আড্ডা : গত দশকের মঞ্চ নাটক

গত এক দশকের মঞ্চাঙ্গন এবং তার অবস্থান নিয়ে এক আড্ডার আয়োজন করেছিল আনন্দধারা। আর এই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক মাসুম রেজা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ও নাট্য নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক, নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক এবং তরুণ নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী, নাট্য নির্দেশক আইরিন পারভিন লোপা, মঞ্চাভিনেত্রী শামছি আরা সায়েকা এবং নাট্য নির্দেশক ও অভিনেত্রী মহসিনা আক্তার। সেই আড্ডায় তারা জানিয়েছেন গত এক দশকের মঞ্চাঙ্গনের অবস্থান। পাশাপাশি মঞ্চাঙ্গনের সংকট ও সম্ভাবনার কথা। সেই আড্ডার সূত্রধর ছিলেন আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেন। থিয়েটার সংখ্যার বিশেষ আয়োজনে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো সেই আড্ডার অংশবিশেষ।

রাফি হোসেন : গত এক দশকে মঞ্চ নাট্যকারদের কথা যদি জানতে চাই তাহলে আমার মনে হয় আমাদের ভালো স্ক্রিপ্টের বড়ই অভাব। এর কারণ কী মনে করেন আপনারা?

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমি এটার সঙ্গে একমত না। আমি মনে করি যে পাণ্ডুলিপি রচয়িতা বা নাট্যকার যে নামেই ডাকি না কেন সবাই কম-বেশি লিখছেন। আমরা যারা নির্মাতা এটা আমাদের ব্যর্থতা। কারণ আমরা একটা ফরমেটের মধ্যে পৌঁছে গেছি। আমরা মনে করছি যে স্ক্রিপ্টটা এই রকম হওয়া উচিত। সে কারণে আমরা ভালো স্ক্রিপ্ট খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু অনেক ভালো স্ক্রিপ্ট কিন্তু আছে।

রাফি হোসেন : অর্ক তুমি হয়তো সেটা একটা প্রথাগত কথা বলছো। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি অনেক নতুন নতুন গ্রুপ, নতুন ছেলে-মেয়ে নানারকম কাজ করছে। কিন্তু সব কাজ একই রকম ভাবেই হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে যার যে কাউকে ভালো লাগতে পারে। কিন্তু ভালোটা তখনই হয় যখন এটা সর্বজন স্বীকৃত হয়।

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমার এখানেও দ্বিমত আছে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়ে কিন্তু শ্রেষ্ঠ নির্বাচন হয় না।

রাফি হোসেন : সর্বজনস্বীকৃত বলতে আমি এটা বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি সমালোচকদের কাছে নাটকের একটা অবস্থান তৈরি হওয়া এবং সর্বমহল থেকে নাট্যকারের কাছে আসা যে উনি ভালো লেখে। সেলিম আল দীনের নাম তো আর এমনি এমনি হয়নি কিংবা আমরা মাসুম রেজার মতো আরেকজন কেন পাচ্ছি না?

ইউসুফ হাসান অর্ক : সর্বজনস্বীকৃত হতে হলে একটা লম্বা সময় দরকার। আমার কাছে এক দশক খুব কম সময় মনে হয়। একজন সেলিম আল দীন কিংবা মাসুম রেজা হতে হলে কিন্তু তার একটা লম্বা সময় প্রয়োজন হয়।

মাসুম রেজা : অর্কের সঙ্গে আমি একটু যোগ করতে চাই। আমি এক দিক দিয়ে মানছি যে নাট্যকারের অভাব নেই এটি সত্য। আবার এটাও স্বীকার করছি, নাট্যকারের অভাবে এটাও সত্য। এর কারণ হিসেবে আমি বলি বলতে চাই যে, এক দশকে কিন্তু অনেকগুলো নাট্যকার অনেক নাটক লিখেছেন। তাদের বেশিরভাগই কিন্তু তরুণ নাট্যকার। একমত এ কারণে যে একজন পরীক্ষিত নাট্যকার হওয়ার জন্য এক দশক সময় যথেষ্ট কিনা! আবার এক দশক সময় খুব কম সেটাও কিন্তু নয়। তবে নতুন নাট্যকারদের ক্ষেত্রে একটু সমস্যা হয়। যেমন শাকুর মজিদ, সে আমাদের বয়সে কিন্তু সমান। নাটক লেখার ক্ষেত্রে কিন্তু নতুন। এখন শাকুর মজিদ কিন্তু তার অন্যান্য অনেক কাজের মধ্যে হঠাৎ করে যখন মনে হলো বাউল অথবা হাছন রাজাকে নিয়ে একটা নাটক লেখা দরকার, তখন তিনি লিখলেন। তিনি কিন্তু মঞ্চের মানুষ নন। তার দুটি নাটক ভালো হওয়ার পরও তিনি কিন্তু মঞ্চের নাট্যকার নন। সে কারণে আমি বলছি যে, মঞ্চে নাট্যকারের অভাবটি আছে। অনেকে একটি গল্পের ওপর ভালো কাজ করলেও দ্বিতীয় গল্পে আর তার নামটি শোনা যায় না। এর মাঝেও কিন্তু অনেক নাট্যকার তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে শুভাশিস সিনহা, আনন জামান, রুবাইয়াত আহমেদ, রুমা মদক, সাইমন জাকারিয়া, শামীম সাগর, মুকুল রহমান এদের নাম চলে আসবে। তাদের নাটক ভালো হচ্ছে কি খারাপ হচ্ছে সে বিচার না করলেও তারা কিন্তু পুরোপুরি লিখে যাচ্ছে। সেলিম আল দীন কিন্তু পড়ানোর পাশাপাশি নাটক লেখা ছাড়া আর কিছুই করতেন না। আমার কাছে মনে হয় বিশুদ্ধ, শুদ্ধ, অপরিশুদ্ধ এই তিন ধরনের নাট্যকার রয়েছেন। আমার মতে বিশুদ্ধ হচ্ছে যিনি শুধুই নাটক লেখেন। শুদ্ধ হচ্ছেন যিনি নাটক লেখেন আবার অভিনয়ও করেন। অপরিশুদ্ধ হচ্ছে যিনি নাটক লেখেন, অভিনয় করেন, আবার পরিচালনাও করেন। এই গোঁজামিলের কারণেই কিন্তু আজকে আমাদের এই অবস্থা। আজকে কেউ একজন এ কারণেই দাঁড়াচ্ছে না। মমতাজউদদীন আহমদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশিদ উনারা প্রথমে নাট্যকার, পরে অন্য অনেক কিছু। অনন্ত হীরাকে কিন্তু আমরা শুধু নাট্যকার বলতে পারি না। সাধনা আহমেদকে দেখছি নাটক লেখায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তবে কেন অভিনয় লোভটা সামলাতে পারল না সেটাই বুঝতে পারিনি। কারণ সে অভিনয় না করলেও পারত। সবকিছু মিলিয়ে আমি অস্বীকার করলাম যে নতুন নাট্যকার নেই। আমার স্বীকার করে নিচ্ছি যে নাট্যকার আছে।

রাফি হোসেন : আপনি বলতে চাচ্ছেন যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি কিন্তু সম্ভাবনা আছে?

মাসুম রেজা : না। তারা যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য খুব বেশি আগ্রহী তা নয়। যে চোখ-কান বুজে শুধু নাটক লিখবে এ রকম মানুষের সত্যিই অভাব  রয়েছে। কিন্তু নাটক লেখে এ রকম অনেক মানুষ আছে।

ইউসুফ হাসান অর্ক : মাসুম ভাইয়ের বেশিরভাগ কথার সঙ্গে আমি একমত। এক দশক যে খুব বেশি আবার যে খুব কম তা-ও কিন্তু নয়। যে নাট্যকারদের নাম মাসুম ভাই বললেন আমি মোটামুটি একমত। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ’৭১ সাল থেকে আমরা ২০১০ সাল পর্যন্ত যেখানে সেলিম আল দীন এর পাশাপাশি যদি লিজেন্ডারি নাট্যকার হিসেবে বলি তাহলে আমরা আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশিদ, মমতাজউদদীন আহমদ, সৈয়দ শামসুল হককে পেয়েছি। সংখ্যায় কিন্তু খুব বেশি নয়। কিন্তু ৪০ বছর যদি এই চার-পাঁচজনের নাম আসে, তাহলে গত ১০ বছর হিসেবেই যে নামগুলো এসেছে এটা কিন্তু অপ্রতুলও নয়। কিন্তু মাসুম ভাই এর সংজ্ঞা অনুযায়ী এরা কিন্তু বিশুদ্ধ নাট্যকার। একমাত্র সাধনা আহমেদ অভিনয় করেছেন বাকিরা কিন্তু প্রত্যেকে নাটক লিখেই যাচ্ছেন। আমি বদরুজ্জামান আলমগীরের নাম বলতে চাই। যদি উনি সিনিয়র তবুও কিন্তু উনি খুব ভালো লেখেন। সব মিলিয়ে আমার মনে হয় এই গত দশকে ৮ থেকে ১০ জন যারা আছেন, তাদের মধ্যে ৩ থেকে ৪ জন প্রতিষ্ঠিত। আমি মনে করি যে নামগুলো এসেছে সংখ্যায় কিন্তু কম নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই আশাবাদী।

