নীলফামারীর নীলসাগরে আন্তর্জাতিক চারুকলা উৎসব

শিল্পচর্চার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদে, তরুণ আর গুণী শিল্পীদের মিলনমেলায় নীলফামারীর নীলসাগরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক চারুকলা উৎসব। উৎসবের প্রথম দিন সকাল ১০টা থেকে নীলসাগর চত্বরে জমায়েত হতে থাকেন ক্ষুদে ও তরুণ শিল্পীরা। বেলা ১১টায় গোটা নীলসাগর চত্বর পরিণত হয় শিল্পীর মিলনমেলায়। উৎসব সফল করতে বিভিন্ন শিল্পকর্ম দিয়ে শিল্পীরা সাজিয়ে তোলেন উৎসবস্থল। দ্বিতীয় দিনে যে যার মতো করে ছবি এঁকে বিকালে যোগ দেয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিশুশিল্পীরা সেখানে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির ঝলক দেখে মনের কোঠায় আঁকে নানান ছবি। মনের কোঠায় আঁকা সেই ছবি তারা কাগজে রূপ দেয় রঙের ছোঁয়ায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আঁকে ফুল আর ফুলের বাগান। আবার কেউবা গ্রামীণ দৃশ্য। তরুণ শিল্পীরা তাদের রঙের ছোঁয়ায় পশু, পাখি, গাছ, গরুর গাড়ি, গ্রামীণ ঘরবাড়ির নানা দৃশ্য এঁকে প্রকাশ করে নিজেদের প্রতিভা। ছবি আঁকার ফাঁকে থেমে থাকেনি তাদের হৈ-হল্লা। আনন্দঘন পরিবেশে ছবি এঁকে নীলফামারীর নীলসাগরের উৎসবকে আনন্দমুখর করে তোলে শিশুরা। ১৫০ শিল্পমনা স্বেচ্ছাসেবীর সহযোগিতায় ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া চারদিনের এই উৎসবটি শেষ হয় ২৯ ফেব্রুয়ারি। উদ্বোধনী এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উৎসব আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক নীলফামারী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ। এছাড়া অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন বরেণ্য শিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান, নীলফামারী পৌরসভার মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ, জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মমতাজুল হক।

অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘শিশুরা উৎসবে এসে গুণীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আনন্দভরে যেভাবে ছবি আঁকছে তারা ভবিষ্যতে যে শিল্পী জয়নুল আবেদীন বা রফিকুন্নবী হবে না সেটি বলা অসম্ভব। হয়তো তারা তাদের থেকেও বড় শিল্পী হতে পারবে। আমি অভিভাবকদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, তাদের এ কাজে উৎসাহ দেয়ার জন্য।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, ‘ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শিল্পচর্চায় যেভাবে এগিয়ে আছে, এই উৎসবের মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গও এগিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।’ বরেণ্য শিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী বলেন, ‘ছবি এঁকেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে শিল্পী কামরুল হাসান ছবি এঁকে প্রতিবাদ করেছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ব্রিটিশ শাসনামলে দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কার্টুন করে প্রতিবাদ করেছিলেন, যা বিশ্বের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।’

উৎসবে অংশ নিতে পেরে উৎফুল্ল ক্ষুদে শিল্পীরা। তাদের মধ্যে অষ্টম শ্রেণির নূরে রাহেনা আক্তার একজন। দ্বিতীয় দিনে তাকে ফুলবাগানের পাশে বসে দেখা গেছে ফুলের ছবি আঁকতে। অনুভূতি প্রকাশ করে সে বলে, ‘ছবি আঁকতে আমার অনেক ভালো লাগে। বড় শিল্পীদের সান্নিধ্যে থেকে ছবি আঁকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’ একই শ্রেণির শিক্ষার্থী অদিতি রায় বলে, ‘এমন একটি বড় আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে পেরে খুশি আমি। আমার জীবনে এটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। জীবনে আর এমন সুযোগ পাব কিনা ভাবতে পারছি না।’ একই অনুভূতি প্রকাশ করে ক্ষুদে শিল্পী তমালিকা রায়, শাহরিয়ার রাফাতসহ অনেকে।

চারুকলা উৎসবটির আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস এবং কিউরেটর সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ টুটুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গুণী শিল্পী, চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিমনা কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে বাস্তবায়ন হয় এই উৎসব। আর এ উৎসবে সহযোগিতা করছে স্থানীয় সংগঠন ভিশন-২০২১ এবং ঢাকার আর্ট বাংলা।

আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ টুটুল বলেন, শিল্পচর্চার মাধ্যমে রুচিশীল ও সংস্কৃতিমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং কয়েক প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উৎসবের এই আয়োজন। বাংলাদেশের বরেণ্য ও তরুণ শিল্পীরা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, রুমানিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, জার্মানি ও ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ১২ জন স্বনামধন্য শিল্পীও অংশগ্রহণ করেছেন এ উৎসবে। তাদের সান্নিধ্যে নীলফামারী জেলা ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০০ শিক্ষার্থী টানা চারদিন শিল্পকর্ম নির্মাণের সুযোগ পেয়েছে। এই উৎসবে ছিল আন্তর্জাতিক আর্টক্যাম্প, কনটেম্পোররি আর্ট প্রজেক্ট, শিল্পকর্ম প্রদর্শনী, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কারুশিল্প মেলা ও লোক সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় উপস্থাপন। এর আগে জয়পুরহাট ও গাজীপুরে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে।’ হারুন অর রশিদ জানান, কারুশিল্প প্রদর্শিত হয়েছে ২০ স্টলে। উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন ১৬০ জন শিল্পী। এর মধ্যে ১০০ জন তরুণ।’

উৎসবে আঁকা চিত্রকর্মগুলোর প্রদর্শনী হয় ২৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর ২৪ এপ্রিল দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে। উৎসবের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ‘শিল্পচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ইতিবাচক কাজের দিকে ধাবিত হবে এটিই আমাদের উদ্দেশ্য। উৎসবের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শিল্পী বানানো নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্ম যেন শিল্পমনার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হয়।’

ছবি : শেখ মেহেদী মোরশেদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।