শিল্পী হওয়া একটা নিজস্ব ব্যাপার -আবদুস শাকুর শাহ

ঐতিহ্যবাহী বাংলার রাখালিয়া চিত্রশিল্পী আবদুস শাকুর শাহ, যার শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার সব ঐতিহ্য, পুঁথি, নকশিকাঁথা, টেরাকোটা, লোকসংস্কৃতির নানা দিক। ছোটবেলায় বেশ আনন্দের সঙ্গে আনমনেই ছবি আঁকতেন। সেই থেকেই আজ অবধি ছবি আঁকছেন গুণী এই শিল্পী। পেইন্টিংয়ে নিজস্বতা আনয়নের জন্য সবসময় নিজের দেশ, দেশের ভাষা, ঐতিহ্য এসব নিয়ে কাজ করার কথা বলছিলেন প্রখ্যাত চিত্রকর আবদুস শাকুর শাহ। ছবি আঁকা বিষয়ক কিছু গল্প নিয়ে তার সঙ্গে বসেছিল আনন্দধারা। সেই গল্পগুলোর অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এই সংখ্যায়।

চিত্রশিল্পী আবদুস শাকুর শাহর জন্ম ১৯৪৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ১৯৬৫ সালে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে আর্ট কলেজে পড়াশোনা শুরু করেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে শিল্পী হয়ে ওঠা। তারপর সেখানে শিক্ষকতা করা। এভাবে জীবনের বেশ কয়েকটি ধাপ পার করেছেন গুণী এই শিল্পী। তার এই যাত্রা নিয়েই শুরু হয়েছিল গল্প-

আনন্দধারা : স্যার আপনার চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার পুরো সময়টা যদি একটু বলেন?

আবদুস শাকুর শাহ : প্রত্যেকটা শিল্পীরই নিজস্ব একটা জার্নি থাকে। আমরা যখন আর্ট কলেজে পড়তে আসি ১৯৬৫ সালে, তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থা, সেখানকার পরিবেশ, ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্কটা বেশ ভিন্ন ছিল। এখন সেটা অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাদের সময়ে আমাদের গুরু শিক্ষক জয়নুল আবেদিন স্যারই ছবি আঁকার একটা প্লাটফর্ম শুরু করলেন। প্রথমদিকে তিনি পুরান ঢাকায় একটা ছোট রুম নিয়ে সেখানে শেখাতে শুরু করেন। তখন বাংলাদেশ ছিল ইস্ট পাকিস্তান। পরবর্তী সময়ে হলো আর্ট ইনস্টিটিউট। তারপর এলো আর্ট কলেজ। এরপর আবার হলো আর্ট ইনস্টিটিউট। এরপর এখন ফ্যাকাল্টি। এভাবে শুরুটাই করেছিলেন আবেদিন স্যার। আবেদিন স্যার খুব কষ্ট করে এই আর্ট ইনস্টিটিউটকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আমি যখন আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম তখন ১৯৬৫ সাল। তখন ডিগ্রি কোর্স চালু হয়েছিল আর্ট ইনস্টিটিউটে। ডিগ্রি শেষ করে আমি দেখলাম একটা জব তো দরকার। মধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয় আর কী? শিক্ষকতা করতে চলে গেলাম সিলেট ক্যাডেট কলেজে। সেখানে যাওয়ার পেছনে যে কারণটা ছিল যে, সেখানের আদিবাসী যারা চা-বাগানে কাজ করেন তাদের ওপর আঁকা। কিন্তু আঁকাটা ঠিকভাবে হয়ে উঠল না। ওটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। পরে ওইখান থেকে আমি চলে গেলাম চট্টগ্রাম। ওইখানে মাস্টার ডিগ্রি করা এবং পাশাপাশি একটা চাকরি করার চিন্তা নিয়েই গেলাম। আর ছবি আঁকা তো আছেই। মাস্টার্স ডিগ্রি করার সময় আমি আঁকাআঁকি করতে থাকি ঠিকই। কিন্তু তখনো কেন যেন হয়ে উঠছিল না। ঠিকভাবে এগোতে পারছিলাম না। তারপর ঠিক ওই সময়টায় ইন্ডিয়ান একটা স্কলারশিপ পেয়েছিলাম আমি। পরে চিন্তা করলাম যাই ওইদিক, গিয়ে উচ্চ শিক্ষাটা নিই। উচ্চশিক্ষা নিয়ে যেন নিজের একটা ধারা তৈরি করতে পারি। পরে আমরা চারজন চলে যাই গুজরাটের বরদা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আমি দু’বছর পড়াশোনা করলাম। সেখানেই আমার আধুনিক শিল্প শিক্ষার কিছুটা পরিবর্তন হলো।

