থিয়েটারটা আমার অক্সিজেন

সাংস্কৃতিক পরিবারের কন্যা সঙ্গীতা চৌধুরী। শিশুকাল থেকেই মঞ্চের সঙ্গে সখ্য তার। ঢাকার মঞ্চে কাজ শুরু করেন থিয়েটার দল নাট্যকেন্দ্রের হয়ে। থিয়েটারের প্রিয় মুখ সঙ্গীতা চৌধুরী বর্তমানে শিক্ষকতার পাশাপাশি নাট্যকেন্দ্র ছাড়াও কাজ করছেন অন্যান্য দলের সঙ্গে। থিয়েটারে নিজের পথচলার গল্প এবং থিয়েটারের সমসাময়িক অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : থিয়েটারে আপনার পথচলা শুরু হয় কীভাবে?

সঙ্গীতা চৌধুরী : গানের মাধ্যমে তিন বছর বয়সে আমার মঞ্চে ওঠা হয়। আমার বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক। ছোটবেলা থেকে আমাদের বাসায় সংস্কৃতির একটা চর্চা ছিল। ঘুম ভেঙেছে কীর্তনের আওয়াজ শুনে। বাবা-মা কখনই ঘুম থেকে ডেকে তোলেননি। চোখ খুলেই কোনো না কোনো মিউজিকের শব্দ শুনেছি। এমন করেই আসলে আমার ভেতরে সুর, তাল, লয়, ছন্দ ও পারফরম্যান্স- এই বিষয়গুলো চলে আসে। আমি ছোটবেলা থেকে আবৃত্তি করতাম। সবকিছু আমার পরিবারের কারণেই হয়ে উঠেছে। তখন থেকেই কবিরুল ইসলাম রতন ভাই, শিবলী মোহাম্মদ ভাই এবং নিপা আপুর কাছে আমি নাচ শিখতাম। আমার বাবা খুব ভালো গান করতেন। আমার বোনেরাও গান করতেন। তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে গান শিখেছি। কখনো ভাবিনি থিয়েটার করব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আমি অনার্স ও মাস্টার্স করেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার সখ্য তৈরি হয় নাটক ও নাট্যকলা বিভাগের সঙ্গে। তখন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন স্যারের সাহচর্য আমি পাই। স্যারের সঙ্গে আমার অনেক কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। সেলিম আল দীন স্যারের গানের দলে তখন আমি গান গাইতাম। স্যার তখন আমাকে বলতেন, তোমার থিয়েটার পড়াটা খুব জরুরি ছিল। যদিও আমি থিয়েটার পড়তে এসেছিলাম কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে বাংলায় পরীক্ষা দিতে পেরেছি এবং ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রথম হয়ে বাংলায় ভর্তি হই। আমি লেখাপড়ার বিষয়ে বরাবরই সিরিয়াস থাকার কারণে ইয়ার গ্যাপ দিইনি। সে কারণেই নাট্যকলা বিভাগে পড়া হয়নি। তবে সেলিম আল দীন স্যারের সাহচর্য ও অনুপ্রেরণা আমাকে নাটকের দিকে অনেক বেশি আগ্রহী করে তুলেছে।

আনন্দধারা : নাট্যকেন্দ্রের সঙ্গে কখন থেকে যুক্ত হন?

সঙ্গীতা চৌধুরী : ২০০৪ সালে আমি নাট্যকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হই। কিন্তু থিয়েটার শুরু করি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ থেকে। ‘সংকীর্তন নাট্য পরিবার’ নামে আমাদের একটি বিভাগীয় গ্রুপ ছিল। সেখানে আমি প্রথম অভিনয় করি মনোজ মিত্রের ‘কিনু কাহারের থেটার’ নাটকে। নাটকটির নির্দেশনা দেন আমাদের

 সিনিয়র এক বড় ভাই। মাস্টার্স শেষ করার পর হলিক্রস কলেজে অধ্যাপনা শুরু করি। তখন আমার মনে হলো আমি এখন কী করতে পারব। কারণ নাট্যকলার শিক্ষার্থী না-হওয়ার কারণে ওইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক করতে পারিনি। সেই ২০০৪ থেকে আজ অবধি প্রতিটি সন্ধ্যা আমি থিয়েটারকে দিয়ে আসছি। আমার পরিবার এবং বাইরের সবাই জানে, আমার থিয়েটার থাকলে অন্য সবকিছু বন্ধ। আমার কাছে থিয়েটারটা আমার অক্সিজেন।

আনন্দধারা : যারা পাশাপাশি অন্য কিছু করছেন না তারা কীভাবে থিয়েটারটা করবেন?

