শত কষ্টের মাঝেও থিয়েটার থেকে বিচ্যুত হইনি

বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের অগ্রদূত নভেরা আহমেদের জীবন ও তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সাজ্জাদ রাজীবের নির্দেশনায় এ শিল্পীর জীবন সংগ্রাম ও অবিরাম পথচলার গল্প একক অভিনয় করছেন ঢাকা থিয়েটারের অভিনয়শিল্পী ও ‘ধ্রুপদী অ্যাক্টিং স্পেস’-এর পরিচালক সামিউন জাহান দোলা। অভিনয় তার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। দুই যুগ ধরে মঞ্চাঙ্গনে পথচলাসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : মঞ্চে আপনার বর্তমান কাজের ব্যস্ততা কী নিয়ে?

সামিউন জাহান দোলা : ঢাকা থিয়েটারের পুত্র নাটকে বর্তমানে কাজ করছি। সেলিম আল দীনের লেখা নাটক থেকেই পুত্র নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফ। এছাড়া ঢাকা থিয়েটারের কয়েকজন মিলে প্রতিবন্ধী শিল্পীদের নিয়ে সুন্দরম নামে আরেকটি প্লাটফর্ম খুলেছি। বর্তমানে সুন্দরমের সঙ্গে কাজ করছি। পেশাগতভাবে আপাতত তিন বছরের এ প্রকল্পে আমরা কাজ করছি। ব্রিটিশ কাউন্সিল আমাদের সহযোগিতা করছে। এছাড়া নিজস্ব ব্যানারে ‘নভেরা’ নামে একটি একক নাটকে কাজ করছি।

আনন্দধারা : একক নাটক তো অনেক চ্যালেঞ্জিং। নিজস্ব ব্যানারে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা হয়নি?

সামিউন জাহান দোলা : যদিও একক বলি, থিয়েটার কিন্তু একা একা হয় না। যদিও মঞ্চে আমাকে একা দেখা যায় কিন্তু নেপথ্যে অনেকেই কাজ করেন, যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার জন্য কাজটা চ্যালেঞ্জিং ছিল যেহেতু এটা আমি ঢাকা থিয়েটারের ব্যানারে করিনি। আমার ধ্রুপদী অ্যাক্টিং স্পেসের নিজস্ব স্কুলের ব্যানার থেকে করেছি। অর্থনৈতিক, প্রচার এমনকি শিল্পের জায়গা থেকে আমার জন্য কাজটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ আমার জীবনে প্রথম একক অভিনয় কেমন হবে, কী হবে সবকিছু মিলিয়ে অভিনয় এবং সৃষ্টিশীলতার জায়গা থেকে নাটকটি আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। নাটকটিতে তেমন প্রচার-প্রচারণাও করতে পারিনি। তবে যা কিছু করার দর্শকই করেছেন। দর্শকই আলোচনা করেছেন। দর্শকই প্রশংসা করেছেন। দর্শকই দর্শক এনেছেন। কিন্তু আমি নভেরার শো করার জন্য চার মাস শিল্পকলার পেছনে ঘুরে কোনো হল পাইনি। আমি একটি নাটক বানিয়ে চার মাস ধরে বসে ছিলাম। পরে এক মাসের বাসা ভাড়া না দিয়ে মহিলা সমিতিতে হল ভাড়া নিয়ে নাটক করেছি।

আনন্দধারা : হল না পাওয়ার কারণ কী মনে হয় আপনার?

সামিউন জাহান দোলা : এখানে একটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাজ করে। আসলে যারা গ্রুপ থিয়েটারের আওতাভুক্ত তারা কম সময়ে এবং কম দামে হল পায়। তবে গ্রুপ থিয়েটার কিছু ভালো নাটককে কম মূল্যে হল দিয়ে ব্যাকআপ দেয়। তবে আমার ক্ষেত্রে গ্রুপ থিয়েটারের ক্ষমতার চর্চাটা একটা বড় বিষয় বলে মনে হয়। আসলে নাটকের মানদ- করা উচিত। কিন্তু শিল্পের মানদ- আসলে করবে  কীভাবে! ফেডারেশনের নেতারা মন খুশি করার জন্য অনেককে হল দিয়ে থাকেন, হয়তো সে কারণে আমি শো করার জন্য হল পাইনি।

আনন্দধারা : সংস্কৃতি অঙ্গনে আপনার পথচলা শুরু হয় কীভাবে?