সুদীপ চক্রবর্তী : আসলে ঘুরেফিরে ঢাকার মধ্যেই সবার নাম বলা হচ্ছে। আমি কিছু নাম বলতে চাই কিন্তু এগুলো যদিও আবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে তবুও বলছি- বদরুজ্জামান আলমগীর, সাইমন জাকারিয়া, সামিনা লুৎফা নিত্রা, রুমা মোদক, শুভাশিস সিনহা মুক্তনীল, সাধনা আহমেদ, রুবাইয়াৎ আহমেদ, শাহমান মৈশান, আনন জামান, সাইমন জাকারিয়া আমার মনে হয় এই নামগুলো সম্ভাবনাময়।

মাসুম রেজা : আমি একজনের নাম যুক্ত করতে চাই। কুষ্টিয়ার একটি ছেলে আসলাম আলী খুব ভালো লেখে।

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমি একটা ভালো স্ক্রিপ্টের নাম বলতে চাই। জানি না স্ক্রিপ্টটি কেউ পড়েছে কিনা। আলতাফ শাহনেওয়াজ একটি নাটক লিখেছেন। সে নিয়মিত নাটক লেখে না। স্ক্রিপ্টটা খুবই ভালো। নাটকটি এখনো মঞ্চায়ন হয়নি। নাটকটি মঞ্চে আনার কথা ভাবছি।

আইরিন পারভীন লোপা : অনেকেই হয়তো ভালো লিখছে কিন্তু আমরা জানতে পারছি না। যখন নাটকটি মঞ্চে আসে তখন আমরা জানতে পারি। আগামী দশকে আরো অনেক নাট্যকার তৈরি হবে। যারা অনেক নাটক লিখে নিজেদের তৈরি করছে। এ রকম বেশ কিছু ছেলেমেয়ে আমার কাছেও আছে। আমি বেশ কয়েক জায়গায় বলেছি, আপনার নতুন নাটক করতে চাইলে তাদের নাটকটি পড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু আমরা মঞ্চে নাট্যকারকে দেখি নাটক মঞ্চে আসার পর। সাধনা আহামেদ এর ‘দমের মাদার’ যতক্ষণ মঞ্চে না এনেছি তার আগে কিন্তু কেউ সাধনা আহমেদকে চিনতে পারেনি। কিন্তু স্ক্রিপ্টটি পরার পর ভালো লাগার কারণে আমি নাট্যম রেপার্টরি তৈরি করেছিলাম ওই নাটকটি মঞ্চায়ন করার জন্য। কারণ এছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না।

মোহাম্মদ আলী হায়দার : একটা খুব ভালো দিক যে, মাসুম ভাই নিয়মিত নাটক লেখেন। আগে সেলিম আল দীন, মমতাজউদদীন আহমদ, মামুনুর রশিদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, সৈয়দ শামসুল হক 

 নিয়মিত লিখতেন। তার অনেক পরে মান্নান হীরা, এসএম সোলায়মান, আব্দুল্লাহ হেল মামুনরা লিখতেন। এখন তারা কেউ আর নিয়মিত লিখছেন না। কেউ হয়তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। রুমা মোদক, সাধনা আহমেদ, শাহমান মৈশান নিয়মিত লিখছেন এটা খুব ভালো দিক। ইদানীং মুক্তনীলও খুব ভালো লিখছে। ওর তিনটা নাটক আমরা মঞ্চে দেখেছি, খুব ভালো কাজ হয়েছে। এছাড়া সামিনা লুৎফা নিত্রা একটা ভালো নাটক লিখেছে। তারপর অনুবাদ করেছে। নাটক লিখলে হয়তো ভালো করবে কিন্তু তার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। হয়তো অভিনেত্রী হিসেবেই বেশি পরিচিত পেতে চায়। আমার মনে হয় সামিনা লুৎফা নিত্রা লিখলে ভালো করবে। আনন জামান, রুবাইয়াৎ আহমেদ নিয়মিত লিখছে এটা ভালো দিক। নির্দেশনা এবং অভিনয়ের পাশাপাশি অনন্ত হিরা কিন্তু নিয়মিত নাটক লিখছে। দশ-বারোজন এখনো আছে এটা কিন্তু কম নয়। একসময় আব্দুল্লাহ আল মামুন ও মামুনুর রশিদ এই দুজন নাট্যকারের নাটক দিয়ে সারা বাংলাদেশে চলত। সব মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয় একটা দেশের জন্য এখন যে দশজন নাটক লিখছেন সেটা কিন্তু কম নয় বরং অনেক বেশি আছে বলেই আমার মনে হয়।

সুদীপ চক্রবর্তী : মাসুম ভাই যেটা বললেন, সেটার সূত্র ধরে বলতে চাই যে একটা সিজন নাট্যকার হওয়ার জন্য একটা সময় প্রয়োজন। কিন্তু চোখ বুঝলে যে একজন নাট্যকার এর লেখা নাটক আমাদের অনুপ্রাণিত করবে বা লেখার মধ্যে যে গভীরতা আছে বা তৈরি হয়েছে সে রকম কিন্তু আমরা পাচ্ছি না। সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল্লাহ আল মামুন এর লেখার শুরুর দিকেই কিন্তু গভীরতা তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতা উত্তরোত্তর মাসুম ভাই, মান্নান হীরা ভাইয়েরা যখন লেখেন তখনকার বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্য কিংবা ফারাকের কারণে গভীরতা নিয়ে আমাদের শঙ্কা রয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়।

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমি একটু সুদীপের সঙ্গে যোগ করতে চাই যে, সুদীপ সেটা বুঝাতে চেয়েছে কিনা যে বিষয়বস্তুর গভীরতা? কোনো বিষয়ের গভীরতার চেয়ে আমার কাছে মনে হয় বিষয়বস্তুর মৌলিকতা আমরা কম পাচ্ছি। সুদীপের সঙ্গে হয়তো আমার মিলবে না। যেমন বদরুজ্জামান আলমগীর, সাধন আহমেদ এই দু’জনের লেখায় আমি যথেষ্ট গভীরতা পেয়েছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে বিষয়বস্তু মৌলিকত্বের ব্যাপার গভীরতার নয়।

মোহাম্মদ আলী হায়দার : আমার কাছে একটা জিনিস মনে হচ্ছে গল্পে হয়তো গভীরতা আছে কিন্তু নাটকের স্টাইল বা কীভাবে গল্পটা বলবে সেটা থেকে অনেক কিছু পাওয়া যায়। যেমন সেলিম আল দীনের স্ক্রিপ্ট একেবারে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা। লেখার কাঠামো একেবারে অন্যরকম। যেখানে কোনো চরিত্র বা দৃশ্যে কিছুই নেই। কিন্তু শুরুর দিকে সেলিম আল দীন প্রচ-ভাবে কিন্তু দৃশ্যপট বিভিন্ন কিছু ধরে নাটক লিখতেন। ইউরোপিয়ান, গ্রিক স্টাইলে নাটক লিখতেন। একটা সময় এসে থেকে সব ভেঙে দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয় আমরা এখনকার নাট্যকারদের মধ্যে নিজস্বতা পাচ্ছি না। আমি যদি মাসুম ভাইয়ের ক্ষেত্রে বলি নিত্যপুরাণ দিয়ে তিনি তার একটা নিজস্বতা তৈরি করেছেন। তার পরে মাসুম ভাই অনেক দিকে হাঁটা শুরু করেছেন। নিত্যপূরণের যে একটা গভীর জায়গা ছিল। নাটকের একটা ভিন্ন ভাষা ছিল। যে ভাষাটা মাসুম ভাইয়েরই ভাষা ছিল সে ভাষা থেকে মাসুম ভাই এখন একটু দূরে চলে গেছেন বা সরে গেছেন। এই ডাইভারসিটি হয়তো ভালো। সেলিম আল দীন কিন্তু একেবারে সরেন নাই যে বিষয়টা ধরেছেন সেটার একেবারে গভীরে গিয়েছেন।

