থিয়েটারে আমি খুব সম্ভাবনা দেখি

মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র- তিন মাধ্যমেই অভিনয়ে সফল শাহাদাৎ হোসেন। শৈশব থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে সখ্য তার। ১৯৯৮ সাল থেকে পেশাদারভাবে যুক্ত হন সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারের (সিএটি) সঙ্গে। সর্বশেষ সিএটির ব্যানারে কামালউদ্দিন নিলু নির্দেশিত স্তালিন নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে প্রশংসিত হন এই অভিনেতা। নাটকটিতে অভিনয়, মঞ্চের বর্তমান ব্যস্ততা ও অন্যান্য আরো বিষয় নিয়ে আনন্দধারার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

আনন্দধারা : সর্বশেষ আপনার অভিনীত স্তালিন নাটকটি আলোচনার পাশাপাশি সমালোচিত হয়েছে। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

শাহাদাৎ হোসেন : শিল্প কোনো সজ্জিত জিনিস নয় যে সাজিয়ে রাখবে। চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্মে, আলোকচিত্রীর আলোকচিত্রে, কবির কবিতায় যেকোনো মাধ্যমেই হোক আসলে শিল্প-সাহিত্য সবসময় কিছু না কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং কোনো না কোনো ব্যাখ্যা নিয়ে দর্শক-শ্রোতা কিংবা পাঠকের কাছে যায়। নাটকের ক্ষেত্রে একজন নাট্যকার বা পরিচালক সেই নাটকটি কীভাবে উপস্থাপন করতে চান এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। সেটা কারো ভালো লাগতে পারে, আবার না-ও পারে। যারা স্তালিনকে মেনে নিতে পারেননি, আমি বলব তাদের কোনো কোনো জায়গায় একটু সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন একজন কার্টুনিস্ট যদি আমার চরিত্রটিকে কার্টুনের মতো আঁকে তা দেখতে আমার মতো লাগবে না। আমার ভেতরের কোনো এক সত্তা কার্টুনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে স্তালিন নাটকটি পুরোপুরি পপ আর্ট। এখন পপ সম্পর্কে কারো ধারণা না থাকলে তাহলে তার সেটি বুঝতে কষ্ট হবেই। আর দুই ঘণ্টার নাটকে সবদিক তুলে আনা সম্ভব নয়। তবে এই নাটকের একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে বলতে চাই স্তালিন কেমন, কী করেছে, ইতিহাসের কোনো অংশজুড়ে আছে অভিনয় বা চরিত্র নির্মাণের সময় আমি এই বিষয়ে বিবেচনা করিনি। অন্য সব নাটকের মতোই চরিত্র নির্মাণ করেছি। নির্দেশক চরিত্রটি যেভাবে চেয়েছেন, সেটা যদি আমি ঠিকঠাকভাবে করতে পারি, অভিনেতা হিসেবে সেটাই আমার সার্থকতা। সর্বোপরি আমি সেভাবেই উপস্থাপন করেছি এবং নির্দেশক খুবই খুশি হয়েছেন।

আনন্দধারা : নাটক বন্ধের যে দাবি তোলা হলো- সে বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