তখন আমি অনেক বড় মাপের গুণী একজন শিক্ষককে পেলাম। তার দিকনির্দেশনা নিয়েই আমি পরবর্তী সময়ে কাজ করলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন শিল্প নিয়ে কিছু করতে হলে তো কিছু জেনে করতে হবে। এমনি রঙ লাগালেই তো শিল্প হবে। কিন্তু জেনে কাজ করতে হবে। কথা প্রসঙ্গেই তিনি একবার বললেন, ‘আমি আমার কোনো ছাত্রকেই শিল্পী বানাতে পারব না। শিল্পী হওয়া একটা নিজস্ব ব্যাপার। তোমার মধ্যে যদি সেই সত্তাটা থাকে, তবেই তুমি শিল্পী হতে পারবে।’ তিনি সবসময় বলতেন বাংলাদেশকে দেখতে। দেশের ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ল্যান্ডস্কেপগুলোকে দেখতে বলতেন সবসময়। এই বিষয়গুলো থেকে কিছু নিয়ে নিজের মতো করে ছবি আঁকতে পারলেই এক সময় কিছু হবে, এমনটাই বলতেন তিনি।

তারপর দেশে ফিরে এসে আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিতে জয়েন করলাম। তারপর কাজ শুরু করলাম কিন্তু তারপরও হয়ে উঠছিল না। ভাটা পড়ে গিয়েছিল কাজে। ওই সময়ে আমার শিক্ষকের ওই কথাগুলো শুনে আমি কিছু বিষয়ে ভাবলাম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবলাম, দ্বিতীয় বিশ্ব নিয়ে ভাবলাম। এ রকম অনেকগুলো বিষয় এলো। এসব নিয়ে আঁকতে শুরু করলাম। অনেকেই ভালো বলে। তবে সেখানে নিজস্বতা পাচ্ছিলাম না। দ্বিতীয় বিশ্বের ওপর কাজগুলো দেখলে আমার এখনো ভালো লাগে। তখন মুক্তিযুদ্ধের ওপর বেশকিছু কাজ করি। কিন্তু কোনো কাজেই আমি যে আবদুস শাকুর সেটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একটা সময় ফ্র্যাস্ট্রেশনে পড়ে যাচ্ছিলাম যে, কেন বরদার মতো এত ভালো জায়গায় পড়াশোনা করে এসেও কাজের মধ্যে নিজস্বতা আনতে পারছি না? ঠিক ওই সময় একটা আন্তর্জাতিক এক্সিবিশনে কিছু ছবি পাঠালাম। চিন্তা করলাম দেশকে নিয়েই কিছু করব। যেহেতু আন্তর্জাতিক একটা প্লাটফর্ম, সেখানে নিজের দেশকে নিয়ে কিছু করে যদি দেশের নামটা ফুটাতে পারি, তাহলে ভালোই হবে। এভাবে সাত-আটদিন ভেবে একটা বিষয় পেলাম- শীতলপাটি, হঠাৎ করেই শীতলপাটির ফর্মগুলো চোখে পড়ল। সেই ফর্মগুলো, ফিগারগুলো নিয়ে তিনটি ছোট ছবি আঁকলাম। ওই তিনটি ছবিই আমি এক্সিবিশনে পাঠালাম। তারপর সেখান থেকে মূল্যায়নের একটা চিঠি পেলাম যে, সারা পৃথিবী থেকে পাঁচজন আর জাপান থেকে পাঁচজনকে মূল্যায়ন করেছে তারা। সেখানে আমার ছবিগুলো মূল্যায়িত হয়েছে। ওই উপলক্ষে আমি জাপানে প্রথম গেলাম। সেখানে এক্সিবিশনে জাপানের ছবি ছিল ১০ হাজার আর সারা পৃথিবী থেকে ১২ হাজার। অনুষ্ঠান শেষে আমি সেখানের ডিরেক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম এত ছবির মধ্যে আমার ছবিগুলো আপনারা কেন বেছে নিলেন। তখন তিনি বললেন, দেখ, এখানে সেই ছবিগুলো পুরস্কৃত হয়েছে, সবগুলোই নিজের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে। তোমার ছবিটাও তাই। তোমার দেশের একটা পুরনো জিনিসের ভেতর থেকে তুমি বিষয়টি নিয়েছ। এই বিষয়গুলো নিয়ে আরো কাজ করো- এমন করে উপদেশ দিলেন তিনি। পরে দেশে ফিরে এসে দেশজ সব ফরমেট নিয়ে কাজ শুরু করলাম। খুব বেশি বড় কাজ না, ছোট ছোট কাজই করেছি তখন।