সামিউন জাহান দোলা : এ তো অনেক লম্বা কাহিনী। প্রায় দুই যুগ ধরে আমি থিয়েটার করছি। আমি প্রথম মঞ্চে অভিনয় করি ১৯৯৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। আমার বাবা নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। বাবা যখন অবসর গ্রহণ করলেন, তখন আমাদের নিয়ে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় চলে যান। তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। সেখানে রাজেশ্বরী থানা নাট্যদল নামে একটা থিয়েটার ছিল। তখন ওনারা বলেছিলেন আমাদের একটি নাচের মেয়ে দরকার। আমি যেহেতু নাচ জানতাম, তখন আমার আগ্রহও ছিল ব্যাপক। যদিও পরিবারের আপত্তি ছিল, তারপর আমার স্কুলশিক্ষকের মাধ্যমে তখন আমি মঞ্চে পারফর্ম করি। এটাই ছিল আমার প্রথম মঞ্চে অভিনয়। তারপর ময়মনসিংহে কলেজে ভর্তি হয়ে থিয়েটার করতে শুরু করলাম। কলেজে থিয়েটার করা থেকে আমার আগ্রহ জন্মাল এবং তখন জানতে পারি, থিয়েটার নিয়ে লেখাপড়া করা যায়। তখনই সিদ্ধান্ত নিই আমি থিয়েটার নিয়েই লেখাপড়া করব। প্রথম বছর ফরম পূরণে ভুলের কারণে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তারপর এক বছর অপেক্ষা করে ২০০২ সালে নাট্যকলা বিভাগে ভর্তি হই। কয়েক মাস পরই আমি ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হই। তখন সেলিম আল দীন স্যার ছিলেন। আরণ্যক, প্রাচ্যনাট, ঢাকা থিয়েটার তিনটি দল আমার পছন্দের ছিল। পরবর্তী সময়ে ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হই। কারণ আমার জন্য ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হওয়া সহজ ছিল।

আনন্দধারা : নিজেকে কেন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত করলেন?

সামিউন জাহান দোলা : মানুষ কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে খোঁজে, নিজের ভালোলাগাকে খোঁজে। নিজের ভালোলাগার বাইরে যখন যায়, তখন কিন্তু সে বেশিদূর এগোতে পারে না। ভালোবেসে পাগলের মতো সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নিজেকে খোঁজার জন্যই আমি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হই। আমি কিন্তু এখন থিয়েটার করে জীবিকা নির্বাহ করি। থিয়েটারই করব বলে আমি কোনো চাকরি করিনি। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া থিয়েটার নিয়েই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তারপরও আমি তা করিনি। কখনো বিসিএসের জন্য আবেদনও করিনি। ২০১০ সালে পড়ালেখা শেষ করার পর মিডিয়াতে কস্টিউমে কাজ করেছি কিন্তু কোনো চাকরিতে জয়েন করিনি। কারণ তাহলে আমার থিয়েটার করাটা মুশকিল হয়ে যাবে। বর্তমানে আমরা থিয়েটারের সদস্যরা মিলে যখন সুন্দরম করলাম, এখানে কিন্তু পাঁচজন মানুষ কাজ করতে পারছে আর সবাই বেতনভুক্ত। আমরা এখনো পাগলের মতো কাজ করছি। দীর্ঘ এ পথচলায় দেখেছি কত শিল্পী ঝরে গেছে। থিয়েটারের সিনিয়র শিল্পী যারা এখন মিডিয়াতে কাজ করছে, তাদের কিন্তু এখনো থিয়েটারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। মঞ্চটা একটা অন্যরকম শিল্পমাধ্যম। আমাদের জন্য এখনো সেই সুযোগটা তৈরি হয়নি। তবে সম্ভাবনাটাও অনেক কঠিন। চোখের সামনে বন্ধু-বান্ধবরা গাড়িতে চলছে। বিসিএস ক্যাডার হয়ে যাচ্ছে। যদিও এখানে মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে উত্তরণ করাটা অনেক কঠিন, তারপর কিন্তু শুধু ভালোবেসে নিজের মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে থিয়েটারটাই করে যাচ্ছি।