শাহাদাৎ হোসেন : এভাবে প্রতিবাদ জানানোর পক্ষে আমি নই। কিন্তু জিনিসটা আবার ভালো হয়েছে। বামপন্থী যেসব মানুষ তারা একটু সজাগ হয়েছেন আর এটা নাটকের জন্য ভালো হয়েছে। তখন তাৎক্ষণিক যে প্রতিক্রিয়াটি হয়েছে, সেটাই হচ্ছে নাটকের শক্তি। কারণ ওই নাটক তাদের নাড়া দিতে পেরেছে যে, তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এ রকম মিছিল দিতে পেরেছে। তার মানে নাটক কতটা শক্তিশালী বা কোন জায়গায় নাড়া দিল এভাবে স্লোগান দিতে পারে। আর সমর্থন করি না এ কারণে যে, সেটা হলো শিল্পের জবাব আসলে শিল্প দিয়েই দেয়া উচিত। যেমন শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশিদ একটা লেখা লিখেছেন যে নাটকের একটি জায়গায় তার দর্শনের মতাদর্শের সঙ্গে মেলেনি। আর এটা স্বাভাবিক। তিনি বলেছেন, আমি একটি স্তালিন করতে চাই। আমি তখন মামুন ভাইকে অনেক আগ্রহ দেখিয়েছি। নাটকের জবাব নাটক দিয়ে দেন সেটা অনেক ভালো এবং দেখেন দর্শক সেটাকে কীভাবে নেয়। কিন্তু নাটক অথবা শিল্পের কোনো মাধ্যম বন্ধ করার কখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চেষ্টা কিংবা উসকানি দেয়া এটি আসলে ঠিক নয়।

আনন্দধারা : আপনার মঞ্চের ব্যস্ততা কী নিয়ে?

শাহাদাৎ হোসেন : মঞ্চে এখন আর কোনো তেমন ব্যস্ততা নেই। ব্যস্ততা খুব একটা বাড়াতেও পারছি না। তবে ২০১৯ সালে যখন আমি স্তালিন নাটক করি, তখন নিজের নির্দেশনায় অন্য একটি নাটক করার কথা ছিল। কিন্তু স্তালিন করার কারণে নাটকটি একটু পিছিয়ে গেছে। নাটকটি এ বছর করতে পারি। দু’জন অভিনয়শিল্পী নিয়ে খুবই ছোট ১ ঘণ্টার একটি নাটক। নাটকটির নাম ‘ক্রিপ্টোগ্রাফ’। এটি লিখেছেন রায়হান আক্তার। তিনি সিএটির নাট্যকর্মী এবং স্তালিনের বাংলা অনুবাদও তিনি করছেন। নাটকটিতে আমি নির্দেশনার পাশাপাশি অভিনয় করব। এটা আমাদের নাটকের দলের ব্যানারে করতে পারি। কিন্তু ব্যানার ভাঙার একটা মানসিকতা আমার মাথায় যোগ হয়েছে। আমরা যখন থিয়েটারের বাইরে এসে টেলিভিশনে বা চলচ্চিত্রে কাজ করি আমাদের অন্যান্য দলের অনেক নাট্যকর্মীর সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। এখন যদি অন্য দলের নাটকে আমি অভিনয় করতে চাই বা অন্যদের নিয়ে নাটক বানাতে চাই, সেটা কিন্তু আমি করতে পারছি না। একজন সংগীতশিল্পী তার গানের দলের বাইরে এককভাবে কিংবা একজন জাদুশিল্পী বা চিত্রশিল্পী তার শিল্পকর্মের একক প্রদর্শনী করতে পারে, তাহলে আমি অভিনয়শিল্পী হিসেবে কেন ব্যানারের বাইরে নাটক করতে পারব না। এই জায়গা থেকেই মূলত আমার মাথায় এই ভাবনাটা চেপেছে। হয়তো নাটকটি ব্যানার ছাড়া করার চেষ্টা করতে পারি।

আনন্দধারা : ব্যানারের কারণে কিন্তু আজকে আপনি সবার কাছে পরিচিত।

শাহাদাৎ হোসেন : এটা একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমি বর্তমানে সিএটির নির্বাহী প্রধান। সিএটি প্রফেশনাল রেপারটরি হাওয়াতে আমাদের কোনো বাধা নেই। তবে অনেক দল থাকে যে একসঙ্গে দুই দল করা যাবে  না। সিএটিতে কিন্তু একটা সময় বিভিন্ন দল থেকে এসে কাজ করত। প্রতিটা দলেরই একটা দর্শন থাকে। দল চাইলেই যেকোনো নাটক করতে পারে না। যদি এমন কোনো নাটক থেকে থাকে যে নাটকটা দলের দর্শনের সঙ্গে যায় না তাহলে তো আমি চাইব না এটি আমার দলের ব্যানারে হোক। তার মানে কিন্তু এই নয় যে আমার নাটকটি আলাদা ব্যানারে করব। যদি করে থাকি আমার ওই ভাবনার জায়গা থেকে করব। সিএটির দর্শনের সঙ্গে আমার নাটকটি যায়। কারণ আমি তো সিএটির দর্শনে বেড়ে উঠেছি।

আনন্দধারা : মঞ্চের বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে কী মনে হয় আপনার?