মাসুম রেজা : হায়দার আমি একটা কথা বললে এ বিষয়ে সবকিছু পরিষ্কার হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নাট্যকারদের কথা যদি বলি। আমরা বাংলাদেশের নাট্যকার আসলে কি মিস করি। পৃথিবীর অন্যান্য নাট্যকারের দিকে ফিরে তাকাই- যদি হ্যারল্ড পিন্টার এর কথা বলি তিনি কিন্তু সরাসরিভাবে অ্যাবস্ট্রাক ফরমেটে নাটক লিখতেন আর যদি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এর কথা বলি উনি জাদুবাস্তবতা লিখতেন। এ রকম ভাবে যদি আমি বিভিন্ন জায়গায় দেখি, তাহলে বুঝতে পারবো যে সাহিত্যের মুভমেন্ট বলে একটা কথা আছে! সেলিম আল দীন তার মারা যাওয়ার আগে সর্বশে মঞ্চায়িত নাটকটি লেখার ভূমিকাতে লিখলেন যে এটি সম্মূখ বাস্তবতার নাটক। আমরা জাদুবাস্তবতার কথা শুনেছি রোমান্টিসিজমের কথা শুনেছি। ন্যাচারালিজম, রিয়েলিজম এটাকে আমরা বলি লিটারেলি মুভমেন্ট। পৃথিবীর বড় বড় সকল লেখকরা নিজস্ব ধারা বা রীতি তৈরি করেছেন। আমরা কোন নাট্যকার এই রীতির দিকে যাইনি। সেলিম ভাই একমাত্র বাংলাদেশি লেখক যিনি তার নিজস্ব ধারায় ছিলেন। আমি হায়দারের সঙ্গে একমত যে আমি বাইরে বেরিয়ে গিয়েছি। আমি একটা জায়গায় যেতে চাই। মধ্যযুগীয় বাংলা নাটকের ইতিহাস পাঠ করে তিনি পাঁচালী ফর্মে নাটক লিখেছেন তিনি নিজেকে নাট্যকার বলতে চাননি পাঁচালীকার বলতে চেয়েছেন। আমরা আমিসহ যত নাট্যকারের নাম বললাম আমরা কেউই এ রকম একটি নিজস্ব ধারার কাছাকাছি যেতে চাইনি।

রাফি হোসেন : আপনার কথার সূত্র ধরে আপনাকে যদি আমি জিজ্ঞেস করি, আপনার কি মনে হয় আপনি কি এখনো রাস্তা খুঁজে পাননি?

মাসুম রেজা : আমি পেয়েছি। আমার সর্বশেষ যে নাটকটি মঞ্চস্থ হলো সেটা দেখলে নিশ্চয়ই হায়দার তখন বলবে আমি সে দিকে ধাবমান হচ্ছি। কেন আমার এমনটা হয়েছে। সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে থেকে এবং বিশ্বের নাট্যকারদের পাঠ করে মনে হয়েছে যে এ রকম কোনো একটা ধারা বা একটা রীতির কাছাকাছি না থাকলে আসলেই এটা টিকবে না। আমাকে সিজন বলাতে সেজন্য একটা কথা বলতে চাই সময় এটা কোন বিষয় না। আমি কতটা ইচ্ছুক সিজন হতে।কারণ সিজন হতে গেলে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢোকা খুবই জরুরি।

আইরিন পারভীন লোপা : আমি একটা ছোট্ট করে যোগ করতে চাই। আমরা আসলে ১০ বছরে যতজন নাট্যকার পেয়েছি কারো স্টাইলটা একইভাবে যায়নি। কেউ ধারাবাহিকতা রাখতে পারেনি। তার কারণ হচ্ছে আমার মনে হয় জীবন দর্শন একটা বড় ব্যাপার। সেটাই তারা ঠিক করতে পারেনি। নাট্যকার নাসরীন মুস্তফার নাম আমি বলতে চাই। ‘লীলাবতী আখ্যান’ নামে খুব চমৎকার একটি নাটক লিখেছেন তিনি এবং নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন লিয়াকত আলী লাকী। খুবই অসাধারণ একটি নাটক। এর পরবর্তী সময়ে তার সেভাবে কোনো নাটক আমরা মঞ্চে পাইনি। তবে আমি তার ছয়টি নাটক পড়েছি। যেগুলো মঞ্চে আসেনি। যদিও তার নিজস্ব স্টাইল দাঁড়ায়নি কিন্তু সে নিয়মিত নাটক লিখে যাচ্ছে।

সুদীপ চক্রবর্তী : একজন নাট্যকার তার স্টাইল বা ধারা অনুযায়ী নাটক লিখছেন কিনা এ বিষয়ে আমি একটু দ্বিমত পোষণ করতে চাই। এখন কিন্তু একুশ শতকের পৃথিবী। নির্দিষ্ট কোনো গতি কোথাও নেই। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, সমাজ সবকিছু মিলে যে মানুষটি বসবাস করে তার কাজ অথবা যে কোনো কিছু লেখার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দিকে যেতে পারছে না। বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে এটা সব জায়গাতেই রয়েছে। আমার মনে হয় এর প্রভাব প্রকটভাবে বাংলাদেশেও রয়েছে। আর এটা একটা কারণ হতে পারে বলেই আমার মনে হয়।

শামছি আরা সায়েকা : আমাদের বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটারে নাটক করছে প্রায় ৪০০-এর মতো নাটকের দল আছে। এই ৪০০ দলের জন্য ১২ জন নাট্যকার আমার কাছে মনে হয় না পর্যাপ্ত নাটক দিতে পারবে। এক্ষেত্রে মানুষ কি করছে বিভিন্ন গল্পের বই থেকে নাটক তৈরি করছে। নাট্যকারের সত্যিই অভাব আছে সেটা আমি মনে করি। নাট্যকারের যে ধারার কথা বলা হলো আমি যদি সেলিম আল দীন স্যারের কথাই বলি কেন একই ধারায় লিখতে হবে। আবার কিছু নাট্যকার আছে যারা শুধুমাত্র নিজের নাটকের দলের জন্য নাটক লিখেন। কেমন যেন বন্দি হয়ে যাচ্ছে এ বিষয়টা আর এ কারণেই আমার কাছে অপর্যাপ্ত মনে হয়।

মহসিনা আক্তার : নাট্যকারের অভাব আছে বলেই আমার মনে হয়। তবে যাদের নাম বলেছে প্রত্যেকেই সম্ভাবনাময়। কিন্তু অভাব আছে আমি বোধ করি। শৈল্পিক মুভমেন্টের কথা যেটা বলা হয়েছে সে প্রসঙ্গে বলতে চাই একজন নাট্যকারকে সারা জীবন ধরে একই ধারায় লিখতে হবে এটা আমি বিশ্বাস করি না। ইবসেনের কথা যদি বলি সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এখন মর্ডান যুগে আমরা কেন একটি নির্দিষ্ট ধারায় কাজ করতে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কাজ হচ্ছে। বিদেশি নাট্যকারের নাটককে আমরা যেভাবে গ্রহণ করছি সে রকম ভাবে আমাদের এখানে যারা বিভিন্নভাবে লিখতে চাচ্ছে আমরা কি তাদেরকে সেই সুযোগটা দিচ্ছি! সেটা আমার প্রশ্ন? আমার মনে হয় সম্ভাবনার জায়গা খোলা রাখা উচিত। সেলিম আল দীন একেবারে আলাদা ধরনের লিখেছেন সেটা ঠিক কিন্তু আমি যখন নাট্যকলা বিভাগে ভর্তি হই তখন বুঝতাম না এটা উপন্যাস নাকি নাটক। সেলিম আল দীন বেঁচে থাকতেই কাজের স্বীকৃতি বা পরিচিতি পেয়েছেন। নির্দেশকদের মধ্যে কেউ না কেউতো আছেন যারা ভিন্ন কিছু করতে চান। এ রকম একজন দুজন নির্দেশকের কাজের মধ্য দিয়ে হয়তো একজন সেলিম আল দীন তৈরি হবে। সেলিম আল দীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্টাইল ধরেছেন বলেই এখনো গ্রহণযোগ্য। তবে আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, আমি রবীন্দ্রনাথের নাটকের চেয়ে সেলিম আল দীনের নাটক করতে বেশি পছন্দ করব। গ্রহণযোগ্যতার কথা যদি বলি যেমন আমাদের ঔপন্যাসিক শহীদুল জহির জাদুবাস্তবতা লিখেছেন এবং তিনি গ্রহণযোগ্য হয়েছেন। কারণ তার লেখার বিষয়বস্তু বা শৈল্পিক স্টাইল আমাদের দাগ কাটে।

