ঢাকাকে আমার শহর মনে হয় না -মেরিনা তাবাসসুম

খ্যাতিমান আর্কিটেক্ট মেরিনা তাবাসসুম দীর্ঘদিন এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এই পেশার অবদানের জন্য আগা খান পুরস্কার পেয়েছেন। ঢাকা শহর নিয়ে তার ভাবনার অন্ত নেই। কীভাবে এই শহরটাকে সুন্দর করা যায় সেটা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবেন। বেঙ্গলের একটা প্রকল্পে ঢাকা নিয়ে গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত আছেন। আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন সেই কথা। তারই অংশবিশেষ-

রাফি হোসেন : আসলেই কি শহরের কোনো ক্যারেক্টার থাকে বা এখনো আছে?

মেরিনা তাবাসসুম : শহরের ক্যারেক্টার থাকে। শহর যেভাবে তৈরি হয়, তাতে করে ঐতিহাসিকভাবে সব শহরেরই একটা ক্যারেক্টার আছে। সেটা সিটি সেন্টার হোক বা ফ্যাব্রিক হোক। প্রতিটা শহরের একেক নিজস্বতা রয়েছে। বিশেষ করে যদি ইউরোপীয় কিংবা পশ্চিমা শহরগুলো দেখি যেমন : নিউইয়র্ক, লন্ডন, রোম, ইস্তাম্বুল, লিসবন- এই শহরগুলোর আলাদা একটা নিজস্বতা রয়েছে। আর্কিটেকচার, ডিজাইন সবকিছু মিলিয়ে একটা ক্যারেক্টার তৈরি হয়। ওই ক্যারেক্টারটার মাধ্যমে শহরটা পরিচিতি পায়। একটা শহর তৈরি হতে অনেকদিন সময় লাগে। আশি, নব্বই এবং দুই হাজার সালের দিকে যেসব শহর খুব দ্রুত তৈরি হয়েছে, সেগুলোর কোনো ক্যারেক্টার তৈরি হয়নি।

রাফি হোসেন : লন্ডনে দেখেছি সেখানে শপিংমলসহ অন্য স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। ওদের একটা ক্যারেক্টার আছে। কিছু ব্র্যান্ডের জিনিস আছে পিৎজাহাট, কেএফসি- তাদেরও ক্যারেক্টার আছে।

মেরিনা তাবাসসুম : এটার জন্য সময়ের দরকার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপিটালিস্ট, কনজিউমার, কালচার- এভাবে তারা নিজেদের অবস্থান বৃদ্ধি করছে। একেকটা জায়গার একেকটা ক্যারেক্টার।

রাফি হোসেন : আমরা সেটা কেন পারছি না? আমাদের পুরান ঢাকার একটা ক্যারেক্টার ছিল।

মেরিনা তাবাসসুম : প্রধানত ব্যবস্থাপনার অভাব, দ্বিতীয়ত পরিকল্পনা। সত্যি বলতে আমাদের ঢাকা শহরের শুরু থেকেই কোনো পরিকল্পনা করিনি। বুড়িগঙ্গার তীরে শহর গড়ে উঠল, মুঘলদের সময়ে এক রকম ছিল, ব্রিটিশরা এটিকে বিস্তৃত করে উত্তরের দিকে মিন্টো রোড এবং রেলওয়ে নিয়ে আসে। ব্রিটিশরা যখন দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে রেলওয়ে নির্মাণ করল, তখন রেলওয়েকে কেন্দ্র করে উত্তরের দিকে বৃদ্ধি পেতে থাকল। নদীপথের যে ব্যবহার ছিল, রাস্তা এবং রেলপথ হওয়ার পর সেটা কমে গেল। কিন্তু উত্তরদিকের যে ব্যবহার শুরু হলো পরিকল্পনা ছাড়াই। তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা ছাড়া বাকিগুলোর সেভাবে কোনো পরিকল্পনা করা হলো না। একটা শহর শুরু থেকে কীভাবে হবে। পুরান ঢাকা ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক নদীর ধারের একটা শহর, সেটা কীভাবে হবে, সেটা সংরক্ষণ করতে কী কী করা প্রয়োজন?- এগুলো সংরক্ষণ করতে গেলে খরচের ব্যাপার আছে। ঐতিহাসিক ভবন ভাঙা যাবে না। যদি ভাঙে তাহলে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবনের মালিকের কোনো ক্ষতি যেন না হয়। কারণ এত বড় ভবন তার মূল সম্পত্তি। আরো অনেক জটিল বিষয় থাকে। এগুলো সত্যিকার অর্থে হয়নি।

রাফি হোসেন : হয়নি নাকি সম্ভব হচ্ছে না?

