ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সফলতা আসবেই

রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় বেসরকারি সংস্থা কেয়ারের একটি মোটর মেকানিক ওয়ার্কশপে কাজ করেন তিনি। সবার কাছে ‘রাব্বি আপা’ নামে পরিচিত এই মানুষটির নাম রাবেয়া সুলতানা। জন্মস্থান দিনাজপুর। সবজি বিক্রেতা আব্দুল আজিজের ছয় ছেলে-মেয়ের একজন তিনি। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা থাকলেও রেজিস্ট্রেশনের টাকা জোগাড় করতে না পেরে পরীক্ষা আর দেয়া হয়নি। সেই রাব্বি আপা এখন তার সংসারের হাল ধরেছেন।

অনুপ্রেরণা

পরিবারের জন্য অর্থের জোগান দিতে মোটর মেকানিক ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করি। গরিবের ঘরে আমার জন্ম। এই চরম দারিদ্র্যই আমাকে স্বাবলম্বী হতে সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছে।

পেছনের গল্প

২০০৫ সালে কেয়ার বাংলাদেশ থেকে একজন মাঠকর্মী আমাদের বাসায় আসেন। তারা গরিব মেয়েদের কাজ শেখাবেন বলে জানান। দিনাজপুরেই গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নেই প্রায় নয় মাস। প্রশিক্ষণ শেষে একটি মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় আমাদের। কিন্তু পরীক্ষায় পাস করিনি। পরে কেয়ার থেকে মেকানিক হিসেবে যোগ দেয়ার কথা বললে আমি সুযোগটি নিই।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যতে নিজের শহর দিনাজপুরে একটি গাড়ি সারার কারখানা করব। ছেলেকে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাই।

কাজ করতে গিয়ে সমস্যা

অনেক গাড়ির পার্টস ভারী হয়। সেগুলো একা সরানো খুব কষ্ট। এই সমস্যা তো ছিলই। আবার কাজের শুরুর দিকে মোটরসাইকেল বা গাড়ির সার্ভিসিং করাতে আসা লোকজন যখন দেখতেন একজন নারী তাদের গাড়ি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন, তখন বাঁকা চোখে তাকাতেন তারা। চেষ্টা করতেন কোনো পুরুষকে দিয়ে কাজ করাতে। তাদের একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল- মেয়ে মানুষ গাড়ির কী বোঝে? আর আমি যখন এখানে জয়েন করার প্রস্তাব পেলাম, তখন আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় বাড়ি থেকেই। মা রাজি হলেন না আমাকে মেকানিক হিসেবে চাকরিতে পাঠাতে, পাছে যদি বিয়েটা ভেঙে যায়।

উত্তরণ

আমি তখন যোগাযোগ করলাম আমার স্বামীর সঙ্গে। আমার আজকের এই জায়গায় আসার পেছনে এই মানুষটার অবদান অনেক। তিনি নিজে তো রাজি হলেনই, তার বাবা-মাকেও রাজি করালেন, তারা যাতে আমার বাইরে কাজ করার ব্যাপারটা মেনে নেন। আমার স্বামী আমার পাশে ছিলেন এবং আছেন বলেই আজ আমি এখানে আসতে পেরেছি। তাকে ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। কাজকে কখনো ভয় পাইনি। কাজ করেছি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে। এক সময় সব ঠিক হয়ে গেছে। কাজের দক্ষতার কারণেই কাজ করাতে আসা মানুষদের ভুল ধারণা ভেঙেছি।

১০ বছর পর বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান

বাংলাদেশের নারীরা অনেকটাই এগিয়েছেন। ১০ বছর পর বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে নারী-পুরুষ একই ধরনের চ্যালেঞ্জিং কাজ করবে এমনটা দেখতে চাই।

বাংলাদেশে নারীদের অগ্রগতিতে বাধা

একজন নারী ঘরে বা বাইরে যেখানেই কাজ করুন তার নিরাপদ পরিবেশ দরকার হয়। আমি যেমন কেয়ারে কাজ করছি। এখানে নিজেকে খুবই নিরাপদ মনে করি। রাত ১০টায় এখানে কাজ করতেও আমার ভয় লাগে না। এমন পরিবেশ যদি সব জায়গায় তৈরি করা যায়, তাহলে নারীরা নির্দ্বিধায় সব জায়গায় কাজ করতে বের হতে পারবে। নারীরা বাইরে কাজ করতে চাইলে প্রথমে বাধা পায় পরিবার থেকে। পরিবার ও সমাজ থেকে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়। আমি যখন গাড়ি চালানো শিখছিলাম তখন আশপাশের অনেকেই বলতেন তোদের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঢুকবে না। ব্যঙ্গ করার জন্যই এসব বলতেন তারা। মেয়ে হয়ে এমন কাজ শিখছি তা নিয়েও অনেক কথা শুনতে হয়েছে। যখন জানল চাকরি করার জন্য গাড়ি চালানো শিখছি, তখন বলত মেয়ে হয়ে কাজ করবি বাড়ির ছেলেরা কি মরে গেছে? এমন অনেক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক কথাই শুনতে হয়েছে, এখনো অনেক সময় শুনতে হয়।

একজন নারী কীভাবে সফল হতে পারে

মানুষের কথা শুনে থেমে গেলে চলবে না। মনের দৃঢ় ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সফলতা আসবেই। প্রতিটা মেয়েরই মনের জোর বাড়াতে হবে। পরিবারের সহযোগিতা পেলে নারীদের কাজ করতে অনেক বেশি সুবিধা হয়।

পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি

শুরুতে তো কিছু নিয়ে আর ভাবিনি। তখন ভাবনায় ছিল পরিবার চালানোর জন্য অর্থ রোজগার করতে হবে। পুরস্কার সব সময়ই অনুপ্রেরণা জোগায়। কাজের স্পৃহা বাড়ায়। এখন যখন আমার কোনো সাক্ষাৎকার বা ছবি কোথাও ছাপে ভালো লাগে। আমাকে দেখাচ্ছে এজন্য ভালো লাগে তা না, ভালো লাগে আমাকে দেখে আরো ১০টা মেয়ে অনুপ্রাণিত হবে সেই জন্য।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।