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমি মহসিনার বেশিরভাগ কথার সঙ্গে একমত। তারপরও আমি কিছু যোগ করতে চাই। স্টাইলের কথা যদি বলি নাট্যকার তো বিষয়টা আঙ্গিকের জন্য লেখেন, পরে এটা স্টাইল হয়ে ওঠে। স্টাইলই থেকে ধীরে ধীরে সেটা কোন লিটারেলি মুভমেন্টের কারণে একটা আকার ধারণ করে। ফলে সেটা তার স্বকীয়তা পায় বলে আমি মনে করি। সেলিম আল দীন তার জীবদ্দশায় আঙ্গিকের অন্বেষণ করেননি। কারণ তিনি আঙ্গিকের বিরোধী ছিলেন। পরে কিন্তু নিজেই তিনি একটি আঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। যে লিটারেলি মুভমেন্টের কথাগুলো এলো মাসুম ভাইয়ের কথার সঙ্গে একমত। নাটক মঞ্চায়ন হলে যে কোনো শিল্পী বা নাট্যকার সবার জন্যই অনেক আনন্দের ও ভালো লাগার। সেটার জন্য সবাই অপেক্ষা করে থাকে। যদি কোন নাটক মঞ্চায়ন না হয় সেটা যে খারাপ নাটক হয়ে গেল তা কিন্তু নয়। নাটক কিন্তু আমাদের সাহিত্য হিসেবে মূল্যায়নের একটা জায়গা আছে। মহাসিনা যেটা বলল সে কথার সঙ্গে আমি একমত যে এমন অনেক নাটক আছে যা এখনো মঞ্চায়ন হয়নি কিংবা ও রকম নির্দেশকের হাতে পড়েনি। সেই নাটকটা বের করে আনার জন্য আমাদের দিগন্তটা ওপেন রাখতে হবে। তবে আমরা কিন্তু জানি না সেটা কোনো স্টাইল হয়ে উঠবে কিনা। কিংবা হয়তো সময়ের আবর্তনে কোন আঙ্গিকের মতো পর্যায়ে চলে যাবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে করি কোনো আঙ্গিকের মুখাপেক্ষী না হওয়াই ভালো।

মাসুম রেজা : লেখকের লেখার রীতির সঙ্গে আঙ্গিক মেলালে আমার মনে হয় ভুল হবে। আঙ্গিক হচ্ছে পরিবেশনারীতি। যখন থিয়েটার করার ব্যাপার আসে তখন এ বিষয়টা অনেকটা চলে আসে। কিন্তু একজন লেখকের লেখার ধরন সেটা কিন্তু আঙ্গিক না। সর্বশেষ ২০০৮ সালের পর এখন পর্যন্ত কেউ কিন্তু নাটকের নোবেল পায়নি কারণ কী! গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কিন্তু নোবেল পেয়েছেন তার জাদুবাস্তবতা লেখার কারণে। পথ খুঁজতে খুঁজতে একজন লেখককে এক জায়গায় এসে স্থিত হওয়া সেটা কিন্তু একজন নাট্যকারের থাকতে হবে। সেটা কিন্তু আমাদের মাঝে পাওয়া যাচ্ছে না। একটা রীতিতে দাঁড়িয়ে যাওয়াকে আমি খারাপ কিছু বলছি না। কিন্তু একটা পথের সন্ধান খোঁজ করে লেখার আচরণটা আমাদের নাটকের মধ্যে আমি দেখছি না। সেলিম ভাই (সেলিম আল দীন) আমাকে বলতেন কোনোদিন উপন্যাস লিখবি না, কারণ উপন্যাস লিখলে নাট্য সাহিত্য উপন্যাসের কাছে পরাজিত হবে। কারণ নাটকই একটা সাহিত্য। যদিও অনেক পরে নাটককে সাহিত্যে হিসেবে বাংলা একাডেমি স্বীকার করেছে। আমি মনে করি, আমরা যারা থিয়েটার করছি আমাদের একটি বিশেষ দায়িত্ব যে নাটককে সাহিত্য আকারে আলাদা মূল্যায়ন করতে হবে।

রাফি হোসেন : আপনারা তো বিভিন্ন গ্রুপের নাটক দেখেন। বর্তমানে মঞ্চে নানা রকমের কাজ হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, যারা ভালো কাজ করে গেছেন তাদের কাজগুলোকে আমরা ছাপিয়ে যেতে পারছি না। যদিও সব নাটক আমার দেখা হয়নি। তার মধ্যে সুদীপের চাকা নাটকটি আমার কাছে খুবই আউটস্ট্যান্ডিং মনে হয়েছে। নাটকটির আঙ্গিক, ফ্রমঅ্যাক্টিং, স্টাইল, সংগীত, আলো সবকিছু মিলিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো লেগেছে। এখন আপনাদের কাছে যদি জানতে চাই কেন মঞ্চে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না! এ বিষয়ে কী বলবেন?

মোহাম্মদ আলী হায়দার : আউটস্ট্যান্ডিং কাজের মধ্যে কতগুলো ব্যাপার আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে আমরা আসলে কীভাবে থিয়েটারটা করছি। কেন আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না! চাকা নাটকটি কেন ভালো? চাকা নাটকটি ভালো হওয়ার পেছনে একটা কারণ হচ্ছে যে ছেলেমেয়েরা নাটকটিতে কাজ করছে তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে এর পেছনে সময় দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কাজ ভালো হয়ে যায়। জামিল ভাই (জামিল আহমেদ) যখন কাজ করে উনাকে যে সময়টা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা দেন তার ফলে উনি যেটা চান সেটা কিন্তু তিনি পেয়ে যান।

রাফি হোসেন : জামিল ভাই তো বলেন তিনি সেটা পান না। এই নিয়ে উনার মাঝে অনেক আক্ষেপও রয়েছে।

মোহাম্মদ আলী হায়দার :  সে আক্ষেপটা হয়তো ঠিক আছে। তারপরও উনি আরো কিছু চায় সেটা তিনি পাচ্ছেন না। সে রকম হলে আমরা আরো ভালো কিছু উনার কাছ থেকে দেখতে পারতাম। সেইটা হয়তো উনি পান পান না। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে আমরা যারা নাটক নির্মাণ করি অথবা নাটকের যুদ্ধে আছি আমরা যে প্রক্রিয়াতে কাজটা করি এটার মাধ্যমে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমি বলব যে সম্ভাবনা একেবারে শূন্য। কারণ প্রতিদিন সন্ধ্যায় একজন নাটকের মানুষের   যাতায়াতে দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট করে এক ঘণ্টা মহড়া করে নাটক মঞ্চায়নের দু’দিন আগে কারিগরি একটি মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে নাটক করে যে শিল্প গড়ে ওঠে কিংবা যে নাটকটি মঞ্চায়ন হয় সেখান থেকে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ কীভাবে আশা করা যায়! এছাড়াও যদি বলি তাহলে মঞ্চের নেপথ্যে বিভিন্ন কাজ করার জন্য কিন্তু ২০ জন লোকের প্রয়োজন হয়। হয়তো খেয়াল করলে দেখা যাবে নেপথ্যে কাজ করতে থাকা এমন মানুষজন সম্পৃক্ত নাটকগুলোই কিন্তু আউটস্ট্যান্ডিং হয়। শুধু আমাদের দেশ নয় পৃথিবীজুড়ে এমন নাটকগুলোই আউটস্ট্যান্ডিং হয়েছে কিংবা হচ্ছে। আমরা তো সেই ভাবনাতে যেতেই পারি না। কারণ আমাদের সেই বিশাল লোক নেই। যারা মঞ্চে চেহারা না দেখিয়ে মঞ্চের পেছনে গিয়ে দড়ি ধরে টানবে এমন শিল্পী বা মানুষের আমাদের বড়ই অভাব। তার জন্যই মঞ্চে সে রকম আউটস্ট্যান্ডিং কাজ আশা করা খুবই কঠিন। কারণ আমরা এখন যেভাবে থিয়েটারটা করছি এখান থেকে আশানুরূপ কাজ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমার মনে হয় এই কাঠামো বা প্রক্রিয়া কিংবা স্টাইলটাই পরিবর্তন করতে হবে।

সুদীপ চক্রবর্তী : থিয়েটার বা বিভিন্ন শিল্পচর্চাকে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বিচ্ছিন্ন কিছু ভেবে থাকি। আমরা মনে করি কেন থিয়েটারে এটা হচ্ছে না? একটা রাষ্ট্র থেকে একটা থিয়েটার কখনো আলাদা করা যাবে না। রাষ্ট্র, রাজনীতি, সরকার ব্যবস্থা, সরকারের নীতি থেকে থিয়েটার বা শিল্পচর্চা এমনকি জীবনটাকেও আলাদা করা যাবে না। এখানে থিয়েটার থেকে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ আশা করা সত্যিই কঠিন। হায়দার ভাই যেটা বলেছেন তার সঙ্গে আমি আরো যুক্ত করে যদি বলতে চাই, যেখানে রাষ্ট্র শিল্পবান্ধব নয়, শিক্ষাব্যবস্থা শিল্পবান্ধব নয়, যেখানে সরকার শিল্পবান্ধব নয় সেখানে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ করা সম্ভব নয়।

