শিল্পীর ক্যামেরায় বঙ্গবন্ধু

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে ঢুকতে প্রথমেই বিশাল একটি ছবি চোখে পড়ল। বিশাল সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু। গিয়েছিলাম আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের ৫৯তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ দেখতে। নাসির আলী মামুন বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি জগতে একটি অতিপরিচিত এবং উজ্জ্বল নাম। বাংলাদেশের পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির কথা বলতে গেলে প্রথমেই তার নাম বলতে হয়। দেশের প্রায় সব বিখ্যাত এবং উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের পোর্ট্রেট তুলে নাসির আলী মামুন নিজেও হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের অংশ। প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে মামুন ভাইয়ের সঙ্গেও কথা হয়।

ছেলেবেলা থেকেই নাসির আলী মামুন বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি সংগ্রহ করতেন। তার এই নেশা পরবর্তী সময়ে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফার করে তোলে। তখন মামুন এত পরিচিত ছিলেন না। প্রেস ফটোগ্রাফারের তকমাও ছিল না তার গায়ে। তবু তিনি খ্যাতনামা ব্যক্তিদের ছবি তুলে গেছেন ক্লান্তিহীন। দেশ-বিদেশের এসব বিখ্যাত ব্যক্তির ভিড়ে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমা তাকে সবসময় বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। মামুন মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর চেহারা, অবয়ব ও মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করতে পারাটা তার জন্য এক বিরাট সম্মান।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে মোট ২১টি সাদাকালো প্রিন্ট করা ছবি। এর মধ্যে বেশিরভাগ ছবিই ১২০ মিডিয়াম ফরম্যাট ফিল্মে তোলা। অবশ্য অল্প কিছু ছবি ১৩৫ ফরম্যাটেও আছে। মামুন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ১৯৭১ সালে তিনি সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবি তোলেন। এরপর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর ৫০০টির বেশি ছবি তুলেছেন। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি নেগেটিভ নষ্ট হয়ে গেছে, যা কিছু টিকে আছে, তা থেকেই তিনি এই প্রদর্শনীর জন্য ছবিগুলো বাছাই করেছেন। এক্ষেত্রে মামুন ছবির গুণগত মান বা টেকনিক্যাল দিকের চেয়ে প্রাধান্য দিয়েছেন ঐতিহাসিক গুরুত্বকে। প্রদর্শনীর কিছু ছবির নেগেটিভ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাই ছবিগুলো যতটা সম্ভব রিটাচ করে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৩ মার্চ ও ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবি।

প্রদর্শনীটি দেখে আমার মনে হলো, নাসির আলী মামুনের একটু ভিন্ন রূপ দেখতে পেলাম। পাঠক জানেন, মামুনের ছবির একটি নিজস্ব স্টাইল আছে। সাদাকালো ফ্রেমে নাটকীয় আলো-আঁধারির খেলা আর সরল কিন্তু শক্তিশালী কম্পোজিশন এই আলোকচিত্রশিল্পীর সিগনেচার। কিন্তু এখানে প্রদর্শিত ছবিগুলোর অধিকাংশে যেন একজন ফটোসাংবাদিকের ছোঁয়া পাওয়া যায়। ছবিগুলো তাই শুধুই বঙ্গবন্ধুর চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদ, অভিব্যক্তি তুলে ধরে না। দর্শক এখানে বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জীবনের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো এবং সেই সময়ে তার আশপাশের মানুষ ও পরিবেশও দেখতে পাবেন। বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড়মাপের নেতার ছবি তোলা নিশ্চয়ই সহজ নয়। অনেক প্রেস ফটোগ্রাফারের মধ্যে থেকে অনেক সময় তাকে কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যেও অবশ্য মামুনের গোছানো কম্পোজিশন লক্ষণীয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যেমন বড়মাপের মানুষ ছিলেন, তেমনি ছিলেন সাদাসিধা। ফলে অনেকবার তিনি খুব কাছ থেকে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছেন।

