‘রূপবানকে বিট করতে পারেনি উর্দু ছবি’

‘রূপবান’ খ্যাত অভিনেত্রী সুজাতা আজিম দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা লাভ করেছেন এই অভিনেত্রী। আননন্দধারার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন তার চলচ্চিত্র জীবনের অনেক কথা। সেই একান্ত সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য।

আনন্দধারা : অভিনয়ের প্রতি কীভাবে আগ্রহী হলেন?

সুজাতা আজিম : ৪০ টাকা বাড়িভাড়ায় নতুন ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে থাকতাম। একদিন আলাপ প্রসঙ্গে বাড়িওয়ালার ভাই মাকে বললেন, তার সঙ্গে মঞ্চের পরিচালক আমজাদ হোসেনের পরিচয় আছে। মা তাকে অনুরোধ করে বললেন, বাবা আমার ছোট মেয়েটাকে যদি অভিনয়ে দিতে পারতাম, তাহলে খুব ভালো হতো। আমজাদ হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের সুযোগ করে দিলেন। ঢাকায় অনেক মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছি। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র পরিচালক নারায়ণ ঘোষ মিতা, নারায়ণ চক্রবর্তী, আমজাদ হোসেনের অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। নাজমুল হুদা বাচ্চু, ইউসুফ ইমামের নাটকেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এসব মানুষের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

আনন্দধারা : সিনেমায় কীভাবে এলেন?

সুজাতা আজিম : ‘রূপবান’ খ্যাত সালাহউদ্দিন সাহেব তার ‘ধারাপাত’ সিনেমার জন্য একটি নতুন মুখ খুঁজছিলেন। আমজাদ ভাই তখন তার সহকারী পরিচালক ছিলেন। তখনই আমি আমজাদ ভাই পরিচালিত ‘মায়ামৃগ’ নাটকে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছিলাম। তিনি আমার কথা বললেন। ধারাপাত নাটকটির মঞ্চায়নের দিন আমার অভিনয় দেখে তার পছন্দ হলো। সিনেমায় একটি নাচের দৃশ্যের মাধ্যমে আমার প্রথম আগমন। সেই ছবিটির নাম ছিল ‘দুই দিগন্ত’; প্রেক্ষাগৃহে প্রথম মুক্তি পেয়েছে ‘ধারাপাত’।

আনন্দধারা : ‘রূপবান’ সিনেমায় অভিনয়ের কথা  কতটা মনে পড়ে?

সুজাতা আজিম : ১৯৫৫ সালে ‘রূপবান’ নামের ছবি তৈরি করলেন, সেটির পেছনেও তার এ দেশপ্রেমই প্রধান ছিল। তখন পুরো পূর্ব পাকিস্তানেই উর্দু ছবি বানানোর হিড়িক চলছিল। এই বাংলার মানুষকে বাংলা ছবি দেখতে আগ্রহী করে তুলতে তিনি একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আমাদের দেশের যাত্রা-লোকগাথা ‘রূপবান’কে নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির করলেন। ছবিতে আমি ১২ দিনের ছেলের ১২ বছরের স্ত্রী। এ ছবিটি আমার ক্যারিয়ারের সেরা ছবি হয়ে আছে। এই ছবিতে অভিনয় করার সময় আমাদের অনেক ঝামেলা ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এফডিসিতে ঢুকলেই আমাকে দেখে অনেকে বলত, এই দেখ যাত্রার নায়িকা যাচ্ছে।  রূপবান নিয়ে চারদিকে এত যে সমালোচনা শুনছি, তাতে ছবিটি মুক্তি পেলে আর কোনো ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পাব তো। কয়েক মাস ‘রূপবান’ একেকটা সিনেমা হলে চলেছে। সেই সময়ে কোনো উর্দু বা বাংলা ছবিই রূপবানকে বিট করতে পারেনি।

আনন্দধারা : রূপবানকে নিয়ে আপনার তো অনেক স্মৃতি।

সুজাতা আজিম : আমরা একবার সিলেট থেকে ফিরছি। ট্রেন দেরিতে আসবে জেনে স্টেশন মাস্টার আমাকে, মাকে আর চন্দনাকে (‘রূপবান’-এর তাজেল) তার রুমে খাতির করে বসতে দিলেন। আমরা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর ১০-১২ জন মহিলা ফুলের মালা, পূজার থালা, পঞ্চপ্রদীপ নিয়ে আমাদের রুমে এলেন। আমরা তো অবাক। তারা এসেই আমাকে পূজা করতে লাগলেন। আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।

আনন্দধারা : অভিনয় জীবনের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর কথা জানতে চাই।