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমি একটু ভিন্ন কথা বলতে চাই আমি মনে করি না যে এখন আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না। আমি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না এ কথাটা একটা গুজবের মতো পরিণত হয়েছে এবং এই গুজব ছড়াচ্ছে আমাদের অগ্রজ প্রজন্মের কেউ কেউ। যারা গত ১৫ বছরে নাটক দেখেন না। দেখলে হয়তো তা নিয়মিত নয় হয়তো মাঝে মাঝে কিংবা বছরে একটা। আমি এ কথাগুলো তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি।

রাফি হোসেন : অর্ক হায়দার ভাই এবং সুদীপ যে কথাটা বললেন এবং সুদীপ এ উত্তরটা না দিলেও কিন্তু হতো কারণ আমি সুদীপের নাটকটিকে আউটস্ট্যান্ডিং নাটক বলেছি। তারপরও তো সুদীপ কিন্তু আউটস্ট্যান্ডিং কাজ না হওয়ার পেছনে কারণ ব্যাখ্যা করছে।

ইউসুফ হাসান অর্ক : এ বিষয়েও আমার যুক্তি রয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে হায়দার ভাই এবং সুদীপ যথেষ্ট বিনয়ী তাই তারা এমনটা বলেছে।

রাফি হোসেন : বিষয়টা আসলে বিনয় নয়। কারণ এখানে যে প্র্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো আমরা উত্থাপন করেছি সেটা আসলেই সত্যি।

ইউসুফ হাসান অর্ক : আমি দ্বিমত পোষণ করছি এ কারণে যে আমার মনে হয় গত এক দশকে অন্তত ডিরেক্টরিয়ালি অনেক আউটস্ট্যান্ডিং কাজ এখানে হয়েছে। আমরা কিছু প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেটা হায়দার ভাই এবং সুদীপের সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও অনেক কাজ হচ্ছে, যা শুধু সংখ্যার দিকে নয় মানের দিক থেকে অনেক ভালো। কিন্তু আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না সেটার সাথে আমি একমত নই। এর কারণ এভাবে যদি বলি তাহলে যারা ভালো কাজ করছে অনুপ্রেরণার দিক থেকে তাদের মাঝে একটা বাজে ইমপ্যাক্ট আসবে বলে আমি মনে করি। তাই আমি এই রাউন্ড টেবিল বৈঠকের মাঝে আমার ব্যক্তিগত মতামত বলতে চাই যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে।

আইরিন পারভিন লোপা : আউটস্ট্যান্ডিং কাজ আসলে হচ্ছে। কারণ গত ১০ বছরে অনেক আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হয়েছে। নাট্যকলায় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রয়োজনে যেভাবে সময় দিতে পারে সেভাবে কিন্তু আমরা বা আমাদের নাটকের মানুষরা পারে না। তারপরও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যখন গুটি গুটি ভাবে মহড়ার মধ্যে দিয়ে একটি প্রযোজনা করা হয়। সেটা আসলে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীর যেমন পড়াশোনার অংশ হিসেবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ ঘণ্টা সময় দিতে পারে। যার ফলে তাদের কাছ থেকে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ প্রত্যাশা করা সম্ভব। আমাদের নাটকের ছেলেরা যদি এভাবে সময় দিতে পারত তাহলে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ আমরা পেতাম। কিন্তু তারা যে সময়টা দেবে বিনিময়ে আমরা তাদের কী দিচ্ছি। এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও গত এক দশকে আমাদের থিয়েটার অঙ্গনে অনেক ভালো নাটক এসেছে।

মোহাম্মদ আলী হায়দার : আমরা থিয়েটার যারা করি খুব কষ্ট করেই করি। কারণ এটা থেকে কোনো রিটার্ন আমরা পাই না। আর সে কারণে আমরা যেকোনো নাটক দেখে বলি খুব ভালো হয়েছে। আমরা কিন্তু বলি না যে কিছুই হয়নি। কিন্তু আমরা দেখি যখন একজন অভিনয়শিল্পী ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারছে না কথা বলতে পারছে না। মহড়াও ঠিকভাবে করেনি সেটাও বোঝা যাচ্ছে তারপরও কিন্তু আমরা বলি যে খুব ভালো হয়েছে। কারণ জিনিসটাকে আমরা একটা মুভমেন্টের মাধ্যমে নিয়ে এসেছি। যেখানে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনসহ সবকিছু মিলিয়ে একটা নাটকের দল থাকতে হবে। কিন্তু অভিনয় শিল্পী তৈরি হওয়ার বিষয়টা আসলে নেই। তার মাঝেও কিছু কাজ আছে যেগুলো আলোর ঝলকানি দেয়। আউটস্ট্যান্ডিং বলতে আমি যে নাটকটিকে বুঝি সেটি হলো যা দেখে দর্শক মনেই করবে না যে, আমি ৩০০ টাকা অথবা ৫০০ টাকার টিকিট কেটে মঞ্চে ঢুকলাম আমার টাকাটাই নষ্ট হয়ে গেল। আমি যখন ব্রডওয়ে থিয়েটারে ৮০ ডলার দিয়ে পেছনে বসে নাটক দেখলাম তখন মনে হলো কেন আরো বেশি ডলার দিয়ে সামনে বসে নাটকটা দেখলাম না। কিন্তু আমাদের বেলায় ১০০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে নাটক দেখে দর্শক বলে দূর টাকাটা জলে গেল। কারণ আউটস্ট্যান্ডিং থিয়েটার করার জন্য আমরা প্রস্তুত না বা আমরা তৈরি না। তাছাড়া আমাদের সুযোগও নেই যেটা সুদীপ বলল। সমস্ত জায়গা থেকে এই সুযোগ-সুবিধা একটা ব্যাপার আছে আর সেটা আমরা পাচ্ছি না। আর সেজন্যই আমাদের ওয়াও টাইপ কাজ হচ্ছে না।

সুদীপ চক্রবর্তী : আমরা যে যা-ই বলি না কেন কোনো কিছু কিন্তু রাষ্ট্রের বাইরে নয়।

মোহাম্মদ আলী হায়দার : আমি সেটাই বলছি যে, আমরা আসলে সে রাস্তাটায় নেই। আমাদের সেই রাস্তায় থাকতে হবে যার মাধ্যমে থিয়েটারটিকে দেখে সবাই একবাক্যে বলবে ওয়াও। এ রকম থিয়েটার আমরা আসলে করি না বা আমাদের হচ্ছে না।

রাফি হোসেন : এ বিষয়ে আমি হায়দার ভাইয়ের সাথে পুরোপুরি একমত। বাকিদের মতামতগুলো শুনতে চাই।

শামছি আরা সায়েকা : আউটস্ট্যান্ডিং শব্দটা শুনলেই ব্লাস্ট হওয়ার মতো একটা। আমার কাছে মনে হয়েছে চাকা অসাধারণ নাটক।

রাফি হোসেন : আমি বলেছি বলে সেটা বলতে হবে না।

শামছি আরা সায়েকা : না আমি সেটা বলছি না চাকার বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। এখন চাকা নাটকটি যারা দেখেনি বা কিছু দশক পর চাকাকে যখন সবাই ভুলে যাবে সে ক্ষেত্রে সেটা আউটস্ট্যান্ডিং থাকবে না।

রাফি হোসেন : এ বিষয়ে আমি একটু বলতে চাচ্ছি কারণ থিয়েটার কখনোই অনাদিকাল ধরে বা যুগ যুগান্তরে হয় না। পিটার বুকের মহাভারত অনেকেই দেখেনি কিন্তু যারা থিয়েটার নিয়ে পড়ে বা পড়ায় সবাই কিন্তু এটার কথা বলবে কারণ এটা ছিল আউটস্ট্যান্ডিং। আউটস্ট্যান্ডিং কাজ কখনোই বন্ধ হয় না বা মুছে যায় না।

শামছি আরা সায়েকা : এটাই আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে জামিল স্যারের বেহুলার ভাসান যারা দেখেছেন এখন পর্যন্ত ঠোঁটের ডগায় সে নামটি রয়েছে। তখনকার সময়ে বিনোদন বলতে শুধু বিটিভি আর মঞ্চনাটক ছিল। সে সময় মানুষ প্রচুর সময় দিতে পারত এবং আউটস্ট্যান্ডিং নাটক তৈরি করতে পারত। এখন মানুষ নানামুখী হয়ে পড়েছে পাশাপাশি নানামুখী বিনোদনও মানুষের কাছে এসে পড়েছে। সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই স্বল্প সময় দিয়ে গ্রুপ থিয়েটারের যারা কাজ করে সেখান থেকে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ করা সম্ভব নয়।

রাফি হোসেন : আমি তাহলে সায়কা আপনাকে বলতে চাই যারা এমনটা পারবে না তাদের কে বলেছে থিয়েটারটা করার জন্য?

