কখনো চিন্তাও করিনি ডিজাইনার হব

ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন শাহনাজ সুলতানা। সবসময় ছবি এঁকেছেন মনের মতো করে। কিন্তু চারুকলায় ছবি আঁকা নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ তার হয়ে ওঠেনি। পড়াশোনা করেছেন হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে। কিন্তু পেশাগত দিক থেকে হয়েছেন একজন ডিজাইনার উদ্যোক্তা। ঘুরে-ফিরে ছবি আঁকা নিয়েই তিনি তার জীবন সুন্দর করেছেন। তার ছোট্ট উদ্যোগ, রংধনু ক্রিয়েশনস নিয়ে গল্প করলেন আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : আপনার হিসাববিজ্ঞানী না হয়ে ডিজাইনার হওয়ার ইচ্ছার পেছনের গল্পটা কী?

শাহনাজ সুলতানা : আমি বরাবরই মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া মেয়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ার কারণে ছবি আঁকা বা শেখা সেভাবে সম্ভব হতো না। ছবি আঁকার চেয়ে তখন পড়াশোনায় মনোনিবেশ করাটাই উত্তম ছিল। পরিবার থেকে এমনটাই আশা করত তাই। স্কুলে পড়া অবস্থায় আমি খুব কম নম্বর পাওয়া ছাত্রী। শুধু আঁকতে বেশি ভালোবাসতাম। ওইখান থেকেই যেই আঁকার আগ্রহটা ছিল, সেটাকে ধরে রাখতে শুরু করি। যখন নবম-দশক শ্রেণিতে পড়ি, তখন মানুষের পরিধানকৃত ব্লকের জামাগুলো আমার নজর কেড়ে নিত। তখন আমি ভাবতাম ব্লকের ছাঁটগুলো থেকে আইডিয়া নিয়ে তুলি দিয়ে কোনো কাজ করা যায় কিনা, এই ভাবনা থেকে কাজ শুরু করি। যদিও তখন আমি অনেক ছোট বিধায় আমার হাতও ছিল আনাড়ি। তাই খুব বেশিদূর এগোতে পারিনি। তারপর আমি আবার শুরু করি, আমার মেয়েটা পৃথিবীতে আসার পর। আমি যখন প্রথম গর্ভবতী হই, তখন আমি চট্টগ্রামে একটি চাইনিজ কোম্পানিতে চাকরি করতাম। আমার গর্ভবতী হওয়াটা নিয়ে ওই অফিসের আপত্তি ছিল। সুতরাং আমার চাকরিটা চলে যায়। ওই সময়টাতে আমি বেশ অসুস্থও ছিলাম। তারপর যখন সুস্থ হলাম, তখন সময় কাটানোর জন্য কিছু করার ছিল না আমার। তাই সময় কাটানোর জন্য টুকটাক কাজ শুরু করলাম। বিভিন্ন কাজ করে বন্ধুদের গিফট করতাম। ওই সময় আমার কাজ দেখে বন্ধুরা আমাকে পুশ করতে থাকে। বলে তুমি এত সুন্দর ছবি আঁকো, এত ভালো কাজ কর তুমি তাহলে একটা ব্যবসা শুরু কর। ওরা যখন বলেছিল, তখন আমি খুব একটা চিন্তা করিনি ব্যবসা নিয়ে। পরে ওরাই বলল, আমরা আর কত তোমার থেকে গিফট নেব? এখন থেকে তুমি বিক্রি করবে। যদি রাজি থাক তাহলেই আমরা তোমার থেকে জিনিসপত্র নেব। তারপর ওরাই আমাকে মেয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত করল। মেয়ে নেটওয়ার্কে যাওয়ার পর ফোয়ারাকে দেখলাম, শৈলী আপুকে দেখলাম, আরো যত স্ট্রং লেডিস আছে সবাইকে আমি পেলাম মেয়ে নেটওয়ার্কে। ওখান থেকেই একদম পুরোদমে ‘রংধনু ক্রিয়েশনস’-এর পথচলা শুরু হলো।

আনন্দধারা : ডিজাইনার হওয়ার ইচ্ছাই ছিল সবসময়?

শাহনাজ সুলতানা : একদমই ছিল না। কখনো চিন্তাও করিনি যে ডিজাইনার হব। পড়াশোনাও ছিল অন্য বিষয়ে। তাই ডিজাইনার হওয়ার কথা কখনো মাথাতেই আসেনি। আমার শুধু ইচ্ছা ছিল আমি ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং নিয়ে কিছু জানব। একটা কোর্স করব। ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে কখনই ভাবিনি। আমি কাপড়-চোপড়ের বেলায় একদমই খুঁতখুঁতে নই। যেমন আমার দর্জিরা আমার দেয়া কোনো গলার ডিজাইন ভুল করে অন্যটা দিয়ে দিলেও আমি কিছু বলতাম না। আর এখন আমি কাপড় নিয়েই কাজ করছি।

আনন্দধারা : শুরুতে কেমন ছিল আর এখন কেমন আছে ‘রংধনু ক্রিয়েশনস’?

