থিয়েটার আমার নেশা- অম্লান বিশ্বাস

মঞ্চে নেপথ্যের নিপুণ কারিগর অম্লান বিশ্বাস। প্রায় দুই যুগ ধরে কাজ করছেন দেশের স্বনামধন্য থিয়েটার সংগঠন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে। কারিগরি বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে আলোকসজ্জায় নিজের সৃষ্টিশীল ভাবনার জাদুতে মঞ্চকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলেন তিনি। মঞ্চের নেপথ্যে নিজেকে যুক্ত করার গল্পসহ অন্যান্য আরো বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : আপনার বর্তমান কাজের ব্যস্ততা?

অম্লান বিশ্বাস : বিভিন্ন দলের নাটকের নেপথ্যে আলোকসজ্জার কাজ নিয়েই আমার বর্তমান ব্যস্ততা। বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়টি নাটক ও বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তির নেপথ্যে নিয়মিত মঞ্চে আলোকসজ্জার কাজ করা হয়। মিডিয়াতে পরিচালনার কাজ করলেও বর্তমানে আমার সব কাজের ব্যস্ততা থিয়েটারকে ঘিরেই। কারণ আমি থিয়েটারেরই মানুষ।

আনন্দধারা : থিয়েটারে আপনার পথচলা শুরু হয় কীভাবে?

অম্লান বিশ্বাস : ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই বাংলায়। কিন্তু বাংলা আমার মূল বিষয় হলেও আমার সহায়ক ছিল নাট্যকলা। বাংলার পাশাপাশি বেশিরভাগ সময় আমি কাটাতাম নাট্যকলায়। আমার শিক্ষক ছিলেন জামিল আহমেদ এবং ওয়াহিদা মল্লিক জলি। তখন একটি প্রয়োজনায় অভিনয়ও করেছিলাম। কিন্তু অভিনয় আমাকে টানত না। ১৯৯৫ সালে আমি নাগরিকের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই কিন্তু আমার দাদা বললেন, ‘থিয়েটার আমাদের জন্য নয়। তুমি টিওশনি করো আমি তোমাকে টিওশনি ঠিক করে দিচ্ছি।’ তবে আমার নাটকের প্রতি বেশ দুর্বলতা ছিল। তখন টিউশনি শেষ করে এসে বিরতির পর থেকে অর্ধেক নাটক দেখতাম। কারণ তখন নাটক দেখার মতো টাকা ছিল না। সে সময় আমার এক বন্ধু বলল, তুই নাটকের দলে যুক্ত হলে ফ্রি নাটক দেখতে পারবি। তারপর ১৯৯৭ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে মঞ্চের নেপথ্যে কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য আবেদন করার মধ্য দিয়ে যোগদান করার সুযোগ হয়। কিন্তু দলে ঢোকার পর নেপথ্যে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমি হাল ছাড়ার পাত্র ছিলাম না। কর্মী হিসেবে নিয়মিত দলের অন্যান্য সব কাজ একাগ্রচিত্তে করে যেতাম। দলের সিনিয়র সদস্য খোকন ভাইয়ের লাইট করা দেখে এবং তার পরামর্শে আমি লাইট করা শিখি। তার মাধ্যমে আমার মঞ্চের নেপথ্যে আলোকসজ্জার কাজের হাতেখড়ি। তারপর ছয় মাসের পর দেওয়ান গাজীর কিসসা নাটকের মধ্য দিয়ে আমি প্রথম মঞ্চের নেপথ্যে আলোকসজ্জায় কাজ করি। ছোটবেলায় পূজা বা ঈদের সময় যাত্রা হতো, তখন প্রচুর যাত্রা দেখতাম। স্কুলের বিভিন্ন প্রোগ্রামে অভিনয়ও করতাম। সে সময় আমাদের এলাকায় কিছু নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছি। মঞ্চ নাটকের প্রতি ভালোবাসা সেই থেকেই মূলত শুরু।

আনন্দধারা : শুধুই কি ভালোবাসা থেকেই নিজেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন?

অম্লান বিশ্বাস : অবশ্যই ভালোবাসা। আমার পেশা টেলিভিশন নাটক পরিচালনা করা আর থিয়েটার হচ্ছে নেশা। আমি জানি থিয়েটারে কিছু নেই। কোনো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করে থিয়েটারে আসিনি। ভালোবাসা তো আর অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। আমি মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক এবং বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছি। ১৯৯৭ সালে আমি শিল্পকলায় একটি কর্মশালা করেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হারুন স্যার সেটি করেছিলেন। তখন কর্মশালায় অভিনয়ের জন্য চরিত্র নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিল সবাই। আমি তখন নিশ্চুপ ছিলাম। একপর্যায়ে স্যার আমাকে বললেন, ‘অম্লান তুমি কোনো চরিত্র করবে না? আমি তখন বললাম, স্যার অভিনয় দিয়ে তো আর একটি নাটক স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না, নাটকের পেছনেও কাউকে না কাউকে কাজ করতে হয়। আমি সেই পেছনের মানুষটিই হতে চাই। আমার এমন কথায় স্যার রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি অনেক খুশি হয়েছেন এবং আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন।

আনন্দধারা : থিয়েটারে কাজ করতে এসে কী কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে বা হচ্ছেন?

অম্লান বিশ্বাস : মঞ্চের সব জায়গায় কম-বেশি প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। তবে নেপথ্যে কাজ করতে এসে সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় সেটা হচ্ছে- নিজের ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে না পারা। এর অন্তরায় হচ্ছে বাজেট। তাছাড়া আমাদের দেশে কারিগরি দিকটা নিয়ে কেউ ভাবেন না।

আনন্দধারা : মঞ্চের নেপথ্যে কাজ করায় তরুণদের অনাগ্রহ কেন?