শামছি আরা সায়েকা : রাফি ভাই আপনার মতো এটা আমারও প্রশ্ন। আমি যখন কোনো ওয়ার্কশপের আগে কারও সাক্ষাৎকার নেই তখন জিজ্ঞেস করি তুমি নাটক কেন করতে আসো। নিজের খাবা টাকা দিবা আবার নাটকও করবা কেন? কোন কিছু না পারলে কথা শুনতে হবে তবুও কেন আসো? এক বাক্যে উত্তর আসে আমি মিডিয়ায় যেতে চাই। সবারই এখন প্রধান লক্ষ্য মঞ্চনাটক নয় মিডিয়াতে কাজ করা।

রাফি হোসেন :  আপনার কথাটা কিন্তু উত্তর চলে এসেছে যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না। তবুও অনেকে বলছেন কিন্তু আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে। এরকম হলে তো আউটস্ট্যান্ডিং কাজ চিন্তা করা তো দূরের বিষয়। মন্দের ভালো কাজ হওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে।

মহসিনা আক্তার : আমি হায়দার ভাই এবং সুদীপ স্যারের সঙ্গে একমত। যদি আমার কথাগুলো একটু এলোমেলো হয়ে যাবে তারপর আমি বলি। সবার কাজ যে সবার ভালো লাগবে সেটা কিন্তু নয়। পাবলিকের সামনে কাজ করতে গেলে মন্দ কথা শুনতে হবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটা মেনে নিতে হবে। এটা কোন বড় বিষয় হতে পারে না। আমি মনে করি থিয়েটার যারা করে তাদের প্রতি আমার আন্তরিক ভালোবাসা আছে। সেটা আমাকে কোথাও লিখে বা কারো কাছে গিয়েপ্রমাণ করতে হবে না। থিয়েটার সম্পর্কে বাংলাদেশ একটি প্রবাদ সবাই বলে যে, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। এই ধরনের কথা আমাদের বলা বন্ধ করতে হবে। আর কেউ বলুক বা না বলুক আমি এ ধরনের কথা বলি না। কারণ আমার মনে হয না যে কেউ কাউকে বলেছে যে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে। কারণ আমি বনের মোষ তাড়াই না। আমি থিয়েটারটা না করলে বাঁচি না, সেজন্য আমি থিয়েটারটা করি। এখন আউটস্ট্যান্ডিং কাজের কথা যদি বলি রাফি ভাই আপনি যে অর্থে বলেছেন যে বাইরের সঙ্গে যদি তুলনা করি। এটা আমরা এখানে বসেই কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাই।

রাফি হোসেন : আমি বাইরের বিষয়টা নাম মাত্রই বলেছি। আমি বাংলাদেশের কথাই বলতে চাই। আমি ছোট থেকে আজ পর্যন্ত অনেক আউটস্ট্যান্ডিং নাটক দেখেছি। আমার কথা হচ্ছে আমি কেন জোড়াতালি দিয়ে সন্তুষ্ট হতে যাব। বাংলাদেশের এই অবস্থা জেনেই তো সবাই থিয়েটারটা করছেন। আপনারা বলছেন আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না। আমার মনে হয় প্রফেশনালিজমের বড়ই অভাব। আমি জামিল ভাইকে দেখেছি কি প্রফেশনালি কাজটা করেন। কেউ একমত পোষণ না-ও করতে পারেন। এই মানুষটা থিয়েটারই করতে চায়। থিয়েটারের জন্য শতভাগ সৎ একজন মানুষ তিনি। কাজের ক্ষেত্রে একচুলও ছাড় দেন না। এটা যতদিন না আসবে টাকা দিয়ে দিলেও আর সরকার সবকিছু দিয়ে দিলেও কোনো লাভ হবে না। কারণ যেভাবে চলছে সেভাবেই কাজ করলে আমার মনে হয় না আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হবে।

মহসিনা আক্তার : আমি একই সঙ্গে সুদীপ স্যারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রে অন্যান্য জায়গার মতো থিয়েটারটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি নাম উল্লেখ করতে চাই না অন্য অনেক ক্ষেত্রে কী হচ্ছে না হচ্ছে। আচ্ছা আপনি কি দেখছেন যাদেরকে টাকা দেয়া হচ্ছে তারা পারফেক্টলি কাজটা করছে?

রাফি হোসেন : আমি কিন্তু সেটা বলিনি। এটা বলা মানে এই নয় যে অন্যরা ভালো কাজ করছে সেটা বুঝবেন না!

মহসিনা আক্তার : না, না। আমি সেই অর্থে বলিনি। তাছাড়া রাষ্ট্র যে আমাদের টাকা দিচ্ছে না সেটা কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ।

রাফি হোসেন : আমি যে বিষয়টা বোঝাতে চাচ্ছি সে বিষয়ে আপনাকে আমি একটু বলতে চাই। অনেকেই রাষ্ট্র থেকে পয়সা পেয়েছে। আমি এখন বলতে চাই হয়তো অনেকেই আমার সঙ্গে একমত পোষণ করবেন আবার করবেন না। বর্তমান সরকার অনেকটাই দিয়েছে এবং দিচ্ছে। অনেকে হয়তো এককভাবে পেয়েছেন। জামিল ভাই তার প্রযোজনার জন্য পেয়েছেন এবং তিনি এই টাকার মাধ্যমে উনার শতভাগ ডেডিকেশন দিয়ে যে প্রযোজনা আমাদের সামনে এনেছে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি এ রকম দ্বিতীয়বার বা দ্বিতীয় মানুষ কেউ আছে যে আমাদের সে রকম একটি প্রয়োজন দিতে পারবে?

সুদীপ চক্রবর্তী : রাফি ভাই আমি আপনার কথার সঙ্গে একটি বিষয় যোগ করতে চাচ্ছি যে আমি কিন্তু টাকার কথা বলিনি। আমি বলেছি যে রাষ্ট্র শিল্পবান্ধব নয়।

রাফি হোসেন : আমি সে বিষয়টা অবশ্যই বুঝেছি। এবার মোহসিনার কাছে জানতে চাচ্ছি?

মহসিনা আক্তার : যদিও এটা একমাত্র সমস্যা না। তবু আবার এটা অনেক বড় সমস্যা। আমি সবাইকে ভালোবাসি আর সে কারণেই বলতে দ্বিধা করি না। কি কি কারনে যা আমাদের হাতে আছে সেগুলো আমরা ব্যবহার করছি না। প্রথমত যদি আমাকে কেউ খারাপ বলে বা আমি আউটস্ট্যান্ডিং কাজ করছি না সেখানে আমার মনে হয় না আমাকে উৎসাহ দেবার কোন ব্যাপার আছে। যখন নিজেকে চ্যালেঞ্জ করব তখন কিন্তু বার বার বলব এবং নিজের মনে হবে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি! আমার মন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে! তখনই আমার পরবর্তী কাজের অনুপ্রেরণা বা জেদটা বড্ড বাড়বে। দ্বিতীয়ত আমাদের এখানে সবাই বলেছেন প্রফেশনালিজমের অভাব এবং অভিনেতার সংকট কারণ তারা সময়টা দিবে কোথা থেকে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যেভাবে বলছি দুই ঘণ্টা সময় দিচ্ছি সে দুই ঘণ্টা সময় কি আমরা পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করছি। অভিনেতা-অভিনেত্রীর দক্ষ হচ্ছে না তার কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যদি বলি সবাই হয়তো পড়ছে পাস করার জন্য। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন মঞ্চে কাজ করতে চায় বা করে! কিন্তু আমাদের দেশে যেভাবে নাটক হচ্ছে সেই দলগুলোর কথা যদি বলি একজন তরুণ অভিনেতা বা অভিনেত্রী যখন দল বা কোন ওয়ার্কশপে আসছে সেটা কি ঠিক ভাবে ঠিক জায়গায় পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণটা পাচ্ছে? নাকি পাচ্ছে না বা যা পাচ্ছে তা কি তার জন্য যথেষ্ট? বা সে কতদিন মঞ্চে উঠতে পেরেছিল বা পারছে? তার যা শেখার সে তার কতটুকু শিখছে? নাকি না শিখতে শিখতে একটা সময় থিয়েটার অঙ্গনে একটা পরিচিত মুখ হয়ে উঠছে। তারপর তার মধ্যে একটা বিষয় কাজ করে যে আমি অনেক বড় সিনিয়র অনেক কিছু জানি এবং আমাকে কিছু একটা দেখাতে হবে। সে রকম অনেক সিনিয়ররা নিজেদের জানান দেয়ার জন্য অনেকে কাজ করছে বলে আমার মনে হয়। কারিগরি সমস্যা আমার কাছে কোনো বড় সমস্যা না। কারিগরি অনেক দিক বাদ দিয়েও অনেক ভালো কাজ করা যায় বলে আমি বিশ্বাস করি। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সেটা আমি বলতে চাই খাঁটি বাংলা ভাষায়- সেটা হচ্ছে ‘পিঠ চাপড়ানো’। এটা ওপেন সিক্রেট। বাইরে সবাই সমালোচনা করলেও সামনাসামনি কেউ বলতে চায় না। আমি শুরুতেই বলেছি আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের অংশ। অন্যরা কাজ করে বলেই আমি কাজ করতে পারছি। সেই জায়গা থেকে আমি বলব আমাদের মধ্যে উৎসাহ দেয়া এক জিনিস, ভালো বলে এক জিনিস, আর পিঠ চাপড়ানো আরেক জিনিস। এই পিঠ চাপড়ানোটা আছে কিনা সেটা চিন্তা করা উচিত। আমার মনে হয় এই বিষয়টা দেখে আমাদের ভালোভাবে চিন্তা করা উচিত এবং সামনে সেভাবে আগানো উচিত। কারণ এভাবে ভালো কাজ করা সম্ভব নয়।