শাহনাজ সুলতানা : আমি কাজ শুরু করি কুশন কভার থেকে। আমি আগে ইউটিউবে খুব এক্সপ্লোর করতাম। তখন ব্রাজিলিয়ান কিছু পেইন্টিং চ্যানেলের কাজ দেখতাম। ওই কাজগুলো আমার নজর কাড়ে। ওরা কাজ করত কাপড়ের ওপর। কাপড়ের ওপর বিভিন্ন রঙের পেইন্টিং করত ওরা। ওদের কাজগুলো কাপড়ে অ্যাপ্লাই করার কথা ভেবে আমি কাজ করা শুরু করি। ওই কাজগুলো দেখার পর একটু মোটা কিছু কাপড় কিনে সেগুলোতে পেইন্ট করে কুশন কভার বানাই। তারপর বানাই ব্যাগ। এ ধরনের পেইন্টিং কাপড়ের মধ্যে করে তা নিয়ে ব্যাগ। এরপর ভাবলাম জামাকাপড়ে এ কাজ করার কথা। তারপর ক্যানভাসেও কাজ করলাম। এভাবে একটার সঙ্গে একটা লিংকড কাজ করলাম। আমি শুরু করেছিলাম ছোট জিনিস কুশন দিয়ে। তারপর কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী একই কাজ কামিজ ও শাড়িতেও করলাম। পরে আস্তে আস্তে ডিজাইনে ভিন্নতা আনলাম। এখনো এভাবেই চলছে।

আনন্দধারা : হ্যান্ডপেইন্টিং ছাড়া আর কী পাওয়া যাবে ‘রংধনু ক্রিয়েশনস’-এ?

শাহনাজ সুলতানা : হ্যান্ডপেইন্টিং ছাড়া আরো বিভিন্ন প্রডাক্টস আমার এখানে আছে। যেমন- ব্লকের কাজ করি, বিডসের কাজ করি, হুপ আর্ট করি। ক্লে দিয়ে বিভিন্ন গয়না বানাই, বিডস দিয়ে মালা বানাই। কিছু না কিছু আমি বানাতেই থাকি। একদম কিছু না করে আমি বসে থাকতে পারি না। এক সময় যখন আমার মেয়ে বড় হচ্ছে আর ওকে সময় দেয়াটা প্রয়োজন মনে হলো, তখন আমি ছবি আঁকার সময় পেতাম না। তখনই কাজটা একটু পরিবর্তন করে বিডসের কাজে গেলাম। এভাবে যখন যেটা আসত তখন সেটা করতাম।

আনন্দধারা : ‘হুপ আর্ট’ বিষয়টা কী?

শাহনাজ সুলতানা : ‘হুপ’ অর্থ হলো গোল কোনো কিছু। মানে চাকতির মতো। এটা মূলত কোনো মেমোরিকে ছোট গোল কোনো কিছুতে ধরে রাখা হ্যান্ডিক্রাফটের মাধ্যমে। আমাদের দেশে যেমন নকশিকাঁথা হয়, তেমনি বাইরের দেশে এই হুপ আর্টটা খুব পরিচিত। ‘হুপ আর্ট’ পুরোপুরিই সুতোর কাজ। আমি খুব বেশিদিন হয়নি হুপ আর্ট করছি। পরে করব আরো অনেক কাজ।

আনন্দধারা : নামটা ‘রংধনু ক্রিয়েশন্স’ কেন?

শাহনাজ সুলতানা : আমি রং ভালোবাসি। রংয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই রংধনু। ২০১২ সালে ‘রংধনু’ নামে একটা পেজ খুলি ফেসবুকে। সেটা কোনো ব্যবসার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। আমি নিজে যেসব কাজ শুরু করতাম, সেগুলোর ছবি ওখানে রেখে দেয়ার জন্য চেষ্টা করতাম। কারণ আগে দু’বার আমার ল্যাপটপ ক্র্যাশ করে আমার কাজের সব ছবি হারিয়ে যায়। তাই আর যেন না হারায় সেই ব্যবস্থা করলাম। পেজে ছবিগুলো রেখে তখন ‘রংধনু’ নামের পেজে কোনো ফলোয়ারস ছিল না। কারণ ব্যবসার উদ্দেশ্য নিয়ে খুলিনি পেজ। কিন্তু যখন ব্যবসা শুরু করলাম তখন এই পেজটাকেই কাজে লাগিয়েছি। চারপাশে অনেক রংধনু নামের ব্যবসায় উদ্যোগ থাকায় আমার ‘রংধনু’ একটু পরিবর্তিত হয়ে হলো ‘রংধনু ক্রিয়েশনস’। খুব কনস্ট্রাকটিভভাবে ভেবে নাম না দিয়েও সাধারণভাবেই তো অনেক কিছু করা যায়। যেমন- মানুষ এখন আমার ব্যবসা উদ্যোগকে ‘রংধনু ক্রিয়েশনস’ নামেই চেনে।

আনন্দধারা : আপনার পরিবার থেকে কাজে সহযোগিতা পাচ্ছেন?

শাহনাজ সুলতানা : প্রথম দিকে আমাকে কেউই তেমন সাপোর্ট করেনি। কারণ আমার বরাবরই পড়াশোনা অন্য লাইনে ছিল। রেজাল্টও ভালো ছিল। আবার বাসার সবই আগাগোড়া ভালো ভালো সেক্টরে কাজ আছেন। আমার ছোট বোনটাও ডাক্তার, সেইদিক থেকে ভেবে হয়তো প্রথম দিকে কেউ সাপোর্ট করেনি। তবে কাজ করে যখন চারদিক থেকে মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি, অ্যাপ্রিসিয়েশন পাচ্ছি, তখন সবাই আস্তে আস্তে সাপোর্ট করা শুরু করল। আর এখন পরিবারের সবাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করে। আমার হ্যাজব্যান্ড এবং আমার মেয়ে যদি কো-অপারেটিভ না হতো, তাহলে আমি বোধহয় এ কাজ করতে পারতাম না।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।