ওই সময় দেশের বাইরে থেকে যারা আসতেন ভিজিটরস, তারা খুব পছন্দ করতেন আমার ছবি। বলতেন আমার কাজে দেশটা ফুটে ওঠে। তারপর ওই ফরমেট থেকে বের হয়ে মৈমনসিংহ গীতিকা পড়ে সেখান থেকে সাবজেস্ট নিয়ে কাজ শুরু করলাম। তখন মৈমনসিংহ গীতিকার কিছু লাইন নিয়ে নিজের মতো করে কম্পোজিশন করে তার ওপর ছবি আঁকলাম। সেখানে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যগুলোই ফুটিয়ে ওঠানোর চেষ্টা করেছি। এ ধরনের ফরমেটে আমার আগেই বড় শিল্পীরা কাজ করে গেছেন। দেশকে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য দেশি ফরমেটে কাজ করাটাই ভালো। আমি কামররুল হাসান, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরীর কাজের ফর্মগুলো ফলো করেছি। তবে আমি আমার নিজস্ব ধারা তৈরি করেছি। যেমন তাদের পাখি আঁকা দেখে আমি ভাবতাম আমি আমার পাখিটা কীভাবে আঁকতে পারি দেখি। এভাবে আমি আঁকতে আঁকতে বাংলাদেশকে ভিত্তি করে আমার নিজের আঁকার একটা ধারা তৈরি করলাম। এভাবেই আঁকতে আঁকতে এতদূর পর্যন্ত এলাম। এর মাঝে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে আমার প্রচুর ছবি গেছে। একটা সময় আমার প্রচুর ছবি আঁকা হয়ে গেল। তখন কিছু পেইন্টিং আমি রেখে দিয়েছিলাম যে, থাক এগুলো পরে দেখা যাবে কী করব। ওই পেইন্টিংগুলো বিক্রি করছিলাম না। পরে ওই সময় ইংল্যান্ডে একটা এক্সিবিশন হয়, সেখানে আমার কিছু ছবি দেয়ার প্রস্তাব আসে। তখন সেখানকার কিউরেটর আমার কিছু ছবি বাছাই করলেন সেখানে প্রদর্শনীতে নেয়ার জন্য। তখন আমি বললাম, এই ছবিগুলো তো আমি বিক্রি করতে চাচ্ছি না। তখন তিনি বললেন পরেরটা পরে দেখা যাবে।

এখন আগে এক্সিবিশন হোক, তুমি ইংল্যান্ডে আসো। তারপর দেখা যাবে তখন তিনি আমার ৪০টি ছবি বাছাই করে নিয়ে গেলেন, কী হয়। পরে আইসল্যান্ডে গেলাম। সেই এক্সিবিশন শেষে তারা আমার ছবিগুলো রেখে দিতে চাইল। তারা সেই ছবিগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে চায় বলে জানাল। সেখানে যারা বাঙালি বাচ্চারা স্কুলে পড়ছে তাদের বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে জানানোর জন্য তারা ওই ছবিগুলো ব্যবহার করতে চায়। এভাবে করেই আমার জার্নিটা চলছে এখন পর্যন্ত।

আনন্দধারা : ছবি আঁকা বিষয়ে তরুণদের জন্য আপনার কোনো উপদেশ যদি দিতেন?