আইরিন পারভীন লোপা : আউটস্ট্যান্ডিং কাজ করতে হলে এর পেছন অনেক সহযোগিতা লাগে। যেমনটা হায়দার ভাই বলেছেন মঞ্চের নেপথ্যে ১৫ থেকে ২০জন লাগবে আমার মনে হয় শুধু তাই না। আমি যদি বলি যে হলের ওপর ভিত্তি করে একজন নির্মাতা নাটক তৈরি করে সেই হলটিতে সে নির্মাতা কয়দিন কাজ করতে পারে। আজ আমরা যে বলছি সেগুলো কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে এই সমস্যার মুখোমুখি সবাই হয়েছে। যারা সিনেমা করেছেন তারাও কিন্তু সমস্যার মোকাবেলা করছেন। কোনো কোনো দল দেখা গেছে নির্মাতা-অভিনেতা এবং কারিগরি দিক দিয়ে ভালো হওয়ার কারণে নাটকটি ভালো হয়েছে। কিন্তু অনেক দল আছে যারা একদিনও কারিগরি শো করতে পারছেন না। তারপরও কিন্তু আমাদের মঞ্চে আমার মতে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে। আমরা কিন্তু ঢাকা থিয়েটারের ‘উজান গাঙের নাইয়া’র কথা বলছি না কেউ। যেটা গ্রুপ থিয়েটারে থিয়েটারে শো করেছে এবং আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হয়েছে আরেকটি কাজ যেটা ব্রিটিশ কাউন্সিলের সঙ্গে করা হয়েছে, যারা সবাই ছিল প্রতিবন্ধী এবং সেটাও কিন্তু একটা ভালো কাজ হয়েছে। তাহলে কি আমরা একেবারে ফেলে দেবো যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না। কাজ হচ্ছে। তবে পরিপূর্ণ হওয়ার মতো যে সুবিধাগুলো দরকার, সেগুলো তো আমাদের পেতে হবে।

মাসুম রেজা : প্রথমত আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না এটা আমি মেনে নিচ্ছি, আবার আগের মতো আমি এটা আবার মেনেও নিচ্ছি না। এটাও আমি অস্বীকার করছি। অস্বীকার করছি এই কারণে যে, যখন আমরা আউটস্ট্যান্ডিং বলছি তখন কিন্তু আসলে একটা স্ট্যান্ডিং লাগে। যখন কোনো স্ট্যান্ডার্ডের কথা বলি, তখন একটা প্রযোজনার সঙ্গে আরেকটা প্রযোজনার তুলনা করতে হয়। অর্থাৎ It is a comparison between this one and that one. স্ট্যান্ডিংয়ের জায়গাটা আসলে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এর অনেক কারণ ইতোমধ্যে সবাই বলেছেন। এর মূল কারণ আমি যেটা মনে করি এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবেই বলতে চাই। ঢাকা থিয়েটারের কীর্তনখোলা যদি একটা স্ট্যান্ডিং ধরি, এটাকে অতিক্রম করেছে সে সময় কোন প্রযোজনা তাহলে সেটা হবে আউটস্ট্যান্ডিং। ঢাকা থিয়েটারের কীর্তনখোলা তখন হয়েছে যখন ১০০ জন কর্মী মহড়া কক্ষে বসে থাকত। তার ভেতর থেকে আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা মোস্তফা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, লায়লা আজাদ নূপুর, জহির উদ্দিন পিয়ার, পীযূষদাসহ অসংখ্য গুণী শিল্পীরা দিনের পর দিন মহড়া করেছেন। বাচ্চু ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে বসে থেকেছেন। এটা ছিল পরিপূর্ণ একটা থিয়েটার। আর এভাবেই মঞ্চে এসেছে তাদের কীর্তনখোলা। পরবর্তী সময়ে ঢাকা থিয়েটারের দুয়েকটি প্রযোজনার আমি যদি নেই সেই পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো কিছুই নয়। তাহলে আমরা কোথা থেকে আমাদের স্ট্যান্ডার্ডকে হারাতে শুরু করলাম! আমরা শুরু করেছি সেই জায়গায় থেকে যখন আফজাল ভাই, ফরীদি ভাই, আসাদ ভাইকে নিয়ে টেলিভিশনে কাজ শুরু করেছেন বাচ্চু ভাই। ওনারা টেলিভিশনে কাজ শুরু করার পর থেকে থিয়েটার থেকে দূরে সরে গেলেন। নাগরিকের বেলায়ও ঠিক একই বিষয়। যদি আরণ্যকের কথা বলি, তাহলে আরণ্যকের যতজন মিডিয়াতে কাজ করছে তা দিয়ে এখন আরও চারটা আরণ্যক তৈরি করা যাবে। আজকে আরণ্যকের ইদানীংকালের নাটকের নাম কেউ বলতে পারছি না। এর পেছনে একটা বিশাল ঘটনা আছে। এছাড়া আরেকটা সবচেয়ে বড় বিষয় সাপ্লাই চেইন বলে একটা কথা আছে। একেক সময় মফস্বল থেকে শুরু করে থানা পর্যায়ে কিন্তু প্রচুর নাটক হতো। সে জায়গায় থেকে আসা ছেলে মেয়েরা যখন ঢাকায় পড়াশোনার জন্য আসত তখন পড়াশোনার পাশাপাশি কেউ কেউ থিয়েটার করতে চাইত। তারা প্রথমে নাগরিক ঢাকা থিয়েটার বা অন্যান্য দল এর মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিজেদের যুক্ত করত। তখন সে রকম সাপ্লাই চেইনটা থাকলেও এখন সেই চেইনটা কেটে গেছে। আমি বলব সরকারের সবচেয়ে বড় জায়গা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা।

এখন ক্লাস টেস্ট লিখে না নিয়ে গেলে নম্বর হবে না। প্রতি সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট দিতে হবে। সেমিস্টার ফাইনাল, ফাইনাল সবকিছু মিলে এমনভাবে বর্তমান ছেলে-মেয়েদের বাধা হয়েছে যে ছেলেটি এখন কোনো নাটকের দলে নিজেকে যুক্ত করবে সেটা সম্ভব নয়। আর সবকিছু বাদ দিয়ে নাটক করবে এ রকম কাউকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। প্রফেশনালিজমের নামটা যে আমরা বলছি সেটা আসলে হবে কোথা থেকে। আগে আমরা ছোটবেলায় দৌড়াতাম। বড়দের একটা লাইনে দাঁড় করানো হতো। আর ছোটদের আরো দশ কদম সামনে নিয়ে আরেকটা লাইনে দাঁড় করানো হতো। কারণ একই সঙ্গে দৌড়াতে হবে। আমি মনে করি আমাদের থিয়েটার এখন নানান ভাবে ভাঙতে ভাঙতে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে পড়তে এই দৌড়ের মতো আমরাও এ রকম দশ পা পিছিয়ে গেছি। এখন আউটস্ট্যান্ডিং কাজ কাজের কথা বলছি কিন্তু দেখা যাবে এই কাজগুলো অনেক নাট্যকর্মীরা মিলে ২৫ থেকে ৩০ দিন একটানা মহড়া করে মঞ্চে এনেছে। এখন আমাদের সেই জায়গাটা ফেরত আনতে হলে আমাদেরকে দশ পা এগিয়ে যেতে দিতে হবে। সেজন্য আমার কাছে মনে হয় যে প্রশ্নটি অবান্তর যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ কেন আসছে না। সুদীপ, মহসিনা যেটা বলেছে শুরুতে হায়দার সেটাও বলেছে। আমাদের থিয়েটার কর্মীদেরও অনেক দোষ আছে।