অম্লান বিশ্বাস : সবাই সব ক্ষেত্রে নিজেকে প্রকাশ করতে মরিয়া। আমি বরাবরই প্রচারবিমুখ। আমি আড়ালে-আবডালে থেকে নিজের কাজটাই করে যেতে চাই। আমার যেটা মনে হয়, নেপথ্যে যারা কাজ করে, তাদের মানুষ চেনে না বা তাদের কথা কেউ মনেও রাখে না। সেটা একটা বিষয়। আর আলোকসজ্জা একটা ভাবনা বা সৃষ্টির বিষয়। নিজেকে প্রমাণের বিষয়। অভিনয় করলে হয়তো মহড়া করতে করতে একটা অবস্থানে যাওয়া যায়। কিন্তু আলোকসজ্জায় নিঃস্বার্থভাবে নিজের সৃষ্টিশীল চিন্তা প্রকাশ করার ছেলেমেয়ে এখন পাওয়া খুবই দুষ্কর বলেই বর্তমানে তরুণদের নেপথ্যে অনাগ্রহ বলেই আমার মনে হয়।

আনন্দধারা : যখন দেখেন কোনো অভিনয়শিল্পী ঠিকভাবে আলোটা নিতে পারছে না বা অভিনয়টা করতে পারছে না তখন কেমন লাগে?

অম্লান বিশ্বাস : যেকোনো নাটক যদি ভালো না হয়, তখন আমার কাজটা করতে ভালো লাগে না। কারণ নাটকে অভিনয়ের সঙ্গে আমাকে যেতে হয়। যদি অভিনয়টা খারাপ হয়, তখন হয়তো কাজের স্পৃহাটা নষ্ট হয়ে যায়। যদিও সে কাজটা করা হয় কিন্তু সে কাজটাতে কোনো আনন্দ পাই না।

আনন্দধারা : নাটকের দৃশ্যের সঙ্গে আলোকসজ্জার ব্যবহারের ভাবনাটা কীভাবে নিজের ভাবনায় সৃষ্টি হয়?

অম্লান বিশ্বাস : নাটকের গল্প, ডিজাইন, অভিনয়, মিউজিক, মঞ্চের মাঝে শিল্পীর ব্লকিংয়ের ওপর নির্ভর করে নিজের ভাবনাটা যুক্ত করে একটি বাস্তবতার নিরিখে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জার পরিকল্পনা করে থাকি।

আনন্দধারা : অন্যান্য নাটকের দলে কাজের ক্ষেত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেন? নাটকের মান, দল, নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক রক্ষার্থে?

অম্লান বিশ্বাস : প্রথমত আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গল্প। ব্যক্তির চেয়ে নাটকের গল্পটাই আগে। তবে যদি একান্ত ব্যক্তিগত কারণে কোনো নাটকে কাজ করা হয়, আর যদি নাটকটি ভালো না হয়, তাহলে আমি ওই নাটকটির ডিজাইন করে চলে আসব। নাটকটি মঞ্চায়নের সময় কখনো আলোকসজ্জা পরিচালনা করব না। কারণ আমি কখনোই নিজের কাজের সঙ্গে আপস করি না।

আনন্দধারা : নেপথ্যে কাজ করার এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা মনে পড়লে খারাপ লাগে?

অম্লান বিশ্বাস : ভালোবাসার যে কোনো কষ্টও অনেক আনন্দের। কাজ করতে গেলে এমন অনেক কিছুই হয়ে থাকে। তাতে কষ্ট পাওয়ার কিছুই নেই। শুরুর দিকের একটা ঘটনা প্রায়ই মনে পড়ে, তখন ঢাকা মেডিকেলে দেওয়ান গাজীর কিসসা নাটকের তিনশত মঞ্চায়ন ছিল। আমি এমন জায়গায় লাইট করছিলাম। সেখানে আমার কেউ খোঁজ নেয়নি এমনকি নাশতাটাও দেয়নি। নাটক শেষে সবাইকে ফুল দেয়া হলেও আমি ফুলটাও পাইনি। তারপর নাটক শেষ হওয়ার পর সবাই চলে গেছে, নাটকের সেটটাও কেউ নেয়নি। পরে আমি আর আমার দলের একটা ছেলে মিলে রাতে সেট নিয়ে দলের ইস্কাটন অফিসে এসে রাতে ওখানেই ছিলাম। সবচেয়ে বড় কথা, পরদিন আমার পরীক্ষা ছিল। এখান থেকে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। তখন কষ্ট পেলেও এখন ভাবলে আনন্দই লাগে।

আনন্দধারা : মঞ্চ নাটকের বর্তমান অবস্থা কেমন মনে হয় আপনার?

অম্লান বিশ্বাস : মাঝখানে যদিও একটু খারাপ ছিল কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে খুব ভালো মানের নাটক হচ্ছে মঞ্চে। মহিলা সমিতির মঞ্চে শুরুতে যখন নাটক দেখতাম তখন নাটক শুরুর অনেক আগেই বাইরে লেখা দেখতাম ‘মিলনায়তন পূর্ণ’। এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। তবে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে সন্ধি করেই কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় মঞ্চে আলো জ্বলছে। আমার বিশ্বাস, দর্শক ভালোবাসায় মঞ্চে আবার সেই সময় ফিরে আসবে।

ছবি : শেখ মেহেদী মোরশেদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।