন। গান লিখে একজন গীতিকার এক জীবনে যতটুকু অর্জন করতে পারে আমার মনে হয় এই গানটি আমাকে সেটার কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে।

আনন্দধারা : আপনার লেখা উল্লেখযোগ্য অন্য গানগুলো সম্পর্কে জানতে চাই?

হাসান মতিউর রহমান : মুজিব পরদেশীর পুরো ক্যাসেট ‘বন্দি কারাগারে’, ‘কেবল ভালোবাসা জানতাম না, আশরাফ উদাসের ‘আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা আসো যদি বাঁশবাগানে আবার হবে দেখা, পুকুরেতে পানি নাই পাতা কেন ভাসে’, মমতাজের ‘এবার না আসিলে বাড়িতে’, ঝুমু খানের ‘পান খাইতে চুন লাগে ভালোবাসতে গুণ লাগে’, রবি চৌধুরীর ‘বন্ধু হইলা না আমার’। দিলরুবা খানের ‘দেখা আরিচা ঘাটে, শাহজালাল ফেরিতে’, রুনা লায়লার ‘রাঙ্গামাটির পাহাড়ে দুপুর বেলা আহারে, নাম ধরে কে বাঁশরি বাজায়’, এন্ড্রু কিশোরের ‘তুমি যে কলেজের নতুন ছাত্রী ভালোবাসা নাম তার’, রাজিবের ‘তুমি যে ক্ষতি করলে আমার’সহ অনেক গান।

আনন্দধারা : একাধারে ফোক গান লিখছেন এবং সঙ্গে হালকা কথারও গান লিখছেন এমনটা কেন?

হাসান মতিউর রহমান : আমার কর্মজীবন শুরু করেছিলাম ব্যাংকার হিসেবে। মুজিব পরদেশীর ক্যাসেট আমার নিজের কোম্পানি থেকে বের করেছিলাম। তখন সেটি ৬০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু আমি চাকরি এবং গান দুটোকে একসঙ্গে সময় দিতে পারিনি। তাই নিজে অডিও প্রতিষ্ঠান করে বিভিন্ন শিল্পীর গান সেখান থেকে বের করতাম। তখন আর্থিকভাবে ভালোর দিকে যাচ্ছিলাম। শুধু গান লিখলে একটা নির্দিষ্ট সম্মানী পেতাম। হালকা গানগুলো যখন লিখি তখন মনে হতো এই গানে পুরস্কার পাব না। তাই এটা দিয়ে লগ্নিটা ওঠাতে হবে এবং কিছু লাভ করতে হবে। চিন্তা করতাম আমাদের শ্রোতা কারা। তখন দেখলাম আমাদের শ্রোতা কর্মজীবী মানুষেরা। তখন গার্মেন্টসে ৪৫ লাখ মানুষ কাজ করত। তাই তাদের পছন্দের শব্দগুলো ফুটিয়ে তোলে এমন শব্দ দিয়ে লেখা শুরু করলাম। এসব কারণেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গান লিখতে গিয়ে আমাকে ফোক গানের সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। শ্রোতাদের জন্যই ভিন্নধারার গানগুলো করেছি এবং তারা সেগুলো গ্রহণ করেছে।

আনন্দধারা : দীর্ঘদিন গানের জগতে সগৌরবে গান লেখার পেছনের কারণ কী?

হাসান মতিউর রহমান : ১৯৭৮ সালে আমার চৌদ্দটি গান নিয়ে লং প্লে রেকর্ড বের হয়। আজকালকার গীতিকবিরা এসব দেখবেন না। কারণ এখন আর এমনটা হয় না। ঢাকায় আসার পর আমার ওস্তাদ কুটি মনসুর সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি একজন বিখ্যাত গীতিকবি। তিনি আমাকে বাংলাদেশ গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডিং সেন্টারে নিয়ে গেলেন। সেটা চালাতেন সালাউদ্দিন সাহেব। সেখানে সত্য সাহা এবং ফেরদৌসী রহমান ছিলেন। আমার গানগুলো জমা দেয়ার পর তারা গানগুলো দেখলেন এবং কিছু গান নির্বাচন করলেন। ১৯৭৮ সাল থেকে আমি টিকে আছি, এর কারণ হিসেবে আমি মনে করি আমি সবসময় আধুনিক থাকার চেষ্টা করি। বয়সকে কখনো বাধা মনে করিনি। যেমন এখন সালমার গান লিখি। তার পরে যারা আসছে তারাও আমাকে ফোন করে গান চায়। অর্থাৎ সবসময় সময়ের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করি।

আনন্দধারা : গান লেখার জীবনে টার্নিং পয়েন্ট কোনটা ছিল?