আনন্দধারা : থিয়েটারের জন্য এত পরিশ্রম, এত ত্যাগ করছেন। আপনার কি মনে হয় থিয়েটারটা আসলে কাদের জন্য?

সামিউন জাহান দোলা : থিয়েটার সবার জন্যই। যদিও আমরা শ্রেণিবিভক্ত করি। অর্থনৈতিক দিক বা ক্ষমতার দিক থেকেই হোক আমরা কিন্তু এটা পার্থক্য করে ফেলি। তবে এখানে অর্থনৈতিক বিষয়টা একটা বড় ব্যাপার। কারণ অর্থনৈতিক চিন্তা না থাকলে নির্বিঘ্নে থিয়েটারটা করা যায়। কারণ পয়সা না থাকলে চিন্তা এবং মনন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

আনন্দধারা : তাহলে একটি থিয়েটার দলের মধ্যে বৈষম্য দেখা যায় কেন?

সামিউন জাহান দোলা : বৈষম্য হয় আমি দেখেছি। পয়সার দিক থেকেও দেখেছি যে কে কতটা প্রিয়। এই জায়গাটা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। মঞ্চে পরিবার চর্চা তো একটা বিষয় আছেই। কারণ যাদের কেউ নেই তাদের কী পরিমাণ স্ট্রাগল করতে হয়েছে, সেটা আমি জানি। যাদের নেপথ্যে পয়সা ও আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই, তাদের জন্য থিয়েটার করা অনেক কষ্টকর। যদি আমি কোনো মন্ত্রী, ক্ষমতাশীল বা বিত্তবান কারো সন্তান হতাম, তাহলে আমার এত স্ট্রাগল করতে হতো না। আমার কোয়ালিটি থাকুক বা না থাকুক আমার একটা জায়গা হয়ে যেত। দুই যুগ ধরে থিয়েটার করে সর্বশেষ চার-পাঁচ বছর ধরে হয়তো মানুষ আমাকে চেনে। সবকিছু আমার ডেডিকেশন আর পাগলামির কারণেই হয়েছে। এছাড়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে মেধা নয়, নারীকে বিচার করছে অবয়ব বা তথাকথিত সৌন্দর্য দিয়ে। থিয়েটারে শারীরিক সৌন্দর্যের প্রয়োজন পড়ে না ঠিকই কিন্তু যখন নায়িকা চরিত্রে কাউকে নির্বাচন করা হয়, তখন অভিনয় না জানলেও চলে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের যুদ্ধ করতে হয় ক্ষমতা চর্চা আর পুঁজিবাদী মনোভাবের সঙ্গে। এগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে সামনের দিকে যাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার।

আনন্দধারা : একটা সময় এসে মঞ্চ শিল্পীদের মাঝে হতাশা কেন কাজ করে?