‘কী ক্যারিশম্যাটিক ফিগার, কী স্টাইলিশ! আমার তো মনে হয়, সারা পৃথিবীতে যত বাঙালি আছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে স্টাইলিশ এবং ক্যারিশম্যাটিক ফিগার বঙ্গবন্ধু। তিনি একজন গ্লোবাল মেগাস্টার। এত ফ্যাশনেবল সুপারস্টার বাঙালি আর একজনও নেই। অতি সাধারণ পাঞ্জাবি, পায়জামা এবং তার পাইপ। মনে হয় হিমালয় পর্বতের মতো উঁচু একজন মানুষ।’ বঙ্গবন্ধুর প্রতি মামুনের এই মুগ্ধতার প্রতিফলন ঘটেছে তার ছবি তোলার মধ্যেও। অনেকগুলো ছবিতে লো অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার লক্ষণীয়। একই সঙ্গে বিশাল আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড বঙ্গবন্ধুর বিশালতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। আবার কতকগুলো ছবি মামুন তুলেছেন একটু উঁচু অ্যাঙ্গেল থেকে, যাতে বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায় জনসমুদ্রের পটভূমিতে। অধিকাংশ ছবি মিডল কম্পোজ করা, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ফ্রেমের মাঝামাঝি রয়েছেন। অনেকে হয়তো বলবেন এটা শুধুই মিডিয়াম ফরম্যাট কম্পোজিশনের ব্যাকরণ। কিন্তু আমার মতে, এটি একটি সত্যের প্রতীকী উপস্থাপনও বটে। সত্যটি এই যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমির শাশ্বত কেন্দ্রীয় চরিত্র।

সাদা ফ্রেমে গ্যালারির সাদা দেয়ালে ঝোলানো প্রমাণ আকার বা লাইফ সাইজ প্রিন্টগুলো বোদ্ধা দর্শকের জন্য ইতিহাসের জানালা খুলে দেয়া ছাড়াও শৈল্পিক ও নন্দনতাত্ত্বিক আনন্দ দেবে। ডিজিটাল প্রিন্ট হলেও সাদাকালো ফিল্মের গ্রেইন এবং ডিটেইলস ছবিগুলোকে ক্ল্যাসিক টোন দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবির প্রতিটি ভাঁজ ছবিতে স্পষ্ট। ছবিগুলোকে কোনো ক্রপ করা হয়নি। ফিল্মের বর্ডারগুলোও দৃশ্যমান। ম্যানুয়াল প্রিন্ট করা সম্ভব হলে ষোলকলা পূর্ণ হতো- একথা না ভেবে পারলাম না।

দর্শকদের জন্য প্রদর্শনীতে রয়েছে আরেকটি চমক। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আট বছর পর মামুন গিয়েছিলেন ৩২ নম্বরের সেই বাড়িতে। হত্যাকাণ্ড আর বঙ্গবন্ধুর জীবনযাপনের ধুলোমাখা নিদর্শনের ছবিগুলো প্রদর্শনীতে রয়েছে একটি কন্ট্যাক্ট প্রিন্টের আদলে। প্রদর্শনীর শেষ ছবিটি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মঞ্চে তোলা। নাটকীয় আলোছায়ার ছবিটি ক্যাটালগের প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে নাসির আলী মামুনের মতো শিল্পীর ক্যামেরায় জাতির পিতার এই উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে খুবই সময়োপযোগী। কথায় কথায় মামুন বলছিলেন, ‘কালের ইশারা খুবই সূক্ষ্ম। সবাই এটা ধরতে পারে না।’ মামুনের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এদেশের কালজয়ী মানুষের মুখচ্ছবির মাধ্যমে তিনি যেভাবে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন, তাতে একথা বলা যেতেই পারে, কালের ইশারা বুঝতে তিনি সিদ্ধহস্ত। শুধু আলোকচিত্রপ্রেমীরা নন, সব ধরনের মানুষের দেখার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী। ৬ মার্চ শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে এ মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত (১৩, ১৪ তারিখ বন্ধ)। সময় সোম থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত, শুক্র ও শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা ও বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা।

লেখক ও ছবি : শাহরিয়ার কবির হিমেল

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।