সঙ্গীতা চৌধুরী : আমাদের অগ্রজ ও যারা আছে, তারা পেশাদারিত্ব থিয়েটারের বিষয়ে বারবার বলে আসছেন। তবে এ বিষয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের ভীষণ দরকার। কলকাতায় থিয়েটার করে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব। যেখানে থিয়েটার করে কর্মীদের মনের ক্ষুধা ও পেটের ক্ষুধা দুটোই মিটছে, যা আমাদের দেশে অকল্পনীয়। চাকরিতে জয়েন করার আগেই বলেছিলাম, আমি থিয়েটার করি এবং আমার থিয়েটারের জন্য যখন ছুটি চাই, তখন যদি আমাকে ছুটি দেন তাহলে আমি চাকরি করব। না হলে চাকরি করব না। এই জায়গাটা আমাদের থাকা দরকার। যদি আমরা থিয়েটারটাকে ভালোবাসি, তাহলে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর নিয়মিতভাবে থিয়েটার চর্চার জন্য কিছু না কিছু খুঁজে নিতে হবে। কারণ আমাদের পেশাদারিত্বের সেই সম্ভাবনা এখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু আমি থিয়েটার পাগল। আমি থিয়েটার ছাড়ব না। থিয়েটারের জন্য জীবনে অনেক ছাড় দিয়েছি।

আনন্দধারা : আমাদের থিয়েটারের বর্তমান অবস্থা কেমন মনে হচ্ছে?

সঙ্গীতা চৌধুরী : আমি খুবই আশাবাদী। কারণ আমি পজিটিভ চিন্তার মানুষ। সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া রেপার্টরিকরণ যদিও আমাদের এখনো সম্ভব না, তবুও অনেকেই রেপার্টরি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আগানোর চেষ্টা করছে। এটা একটা ভালো দিক। আমার ইচ্ছে আছে একটি থিয়েটার কোম্পানি দেয়ার। বর্তমানে আমাদের থিয়েটার দুই ধারায় প্রবাহিত। অনেকে থিয়েটার করে স্ট্যাটাসের জন্য আর অনেকে করে ভালোবেসে। যারা ভালোবেসে থিয়েটার করে, আমি তাদের দলে। তাছাড়া অনেকেই ভিজ্যুয়ালি কাজ করার ক্ষেত্রে থিয়েটারকে সিঁড়ি মনে করে। যারা থিয়েটারটাকে ভালোবেসে করে, সে মানুষগুলোর সংখ্যা অনেক বেশি। আর সে ভালোবাসার জায়গাটা অনেক বেশি বলে এখনো আমরা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে চেষ্টা করে থিয়েটারটা করতে পারছি। তবে আমাদের পারফরমারদের জীবনে অনেক স্ট্রাগল আছে। কিন্তু দিন শেষে আমরা সবকিছু ভুলে থাকার জন্য থিয়েটারের কাউকে না কাউকে পাশে পাই। আমাদের প্রত্যেকের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। আমরা বলে থাকি থিয়েটার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আন্দোলনের একটা উপাদান। কিন্তু থিয়েটার নিয়ে আমরা সেই জায়গাটায় এখনো যেতে পারিনি। এখনো আমাদের মাঝে চাটুকারিতা আছে। তাছাড়া সবাই অস্থির। আমার কাছে যেটা মনে হয়, আমরা কী করতে চাই সেটা আসলে পরিষ্কার হওয়াটা খুব জরুরি।

আনন্দধারা : থিয়েটারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন মনে হয় আপনার?

সঙ্গীতা চৌধুরী : আমি আশাবাদী। তবে আমাদের সদিচ্ছার ব্যাপক অভাব। পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে আমরা অনেক বেশি উন্নত থিয়েটার করি। ওদের চেয়ে আমাদের এখানে অসাধারণ প্রযোজনা হয়। তাহলে কেন আমরা পেশাদারিত্ব আনতে পারব না। আমাদের নীতিনির্ধারক যারা আছেন, তাদের সদিচ্ছার বড্ড অভাব। তাদের মধ্যে কেউ চান আবার কেউ চান না। তাদের মধ্যেও কয়েকটা ভাগ। যদিও এটা আমাদের জাতিগত সমস্যা। আমরা কখনো একটা জায়গায় আসতে পারি না। কোনো না কোনোভাবে আমাদের মতের ভিন্নতা তৈরি হবেই। কিন্তু সামগ্রিক স্বার্থের জন্য কিংবা আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এক জায়গায় আসতে হবে।

আনন্দধারা : অভিনয়শিল্পী, নির্দেশক ও স্ক্রিপ্ট। মঞ্চে কোনটার সংকট রয়েছে বলে মনে করেন?