সামিউন জাহান দোলা : আমার শত কষ্টের মাঝেও আমি একদিনের জন্য থিয়েটার থেকে বিচ্যুত হইনি। আমি অনেককে দেখেছি মঞ্চে খুব ভালো কাজ করত কিন্তু এখন করতে পারছে না। জীবিকার তাগিদে ভালোবাসা থাকলেও থিয়েটারটা করতে পারছে না। কারণ থিয়েটার করে তো সে কিছুই পাবে না। পরিবার-পরিজন সবকিছুর চাপ সহ্য করে নিজের মনে শিল্পের যে ক্ষুধা, সেটাকে মাটিচাপা দিতে হয়। সেজন্য পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরাসরি অভিনয় না করে বিভিন্ন ডিজাইন বা নেপথ্যে কাজ করলে হয়তো কিছুটা অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।

আনন্দধারা : দীর্ঘ এই পথচলায় কী কী প্রতিকূলতার শিকার হতে হয়েছে?

সামিউন জাহান দোলা : শুরু থেকেই প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই থিয়েটার করেছি এবং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই শিখেছি। প্রথম প্রতিবন্ধকতা ছিল পরিবার। পরিবার আমার পক্ষে ছিল না। পরিবার আমার পড়াশোনার খরচও দেয়নি। বাবা বলেছিলেন, থিয়েটার ডিপার্টমেন্টে পড়া তো একটা বিলাসিতা। বাবা চেয়েছেন অন্য কোথাও পড়ি, যাতে সহজে চাকরি পাওয়া যায়। পড়ার জন্য আমি নিজেই নিজের খরচ চালিয়েছি। এছাড়া দ্বিতীয় অর্থনৈতিক এবং তৃতীয় হচ্ছে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। এখনো কিন্তু আমাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ক্যারিয়ার নিয়ে একটা দোদুল্যমানতা কাজ করে। আমি কি এখান থেকে প্রতিষ্ঠা পাব! আমার বিসিএস ক্যাডার বন্ধু যে মূল্যায়নটা পাচ্ছে, আমি কি সেটা পাচ্ছি! অথচ দু’জনই দেশের জন্য কাজ করছি। সমাজের জন্য কাজ করছি। বাড়ি-গাড়ি সবকিছুর মোহ ত্যাগ করেই তো আমি থিয়েটারটা করছি। বাড়ি-গাড়ি হবে না জেনেই থিয়েটার করছি। দুই বছর করা দ্বিগুণ টাকার চাকরি ছেড়ে অর্ধেক টাকা বেতনে আমি কাজ করছি। কারণ আমি থিয়েটারটা করব বলে। নারীর প্রতি আমাদের সমাজের যে মূল্যায়ন, সেটা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আমাকে শুনতে হয়, এত ভালো রেজাল্ট করেও কিছুই করলে না, থিয়েটারটাই করছো। যদিও আমি এগুলোর হিসাব মেলাতে চাই না।

আনন্দধারা : মঞ্চে কাজ করার ক্ষেত্রে তরুণদের আগ্রহ নেই কেন?

সামিউন জাহান দোলা : তার কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যায়ন ছাড়া আর কিছুই না। সমাজে একজন শিল্পীর মূল্যায়ন বাড়িয়ে দিলে আর অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

আনন্দধারা : মঞ্চের বর্তমান অবস্থা আপনার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?

সামিউন জাহান দোলা : শিল্পের জায়গা থেকে বাংলাদেশে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ করে। আমাদের অনেক ভালো ভালো পরীক্ষামূলক কাজ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের পেশাজীবীর জায়গাটা নেই। এটা একটা বড় বাধা। আমরা শিল্পীকে ধরে রাখতে পারি না। হল সংকটের কারণে ভালো ভালো অনেক নাটক নিয়মিত মঞ্চায়ন করা যায় না। আমাদের দক্ষ অভিনেতা, নির্দেশক সবই আছেন কিন্তু আমাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। যদি পেশাদারিত্ব থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ভালো অবস্থানে যাবে। আর যদি না হয়, তাহলে দিন দিন একটা বিলুপ্ত শিল্প পর্যায়ে চলে যাবে এই শিল্পটা। ইতোমধ্যে কিন্তু আমরা হুমকির সম্মুখীন। এখনই সময় শিল্পকে বাঁচাতে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

ছবি : সাজ্জাদ ইবনে সাঈদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।