আড্ডা : গত এক দশকের বই আর লেখকের সন্ধানে

গত এক দশকের উল্লেখযোগ্য বই আর লেখক বিষয়ে এক আড্ডার আয়োজন করেছিল আনন্দধারা। এই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ, লেখক, কবি শাহনাজ মুন্নী, লেখক আফসানা বেগম, কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ, কবি পিয়াস মজিদ ও ঔপন্যাসিক পারমিতা হিম। জমজমাট সেই আড্ডায় তারা জানিয়েছেন গত এক দশকে তাদের পছন্দের বই আর লেখকের নাম। পাশাপাশি উঠে এসেছে সাহিত্যের চলমান সংকট ও তার উত্তরণের কথা। আড্ডার সূত্রধর ছিলেন আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেন। সেই আড্ডার অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য-

রাফি হোসেন : আপনার দৃষ্টিতে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা সম্পর্কে জানতে চাই?

ফরিদ আহমেদ : ২০০১-২০১০ এবং ২০১১-২০২০ গত দুই দশকে আমাদের প্রকাশনায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২০০১ থেকে প্রকাশনার যে প্রসার হচ্ছিল, সে প্রসারটা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০১০ সালের পর প্রকাশনার স্ফীতি বেড়েছে। যদি আমার নিজের প্রকাশনার কথা বলি, তাহলে মূল কাজগুলো ২০০০ সালের পর থেকে করেছি। শওকত ওসমান ১৯৯৮ সালে মারা গেলেন, তার কিছুদিন পরই সুফিয়া কামাল। তারা মারা যাওয়ার পর উপলব্ধি করলাম একটা সময়ে এসে লেখকরা আর গোছানো থাকেন না। তাই তাদের লেখাগুলো সংগৃহীত করে সংরক্ষণ করার চিন্তা আসে। তাছাড়া তখন বাংলাদেশে সামর্থ্যবান প্রকাশকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল না। যারা বেশি লগ্নি করে এই বইগুলো বের করতে পারে। আমরা যেগুলোকে ক্ল্যাসিক লেখা বলি, সে বইগুলো বের করার জন্য লেখকরা বাংলা একাডেমির ওপর নির্ভর করত। অন্যদিকে তখন বাংলা একাডেমির প্রডাকশনের মান খুব সাধারণ ছিল। তখন আমি কিছু রচনাবলির কাজে হাত দিই। গত দশকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কাজ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোষগ্রন্থ করেছি। শুধু মুক্তিযুদ্ধ না, যে কোনো কোষগ্রন্থ বেসরকারিভাবে বাংলাদেশে প্রথম আমার প্রকাশনী থেকেই হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানি জেনারেলরা যত বই লিখেছেন, তারা কি ভেবেছেন সেগুলোর ওপরে আমার বইগুলো এই দশকে করা। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে বইগুলো, সেগুলোও এই দশকে করা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজগুলোকে এই দশকের উল্লেখযোগ্য কাজ বলে আমি মনে করি।

রাফি হোসেন : গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য কোনো তরুণ লেখক কী বের হয়েছে?

ফরিদ আহমেদ : এটাকে আমি উল্লেখযোগ্য বলি না, কারণ প্রতি বছর আমি তাদের নিয়ে কাজ করি। বর্তমানে যারা পরিচিত, তাদের অনেকের শুরুটা আমার সঙ্গেই হয়েছে। যখন হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজ করি, তখন তিনিও স্বল্প পরিচিত। তখন হুমায়ূন আহমেদের দুই-তিন হাজার কপি বই বিক্রি হতো তখন থেকে আমি হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজ করি এবং পরবর্তী সময়ে ৬০ হাজার কপিও বিক্রি করেছি। জাফর ইকবাল বিদেশে থাকতেন। তিনি দেশে আসার পর তাকে বললাম, আপনি কেন নিয়মিত লিখছেন না? তিনি বললেন, আমার বই ৫০০ কপির বেশি ছাপানো হয় না। এখন প্রকাশকরা ছাপান না নাকি এর বেশি বিক্রি হয় না আমি সেটা জানি না। আমি বললাম আমাকে একটা বই দেন আমি চেষ্টা করে দেখি। তখন দুই হাজার কপি বই বিক্রি করেছিলাম। ২০০৯  সালে পঁয়ত্রিশ হাজার কপি বই বিক্রি করেছিলাম। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর তার বই সময় প্রকাশনী থেকে বের হতে থাকে। এই যে তার উত্থান, এটা আমরা একসঙ্গে হেঁটেছি। আনিসুল হকের বইগুলোও সময় প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তার সর্বাধিক বিক্রীত বই ‘মা’, সেটাও সময় প্রকাশনী থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু তারপর কী যে হলো, ২০১০ সালের পর কাটতি লেখক আর পাচ্ছি না।