শাহাদাৎ হোসেন : সংকট আসলে সব জায়গায় আছে। শুধু থিয়েটারে পয়েন্ট করে লাভ কী! আর থিয়েটারের সংকটকে আমি সংকট হিসাবে দেখছি না। এই অবস্থান সব সময়ই ছিল। আমরা বলি আগের দশক ভালো ছিল। তার আগের দশকে বলত তার আগের দশক ভালো ছিল। সব সময়ই এই একই কথা চলে এসেছে। আমি থিয়েটারে খুব সম্ভাবনা দেখি। থিয়েটার যুগে যুগে ছিল এবং থাকবে। থিয়েটারের প্রয়োজনীয়তা প্রভাব ও শক্তি কোনোদিন কমবে না। বরং দিন দিন আরো বাড়বে। দর্শক সংকটের বেলায় আমি মোটাদাগে যদি বলি, তাহলে দর্শক কমে যাওয়ার জন্য ভালো নাটক না হওয়া এই নির্ধারিত কিছু পয়েন্টে সবাই আলোচনা করে। এই কারণ ছাড়াও আরো বিশদ কারণ রয়েছে। ঢাকা শহরে কেউ ২ ঘণ্টার নাটক দেখতে চাইলে অর্থের পাশাপাশি তার সারাদিন নষ্ট হয়ে যায়। কতদিন দর্শক এভাবে নাটক দেখবে। এ বিষয়গুলো আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এগুলো যদি সমাধান না হয় তাহলে দর্শক বাড়বে না।

আনন্দধারা : জাতীয় পর্যায়ে যে নাটক হচ্ছে, সবগুলোই কি মানসম্মত নাটক হচ্ছে বলে মনে করেন?

শাহাদাৎ হোসেন : না, তবে এই জায়গাগুলো আসলে ঠিক করা দরকার। বিষয়গুলো নিয়ে পলিসি মেকারদের বসা উচিত। কীভাবে এটা ঠিক করা যায়। তার মানে আবার এই নয় যে চলচ্চিত্রের মতো নাটকেরও সেন্সরশিপ দরকার। থিয়েটারে তো কখনো সেন্সরশিপ ছিল না। কিন্তু তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো কঠিন হতে হয়। কিছু পদক্ষেপ নিতে হয় ভালোর জন্য। এ রকম কিছু একটা স্তর থাকতে পারে যেখানে মান নিশ্চিত করা হবে। শুধু তা-ই নয়, দেশের বাইরে এমন অনেক নাটক যাচ্ছে, যা দেখলে বাংলাদেশি নাটক সম্পর্কে একটা বিরূপ ধারণা তৈরি হবে। পাশাপাশি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশ থেকে কোনো নাটক যাচ্ছে না কেন। এই বিষয়গুলো নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত। আমি যদি নাটকের সংকট, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের কথা বলি, তাহলে সব বিষয় নিয়েই কিন্তু কথা বলতে হবে। এই জটিলতাগুলো দূর করতে হবে। নাটকের মান ঠিক করতে হবে। তা না হলে আমাদের যে সম্ভাবনা, সেগুলো হারিয়ে যেতে পারে। আমি খুব আশাবাদী। তার কারণ যদি বলি বাংলাদেশে একজন বাঙালি হয়ে জন্মগ্রহণ করে আমি গর্বিত নই। বাংলার ইতিহাস জেনে আমি গর্বিত। কারণ এই জাতির একটি সম্মানের ইতিহাস আছে। এই জায়গা থেকে যদি বলি, আমরা সারা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে এখনো আছি, আগামীতে থাকব। আর সেজন্য সংস্কৃতি অনেক বড় বিষয়। সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে থিয়েটার। সুতরাং থিয়েটারকে দুর্বল করে অন্য মাধ্যমে উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। থিয়েটারের প্রতিটা ছেলেমেয়েই কিন্তু তার কর্মস্থলে সেরা কাজটাই করছে। কাজেই থিয়েটারকে আমি যত সমৃদ্ধ করব। আমার গোটা সংস্কৃতি তত উন্নত হবে।

