ব্যতিক্রম গল্পে প্রাচ্যনাটের ‘পুলসিরাত’

‘২০১৯’ সালটি ছিল দেশের থিয়েটার অঙ্গনের জন্য খুবই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির। তারুণ্যের জয়জয়কারে পুরো বছরটি ছিল একেবারে নাটকময়। নানা বিষয়-বৈচিত্র্যের নতুন নতুন নাটক আর বিশেষ বিশেষ উৎসব-আয়োজনে এ বছরটি কাটে আনন্দমুখর। বিগত যে কোনো বছরের তুলনায় এবার নতুন নাটকের সংখ্যা ছিল বেশি। শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়; বিনোদন, প্রাসঙ্গিকতা, উপস্থাপনশৈলী এমনকি শিল্পমানের দিক থেকে এ বছর মঞ্চে আসা নাটকগুলো সবার মাঝে মুগ্ধতা জাগিয়েছে। বেশিরভাগ প্রযোজনা হয়েছে নন্দিত এবং প্রশংসিত। মঞ্চাঙ্গনে তেমন এক সফল প্রযোজনার নাম ‘পুলসিরাত’। ফিলিস্তিনি লেখক ঘোষণ কানাফানির ‘মেন ইন দ্য সান’ উপন্যাস অবলম্বনে থিয়েটার দল প্রাচ্যনাট মঞ্চে এনেছে নতুন নাটক ‘পুলসিরাত’। মনিরুল ইসলাম রুবেলের নাট্যরূপায়ণে এটি অনুবাদ করেছেন মাসুমুল আলম এবং নির্দেশনা দিয়েছেন কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন। বিগত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর নাটক সরণি খ্যাত বেইলি রোডের বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহীম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন। একই দিনে পরপর দুটি প্রদর্শনী হয়েছে এ নাটকের। প্রথমটি আমন্ত্রিত দর্শকের জন্য, দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি দর্শক টিকিট কেটে উপভোগ করেছেন। নাটকটি দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। কেননা, গল্পটি ব্যতিক্রম। এ ধরনের গল্পের নাটক নিকটঅতীতে ঢাকার মঞ্চে দেখা যায়নি।  নাটকের গল্পের কেন্দ্রে তিন মানবসন্তান- আবু কায়েস, আসাদ ও মারওয়ান। নিজেদের ভাগ্যান্বেষণের জন্য ফিলিস্তিন থেকে স্বপ্নের কুয়েতে পাড়ি জমাতে চায়। তিনজন বয়সে আর প্রজন্মে আলাদা হলেও এক জায়গায় মিল, তারা সবাই উদ্বাস্তু। এই তিনজনকে কুয়েত পৌঁছাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে আবুল খাইজুরান নামের চতুর্থ একজন। খাইজুরান আসলে লরির ড্রাইভার, কুয়েত পর্যন্ত তাদের নিরাপদে পৌঁছে দিতে এগিয়ে আসে, এভাবেই শুরু গল্পের। এই চারজনের আশা-নৈরাশ্য, তাদের বর্তমান ও অতীতের ঘটনাপ্রবাহের মিশ্রণে এগিয়ে যায় সময়। তিনজনেরই আলাদা গল্প আছে। আবু কায়েসের ঘরে দুই সন্তান ও স্ত্রী। তাদের রেখে বন্ধুর পরামর্শে একটু ভালো করে বাঁচা, একটু বেশি রোজগারের আশায় কুয়েত পাড়ি দিতে চায় সে। আবু কায়েসের স্বপ্ন, তার সন্তানরা স্কুলে পড়াশোনা করতে পারবে। বয়সের কারণেই হোক বা চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যই হোক, আবু কায়েস স্বভাবে বেশ নরম ও কিছুটা ভীতু। আর তার ঠিক বিপরীত চরিত্রের আসাদ। টগবগে তরুণ। কিছুটা রাগী, স্বভাবে বেশ কৌশলী। সে এর আগেও সীমান্ত পার হয়ে অবৈধ পথে কুয়েত যেতে চেষ্টা করেছিল। নিশ্চিত ও উন্নত ভবিষ্যৎ, চাচাতো বোনকে বিয়ে করার স্বপ্ন তার। অন্যদিকে ১৬ বছরের মারওয়ান স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে নিজের পরিবারের দায়িত্বের চাপে পাড়ি দিতে চায় স্বপ্নের কুয়েতে। মারওয়ানের বড় ভাই কুয়েত থাকে। সেখানে সে কাজ করে দেশে পরিবারের জন্য টাকা পাঠাত। কিন্তু বিয়ে করে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয় সে। মারওয়ানের বাবা সন্তানদের ভরণ-পোষণে অপারগ হয়ে নিজের সচ্ছল জীবনের স্বপ্নপূরণে এক পঙ্গু মহিলাকে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। মারওয়ান তাই পরিবারকে বাঁচাতে অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিতে চায় কুয়েত। আগস্ট মাসের প্রচণ্ড গরমে, রোদে পুড়ে মরুভূমির পথে লরিটি এগিয়ে যায়। তিনটি হতভাগ্য জীবন ছুটে চলে স্বপ্নময় এক নতুন সচ্ছল জীবনের প্রত্যাশায়।

উপন্যাসটির লেখক ঘাসান কানাফানির জীবনও ছিল অনেক কঠিন। ফিলিস্তিন থেকে তিনি লেবানন গিয়েছিলেন। লেবানন থেকে সিরিয়া। সেখানে বাস্তু শিবিরে ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এক বোমা হামলায় মৃত্যু হয় তার। তার সংগ্রামের জীবনও প্রেরণা জুগিয়েছে। তাছাড়া সবাই যখন একদিকে ছুটছেন, সেখান থেকে একটু ভিন্ন দিকে হাঁটার পরিকল্পনা থেকে নাটকের বিষয়টি প্রাচ্যনাট বেছে নিয়েছে বলেও জানান নাটকটির নির্দেশক কাজী তৌফিকুল ইসলাম। তিনি আরো বলেন, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করে নয়, ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়ে রূঢ় বাস্তবতার শিকার এক জনগোষ্ঠী। এই চারজন হতভাগ্য মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও পুনর্র্নির্মাণ আখ্যানের মাধ্যমে বিবৃত। এই মরুভূমি যেন সেই জীবনের রাস্তা, যা প্রতিটি মানুষ যাপন করে। এরা তো প্রতিনিধিত্ব করে উপমহাদেশীয় অর্থনৈতিক উদ্বাস্তুদের, যারা ক্রমাগত ভিড় করছে উন্নত বিশ্বে।

নাটকটিতে অভিনয় করেছেন আজাদ আবুল কালাম, শাহরিয়ার ফেরদৌস, সাইফুল জার্নাল, মিতুল রহমান, জগন্ময় পাল, মনিরুল ইসলাম, চেতনা রহমান, তানজি কুন, শামীম শ্রাবণ প্রমুখ। সেট ডিজাইন করেছেন শাহীনুর রহমান, সংগীত পরিকল্পনায় নীল কামরুল, আলোক পরিকল্পনায় বাবর খাদেম। সেট, লাইট, মিউজিকের পাশাপাশি আজাদ আবুল কালামসহ সব শিল্পীর মন্ত্রমুগ্ধ অভিনয় দর্শকদের দৃষ্টি স্থির করে রাখার মতো একটি নাটক প্রাচ্যনাটের পুলসিরাত।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।