রাফি হোসেন : এর কারণ কী?

ফরিদ আহমেদ : বইয়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে, লেখকের সংখ্যা বেড়ে গেছে, বই বের করা খুব সহজ হয়ে গেছে। সুতরাং বইয়ের মান যাচাই হচ্ছে না। যারা সম্ভাবনাময় তরুণ, উঠতি লেখক তাদের পাণ্ডুলিপি কয়েকজনকে দেখিয়ে মৌখিক সার্টিফিকেট নিয়ে প্রকাশকের কাছে আসতে হতো। এখন আর সেটা হয় না। এখন যেকোনো স্তরের মানুষ চাইলেই বই বের করতে পারে। যার ফলে বর্তমানে লেখকরা বেশি পরিমাণে বই লিখছেন। তবে ক্রেতার সংখ্যা বাড়লেও পাঠকের সংখ্যা বাড়েনি।

রাফি হোসেন : বিক্রি বেশি হচ্ছে কিন্তু পাঠকের সংখ্যা কম এটা কেন? পাঠকরা তাহলে বই নিয়ে কী করছে?

ফরিদ আহমেদ : ২০০১ সালে যে বইয়ের দাম ছিল একশত টাকা এখন সেটা আড়াইশত টাকা। জনসংখ্যা বেড়েছে। তখনকার চেয়ে এখন শিক্ষিতের হারও বেশি। বইমেলা এখন একটা উৎসবের মতো। মানুষ বই কেনে উপহার দেয়ার জন্য। উপহার যাদের দেয়, তারা কতটুকু পড়ে এই বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। বইমেলায় বই কেনার রেওয়াজটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেটি ব্যবসার জন্য ভালো দিক। কিন্তু পাঠক বৃদ্ধির জন্য যে কাজগুলো করা দরকার, সে পথটা আসলে খোলা নেই। স্কুলে যে লাইব্রেরিগুলো গড়ে উঠেছে শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক পড়ার পর সেখানে শিক্ষার্থীরা কতটুকু পড়ার সময় পাচ্ছে? মনে হয় না তারা লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ার সময় পাবে।

রাফি হোসেন : আপনি বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি, একজন প্রকাশক। আপনার কাছ থেকে গত দশকের উল্লেখযোগ্য বই এবং নতুন লেখকদের নাম জানতে চাই?

ফরিদ আহমেদ : নতুন লেখক অনেক বের হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠিত কেউ হয়েছে কিনা সেটা বলা খুবই মুশকিল। কারণ প্রতিষ্ঠিত বলতে আমরা তাদের বুঝি, যাদের লেখা ব্যবসাসফল হয়েছে। প্রকাশকের ঘরে লক্ষ্মী যে এনে দিচ্ছে, প্রকাশকরা তাদের ভালোবাসছে। আমার একটা দুর্বলতা আছে, সবার নাম মনে রাখতে পারি না। তবে আমার প্রকাশনীর বেস্ট সেলার মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আনিসুল হক।

রাফি হোসেন : নতুন লেখকদের মধ্যে এখন কার নাম বেশি শোনা যাচ্ছে?

ফরিদ আহমেদ : ফিকশনের দিক থেকে সাদাত হোসেনের নাম বেশি শোনা যায়। তার নিজস্ব কিছু পাঠকও তৈরি হয়েছে। আর নন-ফিকশনে মোটিভেশনাল বইয়ের মধ্যে আইমান সাদিকের নামটা শোনা যায়।

রাফি হোসেন : কবিদের মধ্যে এখন কাদের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে?