মেরিনা তাবাসসুম : সম্ভব না এমন না। পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল সেটা হয়ে ওঠেনি। বর্তমানে রাজউকের অধীনে পুরো শহর একই নিয়মে চলছে। এখানে ঘনত্বের কোনো নিয়মনীতি নেই। ধানমণ্ডিতে যে ঘনত্ব, গুলশানেও একই, কোনো নিয়ম নেই। প্রত্যেকটি শহরে এটা থাকে আমাদের হয়তো আঞ্চলিকভাবে ভাগ করা হয়েছে যে, আবাসিক আর বাণিজ্যিক- এতটুকু করতে রাজউক চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে প্রত্যেক এলাকায় কেন ১২তলা ভবন নির্মাণ হবে? এটার কোনো নিয়ম নেই? আগে ধানমণ্ডিতে একজনের পরিবারের জন্য এক বিঘা প্লট বরাদ্দ থাকত। কিন্তু এখন সেখানে চল্লিশটা পরিবার থাকছে। একটা পরিবারের জায়গায় চল্লিশটা পরিবার। তাই চাপটা বাড়ছে, কিন্তু সেভাবে পরিকল্পনা করে কোনো কিছু তৈরি করা হয়নি। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

রাফি হোসেন : এগুলো বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় কি ঠিক হয়েছে?

মেরিনা তাবাসসুম : চাইলেই তো আর সবাইকে উঠিয়ে দিতে পারি না। সরকার যদি খুব গুরুত্বের সঙ্গে এই বিষয়ে মনোযোগ দেয় তাহলে হয়তো সম্ভব। ঢাকাতে মানুষ কেন আসে এই কারণটা আগে খুঁজে বের করতে হবে। পুরো বাংলাদেশে সবাই

 ঢাকাকেন্দ্রিক। সর্বপ্রথম এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেমন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি মানুষকে ঢাকার দিকে টানছে। মেডিকেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবকিছুর টানে এখানে আসে। একটা বাচ্চা তো আর একা আসতে পারে না। তখন পুরো পরিবারই চলে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে ঢাকার চাপ অনেক কমে যাবে। আমরা কোথায় কোথায় সেগুলো সরিয়ে স্থাপন করতে পারি। এগুলো বাস্তবায়ন করতে এখন শক্তিশালী রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি দরকার। ঢাকা থেকে বড় সংখ্যার একটা জনসংখ্যা আমরা যে স্থানগুলোতে সরিয়ে দেব, সেখানে ঢাকার মতো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।

রাফি হোসেন : কীভাবে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা যায় বলে মনে করো?

মেরিনা তাবাসসুম : সরকার থেকে প্রস্তাবনা আসতে হবে। বেঙ্গল ইনস্টিটিউট এটা নিয়ে গবেষণা করছে। গবেষণার নাম ছিল ‘ঢাকা নেক্সাস’। ঢাকা হলো কেন্দ্রীয় একটা শহর এটার আশপাশে শহরগুলো যেমন মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ। এই এলাকাগুলো ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত এবং কাছাকাছি। এই শহরগুলোতে যদি আমরা ঢাকার মানুষদের নিয়ে যেতে চাই, তাহলে দেখব সেখানে কোনো সুযোগ নেই। ঢাকায় যা আছে তার কিছুই সেখানে নেই। যে প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকার মধ্যে রয়েছে, সেগুলো যদি চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে সেটা সম্ভব।

রাফি হোসেন : বেঙ্গলের প্রকল্পটা কি সরকার নিয়েছে?

