থিয়েটার নিজেই একটা বড় ক্যানভাস

সামিনা লুৎফা নিত্রা যিনি একজন শিক্ষক, অভিনয়শিল্পী ও নাট্যকার। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে ঢাকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন সেই এক­ই বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার ভালবাসা শুধু থিয়েটারকেই ঘিরেই। প্রথমে সুবচনে কাজ করলেও পরে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি করেন বটতলা থিয়েটার। তার পথচলার গল্পের পাশাপাশি বর্তমান কর্মকান্ড ও আর ভবিষ্যৎ ভাবনার কিছুটা ভাগ করেছেন আনন্দধারার সঙ্গে। 

আনন্দধারা : খনা নাটকটির পর নাটক লেখা নিয়মিত করেননি কেন?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : আমার আসলে নাটক লিখতে গেলে রিসার্চে প্রচুর সময় লাগে। খনা লিখতে আমার আট বছর লেগেছে। খনা লিখেছি ২০০৮ সালে। তার আট বছর পর ক্র্যাচের কর্নেলের নাট্যরূপ নিয়ে দু’জন মিলে কাজ করেছি। তার মাঝে একটা পথনাটক লিখেছি। ক্রিয়েটিভ রাইটিং কখনোই আমার মূল কাজ ছিল না। দলের প্রয়োজনে নাটক লেখা হয়েছে। এছাড়া কোনো বিষয়বস্তু যদি তাড়িত করে তখন লেখা হয়। যেটা খনার বেলায় হয়েছিল। লেখক হতে গেলে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমি মূলত পাঠক। আমার কাছে মনে হয় আমার লেখায় অনেক ঘাটতি থেকে যায়, সেটা একটা কারণ হতে পারে। কারণ আপনি তৃপ্ত হই না সহজে। এছাড়া সময় একটা বিষয়। ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের জন্য যে নিজস্ব সময় দরকার, সেটা আমার হয়ে ওঠে না।

আনন্দধারা : অভিনয় নাকি লেখালেখি নিজেকে কোথায় খুঁজে পান?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : অভিনয় আমাকে সার্বক্ষণিক টানে কারণ অভিনয়ের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে একটা নতুন কিছু সৃষ্টি হয়। তাছাড়া আমি মূলত একজন অভিনেত্রী। অভিনয় করার জন্যই থিয়েটারে এসেছি। কিন্তু লেখালেখি যে একদম টানে না তা কিন্তু নয়। গত পাঁচ-সাত বছরে এ রকম অনেক নাটক লেখা শুরু করেছি কিন্তু শেষ করতে পারিনি। লেখার জন্য যে স্থির সময়টা দরকার সেটা পাচ্ছি না যে, একাগ্রচিত্তে বসে বসে লিখব। অনেক সময় সবকিছু এত বেশি তাড়িত করে যে কোনটা নিয়ে নাটক লিখব সেটাই ভেবে উঠতে পারি না। লেখার প্রতি আগ্রহ থাকলেও দলগত কারণে অভিনয়টাই বেশি করা হয়।

আনন্দধারা : আমাদের মঞ্চে নাট্যকার সংকট আছে বলে মনে করেন?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : অবশ্যই সংকট রয়েছে। আমি যেহেতু লিখি কিন্তু সেটা নিয়মিত করছি না এটা একটা খারাপ দিক বলেই আমার মনে হয়। কারণ আমাদের ভালো স্ক্রিপ্টের খুবই অভাব রয়েছে। একটা ভালো স্ক্রিপ্ট দিয়ে খারাপ নাটক বানানো যাবে কিন্তু একটি খারাপ স্ক্রিপ্ট দিয়ে ভালো নাটক করা কখনোই সম্ভব নয়। বর্তমানে আমাদের কাছে ভালো স্ক্রিপ্ট নেই। গত দুই-তিন বছর ধরে আমরা স্ক্রিপ্ট খুঁজছি। দেখা যায় যেগুলো সাহিত্যিকরা লিখেছেন, সেগুলো অনেক দুর্বোধ্য। আবার যেগুলো থিয়েটারের লোকজন লিখেছেন, সেগুলো আবার খুব সাদামাটা। আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে এ রকম নাটক আমরা পাচ্ছি না। সব চর্বিত চর্বণ মনে হচ্ছে। ক্ল্যাসিক নাটকগুলোর মধ্যে যে কৌশল আছে, সেগুলোর কাছাকাছিও আমরা নেই। নিজস্বতা তৈরি করা তো অনেক দূরের ব্যাপার। বর্তমানে নাট্যকাররা নাটক লিখতে পারছেন না বলে উপন্যাস থেকে নাট্যরূপ দেয়া হচ্ছে। ফলে আমাদের ক্যানভাসটা ছোট হয়ে যাচ্ছে। থিয়েটার নিজেই একটা বড় ক্যানভাস দাবি করে। কিন্তু আমাদের নাট্যকাররা সেটা করতে পারছেন না।