আবদুস শাকুর শাহ : তরুণরা ভালো কাজ করে, ভালো ছবি আঁকে। এটা আমি সবসময়ই বলি। আমি তরুণদের সবসময় বলি, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন শিল্পচর্চার জন্য কী অবদান রেখে গেছেন। এদেশে সেগুলো যেন তরুণরাও ফলো করে। আবেদিন স্যার কেমন লোক ছিলেন, তিনি দেশের জন্য কী করে গেছেন, চারুকলা নিয়ে তার কেমন চিন্তাভাবনা ছিল। আজকের তরুণরা যারা ছবি আঁকে, তারা যদি আবেদিন স্যারের চিন্তাধারা এবং দর্শন নিয়ে কিছু জানে বা ফলো করে, তাহলে আমি বলব তারা অনেক ভালো করবে। বাংলাদেশের জন্য তারাও কোনো ভালো অবদান রাখতে পারবে।

আনন্দধারা : পুরস্কার প্রাপ্তি বা সম্মাননা প্রাপ্তি নিয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই?

আবদুস শাকুর শাহ : পুরস্কার শিল্পীকে সবসময় উৎসাহিত করে। একটা সময়ে গিয়ে শিল্পীকে বিভিন্ন সম্মাননা বা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এতে শিল্পীর কাজের স্পৃহা আরো বেড়ে যায়।

আনন্দধারা : তরুণ শিল্পীদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতেন?

আবদুস শাকুর শাহ : এই শতাব্দীর অর্থাৎ এই যুগের যারা তরুণ শিল্পী তাদের সঙ্গে আমাদের যুগের শিল্পীদের কোনোভাবেই তুলনা করা যায় না। কারণ, এ যুগের তরুণ শিল্পীরা চাইবে খুব দ্রুত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে। সঙ্গে তার আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের কথাও ভাববে। এটার সঙ্গে যেটা অতিরিক্ত সুবিধা তারা পাচ্ছে, তাহলো ইন্টারনেটে। ইন্টারনেটের কিছু ভালো দিক আছে, আবার খারাপও আছে। ভালো যেটা আছে তাহলো, অনেক পুরনো শিল্পীদের কাজ দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে ইন্টারনেট। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমাদের এই সুযোগটা ছিল। আমরা অনেক আগের বড় শিল্পীদের কাজ দেখার সুযোগ পাইনি। এখানকার নতুন ছেলেমেয়েরা যারা ছবি আঁকে আর সব বড় আর্টিস্টদের ছবি দেখার সুযোগ পায়, তারা ভাবে আমিও এমন বড় বড় কাজ করব না কেন? খুব অল্প বয়সেই বড় বড় কাজ করতে চায়। চট করেই এক্সিবিশন করে ফেলে, ক্যাটালগ বানিয়ে ফেলে। আমাদের সময় আমরা এক্সিবিশনে ক্যাটালগ করার সুযোগ কম পেতাম। তাও শুধু একটা ফাইলের মতো দুই পৃষ্ঠার ক্যাটালগ হতো। আমাদের সময়ে ২০০ টাকা দিয়ে সারা বছরের পেইন্টিংয়ের সরঞ্জাম পাওয়া যেত। এখন প্রতিদিনই ২০০ টাকা খরচ করা লাগে। এই বাস্তবতা ও ইন্টারনেট দুটোর সংস্পর্শে এসে এ যুগের তরুণ আর্টিস্টরা খুব দ্রুত সফলতা অর্জনের দিকে ঝুঁকছে।

শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ সব সময় নিজের দেশকে নিয়ে ছবি এঁকে গেছেন। তরুণদেরও আহ্বান করেন নিজের দেশকে নিয়ে তাদের শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্য। দেশের ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে অসীম অবদান রেখেছেন এবং রাখছেন গুণী ও জ্ঞানী এ শিল্পী।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।