মেরিনা তাবাসসুম : না। আমরা নিজেরা এটা গবেষণা করছি। আমাদের গবেষণা কীভাবে ঢাকাকে পুনরায় একটি বাসযোগ্য শহরে নিয়ে যাওয়া যায়। কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ভেবেই আমাদের এই গবেষণা। এখানে সরকারের খুব বেশি সম্পৃক্ততা নেই। ঢাকার আশপাশের শহরগুলোতে মানুষের যে মৌলিক জিনিসগুলো প্রয়োজন, সেগুলো দিয়ে গোছানো যায় তাহলে ঢাকার চাপ অনেক কমে যাবে। সব সিটি মেয়রকে নিয়ে একসঙ্গে তাদের কোথায় কী সমস্যা কী প্রয়োজন- এগুলো শনাক্ত করে বাস্তবায়ন করা। পরিকল্পনা সবই আছে, এখন সেটা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলো নিয়ে যদি সরকার এগোতে চায়, তাহলে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হবে জানি না। আমরা শুধু গবেষণা করছি কিন্তু সরকারের সঙ্গে আমাদের একটা সংযোগ থাকা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে না।

রাফি হোসেন : বেঙ্গল থেকে তোমরা যে গবেষণা করেছিলে, সেগুলো কি রাজউক বা সরকারি যে সব প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, তাদের কাছে তুলে ধরা হয়েছিল?

মেরিনা তাবাসসুম : হ্যাঁ হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাছে আমরা কিছু উপস্থাপন করেছি। কিন্তু এটা নিয়ে আরো বিস্তরভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। একেবারে যদি ওপর থেকে নির্দেশনা না আসে, তাহলে এগুলো নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

রাফি হোসেন : চারিদিকে শুধু বাড়ি আর বাড়ি- একজন : আর্কিটেক্ট হিসেবে কতটা পীড়া দেয় তোমাকে?

মেরিনা তাবাসসুম : অসম্ভব রকমের পীড়া দেয়। আমার ছোট থেকে এই শহরে বড় হওয়া। এখন ঢাকাকে আমার শহর মনে হয় না। কিন্তু এখানেই জন্ম, বড় হয়ে ওঠা আমার।

রাফি হোসেন : ইউরোপের বাড়িঘরগুলোর জন্য নির্দিষ্ট রঙ ব্যবহার করা হয়? এটাকে কীভাবে দেখ?

মেরিনা তাবাসসুম : এটা খুব জরুরি না। আর্কিটেক্টের কিছু ব্যাপার রয়েছে, যখন তারা ডিজাইন করেন। তখন আশপাশে কীভাবে করা হয়েছে, ক্যারেক্টরের সঙ্গে মিলিয়ে করেন। কিন্তু অনেক সময় আমাদের এখানে সেটা হয় না। যে যার ইচ্ছামতো করে।

রাফি হোসেন : আর্কিটেক্টদের কথা কি ক্লায়েন্টরা রাখে?

মেরিনা তাবাসসুম : এখন ক্লায়েন্টরা অনেক শিক্ষিত, তারা জানে ও বোঝে। এখন আমরা কতটুকু তাদের দিতে পারছি এটা একটা ব্যাপার। কিছু ক্লায়েন্ট রয়েছে, যারা নিজেরাই সবকিছু করে। সে কী চায়, সেটা নিজেই আঁকিয়ে নেয়। ক্লায়েন্ট এবং আর্কিটেক্ট যৌথ বিষয়। আমি ক্লায়েন্টদের কথা শুনি। আমার নিজস্ব অগ্রিম কোনো নকশা থাকে না। ক্লায়েন্টদের কথা শুনে তারা কী চাচ্ছে, কীভাবে চাচ্ছে, তারপর আমার মতো করে কাজ শুরু করি। একটা সামঞ্জস্যতা রেখে তাদের চাওয়া অনুযায়ী ডিজাইন করি।

রাফি হোসেন : একজন আর্কিটেক্ট শুধু একটা বিষয় নাকি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে?

মেরিনা তাবাসসুম : এটা নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। সব আর্কিটেক্ট এক না। কিছু ভবনে বিশেষ কিছু লাগে, যেমন হাসপাতাল শিল্প-কারখানার ডিজাইন করার ক্ষেত্রে। তবে যারা করে তারা স্পেশালাইজ করে ফেলে। নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়। কিছু আর্কিটেক্ট যারা শুধু বাড়ির ডিজাইন করে আবার কিছু আছে যারা হাসপাতাল, বিভিন্ন শিল্প-কারখানার ডিজাইন করে থাকে।

রাফি হোসেন : তোমার কোন ধরনের কাজ বেশি ভালো লাগে?

