থিয়েটার বাঁচবে কর্মী নিয়ে শিল্পী নিয়ে নয়

মুকুল রহমান একাধারে একজন মঞ্চাভিনেতা ও নির্দেশক। এই নাট্যকর্মী তার থিয়েটারের যাত্রা শুরু করেন অরিন্দম নাট্য সংগঠনের মধ্য দিয়ে। এরপর নাটকের প্রতি অবিরাম ভালোবাসা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা করেন থিয়েটার নিয়ে। পেশাদারিত্ব থিয়েটারচর্চার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যদল পালাকার। বর্তমানে মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন এই অভিনেতা। তার কর্মব্যস্ততা আর থিয়েটারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে। 

আনন্দধারা : মঞ্চে আপনার বর্তমান কাজের ব্যস্ততা কী নিয়ে?

মুকুল রহমান : তিনটি প্রযোজনা নিয়মিত হচ্ছে পালাকারে। বাংলার মাটি বাংলার জল, ওজানে মৃত্যু, রং লেগেছে। বাংলার মাটি বাংলার জল-এ আমি অভিনয় করি এবং সহকারী পরিচালক। উজানের মৃত্যুতে আমি অভিনয় করছি এবং রং লেগেছে আমার নির্দেশনা। 

আনন্দধারা : সংস্কৃতি অঙ্গনে আপনার পথচলা শুরু হয় কীভাবে?

মুকুল রহমান : ১৯৮৯ সাল থেকে চট্টগ্রামের অরিন্দম নাট্য সংগঠনের মধ্য দিয়ে আমার পথচলা শুরু হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি থিয়েটার নিয়ে লেখাপড়া করেছি। এর আগে স্কুলে এবং শাপলা কুঁড়ির আসর শিশু সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করেছি। আমি অভিনয় দিয়ে শুরু করলেও একটা সময় দল আমাকে নির্দেশনার দায়িত্ব দেয়। ঢাকায় আরো দু-একটি নাট্যদলের সঙ্গে অভিনয় করছি এবং সহকারী নির্দেশনার কাজও করছি। চট্টগ্রাম থাকা অবস্থায় ১৯৯৫ সাল থেকে আমি নির্দেশনার কাজ শুরু করি। পরবর্তী সময়ে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ২০০২ সালে পালাকার প্রতিষ্ঠা করি।

আনন্দধারা : থিয়েটারে কেন নিজেকে যুক্ত করলেন?

মুকুল রহমান : প্রথমত অভিনয়ের প্রতি ভালোলাগা ও প্রেম। টেলিভিশন দেখতে দেখতে এ প্রেম জন্মেছে। থিয়েটার বলে কিছু আছে তখন জানতাম না। কলেজে পড়ার সময় থিয়েটার সম্পর্কে জানতে পারি। হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় দেখে আমার মনে হতো উনার মতো অভিনয় করতে পারব। উনার অভিনয় দেখে তখন মুগ্ধ হতাম। সত্যিকার অর্থে আমি যখন অরিন্দমের সঙ্গে যুক্ত হলাম, তখন বুঝতে পারলাম থিয়েটার একটা বড় জায়গা। একটা সমুদ্রের মতো। থিয়েটার পড়ালেখার বিষয়। তখন থেকেই থিয়েটারের প্রেমে পড়ে গেলাম। থিয়েটার আমার জীবনটাকে পাল্টে দিয়েছে। তবে পেশাদারিত্বের কথা যদি বলি, সেটা আমি অনুভব করি যখন স্নাতকোত্তর শেষ করলাম তখন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর একজন মানুষ কোথায় যাবে তার কোনো জায়গা নেই। এটা যখন আমি অনুভব করলাম, তখন আমার এক ধরনের স্ট্রাগল শুরু হলো। বিভিন্ন চাকরি করলেও এক পর্যায়ে ছেড়ে দিয়ে টানা দু’বছর থিয়েটার কর্মী হিসেবে ঢাকায় কাজ করেছি। আমরা যখন পালাকার করি, তখন প্রকৃতপক্ষে প্রফেশনালি থিয়েটার করব সে লক্ষ্যেই তৈরি করি।

 আনন্দধারা : মঞ্চে পেশাদারিত্ব আসা সম্ভব বলে কি মনে করেন?