ফরিদ আহমেদ : বাণিজ্যিকভাবে বলতে গেলে এখন কবিদের খরা যাচ্ছে।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : ফরিদ ভাইয়ের সঙ্গে আমি একটু যোগ করব, তা হলো- বর্তমানে সারা পৃথিবীর বিনোদনের মাধ্যমগুলোর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে মানুষ বই পড়ত আর এখন বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে তারা সংযুক্ত থাকছে। যার ফলে পাঠক কমছে এবং বইয়ের গুরুত্বও কমে যাচ্ছে।

রাফি হোসেন : আপনার দৃষ্টিতে গত দশকের উল্লেখযোগ্য বইয়ের এবং নতুন লেখকদের নাম জানতে চাই?

আলতাফ শাহনেওয়াজ : আমিও একজন নতুন লেখক। তাই আমার পক্ষে এটা বলা অনেক মুশকিল। তবে নন-ফিকশন বইয়ের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, ইতিহাসনির্ভর বই, আত্মজীবনী এসব বই মানুষ এখন বেশি পড়ছে। ইংরেজি সাহিত্যের পাঠক বেড়েছে। শাহীন আখতারের ‘সখি রঙ্গমালা’, ‘ময়ূর সিংহাসন’, শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’, সুমন রহমানের ‘নিরপরাধ ঘুম’। বাজার কাটতি কবি গত ১০ বছরে আমার চোখে পড়েনি। বিজয় আহমেদ, পিয়াস মজিদ, জাফর আহমেদ রাশেদ, ইমরান মাঝি, আহমেদ মনির এদের লেখা ভালো লাগে। শাহনাজ মুন্নি গল্পকার হিসেবে ভালো, অদিতি ফাল্গুনি, শাহগুপ্তা শারমিন তানিয়া, সুমন রহমান এরাও ভালো লিখছে।

রাফি হোসেন : পিয়াস মজিদ আপনার দৃষ্টিতে গত এক দশকের উল্লেখযোগ্য লেখক আর বইয়ের নাম জানতে চাই?

পিয়াস মজিদ : হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি, সৈয়দ শামসুল হকের ‘তিন পয়সার জোসনা’, প্রণীত জীবন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘দুই যাত্রার এক যাত্রী’। গত এক দশকে এগুলো অনেক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই লেখকদের দ্বিতীয় যাত্রাটা এই দশকে হয়েছে। পাকিস্তানি জেনারেলরা কীভাবে দেখছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাইরের দেশের লোকজনরা কীভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ উপলব্ধি করছে, এই দশকে বইগুলোর অনুবাদ অনেক বেড়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ সম্পর্কে বাইরের লেখকরা যে বইগুলো লিখেছিলেন, সেগুলোর অনুবাদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কবিতার বিষয়ে যদি বলি শহীদ কাদরী এই দশকে আবার লিখছেন। নব্বই দশকে যাদের বই বের হতো না, ম্যাগাজিনে লেখা বের হতো; এই দশকে তাদের বই বের হয়েছে। এখন যারাই কথাসাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন তারা সায়েন্স ফিকশন নিয়ে লিখছেন। যারা লেখালেখি শুরু করছেন তারা শিশুসাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন।

আফসানা বেগম : আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা  হলো আমি নামগুলো ওইভাবে বলতে পারব না। আমরা অনেক বেশি নন-ফিকশন বই পড়ছি। হাসান মোর্শেদ নামের একজনের গবেষণামূলক বই ‘দাশবাটির খোঁজে’ খুব ভালো লেগেছে। ফিকশনের ক্ষেত্রে শাহীন আখতার, ফয়েজুল ইসলামের খোয়াজ খিজিরের সিন্ধুক, আহমেদ মোস্তফা কামালের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’সহ আরো অনেকের বই বের হয়েছে। কিন্তু আমি ঠিক জানি না যে, বইগুলো কেমন বিক্রি হয়েছে। বেশি পাঠক পড়েছে বলে আমার মনে হয় না। আগের চেয়ে এখন পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে।

রাফি হোসেন : পাঠকের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ কী?