মেরিনা তাবাসসুম : আমি পাবলিক প্রজেক্ট করতে বেশি পছন্দ করি। এখানে কাজ কম পাই, কারণ আমাদের পাবলিক প্রজেক্টের কাজ তারা নিজেরাই বেশি করে থাকে।

রাফি হোসেন : ওরা কী বাইরে থেকে কাউকে নেয় না?

মেরিনা তাবাসসুম : খুব কম। যখন খুব মর্যাদাপূর্ণ কাজ হয়, তখন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে লোক নেয়। তখন সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারি। স্বাধীনতা স্তম্ভ এভাবে করা হয়েছে। সরকারি যারা আছেন তাদের অনেক কাজ অনেক প্রকল্প বাংলাদেশের যাবতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ভবন সাংস্কৃতিক ভবন, তারা নিজেরাই বেশি করে থাকে। কিন্তু বাইরের দেশে যারা সরকারি আর্কিটেক্ট থাকে, তার শুধু ম্যানেজমেন্টটা দেখে থাকে। যখন ওদের কাছে কোনো প্রকল্প আসে তখন তারা দেখে যে কোন আর্কিটেক্ট কোন বিষয়ে ভালো। তাদের ডেকে নিয়ে কাজ করাতে পারে বা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে ভালো কিছু করে তাকে কাজগুলো দিয়ে দেয়। সরকারি প্রকৌশলী যারা থাকেন, তাদের কাজ ম্যানেজমেন্ট করা ডিজাইন করা না।

রাফি হোসেন : মসজিদের যে প্রজেক্টটা করেছিলে, সেটার জন্য কী বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল?

মেরিনা তাবাসসুম : মসজিদের জন্য নানী জায়গাটা দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেই আমাকে বলেছিলেন তুমি এটার ডিজাইনটা কর এবং বানিয়ে দাও। ঠিকাদার নিয়োগ, ফান্ড সংগ্রহ থেকে সবকিছুই আমরা নিজেরাই করেছিলাম।

রাফি হোসেন : এটার জন্য তুমি আগা খান পুরস্কার পেয়েছিলে। এখানে তুমি লাইটের যে জায়গাটা করেছিলে, সেটি কি তোমার স্বাক্ষর নাকি তোমার প্রজেক্টের জন্য করা প্রয়োজন ছিল তাই করেছো?

মেরিনা তাবাসসুম : আমি প্রকৃতি দেখি অন্যভাবে। ভবনের গায়ে গাছ দেবো- এভাবে প্রকৃতি দেখি না। প্রকৃতি যদি দিতে হয়, তাহলে ভবনটাই প্রাকৃতিক হতে হবে। এয়ারকন্ডিশন ও বৈদ্যুতিক বাতি লাগিয়ে একটা ভবন হাইফাই করলাম, তারপর সেখানে গাছপালা লাগালাম এটাতে বিশ্বাস করি না। প্রাকৃতিক মানে শুধুই প্রাকৃতিক হবে। প্রত্যেকটি মানুষের যেমন নিজস্বতা থাকে, ঠিক তেমনই ভবনেরও আলাদা নিজস্বতা থাকবে। নিজস্বতা  আর্কিটেক্টদের তৈরি করতে হয়। ভবনের যখন ওই নিজস্বতা দেখা যায়, বোঝা যায় তখন সেটার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। হাসপাতালে মানুষ সুস্থ হতে যায়। শুধু শারীরিক না মানসিকভাবেও তারা সুস্থ হতে যায়। তাই তার পরিবেশটাও তেমনই হওয়া দরকার। আমি যখন যে প্রকল্পগুলোই করি, আমার প্রধান লক্ষ্য থাকে একটা ক্যারেক্টার দেয়া। এগুলো যেন মানুষকে ছুঁয়ে যেতে পারে এবং সংযোগ ঘটাতে পারে।

রাফি হোসেন : তোমার নিজস্ব জ্ঞান, দর্শন থেকে যে কাজগুলো করছ, এখন অনেককে দেখছি নকল করতে চেষ্টা করছে। একটা কাজ দেখে হয়তো ভালো লেগেছে, তখন সেটা সে নকল করল। কিন্তু একসঙ্গে দুটো কাজ দেখলে তখন পার্থক্যটা বোঝা যায়। যারা এমন করছে তারা কেন সেটা বুঝতে পারে না?

