‘বিভিন্ন ভাষার মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই’

প্রবাসী একজন ডাক্তার ডা. সাইফুদ্দৌলা খান। যেসব বাঙালি দেশের বাইরে থাকেন, তাদের দেশের প্রতি অনেক টান থাকে। টান থেকেই তারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। তেমনই একটা উৎসবের আয়োজন করেছিলেন ভাষা ফেস্টিভ্যাল নামে। সেসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে।

রাফি হোসেন : এই ভাষা ফেস্টিভ্যালটা আসলে কী?

সাইফুদ্দৌলা খান : ভাষা ফেস্টিভ্যাল এই বছর ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে করেছি। ফেব্রুয়ারি বা তার কাছাকাছি সময়ে করতে চাচ্ছি। এই বছর চেষ্টা করেছিলাম ফেব্রুয়ারি মাসেই এটা করতে। কারণ ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস, ভবিষ্যতে এটা ফেব্রুয়ারিতেই থাকবে কিনা বলা মুশকিল।

রাফি হোসেন : কোনো চিন্তাভাবনা থেকে এমন পরিকল্পনা করেছেন?

সাইফুদ্দৌলা খান : আমরা যারা গ্লাসগোবাসী বাঙালি তাদের ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনস গ্লাসগো’ নামের একটা সংগঠন আছে। ১৯৭১ সাল থেকে এটি রয়েছে। ২৫ মার্চ কালরাতের পর তৎকালীন পাকিস্তানের যে ছাত্র সমিতি ছিল, তারা সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে এই সংগঠনটি তৈরি করে। সংগঠনের ক্ষেত্রে যেটা হয় একটা প্রজন্ম যে সংগঠনটা চালায় সেটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যায়। ২০১৩ সাল থেকে আমরা এটাকে আবার সঞ্জীবিত করি। আর দশটা সংগঠনের মতো আমরা প্রতিটা অনুষ্ঠান করব এমন ইচ্ছা আমাদের ছিল না। যারা বাইরে থাকি তারা সবাই কোনো না কোনো পেশার সঙ্গে জড়িত, তাই দেশের প্রতিটা দিবস নিয়ে অনুষ্ঠান করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আমরা চাই যে উন্নতমানের অনুষ্ঠান করতে এবং আয়োজনটা শুধু বাঙালিদের মধ্যে না রেখে স্কটিশদের এবং বিভিন্ন ভাষার মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। ২০১৪ সালে গ্লাসগোতে যখন কমনওয়েলথ গেম হয়, তখন আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশি দলকে সংবর্ধনা দেই। এবং স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বেশিবার কমনওয়েলথ পদক জেতা পিটার হেন্থলি, তাকে আমরা বিশেষ সম্মাননা দেই। ২০১৫ সালে নববর্ষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। ভাষা নিয়ে চিন্তা করলাম যে আমাদের আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসকে গ্লাসগোর পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে উপস্থাপন করতে পারি। গ্লাসগোর লোকজনের কাছে কীভাবে তুলে ধরতে পারি, তাদের এটার সঙ্গে জড়িত ও আকর্ষিত করতে পারি। সব ভাষার মানুষদের যদি এটার সঙ্গে জড়িত করতে পারি, তাহলে এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। অক্টোবর ২০১৭ সালে এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। প্রথমে গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তারা আমাদের গ্লাসগো মিউজিয়ামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ভাষা নিয়ে যারা কাজ করে তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। তাদের কাছে আমাদের এই পরিকল্পনাটা খুবই আবেদনময় মনে হয়েছে এবং তারা এগিয়ে এসেছে।

রাফি হোসেন : ন্যাশন্যাল ফেস্টিভ্যাল অব স্কটল্যান্ডে আপনাদের নাটক প্রদর্শনী করেছিলেন সেই সম্পর্কে জানতে চাই?