আফসানা বেগম : আশা করেছিলাম ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র যারা, তারা খুব বড় লেখক না হলেও বড় বড় ইংরেজি সাহিত্যগুলোর অনুবাদ করবে। কিন্তু সেটা এখনো ঘটেনি। যারা অনুবাদ করছে তারা বাংলা মিডিয়ামের। এখন যারা বড় লেখক উঠে আসছে পাঠক তাদের বই পড়ছে না। ব মেলার সময় মেলায় অনেক ভিড় দেখা যায়। একজন পাঠকের কাছে যদি কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে মেলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি শুধুই ভেবে যাবেন যে কোন বই কিনবে। কারণ প্রকাশকরা অনেক সময় ভালো বই তুলে ধরেন না কোনো বিজ্ঞাপন বা প্রচারণাও করেন না।

রাফি হোসেন : পাঠক কমে যাওয়ার সংকট ছাড়া আর কী কী সংকট আছে? এসব থেকে কীভাবে উতরানো যায়?

ফরিদ আহমেদ : আগে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা বেশি বই পড়ত। এখন সেটা হচ্ছে না। তাদের কাছে যদি জানতে চাই বই পড়া হয়? তারা বলে পড়ি। কী বই পড়? তখন আর বলতে পারে না। তারা পুরনো কালের লেখকদের কথাই বলে। পাঠক বৃদ্ধি করার ব্যপারটা খুব সহজ একটা ব্যাপার না। আমাদের সমাজ এখন একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতি ১০ বছরে আমাদের সমাজের পরিবর্তন হয়েছে। তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সমাজের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকরাও পরিবর্তন হয়েছেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির পাঠক এখন আর নেই। হুমায়ূন আহমেদের মূল পাঠক ছিল গৃহবধূরা। এখন সেই পাঠকটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। গত দশকে ইন্টারনেটের ব্যবহার এত বেশি বেড়ে গেছে, সেখানে মানুষের আগ্রহ ও মনোযোগ বেশি থাকছে। চটজলদি এর সমাধান সম্ভব না।

পিয়াস মজিদ : আমার কাছে আলাদা কোনো সংকট মনে হয় না। প্রতি বছর বিক্রির সংখ্যা বাড়ছে। নন-ফিকশন বইগুলো মানুষ পড়ছে। যে প্রজন্ম লিখছে, সেই প্রজন্মের পাঠকরা তাদের বই পড়ছে। গত এক দশকে ব্লগ লেখকদের কথা যদি বলি, তাদের নতুন সংকলন এবং বই বের হচ্ছে। জনপ্রিয় পুরনো বইগুলো অনেক তরুণ পিডিএফ আকারে দিচ্ছে। বর্তমানের শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ার সুযোগ খুব কম। তারা একাডেমিক পাঠ সর্বোচ্চ ফলাফল নিয়ে সবসময় বেশি ব্যস্ত থাকে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে এই সংকট কাটানো সম্ভব না।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : সমাজটা এখন অস্থির অবস্থায় রয়েছে। ১০-২০ বছর পর সেটা একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে, তখন আমরা বুঝতে পারব আমাদের কী হবে। হুমায়ূন আহমেদের যারা পাঠক ছিলেন, তারা অন্য কারো পাঠক হচ্ছেন না। পরিবার থেকে বই পড়ানো চর্চার শুরুটা করতে হবে। আমরা এখন একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তাই চটজলদি এখন বিষয়গুলো বোঝা যাবে না। তবে পাঠকদের মধ্যে পড়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে।

রাফি হোসেন : এখানে সবাই যেহেতু লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। সবাই তো আর খারাপ লিখছে না, কেউ তো ভালো লিখছে, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের সম্পর্কে জানতে চাই?

