পুরস্কার প্রাপ্তি সবাইকেই অনেক অনুপ্রাণিত করে

খুব অল্প বয়সে শিক্ষকতা করতে দেখা যায় অনেককেই। কিন্তু এত কম বয়সে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে একাধারে শিক্ষকতা ও ডিরেক্টর অব স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পদবি পাওয়া এবং দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা কিন্তু চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এমনই একজন শিক্ষিকা পারিসা শাকুর। অসম্ভব সুন্দর মনের এই মানুষটির সঙ্গে নারী দিবস উপলক্ষে আলোচনা হয়েছিল আনন্দধারার।

আনন্দধারা : একজন সফল শিক্ষক হওয়ার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কে?

পারিসা শাকুর : আমি কতটুকু সফল তা আমি ঠিক বলতে পারব না। শুধু এতটুকু বলতে পারি যে, আমি আমার প্রফেশনকে যা দিতে পেরেছি তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি। এদিক থেকে আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবতী। আর এত কিছু পেয়েছি যাদের কারণে, তারা হলো আমার ছাত্র-ছাত্রীরা। আমার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই আমি আমার কাজের স্পৃহা খুঁজে পাই। তারুণ্যই আমাকে সর্বদা অনুপ্রাণিত করে।

আনন্দধারা : আপনার আদর্শ কে?

পারিসা শাকুর : আমি যখন লন্ডন ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিক্সে পড়তাম, তখন আমার একজন শিক্ষিকা ছিলেন। তার নাম ছিল সিলভিয়া চান্ট। তিনি অসম্ভব জ্ঞানী একজন মানুষ এবং অসম্ভব পরিশ্রমীও ছিলেন। আমি যখন তার ছাত্রী ছিলাম তখন তার বয়স ৬০ বছরের বেশি। কিন্তু তার এনার্জি দেখে মনে হতো তিনি পঁচিশ বছরের একজন তরুণী। তিনি খুব হাস্যোজ্জ্বল ও ফ্যাশন সচেতন ছিলেন। তবে ক্লাস করতে পারাটাই অনেক বড় ব্যাপার ছিল আমার কাছে। আমি তাকেই আমার আদর্শ মেনেছি সবসময়।

আনন্দধারা : শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আপনার যাত্রাটা কেমন ছিল?

পারিসা শাকুর : আমি জীবনের প্রথম ধাপ থেকেই অনেক ভাগ্যবতী। সবসময় সব দিক থেকে আমি সহযোগিতা পেয়েছি। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে জিনিসটা আমাকে আজকের আমি হওয়ার জন্য সহযোগিতা করেছে তাহলো আমার সংকল্প। আমি সবসময় নিজের কাজ নিয়ে খুব দৃঢ়সংকল্প ছিলাম, এখনো আছি।

আনন্দধারা : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

পারিসা শাকুর : আমি যেহেতু অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছি, সেই দিক থেকেই আমি দেশের অর্থনীতিকে নিয়েই কাজ করতে চাই। আগেও বলেছি, আমাকে সবচেয়ে বেশি জাগ্রত করে তারুণ্য। আমি এ যুগের তরুণদের নিয়ে এদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য কাজ করব এটাই আমার লক্ষ্য। তরুণরা যে ইন্টারনেট এবং ফেসবুকের বাইরে কতটা সৃজনশীল ও শক্তিশালী মস্তিষ্কধারী, সেটা তাদের বোঝাতে চাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করানোর মাধ্যমে।

আনন্দধারা : আপনার এই কর্মক্ষেত্রে আসার পথে কোনো বাধা ছিল কী?

পারিসা শাকুর : আমি কখনো কোথাও বাধা পাইনি। আমি সবসময় যেটা বলি যে, আমি অনেক ভাগ্যবতী। আমার পরিবার, পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব, সমাজ সবদিক থেকেই আমি খুব সাপোর্ট পেয়েছি সবসময়। আমি কর্মক্ষেত্রে সবসময় নিজের যোগ্যতা দিয়েই জায়গা করে নিয়েছি, বাধা পাইনি। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত হয়েছি।

আনন্দধারা : কীভাবে বাধা অতিক্রম করেছেন?

পারিসা শাকুর : বাধা তো কখনো পাইনি। তবে যেসব জায়গায় উৎসাহ দরকার হতো, সেসব জায়গায় নিরুৎসাহ পেয়েছি। আমি একজন ফিমেল বলেই এমনটা হয়েছে হয়তো। যখন মেয়ে বলে এটা পারবে না, ওটা পারবে না অথবা যা করেছে তা মেয়ে হিসেবে অনেক বেশিই করেছে- এই ধরনের কথা কর্মক্ষেত্রে হয়, তখন সেখানে নিজেকে টিকিয়ে রাখার এক এবং একমাত্র উপায় নিজের স্থির সংকল্প। আপনি যদি একবার ঠাহর করেন যে, আমি এটা করবই তাহলে কোনো কিছুই আপনাকে আটকাতে পারবে না।

আনন্দধারা : ১০ বছর পর শিক্ষাগত দিক থেকে বাংলাদেশকে কতটা সমৃদ্ধ দেখতে চান?

