শ্রদ্ধাঞ্জলি : শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি থিয়েটারের ‘বিদ্রোহী কণ্ঠ’ ইশরাত নিশাতকে

জন্ম : ২৬ আগস্ট ১৯৬৪

মৃত্যু : ১৯ জানুয়ারি ২০২০

নতুন বছরের শুরুতেই থিয়েটার অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। গত মাসের ১৯ তারিখ রাত ১১টা ৩০ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন থিয়েটার জগতের খ্যাতনামা মুখ ইশরাত নিশাত। ঢাকার গুলশানে বোনের বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি আর সেখানেই মৃত্যু হয় তার। ৫৬ বছর বয়সী ইশরাতের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নামে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি মহলে। প্রয়াত অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ারের মেয়ে ইশরাত নিশাত। বাংলাদেশের থিয়েটার জগতে ‘বিদ্রোহী কণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ইশরাত নিশাত ‘দেশ নাটক’ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মঞ্চের পাশাপাশি অভিনেত্রী, নির্দেশক ও আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছিলেন তিনি। নাসিরউদ্দীন ইউসুফের ‘আলফা’ ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ইশরাত নিশাত। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর কণ্ঠ ছিল সব সময় সোচ্চার। ইশরাত নিশাতের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি।

ইশরাত নিশাত কখনো শুধু একটি দলের হয়ে নয়, বরং সব দলের হয়ে কাজ করেছেন। সবাইকে ভালোবেসেছেন পাশাপাশি সবার ভালোবাসাও পেয়েছেন। ইশরাত নিশাত নাটক ও জীবনকে একীভূত করেছিলেন, যা খুব কম মানুষই পারেন। অথচ এই মানুষটিই অকালে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

২০ জানুয়ারি সোমবার দুপুর ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সামনে সর্বস্তরের মানুষ শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ইশরাত নিশাতকে। তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই কথা বলেন ভালোবাসার মানুষগুলো। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন আসাদুজ্জামান নূর। ইশরাত নিশাতকে নিয়ে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বলেন, নিশাত আমার কন্যার মতো নয়, সে আমার কন্যা। ওর মা-ও মারা গিয়েছিলেন এমন গভীর রাতে। ওকে আগলে রাখতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু এমন উচ্ছল প্রাণের মানুষকে কী আর আগলে রাখা যায়! আপনারা সবাই মঞ্চের মানুষ হারিয়েছেন, আমি ঘরের মানুষ এবং মঞ্চের মানুষ, দু’জনকেই হারিয়েছি। নিশাত মানুষকে ভালোবাসতে জানতেন। সে নাটক ও জীবনকে একীভূত করেছিলেন। নির্দেশক এবং অভিনেতা আলী যাকের বলেন, নিশাতকে আমি মেয়ের মতো স্নেহ করতাম। তার চলে যাওয়াটা মেনে নেয়া কঠিন। তাকে হারিয়ে মঞ্চ অনেক কিছু হারাল। ইশরাত নিশাতের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেশ নাটকের সদস্যদের পাশাপাশি আরো উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী সারা যাকের, সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার, অভিনেত্রী মোমেনা চৌধুরী, কামাল বায়েজিদ, বৃন্দাবন দাসসহ অনেক থিয়েটার কর্মী এবং থিয়েটার ভালোবাসা অসংখ্য মানুষ। দলগতভাবে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগ, অভিনয় শিল্পী সংঘ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়সহ বেশকিছু সংগঠন। সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ নিশাতের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীসহ নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নাট্যশালার সামনে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ইশরাত নিশাতের মরদেহ নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদে। সেখানে তার জানাজা শেষে বনানী গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়। এছাড়া তাকে নিবেদন করে গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা পরীক্ষণ থিয়েটার হলে একটি শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে।

থিয়েটারের দ্রোহ কন্যা ইশরাত নিশাত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুতে থিয়েটার থেমে যেতে পারে না। আমার মৃত্যু হলেও দেশ নাটকের স্বপ্ন থামবে না।’ তারপরও শোক কাটিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারই হাতে গড়া নিজের দল ‘দেশ নাটক’ মঞ্চায়ন করেছে নতুন প্রযোজনা ‘জলবাসর’। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মাসুম রেজা। দলের সঙ্গে এই নাটকটি তার শেষ কাজ।

প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিতে মন আহত হলেও পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি, সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চায়িত হয় ‘জলবাসর’।

১৯৮৮ দেশ নাটকের প্রযোজনায় মঞ্চায়িত ইশরাত নিশাত রচিত নাটক ‘যাত্রা নাস্তি’। ১৯৯৯ সালে মাসুম রেজার কাহিনী অবলম্বনে ‘লোহা’ নাটকটির নাট্যরূপ দেয়ার পাশাপাশি নির্দেশনা দেন তিনি।

দেশ নাটকের হয়ে প্রথম ১৯৯২ ‘বোধ’ নাটকটির নির্দেশনা দেন ইশরাত নিশাত। এরপর ১৯৯৩ সালে তপন দাশ রচিত ‘পার্থক্য’ এবং সর্বশেষ দলের হয়ে ২০১২ সালে মাহবুব লীলেন রচিত ‘অরক্ষিতা’ নাটকটির নির্দেশনা দেন তিনি। এছাড়া তিনি সর্বশেষ ২০১৭ সালে নিউইয়র্কে মোস্তাক আহাম্মেদের রচনায় ‘হাছন রাজা’ নাটকের নির্দেশনা দেন।

ইশরাত নিশাত স্মরণে ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জ্যামাইকার স্টার কাবাবে অনুষ্ঠিত হয় শোকসভা। এতে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্কের জনপ্রিয় শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ। সভায় বক্তারা প্রয়াত ইশরাত নিশাতের ব্যক্তি ও কর্মজীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তার স্মরণে কবিতা আবৃত্তি করেন।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।