সুজাতা আজিম : ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘মোমের আলো’, ‘মেঘভাঙা রোদ’, ‘ডাক বাবু’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘এতটুকু আশা’, মহিউদ্দিন ভাইয়ের ‘গাজী-কালু-চম্পাবতী’, খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘রাজাসন্ন্যাসী’, নুরুল হক বাচ্চুর ‘বড় বউ’, বশির আহমদের ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’, সফদার আলী ভুঁইয়ার ‘কাঞ্চন মালা’, ইবনে মিজানের ‘জরিনা সুন্দরী, ‘নাগিনীর প্রেম’, নাজমুল হুদা মিঠুর ‘অনেক প্রেম অনেক জ্বালা’, কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’, আজিম পরিচালিত ‘টাকার খেলা’, ‘প্রতিনিধি’, ‘বদলা’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’, হাসান ইমাম পরিচালিত ‘লালন শাহ’, ইবনে মিজান পরিচালিত ‘তিতুমীর’, ‘নাগিনীর প্রেম’, ‘আমির সওদাগর’, ‘ভেলুয়া সুন্দরী’, রাজ্জাক পরিচালিত ‘বেঈমান’, ‘আপনজন’, সুমিতাদির (দেবী) ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘আদর্শ ছাপাখানা’ ইত্যাদি।

আনন্দধারা : নায়ক আজিমের সঙ্গে বিয়ে হলো কবে?

সুজাতা আজিম : ১৯৬৭ সালের জুলাইয়ে আজিম সাহেবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পরও সিনেমায় অভিনয় করেছি।  বিয়ের ১০ বছর পর ১৯৭৭ সালে আমাদের ঘর আলো করে সন্তান ফয়সাল জন্ম নিল। আমি সংসার ও চলচ্চিত্র দুটি দিকই একসঙ্গে চালিয়ে গিয়েছি।

আনন্দধারা : কোনো প্রিয় পরিচালকের কথা মনে পড়ে?

সুজাতা আজিম : পরিচালক ছিলেন কাজী জহির মনের মতো অভিনয় যতক্ষণ না হতো, ততক্ষণ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তিনি ছাড়তেন না। আমরা যারা তার ছবিতে অভিনয় করেছি, তারা জানি, একটি দৃশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয়-সাতবারও টেক দিতে হয়েছে। যতই নামকরা নায়ক-নায়িকা হোন না কেন।  কাজী জহির মানেই ‘হিট’। তার ছবিতে অভিনয় করার জন্য আমরা সবাই মুখিয়ে থাকতাম।

আনন্দধারা : শ্যুটিংয়ের কোনো স্মরণীয় দৃশ্য?

সুজাতা আজিম : ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’ সিনেমার একটি ঘটনা বলি। এই ছবির শ্যুটিং হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। পরিচালক ছিলেন ইবনে মিজান। ছবির সেই দৃশ্যের জন্য একটি শোবার ঘরের আদলে সেট বানানো হয়েছিল। দৃশ্যটি ছিল রাজকন্যা বিছানায় শুয়ে আছে, পাহারাদার সাপগুলো তাকে পাহারা দিচ্ছে। মিজান ভাই দৃশ্যটি বুঝিয়ে দেয়ার সময় খেয়াল করলেন, টেনশন করছি তিনি অভয় দিয়ে বললেন, ‘সাপ বেশি নয়, কয়েকটি মাত্র। তুমি শুয়ে আছো আর তোমার শরীরের ওপর দিয়ে একটি অজগর সাপ আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে- এমন একটি দৃশ্যের শ্যুটিং করব। ভয় পেয়ো না, বেশিক্ষণ লাগবে না। ততক্ষণে মিজান ভাই ক্যামেরা রেডি করে ফেলেছেন। তিনি অ্যাকশন বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম। তখনই সাপুড়ে একটি অজগর সাপকে আমার গায়ের ওপর তুলে দিল। আমি ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছি, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কোনো কিছু বলার উপায় নেই। আমি অনেক কষ্টে শুয়ে আছি।

আনন্দধারা : আর কোনো প্রিয় স্মৃতি?

সুজাতা আজিম : ১৯৭২ সালে ‘এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ হয়েছিল। সেখানে অংশ নেয়ার জন্য আমি, আজিম, হাসান ইমাম, জহিরুল হক ও সরকারি কর্মকর্তা ফারুক মিলে প্রথমে মস্কো গেলাম। এরপর তাসখন্দ। এই উৎসবে ৬৪টি দেশ থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা গিয়েছিলেন। তাসখন্দে আমরা রাজ্জাক, কবরী, ববিতার সঙ্গে মিলে উৎসবে অংশ নিলাম। বোম্বে থেকে রাজ কাপুর ও ঋষি কাপুর উৎসবে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল। একদিন রাত ৮টার সময় হোটেলের রুমে কেউ একজন নক করলেন। দরজা খুলে দেখি, ঋষি কাপুর দাঁড়িয়ে আছেন। ফর্সা, ছিপছিপে অসাধারণ সুন্দর এই অভিনেতা আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি সুজাতা?’ জি। ‘রুমে একটি শ্যাম্পেনের বোতল আছে, আজিম ভাই সেটি দিতে বলেছেন।’ আমি বোতলটি তার হাতে তুলে দিলাম। তারা ‘ববি’ ছবিটি নিয়ে উৎসবে এসেছিলেন। বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে এমন আরো অনেক স্মৃতি আছে।