মুকুল রহমান : অসম্ভব বলাটা বোকামি। আমাদের সেই কাঠামোটা নেই। পালাকার সেমি-প্রফেশনাল দল। এখনো পুরোপুরি পেশাদারিত্ব আচরণ নিয়ে শুরু করতে পারিনি। পালাকার কারো কাছ থেকে অনুদান নেয়নি। পালাকার সব সময় কাজ করে সে টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের যাতায়াত বা বেতন দিয়েছে। পালাকারে বর্তমানে চারজন আছে যারা ফুলটাইম বেতন নিয়ে কাজ করছে। থিয়েটার করেই আমরা সেটা আয় করি। আমাদের যে প্রক্রিয়ায় থিয়েটার চর্চা হয়, সেভাবে চললে পেশাদারিত্ব আচরণ আসা সম্ভব না। একটি নাটক যদি টানা ৩০ দিন মঞ্চায়ন হয়, সেখান থেকে লাভ করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের চলমান প্রক্রিয়ায় ৩০টা মঞ্চায়ন করতে চার বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে ছেলেমেয়েদের ধৈর্য থাকে না সামাজিক চাপে সবকিছু মিলিয়ে আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। এমন করে থিয়েটারকে কোনোভাবে পেশাদারি জায়গায় নেয়া যাবে না। সেজন্য আমরা নিজেদের মতো করে থিয়েটারকে পেশাদারি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। যারা আমাদের থিয়েটারের পথপ্রদর্শক কিংবা সিনিয়র আছেন, যারা থিয়েটার নিয়ে সারাদেশে সরকারি পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করছেন, তারা থিয়েটার নিয়ে না ভেবে নিজেদের নিয়েই ভাবেন বা ভেবেছেন।

আনন্দধারা : আপনার মতে জাতীয় নাট্যশালায় কোন ধরনের নাটক হচ্ছে?

মুকুল রহমান : গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এবং শিল্পকলা একাডেমির কিছু মানুষ আছেন তারা কিসের ভিত্তিতে হল বরাদ্দ দেন, এটা কখনোই স্পষ্ট নয়। এটার ভেতর প্রচুর রাকঢাক আছে। কারণ তাদের নির্বাচন  করতে হয়। সে কারণে নামকাওয়াস্তে কিছু সদস্যের পচা নাটকের জন্য হল না দিলে পরে তারা ভোট পাবে না। এ বিষয়গুলো আমরা সবাই জানি। তাদের কারণেই বাজে, পচা নাটকগুলো জাতীয় পর্যায়ে হচ্ছে। ফেডারেশন কিংবা হল বরাদ্দ কমিটিতে যারা আছেন, তাদের বিষয়গুলোতে দৃষ্টি দেয়া উচিত।

আনন্দধারা : গ্রুপ থিয়েটার চর্চা থিয়েটারের জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন?

মুকুল রহমান : যে ধারণা থেকে গ্রুপ থিয়েটার চর্চাটা শুরু হয়েছিল এখনকার গ্রুপ থিয়েটার সেই চর্চা থেকে সরে এসেছে। গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় আমি বিশ্বাসী না। সে কারণে পালাকার এখনো গ্রুপ থিয়েটারের মেম্বার হয়নি। কখনো হতেও চাইনি। গ্রুপ থিয়েটার একটা আন্দোলন হিসেবে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তারা যতটা না এসব বিষয় আদায় করছে, তারচেয়ে বেশি দলের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ফেডারেশন বলছে, নাট্যকর্মী শব্দটা সরিয়ে নাট্যশিল্পী করার জন্য। এটা নিয়ে আমি খুবই প্রতিবাদ করেছি। কারণ থিয়েটার বাঁচবে কর্মী নিয়ে, শিল্পী নিয়ে নয়। আজকে যে আসবে সে কালকে শিল্পী হয়ে যাবে। এগুলো আসলেই ফালতু কথাবার্তা। শিল্পী কথাটির মধ্যে কোনো মহত্ত নেই, যতক্ষণ না পর্যন্ত লোকটি মহৎ হয়ে ওঠে। কর্মী কথাটা যে কোনো মানুষের কাছেই গৌরবের। এ বিষয়গুলো নিয়ে ওনারা যখন কথা বলেছেন, তখন আমি বলেছি, এসব বাদে অন্য আরো কাজ আছে, সেই কাজগুলো করেন। উৎপল দত্তের মতো মানুষ নিজের নামের পাশে শিল্পী ব্যবহার করতে রাজি নন। কারণ তিনি বলেছেন, তিনি শিল্পী কি শিল্পী নন, সেটা ২০০ বছর পরে জানা যাবে। এখানে আমরা অর্বাচীনরা নিজেদের শিল্পী নির্ধারণ করে ফেলছি।

আনন্দধারা : মঞ্চে কাজ করতে এসে কী কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে?

মুকুল রহমান : যে বাধাগুলোর কথা আলোচনা করলাম, এগুলোকে খুব বড় বাধা মনে হয়নি। আমার কাছে সবসময় বড় সমস্যা মনে হয়েছে, আমাদের কর্মীরা থাকছে না। তাদের আমরা প্রেষণা দিতে পারছি না। একটা কর্মীদল তৈরি করতে পারছি না। পালাকার শুরুর তিন-চার বছরের মাথায় পুরো বাংলাদেশকে জানিয়ে দিতে পেরেছিলাম, কারণ তখন আমরা একটা কর্মী দল তৈরি করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এখন সেটার অভাব বোধ করি। কারণ এখনকার ছেলেমেয়েদের ডেডিকেশন নেই। এখন ওরা ভিন্ন সমাজব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছে। ফলে থিয়েটার নিয়ে তরুণদের আগ্রহ কম। তারা দেখছে, যারা থিয়েটার করেছেন বা তাদের পরিবারের কেউ করলে তিনি কিছুই করতে পারছেন না। অথবা নতুনরা এসে দেখছে সব সুবিধাভোগী এবং নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী নিজেরা নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তখন ওরা থাকবে না বা ওদের ধরে রাখা সম্ভব না। এখনকার থিয়েটার একটা সময়ের চুক্তিতে হওয়া উচিত। যেটা সৈয়দ জামিল আহমেদ দেখিয়েছেন।

আনন্দধারা : থিয়েটার দলগুলো ভেঙে যাওয়ার কারণ কী মনে হয় আপনার?