মেরিনা তাবাসসুম : মানুষের নকল করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একটা জিনিস ভালো লাগতেই পারে, এটা সবারই লাগে। কিন্তু সেটার মতো করে নকল করে করা সম্ভব না। কখনই সেটা হবে না।

রাফি হোসেন : যে স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছে এটা কি তাদের সমস্যা?

মেরিনা তাবাসসুম : না স্কুলের সমস্যা না। এটা ব্যক্তিগত সমস্যা। স্কুল আমাকে একটা নির্দেশনা দেয় তার পরের যাত্রাটা আমার নিজের। নিজেকে কীভাবে তৈরি করব, সেটা আমার ওপর নির্ভর করছে। স্কুল থেকে পাস করার পর কাজে প্রবেশ করে ভাবে না যে কী নিয়ে কাজ করলে বেশি সফল হবে বা কোনটা তাকে বেশি টানে। অনেকের ক্ষেত্রে ওই বোঝাপড়াটাই আসে না। আর্কিটেকচার গণিতের মতো না যে শিখে বের হলাম, যা যা সূত্র শিখলাম তা দিয়ে সারা জীবন অনুশীলন করে যাব। আর্কিটেকচার হলো শিল্প এবং বিজ্ঞানের সমন্বয়। কিছু জিনিস স্কুল থেকে শিখতে পারি কিন্তু বাকিটা আমার নিজের যাত্রায় আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। উদ্ঘাটন, অভিজ্ঞতা যেটা আমাকে সমৃদ্ধ করবে ভালো কাজ করার জন্য।

রাফি হোসেন : এখানে স্কুল কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে?

মেরিনা তাবাসসুম : পাস করলেই আর্কিটেক্ট হয়ে যাবে না এই বিষয়টা ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া। একজন তখনই আর্কিটেক্ট হবে, যখন সে ডিজাইন করবে। আবার সব আর্কিটেক্ট ডিজাইনার হবে, এটাও আশা করা যায় না। একেকজন একেক বিষয় পছন্দ করতে পারে। কিন্তু কেউ যদি ডিজাইনার হতে চায়, তাহলে তার জার্নিটা অনেক বেশি। ডিজাইন করে একটা ভবন তৈরি করা মানে একটা বই বের করা। ওইটার যে গুণমান সেটার মধ্যে গবেষণা থাকতে হবে, ক্লায়েন্ট তৈরি করতে হবে। অনেক বিষয় জড়িত থাকে, এত বড় কাজে যাওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। এগুলো দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

রাফি হোসেন : তুমি একজন শিক্ষিকাও। ঢাকার বিষয়ে আমরা একটু আগে বললাম সবাই আলাদা তার শ্রেষ্ঠটা করছে কেউ কাউকে দেখছে না। আর্কিটেক্ট হিসেবে তুমি কি মনে কর ঢাকার নিজস্ব পরিচয়টা, যা নষ্ট হওয়ার হয়ে গেছে কিন্তু এখন থেকে যদি আমরা আবার ভাবি যে ঢাকার একটা ক্যারেক্টার করতে চাই, এটা কীভাবে করব?

মেরিনা তাবাসসুম : এটা অনেক কঠিন একটা বিষয়। ঢাকা বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো ডেভেলপারের তৈরি সব ভবন।

রাফি হোসেন : এখন কাচের ব্যবহার ঢালাওভাবে হচ্ছে।

মেরিনা তাবাসসুম : কাচের ঢালাও ব্যবহার শুরু হয় নব্বইয়ের দশক থেকে। ডেভেলপাররা যখন থেকে কাজ শুরু করল তখন থেকেই কাচের ব্যবহার শুরু। কারণ এটা খুব দ্রুত নির্মাণ করা যায়। কাচ, অ্যালুমিনিয়াম নিয়ে এলাম, লাগিয়ে ফেললাম অল্প দিনেই ভবন তৈরি করে বিক্রি করে লাভবান হয়ে গেলাম। এটা আসলে মুনাফা লাভের জন্য। সেটা লাভ করার জন্য ভালো, পরিবেশের জন্য ভালো না। আর্কিটেক্টদের এই কাজগুলো থেকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কাচের ভবনের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। ক্লায়েন্টরা বড় ধরনের চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন, অনেক অপচয় হচ্ছে। কাচ লাগবেই, একেবারে বাদ দেয়া যাবে না।

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।