আনন্দধারা : এর কারণ আপনার কাছে কী মনে হয়?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : আমার মনে হয় যারা নাটক লিখছেন তারা যথেষ্ট পড়েন না। এছাড়া কোনো উত্তর আমার কাছে নেই, তবে সময়টাকে বুঝতে পারার একটা ব্যাপার আছে, কোন সময় আপনি কী লিখবেন এবং কী নিয়ে লিখবেন। এ  বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের মধ্যে একটা আপস কাজ করে। সেটাও একটা বিষয় আমি মনে করি।

আনন্দধারা : মঞ্চের বর্তমান সংকট এবং সম্ভাবনার কথা জানতে চাইলে কী বলবেন?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : আমাদের স্ক্রিপ্টের একটা বড় সংকট তো রয়েছেই। বর্তমান সময়টাতে থিয়েটার করা আসলে খুব কঠিন। যারা এখন বিনা পয়সায় সময় দিয়ে থিয়েটার করে তারা আজকের সমাজে উন্মাদ বলে বিবেচিত হবে। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আমাদের কর্মীর। কর্মীদের কারণে বড় ক্যাম্পাসের নাটক ছোট করে করতে হচ্ছে। কারণ কর্মীদের দায়বদ্ধতার অভাব বলে মনে হয়। এ রকম বিষয় থিয়েটারে থাকলেও আমাদের বুঝতে হবে এখনকার থিয়েটারে আমরা তাদের কীভাবে যুক্ত করব। দর্শকের কথা যেটা সবাই বলে সেটার সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ আমি বিশ্বাস করি নাটকের কনটেন্ট যদি ভালো হয়, ভালোভাবে নির্মাণ করা হয় এবং দর্শকের কাছে খবর পৌঁছে, তখন দর্শক নিজ থেকে এসেই নাটক দেখবে। কারণ দর্শকের কাছে দর্শকই খবর পৌঁছে দেবে। যেটা আমরা খনা এবং ক্র্যাচের কর্নেল নাটকে দেখেছি। আর মঞ্চে আমি সম্ভাবনা দেখছি এ কারণে যে, আমাদের দেশ হচ্ছে তরুণদের। তরুণরা এখন যে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে গল্পটা এখন আমরা থিয়েটারে বলি নাই। এই সময়ের মানুষের যে গল্প সেটা এখনো মঞ্চনাটকে আসে নাই। এই বিষয়টাতে আমাদের মনোযোগ দেয়া উচিত। আর একটা বিষয় হচ্ছে শিল্পকলার বাইরে নাটক করা। কারণ শিল্পকলার নাটক করার কথা চিন্তা করলে এক ধরনের আলস্য চলে আসে। কারণ শিল্পকলায় নাটক হলে পরিশ্রম করতে হয় না। মাসে একটা-দুইটা শো দলের তহবিল থেকে চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বাইরে শো করতে গেলে একটা চাপ থাকে। সেই চাপ সামলানোর জন্যও নাটকের প্রচার করতে হয়। বাইরে শো করার মধ্য দিয়ে এ ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা উচিত। যার ফলে নাটক দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারবে।

আনন্দধারা : আপনার সংস্কৃতি অঙ্গনের পথচলার গল্পটা...

সামিনা লুৎফা নিত্রা : আমি ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বড় হয়েছি। ক্যাম্পাসের সবাই কম-বেশি নানা রকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে। আমি নিজেও জড়িত ছিলাম। বিশেষ করে মা চাইতেন আমিও জড়িত থাকি। ১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় বর্ষ থেকে আমি একটি কর্মশালার মধ্য দিয়ে সুবচন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হই। সুবচনে প্রায় ১২ বছর থাকার পর আমরা যা করতে চেয়েছি তার সঙ্গে সুবচনের মতাদর্শের পার্থক্য ছিল বলে ২০০৮ সালে ২৫ জনের মতো বের হয়ে আমরা বটতলা দলটি গঠন করি।

আনন্দধারা : আপনারা কি শুধু মতাদর্শের কারণে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা যা করতে চেয়েছি তা গ্রুপ থিয়েটার করতে দিচ্ছে না। তখন মনে হয়েছে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা দিয়ে আমাদের হবে না। আমরা যখন বটতলা করি, তখন বটতলার গঠনতন্ত্রে আছে যে বটতলা কখনো গ্রুপ থিয়েটারের মেম্বার হবে না। কারণ গ্রুপ থিয়েটার ফরমেট আমাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। পেশাদারিত্ব থিয়েটার করাই আমাদের পরিকল্পনা ছিল। যদিও আমরা এখনো পরিপূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। তবে আমাদের দলে যারা দীর্ঘ সময় ধরে আছেন, তারা কিছুটা কাছাকাছি জায়গাটায় যেতে পেরেছে। আমাদের দলে একটা নিয়ম আছে যে, নাটক থাকলে তার চারদিন আগে মহড়া করতেই হবে। যারা নাটকে পারফর্ম করে না তাদের মহড়াতে আসার ক্ষেত্রে কোনো চাপ নেই। বটতলা সবসময় নানা ধরনের প্রান্তিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং আমাদের নাটকগুলোতে তার প্রভাব রয়েছে।