সাইফুদ্দৌলা খান : ন্যাশন্যাল ফেস্টিভ্যাল অব স্কটল্যান্ড ২০১৬ সালে তাদের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই আয়োজন করেছিল। আমরা সেখানে গ্লাসগোর হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। ফেস্টিভ্যালটার মূল বিষয় ছিল হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে। আমাদের সংগঠনের কেউ কোনো দিন থিয়েটার করেনি। ন্যাশন্যাল ফেস্টিভ্যাল অব স্কটল্যান্ডের মূল উদ্দেশ্যই হলো তারা আপামর জনতার কাছে থিয়েটার ছড়িয়ে দিতে চায়। আমাদের প্রদর্শনী ছিল প্রথম দিন এবং সেদিন আমরাই ছিলাম মূল আকর্ষণ। গ্লাসগোয় বসবাসকারী তিনজনের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে তিনটি ছোটগল্প সেখানে উপস্থাপন করি। আমাদের নাটকের নাম ছিল ‘মেমোরাই’। একটা করি অডিও ড্রামা যেটার ভাষা ছিল ইংরেজি। আর একটা করেছিলাম প্রপার থিয়েটার, সেটা বাংলায়। গ্লাসগোর ঐতিহাতিক ট্রামওয়ে থিয়েটারে সেগুলো প্রদর্শনী হয়েছিল। স্যার পিটারব্রুকের মহাভারত নাটকের জন্য থিয়েটারটা তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার গল্প হলভর্তি দর্শকের সামনে আমরা বলেছি।

রাফি হোসেন : তাহলে ভাষা ফেস্টিভ্যাল নিয়ে আপনাদের পরিসরটা তো অনেক ব্যাপক?

সাইফুদ্দৌলা খান : আমরা এটা নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। যেহেতু গ্লাসগোতে অনেক ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে, তাই চেষ্টা করে যাচ্ছি এই ফেস্টিভ্যালটার যেন নিজস্ব স্বকীয়তা থাকে। এই ফেস্টিভ্যালের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন গ্লাসগোর ইউনেস্কোর কর্তা প্রফেসর অ্যালিসন ফিপ্স। তিনি এই ফেস্টিভ্যালের থিমটা দিয়েছেন। সেটা হচ্ছে ‘আউয়ার গিফট টু গ্লাসগো’। তিনি সবসময় আমাদের বলেন তোমরা কখনো তোমাদের গল্পটা ভুলবে না। আমাদের এখন মূল উদ্দেশ্য এটাকে সাহিত্যের আকার দেয়া। ভাষাভিত্তিক যে বিষয়গুলো রয়েছে, সবকিছুকে জড়িত করা। শুধু ভাষা নিয়ে কথা বললে এটা ছোট পরিসরে হবে। যারা ভাষাবিদ না তারাও যেন এটা নিয়ে আগ্রহবোধ করতে পারে। এই বছর আমাদের আয়োজনে গান, কবিতা, অভিনয়, সবকিছুই ছিল। আমরা এভাবেই ফেস্টিভ্যালটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। যারা গ্লাসগোতে ভাষা নিয়ে কাজ করে তারা সবাই আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ইরান থেকে অর্থনীতিবীদ, কুর্দিশ গায়ক, চাইনিজ মিউজিশিয়ান, প্যালেস্টানিয়ান কবি তারা ফেস্টিভ্যালে এসেছিলেন। ক্যালিক ভাষার গায়ক এসে একটা বিশেষ কবিতা রচনা করেছেন এবং সেটা আমাদের ভাষাশহীদের উৎসর্গ করেছেন। একজন বিশেষ মানুষ এসেছিলেন জেনি সিলি তিনি সারা বিশ্বের ডিজেবল থিয়েটারের পথিকৃৎ। এ সবকিছু নিয়ে খুব আশাবাদী।

রাফি হোসেন : আমার মনে হচ্ছে এটা খুবই আকর্ষণীয় প্রকল্প। এখানে বিভিন্ন দেশের সবার অংশগ্রহণ দেখতে পাচ্ছি। সামনে আরো মানুষের কাছে এটা পৌঁছাবে এবং বাংলাদেশকে আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবে এই কামনা করি।

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।