ফরিদ আহমেদ : আত্ম-উন্নয়নমূলক লেখার আনেক চাহিদা এখন। আলতাফ শাহনেওয়াজ, পিয়াস মজিদ, আফসানা বেগমসহ আরো অনেকেই যারা সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন, তারা খুবই ভালো করছেন। দিন দিন প্রকাশকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যবসা হিসেবে এখন আমাদের অবস্থান ভালো। কিন্তু যখনই আমরা এটাকে সাহিত্যের মধ্যে নিয়ে যাব, তখন ভাবতে হবে।

রাফি হোসেন : সাদাত হোসেনের পাঠক শ্রেণি তৈরি হওয়ার কারণ কী?

আফসানা বেগম : সাদাতের বিষয়ে আমার মনে হয়েছে একটা গল্প একটানা লিখে যাচ্ছে খুব সাধারণ ভাষায়। যেন পাঠকরা পড়লেই সেটা বুঝতে পারে। আমার মনে হয় এজন্যই তিনি পাঠকদের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন। লেখার প্রতিটা দৃশ্য যখন বাস্তবে দেখা এবং জানাশোনা বিষয় নিয়ে হয়, তখন পাঠকরা সেটাকে গ্রহণ করে।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : আমার মনে হয় সাদাতের লেখার একটা ধরন রয়েছে। সে অনেক সংলাপ ব্যবহার করে। উপন্যাসে যেমন দেখি কোনো একটা বিষয়ের বণনা করা থাকে। কিন্তু সে সেখানে সংলাপের ব্যবহার করে। এই বিষয়টা পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে।

রাফি হোসেন : তাহলে কি আমরা ধরে নেব হুমায়ূন আহমেদের শূন্যস্থানটা পূরণ করছে সাদাত হোসাইন?

আলতাফ শাহনেওয়াজ : না। কারণ হুমায়ূন আহমেদ অনেক বড় সাহিত্যিক। তিনি গল্প বলতে চাইতেন। গল্প বলার যে ভঙ্গি, সেটা সাদাতের সঙ্গে মিলবে না।

আফসানা বেগম : একটা কাজে যে যত দক্ষ, তার কাছে কাজটা তত বেশি সহজ। হুমায়ূন আহমেদের কাছে সাহিত্যটা ছিল তরল। কারণ এতে তিনি দক্ষ ছিলেন। দক্ষ হওয়ার জন্য তাকে কাটখড় পোড়াতে হয়েছে।

পিয়াস মজিদ : সংলাপের বিষয়টাকে পাঠক এখন বেশি গ্রহণ করে। মানুষের কাছে সে পৌঁছাতে পারল এটাও একটা রসায়ন। তবে শুধু সংলাপবিষয়ক বই যে পাঠক পড়ছে, সেটাও না। পাঠকদের মানসতত্ত¡ কী সেটা ধরে তাদের কাছে পৌঁছানো, এটাও একটা বড় সাফল্য। ইতিহাস, অনুবাদ যেমন পাঠকরা পড়ছেন, তেমন সাধারণ উপন্যাসগুলোও তারা পড়ছেন। আমিও জানতে চাই যে পাঠক আসলে কী চায়? পাঠকদের পাঠস্পৃহাকে ধরতে পারা একটা বড় সাফল্য।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : শামসুল হকের ভাষায় প্রকল্পবাদী সাহিত্যের সংখ্যা বেড়েছে। যেমন : জেলের জীবন, তাঁতির জীবন- এই ধরনের লেখাগুলো। এর ফলে আমাদের সাহিত্যের ক্ষতি হয়েছে। এভাবে কারো জীবনী নিয়ে উপন্যাস লেখা হয় না। তবে থ্রিলারের পাঠক বেড়েছে।

রাফি হোসেন : কিন্তু ভালো থ্রিলার লেখক কি তৈরি হয়েছে আমাদের এখানে?