হাসান মতিউর রহমান : মুজিব পরদেশীর অ্যালবামটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। তারপর ১৯৮৭ সালে আমি বন্দি কারাগারে গানটা শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল।

আনন্দধারা : নতুন যারা গান লিখতে চায়, তাদের জন্য কিছু বলেন?

হাসান মতিউর রহমান : বর্তমানে আমাদের দেশে সর্বোচ্চ ভালো কম্পোজিশন হচ্ছে। যে কেউ গান লিখে জনপ্রিয় একজন শিল্পীর কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু একজন শিল্পীর বোঝা উচিত ভালো গান নাহলে সে কখনো টিকে থাকতে পারবে না। তাই নতুনদের সঠিক গানটি বাছাই করতে হবে। বর্তমান সময়ে অনেক ব্যয় করে গান নির্মাণ হচ্ছে কিন্তু গানের কথার প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল না। এখন একজন কিবোর্ড বাজানো শিখলেই সুর করতে বসে যায়। আমার মনে হয় গানকে সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা দারুণ সুযোগ পেয়েছিলাম কিন্তু আমাদের খামখেয়ালির কারণে গানের কথার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে শুধু কম্পোজিশনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।

আনন্দধারা : আপনাকে অনেকে অনুপ্রেরণা মনে করে কিন্তু আপনার অনুপ্রেরণা কারা?

হাসান মতিউর রহমান : আমি অনেক ছোটবেলা থেকে গানের সঙ্গে জড়িত। যারা পল্লীগীতি গাইত তাদের ভালো লাগত। আব্দুল আলীমের গান শুনে বড় হয়েছি। তার গান শোনার সময় মনের মধ্যে স্পৃহা জাগত নিজে গান গাওয়ার। কিন্তু গাইতে এসে দেখলাম গান গাওয়ার জন্য যে যোগ্যতার দরকার, তাতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। একটা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি এবং আমার লেখা গান সেখানে প্রথম স্থান লাভ করে। তারপর থেকে লেখার প্রতি ঝুঁকে গেলাম।

আনন্দধারা : হাসান মতিউর রহমানকে এক কথায় ব্যাখ্যা করেন?

হাসান মতিউর রহমান : হাসান মতিউর রহমান খুব সহজ-সরল একজন মানুষ। সাধারণ মানুষের জন্য তিনি গান লেখেন। ব্যক্তি হিসেবে আমি একজন সমবায় মানুষ, জটিলতা আমার মধ্যে নেই। আমি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। রাজনীতি করলেও সেটাকে জীবনের অংশ হিসেবে নিইনি। গান লেখার জন্য মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে বলে আমি মনে করি।

আনন্দধারা : প্রেমকে কীভাবে দেখেন?

হাসান মতিউর রহমান : প্রেম আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই দরকার সেটা বয়সের ওপর নির্ভর করে না। কারো প্রেম গোপনে, কারোটা প্রকাশ্যে। প্রেমকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

আনন্দধারা : আপনার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দারুণ হিউমার থাকে, এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

হাসান মতিউর রহমান : আমার যে বয়স তাতে রাস্তায় শুয়ে তো আমি বলতে পারব না যে আমার কেউ নেই। আমার যে স্ট্যাটাসগুলো দেয়ার কথা, সেগুলো আমি বয়সের কারণে দিতে পারছি না। ফেসবুকে আমার কনিষ্ঠ আত্মীয় এবং আমার ছেলে-মেয়েরা রয়েছে। বয়স ও মর্যাদার কারণে সব স্ট্যাটাস দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। সেহেতু আমার ফেসবুকটাকে এমন পর্যায়ে রেখেছি, যাতে সেখান থেকে মানুষ কিছু শিখতে পারে। যদি কেউ মন দিয়ে দেখে তাহলে আমার ফেসবুক একটি পাঠশালা। এগুলো গবেষণালব্ধ জিনিস, তাই আমাকে অনেক পরিশ্রম করে এসব করতে হয়।

আনন্দধারা : আপনার ভক্তদের উদ্দেশে কিছু বলেন?

হাসান মতিউর রহমান : আমার ভক্তদের সঙ্গে আমি সংযুক্ত আছি। তারা আমাকে অনেক ভালোবাসা এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ভালো শিল্পীর গানের মধ্যেও তারা আমাকে অনেক ভালোবাসেন এবং এখনো অনুরোধ করেন বর্তমান শিল্পীদের সঙ্গে গান করার জন্য এবং আগের গানগুলো ইউটিউবে আপলোড করার জন্য। তারা বলেন, আপনার গানগুলো অনেক স্থায়ী গান, এগুলো কখনো হারিয়ে যাবে না। অবশেষে ভক্তদের বলব, আপনারা বাংলা গান বেশি বেশি শুনুন এবং বাংলা গানের সঙ্গে সবসময় থেকে আমাদের উৎসাহিত করুন। দেশ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতিকেও আমরা যেন সেভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।