পারিসা শাকুর : আমরা যখন ইকোনমিক্সে পড়েছি, তখন বাংলাদেশকে পড়েছি একটা ডেভেলপমেন্ট মিরাকেল হিসেবে। অর্থাৎ যেসব উন্নয়ন কর্মকা- একটি দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য করা প্রয়োজন, তার থেকে অনেক বেশি কাজ বাংলাদেশে হয়েছে। বাংলাদেশ অনেক কাজই অনেক দ্রুত করে ফেলতে পারে। এটা একটা বড় ব্লেসিং। সুতরাং ১০ বছর পর অবশ্যই বাংলাদেশ শিক্ষাগত দিক থেকে অনেক সমৃদ্ধ হবে, তাতে আশা রাখা যায়। তবে কিছু বিষয়ে মানুষকে জোর দিতে হবে। যেমন : কারিগরি শিক্ষায় বাংলাদেশের মানুষকে আরো উন্নত হতে হবে। শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল’ইয়ার হলে হবে না। শুধু ডাক্তারই হতে হবে কেন, নার্স কেন হবে না? সবাই ডাক্তার হলে বেকার ডাক্তার তৈরি হবে। সবাই ইঞ্জিনিয়ার হলে বেকার ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে। বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন দিকে কাজের সুযোগ হয়েছে এবং হচ্ছে। সুতরাং সব ধরনের পড়াশোনার ক্ষেত্রকে উন্নত করলে ১০ বছরে দেশ আরো অনেক উন্নত হবে। আরেকটা বিষয় আমি বলতে চাই, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইম্পর্ট্যান্স অব ইমপ্যাথি বিষয়টি নেই। অন্যান্য উন্নত দেশের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় Empathy বলে একটা বিষয় থাকে আলাদা। যেখানে সবাইকে একসঙ্গে শিক্ষিত হওয়ার, একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার, একতার শিক্ষা দেয়া হয়। আমাদের দেশে ঠিকই উল্টো। তুমি নিজেই পড়ো, নিজেই ভালো রেজাল্ট করো, নিজেই ভালো পজিশন নিয়ে বসে থাকো এমন শিক্ষা দেয়া হয়। সুতরাং আমরা যদি এডুকেশন সিস্টেমে Empathy বিষয়টি যোগ করতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় ভবিষ্যতে বাংলাদেশ শিক্ষাগত দিক থেকে আরো অনেক উন্নত হতে পারবে।

আনন্দধারা : বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগতিতে বাধা কী কী?

পারিসা শাকুর : এদেশের নারীদের প্রথম থেকেই একধরনের নিরুৎসাহ দেয় সবাই ‘মেয়ে’ বলে। একজন সন্তানকে যখন বাসা থেকেই বলবে তুমি মেয়ে তুমি এটা করতে পারবে? তুমি ওটা করতে পারবে না, তখনই একটা মেয়ে নিজেকে ‘মেয়ে’ ভেবে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রেও ঠিক তাই। একজন পুরুষ কলিগের সমমানে আসার জন্য একজন মহিলা কর্মকর্তাকে তিনগুণ বেশি কাজ করে দেখাতে হয়। তারপরও অনেক সময় শুনতে হয় মেয়ে বলে বেশি কাজ করতে পারবে না।

আনন্দধারা : বাধা অতিক্রম করে একজন নারী কীভাবে সফল হতে পারে?

পারিসা শাকুর : মানুষ তোমাকে সবসময় নিরুৎসাহিত করবেই। এটা তোমার দৃঢ়তার বিষয় যে, তুমি কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখবে। আমি যখন আমার কর্মক্ষেত্রে প্রথম কাজ শুরু করি, তখন আমার ডিপার্টমেন্টে আমি একাই মেয়ে শিক্ষিকা ছিলাম, বাকি সবাই ছিল পুরুষ এবং আমার দুইগুণ বেশি বয়সী। তাদের সঙ্গে কাজ করে নিজেকে টিকিয়ে রাখা এবং আজকের এই পজিশনে আসা সম্ভব হয়েছে, শুধু আমার দৃঢ়তার কারণে। দৃঢ়সংকল্প হলেই একজন নারী অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারে।

আনন্দধারা : যে কোনো ধরনের পুরস্কার প্রাপ্তি আপনাকে কতটা অনুপ্রাণিত করে?

পারিসা শাকুর : পুরস্কার প্রাপ্তি সবাইকেই অনেক অনুপ্রাণিত করে। আমার কাছে যদিও পুরস্কার প্রাপ্তিটা খুব বড় কিছু না। যেটা আমার কাছে পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দ দিতে পারে তা হলো আমার কোনো কাজে কেউ একজনের জীবনে ভালো কিছু হয়েছে। এমন কিছু কেউ এসে আমাকে বললে আমি যে আনন্দটা পাব এবং আমি যতটা অনুপ্রাণিত হব, তা হয়তো কোনো পুরস্কার প্রাপ্তির থেকেও আরো অনেক বেশি।

আফরিন বুশরা

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।