আলতাফ শাহনেওয়াজ : কাজী আনোয়ার হোসেন যে চেষ্টাটা শুরু করেছিলেন, শেখ আব্দুল হাকিম, রকিব হাসান হয়ে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন একটা পাঠক তৈরি করতে পেরেছেন। তার থ্রিলার নিয়ে ওয়েব সিরিজও হচ্ছে। সায়েন্স ফিকশনে শিবব্রত বর্মণের পাঠক রয়েছে।

শাহনাজ মুন্নী : পাঠক কী চায় আর আমরা কার জন্য বই লিখি। স্বাভাবিকভাবে আমরা চাই আমাদের বইগুলো অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছাক। কিন্তু বাস্তবে সেটা হচ্ছে না। এর কারণগুলো হচ্ছে আমাদের পাঠ্য অভ্যাসের পরিবর্তন হয়েছে বিনোদনের অনেক উপকরনণ চারপাশে। সুতরাং বইয়ের যে ব্যাপার ছিল, সেই জায়গাটা নড়ে গেছে। আমরা যারা লিখি, তারা কখনোই এভাবে পাঠকের কথা ভেবে লিখি না। নিজের যা মনে হয় তাই লিখি। আশা করি, আমার ভালো লাগছে তাই নিশ্চয়ই কারো না কারো ভালো লাগবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা জনমানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি না। আমি মনে করি এটা আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থার সমস্যা। ভালো নাটক, সিনেমা, বই চলছে না। জানি না কোন শ্রেণির এবং কোন বয়সের পাঠকরা বই পড়ছে। বেশিরভাগেরই এটা মৌসুমি ব্যবসা। তারা এই ব্যবসাটাকে পেশাদার হিসেবে নেয়নি, তাই তারা এটা করে না। কোনো সম্পাদনা, সংশোধন ছাড়া মানহীন, ভুলে ভরা এবং রিভিউ ছাড়া বই বের হয়। এসব কারণে পাঠকের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে প্রথম আলো, ইউপিএল- এরা ভালো করছে। কারণ এরা গবেষণার মাধ্যমে বই বের করছে।

রাফি হোসেন : অনেকদিন ধরে সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত আছেন এবং একটা অবস্থান তৈরি করেছেন। আপনার বইগুলো কীভাবে প্রকাশ করছেন?

শাহনাজ মুন্নী : খুবই পেশাদার বনেদি প্রকাশক যারা আছেন, তাদের দিয়েই আমার প্রথম বইগুলো বেরিয়েছে। একটা দুঃখের বিষয়, প্রকাশকরা বই বের করছেন ঠিকই কিন্তু লেখকদের তারা কোনো তথ্যই দেন না। কত কপি বিক্রি হয়েছে, উনি কত কপি ছাপিয়েছেন। লেখকের সম্মানী এসব বিষয় নিয়ে তারা কথা বলতে রাজি না। তাদের কাছে যখন এই প্রসঙ্গগুলো তুললাম, তারা আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে দিল। পরবর্তী সময়ে যারা আমার বই করেছে, তারা একেবারে নতুন প্রকাশক। তাদের উদ্যম আছে কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না। শুধু বইমেলাতে তাদের ব্যবসা। তারপর সারা বছর খুঁজলেও আর বই পাওয়া যায় না।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : লেখকদের সংকটটা হচ্ছে তারা কষ্ট করে লিখবেন। এরপর পাণ্ডুলিপি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাবেন। কিন্তু প্রকাশক বইটা করে এমন একটা ভাবমূর্তি ধারণ করেন, যেন উনি লেখককে সাহায্য করলেন। বাংলাদেশে তিন-চারজন লেখক ছাড়া আমার মনে হয় না কেউ বই লিখে চলতে পারেন। কতগুলো বই ছাপা হয় এবং কতগুলো বিক্রি হয় এর প্রকৃত সংখ্যা কোনো লেখকই জানতে পারেন না।

শাহনাজ মুন্নী : ভালো পাঠক তৈরির জন্য প্রকাশনাকে একটা পেশাদারিত্বে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে একজন লেখক হিসেবে আমাকে শুধু লেখার কথা ভেবে থাকলেই হয় না, আরো অনেক বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। কথাসাহিত্যে শাহাদুজ্জামান ভালো লেখেন। তরুণদের মধ্যে বলার মতো কাউকে পাই না।

রাফি হোসেন : পাঠকদের কাছে সঠিক বইটা আমরা কীভাবে তুলে ধরব?