রাফি হোসেন : মাসুম ভাই আপনি বলেছেন যে প্রশ্নটা অবান্তর কিন্তু আবারও বলেছেন যে কী কারণে হচ্ছে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না। সত্যি সবাই কিন্তু স্বীকার করেছেন যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হচ্ছে না। আমাদের আর্থসামাজিক, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সবকিছু হয়তো সেভাবে অনুকূলে নেই। আমার প্রত্যেকটি কথা সবাই স্বীকার করেছেন এখন আমরা ওইরকম কাজ দেখছি না। যে এত কিছু না পাওয়ার পরও একজন জামিল আহমেদ কিংবা সেলিম আল দীন আঁকড়ে ধরে থিয়েটারটাই করেছেন। যে আমার নাটক কেউ বুঝুক বা না বুঝুক কেউ করুক বা না করুক আমি এ রকম করে লিখব বা এ ভাবেই থিয়েটারটা করব। সর্বশেষ জামিল ভাই এর রিজওয়ান দেখে অনেকে অনেক মন্তব্য করেছে। সেটা বিষয় না। কিন্তু আমাকে বলতে হবে যে গত এক দশকে কোনো দলের এ রকম একটি প্রযোজনা মঞ্চে এসেছে? জামিল ভাই যখন বিষাদসিন্ধু করেছে বাচ্চু ভাই যেমন কীর্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, হাত হদাই করছেন সেই রকম কাজ কিন্তু আমরা এখন পাচ্ছি না। উনারা কিন্তু এই প্রতিকূলতা নিয়ে কাজ করেছেন। বিদেশ থেকে কোনো শিল্পী এনে কাজ করেননি। আমাদের সংকট আছে সেটা বাচ্চু ভাই এখানে থাকলে বাচ্চু ভাইও স্বীকার করতেন। আমার বলার উদ্দেশ্য এটা নয় যে কিছুই হচ্ছে না। আমি যেটা বলতে চাই এবং বোঝাতে চাই পয়সা অবশ্যই একটা বিষয় কিন্তু লক্ষ্য যেটা সেটা কেন আমরা পরপূর্ণ ভাবে করতে পারছি না?

মাসুম রেজা : আমি এ বলতে চাচ্ছি বলেই বিষয়টি অস্বীকার করিনি। বলেছি প্রশ্নটি অবান্তর। ধরা যাক আমি যদি সিভিলাইজেশনের সংজ্ঞা বলি, তবে এটা সংজ্ঞা হচ্ছে ডযধঃ বি যধাব অর্থাৎ আমার ভিক্ষার থলে কী? আমার ছেঁড়া কাথা, আমার খালি গা, এক বেলা খাওয়া। যদি বাংলাদেশের কথা বলি তাহলে এটাই আমাদের সভ্যতা। আর এটা যদি সভ্যতা হয় তাহলে এই সভ্যতাকে আমরা মানতে পারি না। এখন আমরা বলার চেষ্টা করি, What we have, What we will have. যেটা আমাদের হবে সেটাই আমাদের সভ্যতা। আমরা সবাই তাকিয়ে আছি সামনের দিকে যে আমাদের ভালো হবে। আমি মনে করি আউটস্ট্যান্ডিং কাজ শুরুর সম্ভাবনা সেই জায়গাটিই আর আমরা সেটি তৈরি করার চেষ্টা করছি।

রাফি হোসেন : মাসুম ভাই এ বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে একমত। সেটা যখন আপনি চিহ্নিত করবেন তখনই একদম ভালো কাজ হবে। ডাক্তারের কাছে গিয়ে যদি কী অসুখ হয়েছে লজ্জায় বলতে না পারি, তাহলে তো পরীক্ষা করতে করতেই মেরে ফেলবে অথবা কিছুই করবে না। আমাদেরও এখানে একসঙ্গে হওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদের পর্যালোচনা করা এবং গঠনমূলক সমালোচনা করা। আমার উদ্দেশ্য এটা না যে এখানে কিছুই হচ্ছে না। হবেও না সেটা নয়। সুদীপের নাটকের কথা উল্লেখ করেছি বলে লোপা বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোডাকশন বলে ভালো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রোডাকশন যেমন ভালো না। হয়তো চাকা নাটকটি সবকিছুর সমন্বয়ে একটি দুর্দান্ত প্রযোজনা হয়েছে।

আমি চাই আমাদের এখানে সবসময় সেই রকম আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হউক। আমি সবকিছুই আপনাদের মুখ থেকে জানতে চেয়েছি। আমি বলে দিলেই হয়ে গেল আমি কিন্তু সেটা চাইনি, চেয়েছি আপনারা কিছু বলেন। আমাদের দেশে সম্ভাবনা আছে এবং আছে বলেই আউটস্ট্যান্ডিং কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। আপনারা কি পাঠক কিংবা মঞ্চ নাটকদের দর্শকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?

মাসুম রেজা : আমি একটা কথা সবসময় বলি এবং সেটা আবারও বলতে চাচ্ছি। একটা শহর রুচিবান এবং সংস্কৃতিবান হয়ে ওঠে সে শহরের বিভিন্ন নাটক, নাচ, পেন্টিং এ সে শহরের দর্শকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এখানে বিয়ে বাড়ি যত সরব হয় নাটকের দলের প্রদর্শনী ততটা সরব হয় না। টিউশনি পড়াতে আমি আমার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে এখানে এই করতে করতে এবং ছেলে-মেয়েদের ঘাড়ের ওপরে বড় বই দিয়ে আমরা হয়তো তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলছি। কিন্তু শিল্প এবং সংস্কৃতিমনা যে বিষয়টি শহরকে পরিচিত করে সেটি হচ্ছে না। যেমন আমরা পেইন্টিং দিয়ে কিন্তু পেরিসকে চিনেছি। ইতালির রোমে কে অপেরা দিয়ে চিনি। ঢাকার বেলায় কেন এমনটা হচ্ছে না। এই দেশ, শহর শুধু আমার আপনার নয়। এই দেশ, শহর আমাদের সবার। তাই এর দায়িত্ব প্রত্যেকটা মানুষের।

সুদীপ চক্রবর্তী : আমি একটা কথাই বলতে চাই যেন তরুণ নির্মাতাদের ওপর আস্থা রাখা হয়।  আমাদের নাট্যজন এবং পাঠকদের জন্যই বলছি সবাই যেন তরুণদের ওপর আস্থা রাখে এবং তরুণদের কাছে আমার আহ্বান, আমরা যেন শুধু থিয়েটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন চলচ্চিত্র দেখতে যাই, কবিতা আবৃত্তিসহ শিল্প-সংস্কৃতির সব মাধ্যমে নিজেদের বিচরণ করি। কারণ এই চর্চার আমাদের খুবই অভাব। একাডেমিক এবং গ্রুপ থিয়েটারের যে সীমারেখাটা সেটা যেন আমাদের চর্চায় না আসে। সেটা আমি আহ্বান করি সব জায়গাতে।

শামছি আরা সায়েকা : আমি বলতে চাই, তরুণরা শুধু নাটক নয় যেন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত হয়। কারণ এখন তরুণদের খুবই অভাব।

আইরিন পারভীন লোপা : শেষ কথা আমি বলতে চাই আমি স্বপ্ন দেখি ঢাকা শিল্পনগরীতে গড়ে উঠুক। আমারা যে স্বপ্ন দেখতাম আমার বিশ্বাস তরুণদের মাধ্যমে সে স্বপ্ন পূরণ হবে এবং পাঠক যারা পড়বেন তাদেরকে আহ্বান করছি আপনারা নাটক দেখতে আসুন।

মহসিনা আক্তার : আমরা সবাই মিলে নতুন নতুন কাজের মাধ্যমে নতুন নতুন দর্শক আনার চেষ্টা করি। আমার মনে হয় যে মানুষের সময় আছে থিয়েটার দেখার। আমাদের তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি আমি চাই পরস্পর এবং পরস্পরের কাজের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আরো বাড়ুক।

মোহাম্মদ আলি হায়দার : দর্শক কী দেখতে চায় সেটা আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত। আমি একটা কথা গল্প বলতে চাচ্ছি কিন্তু দর্শক সেটার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছে না। তাহলে তো কোনো লাভ নেই। এ সময়ে এসে আমরা কী দেখছি, কেন দেখছি, যা দেখছি সেটা আমাদের সমাজ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত অথবা যে গল্প বলতে চাই পরিপূর্ণভাবে তা বলতে পারছি কিনা এই বিষয়গুলোর অভাব আমাদের রয়েছে।

অনুলিখন : আখন্দ জাহিদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।