আনন্দধারা : নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গেও তো অনেক ছবি করেছেন।

সুজাতা আজিম : সিলেটে একটি চা বাগানে ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ছবিটির শ্যুটিং হয়েছিল। মেঘলা আকাশের জন্য ক্যামেরাম্যান কামাল ভাই শ্যুটিং করতে পারছিলেন না। এমন আবহাওয়া টানা কয়েক দিন ছিল। তখন আমি, রাজ্জাক, পরিচালক নারায়ণদা (নারায়ণ চক্রবর্তী) সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই মিলে তাস খেলতে বসে যেতাম। এটি ১৯৭০ সালের ঘটনা। তখন দক্ষিণে যে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল, আমরা টেরও পাইনি। কারণ তখন যোগাযোগব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। খবরের কাগজ পৌঁছতে সময় লাগত। আকাশের মেঘলা অবস্থা ১২ দিন পরে কেটেছিল। সেই সময়ের মধ্যে জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। এই ছবিতে খুরশিদ আলমের কণ্ঠে রাজ্জাকের ঠোঁটে যারা ‘ও দুটি নয়নে, স্বপনে চয়নে’ গানটি শুনেছেন, তারা নিশ্চয়ই ছবিটির কথা ভুলতে পারবেন না। এই গানটির শ্যুটিংয়েও অনেক মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমি আর রাজ্জাক পাহাড়ের ওপর বসে আছি। কামাল ভাই ক্যামেরা রেডি করছেন। রাজ্জাক একটু দুষ্টু ছিল। কো-আর্টিস্টদের সঙ্গে সারাক্ষণ সে মজা করত, সবাইকে হাসি-খুশি রাখত। সিলেট কিন্তু চীনা জোঁকের জন্য বিখ্যাত। রাজ্জাক জানত, আমি জোঁককে খুব ভয় পাই। তার পরও সে আমার পাশে বসে একের পর এক জোঁকের গল্প করে চলেছে আর আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। সে বলছে- ‘ম্যাডাম, সিলেটের এই চীনা জোঁক কিন্তু খুব বিপজ্জনক। একবার যদি আপনাকে কামড়ে ধরে, তাহলে আর ছাড়াতে পারবেন না।’ আমি তো ভয়ে শিউরে উঠছি, এর মধ্যে একটি জোঁক আমার গায়ে উঠে গেল। সেটি আমি নই, রাজ্জাকই খেয়াল করল। বলল, ‘আপনি একটুও নড়বেন না। আপনার গায়ে জোঁক উঠে গেছে।’ তবে ভয়ে অনেক লোকের সামনেই মোড়া থেকে উঠে আমি লাফাতে শুরু করলাম। রাজ্জাক তখন উপস্থিত বুদ্ধিতে আমাকে শান্ত করল, ‘আপনি চুপ করে বসুন। নইলে আমি জোঁকটি ফেলব কী করে?’ এরপর শ্যুটিংয়ের জিপের ড্রাইভার আমার বাঁ কানের নিচ থেকে জোঁকটি ধরে ফেলে দিল। সহশিল্পী হিসেবে রাজ্জাক খুবই আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ ছিল। তার সঙ্গে অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছি। সেগুলোর প্রায় সবই জনপ্রিয় হয়েছে। রাজ্জাকের সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে আমরা কেউ বোর ফিল করতাম না।

 আনন্দধারা : আপনার সময়ের অনেকেই অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।

সুজাতা আজিম :  এখনো অভিনয় করে যাচ্ছি, কারণ অভিনয়কে ভালোবাসি। এখন একা হয়ে গিয়েছি। আমার ছেলে বড় হয়েছে, তার কাজকর্ম আছে। নাতিরাও বেশ বড় হয়ে গেছে। তারা আমাকে কতটুকুইবা সময় দিতে পারে? এই আশা করাও আমার অন্যায়। তাদের নিজস্ব জগৎ আছে। এসব কারণেই আমি কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে চাই। তাছাড়া সবারই তো টাকার প্রয়োজন, তাই না? ফলে ঘরে বসে স্মৃতি মন্থন করার চেয়ে বাইরে সবার সঙ্গে গল্প করে, শ্যুটিং করে কাটিয়ে দেয়াই ভালো মনে করি। তাই এখনো আমি কাজ করে যাচ্ছি।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।