আনন্দধারা : থিয়েটারে কাজ করার অনুপ্রেরণা?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : এককভাবে কারো কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি কিনা জানি না। ছোটবেলায় স্কুলে সবসময় নাটক করতাম। এছাড়াও ঢাকার প্রথম শ্রেণির থিয়েটার দলগুলোর নাটক দেখে আমার কাছে খুব ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। তখন থেকেই আমার মাথার মধ্যে থিয়েটারের বিষয়গুলো কাজ করত। তাছাড়া আমি যে অভিনয় করব, সেটা অনেক আগেই পরিবারকে বলেছি। তারা হয়তো ভেবেছে, ছোটবেলায় এমনি এমনি বলেছি। কিন্তু আমি অনেকদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে যখন প্রথম বর্ষের রেজাল্ট ভালো করলাম, তারপর থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। কারণ পরিবারের একটাই চাওয়া ছিল, রেজাল্ট খারাপ করা চলবে না। তাছাড়া ছোটবেলায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চের আলোয় থাকার যে একটা নেশা সেটা নিজের মধ্যে কাজ করেছিল।

আনন্দধারা : অনেক থিয়েটার নাকি পারিবারিক সংগঠন। আসলে কি পারিবারিক প্রভাব থিয়েটারের ওপর পড়ে?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : অবশ্যই পড়ে। ঢাকায় তো অবশ্যই পড়েছে। আমি যদি থিয়েটারের পরিবার থেকে আসতাম, তাহলে আমার জন্য সবকিছু অনেক সহজ হয়ে যেত। আমার আর হায়দারের সন্তান যদি এখন থিয়েটারে আসে, ওর জন্য বিষয়গুলো সহজ হবে। যদি আমাদের মেয়ে থিয়েটার করে, সে বলেই দিয়েছে আমাদের দলে করবে না। কেউ কেউ বলেন, স্বামী-স্ত্রী থিয়েটার করলে থিয়েটার করা সহজ হয়। এ বিষয়টা একটু দ্বিমত আছে। কারণ আমরা হয়তো তাদের চিনি, যারা সফলভাবে থিয়েটার করে যাচ্ছেন। কিন্তু এর মধ্যেও যে কত হাজার হাজার স্বামী-স্ত্রী চলে গেছে সে হিসাব কিন্তু আমাদের কাছে নেই। যেহেতু আমাদের কাছে সফল কাপলদের হিসাব আছে, সেহেতু সবাই ভাবে হাজব্যান্ড ওয়াইফ একসঙ্গে থিয়েটার করলে থিয়েটারটা দ্রুত কাজ করে। এটা আমাদের নির্বাচিত একটা বয়ান। এটা কোনো ধরনের বিষয়বস্তু হতে পারে না। পাশাপাশি একসঙ্গে কাজ করলে অনেক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। যদি আমার স্বামি নির্দেশনা দেয়, আমি অভিনয় করি এবং আমি নাটক লিখিও তাতে করে শক্তিটা পরিবারের মধ্যে ঘুরতে থাকে। এটা সবসময় ভালো না-ও হতে পারে। দলের অন্যরা ভাবতে পারে উনারা পরিবারের সদস্য বলেই সে চরিত্র পাচ্ছে। এ ধরনের স্বজনপ্রীতির একটা সুযোগ থাকে বলে আমার মনে হয়। তবে আমাদের দলে স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই।

আনন্দধারা : থিয়েটারে বর্তমানে আপনার কাজের ব্যস্ততা?

সামিনা লুৎফা নিত্রা : আমরা একটি নতুন নাটক শুরু করছি। সেটাতে আমি অভিনয় করব। নাটকের নাম এখনো ঠিক হয়নি। তবে এটি কাঙ্গাল হরিনাথকে নিয়ে। নাটকটি লিখেছেন মাসুম রেজা। নির্দেশনায় ইউসুফ হাসান অর্ক। বর্তমানে আমি বটতলার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। আমাদের আগামী দু’বছরের কিছু পরিকল্পনা আছে। ছোট ছোট নানা ভাবনা কিংবা নারীজীবন নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা চলছে। এছাড়া বটতলা সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজ করতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রযোজনা ভালো হয়। সেগুলো পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে আর মঞ্চায়ন হয় না। এখন আমরা চাচ্ছি বটতলার প্রযোজনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নাটকগুলো টানা মঞ্চায়ন করব। দেশ নাটকের সঙ্গে আগে আমরা যমুনা নামে একটি ইংরেজি নাটক করেছিলাম। নাটকটি মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনার গল্প। এবারে নাটকটি আমরা বাংলায় করতে চাচ্ছি। নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এ নাটকটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছে। নাটকটি দুই দল মিলে করার কথা চলছে। নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করবেন এই নাটকটির নাট্যকার সেলিনা শেলী। উনি দেশ নাটকের। এটি নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী হায়দার। নাটকটির কোরিওগ্রাফি করেছি আমি।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।