সঙ্গীতা চৌধুরী : আমাদের যথেষ্ট স্ক্রিপ্টের সংকট রয়েছে। অনেকদিন ধরে আমি ব্যক্তিগতভাবে চাচ্ছি সাতজন মেয়ে নিয়ে একটি কাজ করব। কিন্তু আমরা যে কাজটা করব তার জন্য স্ক্রিপ্ট পাচ্ছি না। প্রকৃত পাণ্ডুলিপির বড়ই অভাব। আমাদের নাট্যকার হাতেগোনা কয়েকজন এবং ঘুরেফিরে তারাই নাটক লিখছেন। তবে আমাদের অভিনয় পাগল কিংবা প্যাশেনেট অ্যাক্টরের বড় অভাব। যদি থাকে রাজনীতির শিকার হওয়ার কারণে হাইলাইটস হয় না। কারণ থিয়েটার দলগুলোতে প্রচুর রাজনীতি আছে। এ বিষয়ে আমি খুবই লাকি। কারণ আমার নিজের ডেডিকেশনের কারণে দলের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি।

আনন্দধারা : মঞ্চে নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে না কেন?

সঙ্গীতা চৌধুরী : আমি খুবই লাকি, কারণ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যারা থিয়েটার চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আমি সবার সাহচর্য পেয়েছি। কিন্তু এখন যারা তৈরি হচ্ছে বা হওয়ার কথা, সবার মধ্যে একটা যান্ত্রিকতা চলে এসেছে। আমরা তো এখন সেলফোন ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারি না। আমরা সবাই এবং সবকিছুকে ডিভাইসনির্ভর করে ফেলেছি। ফলে তাদের আগ্রহের জায়গাটা অনেক কম। আমি একটি চরিত্রের জন্য সারাদিন রেল স্টেশনে বসে থাকতে পারব কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা যে পরিমাণ অস্থির, তারা সেটা পারবে না। এ বিষয়ে তাদেরও দোষ নেই। কারণ তাদের গ্রুমিং একটা বড় বিষয়। আমাদের সেই গ্রুমারের প্রচণ্ড অভাব। যারা তরুণদের তৈরি করবে। যারা থিয়েটার করতে আসে, তাদের মধ্যেও ঝামেলা আছে। তারা ভাবে থিয়েটার করতে গেলেই অভিনেতা বা অভিনেত্রী হয়ে যাব। এখনকার ছেলেমেয়েরা সব যান্ত্রিক। তাদের মধ্যে সুর-তাল-লয় কিছুই নেই। সবকিছু মিলে আমাদের থিয়েটারে একটা জট লেগে আছে। ফলে শুধু আমরা বলেই যাচ্ছি, কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। অগ্রজ, অনুজ, গ্রুমারসহ সংশ্লিষ্ট সবার একাগ্রতা প্রয়োজন।

আনন্দধারা : আপনার এ পথচলায় কী কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে?

সঙ্গীতা চৌধুরী : সত্যিকার অর্থে প্রতিবন্ধকতা বলতে তেমন কিছু পাইনি বরং সবার আশীর্বাদ পেয়েছি। তবে মেয়েদের অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে এটা আমি বিশ্বাস এবং স্বীকার করি। নিজের বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব আর আচরণ সবকিছুর কারণে হয়তো আমার এই প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে কীভাবে চলতে হবে, সেগুলো অনেক ঠেকে ঠেকে শিখেছি। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে আমি সাংস্কৃতিক পরিম-লে বড় হয়েছি। যার ফলে এই বিষয়গুলোর সঙ্গে আমি পরিচিত। তবে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে বলব, একটা গোষ্ঠী আছে যারা মেয়েদের মেধার মূল্যায়ন করতে চায় না। মেয়েদের সবসময় ভোগের পণ্যই ভাবে। তাদের ধারণা, মেয়েরা একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকবে এবং তাদের তুড়িতেই কাজ করবে। এ কারণেই আমাদের সাধারণ পরিবারের মেয়েরা থিয়েটার করতে ভয় পায়। তবে মেয়েদের থিয়েটারে একজন ঢাল লাগে। আমার ঢাল হচ্ছেন তারিক আনাম খান।

আনন্দধারা : মঞ্চে আপনার বর্তমান কাজের ব্যস্ততা?

সঙ্গীতা চৌধুরী : আমি নিজের দল নাট্যকেন্দ্রের পাশাপাশি অন্যান্য দলের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দলের নতুন নাটক সাইফ আহমেদের অনুবাদ এবং নির্দেশনায় মলিয়ারের ‘কিংকর্তব্য’-এ কাজ করেছি। এছাড়া বর্তমানে সৈয়দ শামসুল হকের শেষ অনুবাদ এবং আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ন্যাশনাল রেপার্টরির হ্যামলেট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর ভাবনা এবং পরিকল্পনায় ‘মহাস্থান’। থিয়েটারওয়ালা রেপার্টরির সঙ্গে ‘জবর-আজব ভালোবাসা’। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের অতিথি শিল্পী হিসেবে তিনটি প্রযোজনায় কাজ করছি। এছাড়া আমি ইংল্যান্ডের একটি রেপার্টরিতে কাজ করেছি। বর্তমানে আরো তিনটি নতুন নাটকে কাজ করা নিয়ে কথা চলছে। আমার সব ব্যস্ততা থিয়েটারকে ঘিরেই।

ছবি : সাজ্জাদ ইবনে সাঈদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।