আনন্দধারা : মঞ্চে উল্লেখযোগ্য কাজের খুবই অভাব। এর কারণ কী মনে হয় আপনার?

শাহাদাৎ হোসেন : এই মুহূর্তে আমার মনে হয় নির্দেশকের অভাব। ভালো নির্দেশক হলে ভালো নাটক আসবে। কারণ ভালো নির্দেশক হলে তার সঙ্গে ভালো অভিনয়শিল্পীরা কাজ করতে চাইবে। পাশাপাশি কিছু শিল্পী তার সঙ্গে কাজ করে ভালো শিল্পী হয়ে উঠবে। ভালো ডিজাইনার তখন তৈরি হবে। মূল চাবিকাঠি হচ্ছে নির্দেশক। আমি কিন্তু সিএটি নাম দেখে থিয়েটার করতে আসিনি। কামালউদ্দিন নিলু স্যারের জন্যই এসেছি। এখন পর্যন্ত দর্শক নির্দেশকের নাম দেখেই নাটক দেখে। যেমন জামিল স্যারের নামেই কিন্তু দর্শক নাটক দেখে, দলের নামে নয়।

আনন্দধারা : ভালো নির্দেশক তবে কেন তৈরি হচ্ছে না?

শাহাদাৎ হোসেন : মানুষের এখন অনেক ব্যস্ততা। আগে মানুষ আয় বুঝে ব্যয় করত। এখন মানুষ ব্যয় বুঝে আয় করে। এখন এই আয়-ব্যয়ের নিমিত্তে মানুষের ব্যস্ততা এত বেড়ে গেছে। মানুষ তার চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা আর বিলাসিতা বাড়িয়ে ফেলেছে। এগুলো পূরণ করার পাশাপাশি সামাজিক সম্মান এবং উন্নয়নের পেছনে ছুটতে গিয়ে এখন আর ভালোমানের নির্দেশক তৈরি হচ্ছে না। কারণ থিয়েটারের নির্দেশক হতে গেলে পর্যাপ্ত অর্থ উর্পাজন করা যাবে না। সিএটির বাইরে আমার কাজের অভিজ্ঞতা খুবই কম। সেটার পেছনে কিন্তু এটাও একটা কারণ। আমি বলছি না যে ভালো নির্দেশক নেই। অনেকে ভালো কাজ করছেন। সেই সংখ্যাটা খুবই কম। আমার হয়তো সেসব নির্দেশকের সঙ্গে বসা হয়নি। আমাদের এ রকম নির্দেশক দরকার, যাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য নাট্যকর্মীরা বসে থাকে। যেমন কামালউদ্দিন নিলু স্যার কবে দেশে আসবেন এজন্য আমরা সবাই বসে থাকি। অন্যান্য দল থেকে অনেক কর্মী আমাকে বলে, স্যারের সঙ্গে কাজ করতে চায়। ভালো নির্দেশকের নাটকে কিন্তু অর্থের সংকটও হয় না। আমার কাছে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা মনে হয় সেটা হলো, আমরা শিল্পের সঙ্গে আপস করে চলি। শিল্পের প্রতি প্রেমটা ঠিক নেই। আমাদের কাছে শিল্পপ্রীতির চেয়ে বিলাসিতা প্রীতিতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।