 মুকুল রহমান : প্রত্যেকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। একেকজন মনে করে অন্যজন লাভবান হচ্ছে, যেখানে সে নিজে কিছুই করতে পারছে না। আবার কখনো কখনো ভাঙে মতাদর্শের কারণে। কিন্তু দেখা গেছে ভাঙার সময় মতাদর্শের কারণে ভাঙলেও পরে কিন্তু ঠিক একই কাজ করে। যে দল থেকে বেরিয়ে আসেন ওই দল যে রকম প্রোডাকশন করছে, ঠিক একই কাজ সেও করে। আবার একটা সময় মতাদর্শ থেকেও বিচ্যুত হয়ে যায়। সর্বোপরি আমার মনে হয় নিজের নাম ফুটানোর জন্যই আলাদা হয়।

তবে একটা লাভ অবশ্যই হয়। যখন একটা দল থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সে একটা বড় ধরনের জাম্প দেয়। এতে করে অন্তত একটা ভালো প্রযোজনা দর্শকরা পায়। এছাড়া আর কোনো সুবিধা নেই, সবই অসুবিধা।

আনন্দধারা : মঞ্চের বর্তমান অবস্থা কেমন মনে হয় আপনার?

মুকুল রহমান : এখন বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা হচ্ছে। আমরা অনেক টুকরো হয়ে গেছি। আগে হয়তো এত টুকরো ছিল না। এখন সবগুলো দল এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আগে যেমন আদান-প্রদান করার একটা সুযোগ ছিল বা একটি দলের নাটক অন্যদল দেখতে যেত, সেটা এখন কমে গেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাড়া কেউ কারো নাটক দেখতে যায় না। তবে এখন কিছু ভালো কাজ হচ্ছে। সেগুলো হয়তো এক জায়গায় সমন্বয় করা দরকার। যদি সমন্বয় করা হয়, তাহলেই ভালো হবে। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি না। এখন কী অবস্থায় আছে, ভবিষ্যতে কোথায় যাবে। আমি মনে করি, সংঘবদ্ধতা এবং আদান-প্রদান থিয়েটারের বড় শক্তি। বিচ্ছিন্নভাবে এখন যে ভালো কাজ হচ্ছে তাতেও কোনো সমাজের প্রতিচ্ছবি নেই। একটা থিয়েটার খুব বেশি মানুষ দেখছেন না। নির্দিষ্ট দশকের মধ্যেই আমাদের থিয়েটার সীমাবদ্ধ। এর কারণ হচ্ছে আমরা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ। আমরা দর্শকদের কাছে যেতে পারছি না। বিভিন্ন জায়গায় নাটক ছড়িয়ে দিয়ে নাটকের প্ল্যাটফর্ম করে দর্শকের সঙ্গে আদান-প্রদান করতে হবে।

আনন্দধারা : অনেকেই বলে নাটকের মান ভালো হলে দর্শক শিল্পকলা এসেই নাটক দেখবেন। আপনার কি তাই মনে হয়?

মুকুল রহমান : হয়তো কিছু দর্শক এসে দেখবে। কিন্তু সবাই আসবে না। আমরা ঢাকা শহরে যে কাঠামোটা করে রেখেছি এটা শিল্পবান্ধব নয়। আমরা মানুষকে শিল্পমনা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি না। এগুলোর পরিবর্তন এবং এই মানসিকতা থেকে যতদিন বেরিয়ে আসা যাবে না, ততদিন আসলে দর্শক বাড়ার সম্ভাবনা কম। ভালো প্রযোজনা দর্শক টানে এটা সত্য। তবে নতুন দর্শক পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ ভালো নাটক হলে ঘুরেফিরে নাটকের দর্শকরাই নাটকটা দেখে। আমি এটা মনে করি না যে ভালো নাটক হলেই পুরো সমাজের মানুষ এসে নাটকটি উপচে পড়ে দেখবে। দর্শক কিছুটা বাড়লেও সাধারণ দর্শক কিন্তু আসবে না। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। একটা নীতিমালা দরকার যে, আমি আমার সমাজকে কীভাবে দেখব। কারণ যদি টাকা-পয়সার কামড়াকামড়ি চলে, তাহলে কখনই সমাজ শিল্পবান্ধব হবে না। এর ফলে নিজেদের মধ্যে হয়তো পরিবর্তন আসবে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোনো লাভ হবে না। সব শিল্প সবাই দেখেন না সত্যি। কিন্তু থিয়েটারের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা থাকবে তখনই, যখন সরকারিভাবে সমাজব্যবস্থার একটা পরিবর্তন আসবে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।