আফসানা বেগম : এই মুহূর্তে এটা বলা খুব কঠিন। পছন্দ যখন অনেক বেশি। অনেক পথ খোলা আছে, তখন একটাকে বেছে নেয়া অনেক বেশি কঠিন। আমরা আশা নিয়ে লিখে যাই, যদি কোনো পাঠকের হাতে পড়ে ভালো কিছু পড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে বর্তমানে লেখকরা তাদের বই সম্পর্কে জানাতে পারছেন। কিন্তু এই বিষয়ে প্রকাশকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : গণমাধ্যমের একটা বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু কোনো মিডিয়ায় এই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না। ভালো লেখকদের কী কী বই বের হচ্ছে, সেগুলো তুলে ধরা উচিত। যাতে করে পাঠক বই সম্পর্কে জানতে পারে।

রাফি হোসেন : সাহিত্য পুরস্কার কেমন ভ‚মিকা রাখে? পুরস্কারপ্রাপ্ত বইগুলোর প্রতি পাঠকদের চাহিদা কেমন?

পিয়াস মজিদ : আগে শুধু লেখকদের পুরস্কার দেয়া হতো আর এখন বইয়ে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে- এটা গত ১০ বছরে আমাদের বড় অর্জন। পুরস্কার একটা ভ‚মিকা অবশ্যই রাখে। তবে শুধু পুরস্কার পেলেই যে বিক্রি বাড়ে বা পাঠকরা পড়বে এই অভিজ্ঞতা আমার নেই।

পারমিতা হিম : আমি মনে করি না যে, পুরস্কার পাঠকদের আকৃষ্ট করে বা বিক্রির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভ‚মিকা রাখে। কারণ পুরস্কার তারাই পায়, যাদের অতিরিক্ত কোনো যোগাযোগ আছে। লেখালেখি ভালো করা বা পাঠকের কাছে প্রিয় হওয়ার সঙ্গে পুরস্কারের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না।

রাফি হোসেন : তাহলে সাহিত্যে যে পুরস্কারগুলো দেয়া হয় এগুলো কি নিরপেক্ষ নয়?

পারমিতা হিম : সবখানেই কোনো না কোনো পক্ষ আছে। আমার মনে হয় এই বিষয়ে পাঠকরা জানে। লেখককে চেনাতে বা পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পুরস্কার কোনো ভ‚মিকা রাখে বলে মনে করি না।

আফসানা বেগম : একজন নতুন লেখক যদি পুরস্কার পান, তাহলে সাময়িকভাবে তাদের পরিচিতি এনে দেয়। মিডিয়ায় দেখে অনেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত বইগুলো কেনে। কিন্তু সেই লেখক যদি পরবর্তী সময়ে ভালো না লেখেন তার নাম আর থাকে না। একজন লেখক পুরস্কার পেলেন বলেই যে সারাজীবন পাঠকের হৃদয়ে বসে থাকবেন এমন না। এইটা সাময়িক। পারমিতা যেমন বললেন, এগুলো আমরা শুনতে পাই। এমনও দেখা গেছে, যারা পুরস্কার দিচ্ছেন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন ব্যক্তিকেও দিচ্ছেন এবং অপরিচিত একজন যে ভালো লেখেন, তাকেও দিচ্ছেন। তাই চট করে বলতে পারি না পুরস্কারটার মান নষ্ট হয়ে গেছে।

শাহনাজ মুন্নী : আমাদের কোনো পুরস্কারই বিতর্কের ঊর্ধ্বে না। ভালো ভালো বই যে একেবারে পুরস্কার পায় না এমনটাও হয় না। এই বিষয়ে আমার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। পুরস্কার লেখকদের এক ধরনের স্বীকৃতি সবারই ভালোলাগার কথা। তবে পুরস্কার কখনোই চূড়ান্ত ব্যাপার নয়। আমি কার জন্য লিখছি তারা কীভাবে সেটা গ্রহণ করল সেটাই বড় ব্যাপার।

আলতাফ শাহনেওয়াজ : নতুন কেউ যখন লেখে তখন পরিবার এটাকে বাতিল জিনিস বলে গণ্য করে। সে যখন পুরস্কার পায়, তখন তার পরিবার তার দিকে ঘুরে তাকায়। এই কাজটা হয়। আর যে টাকাটা পায় সেটা কাজে লাগে।

পারমিতা হিম : সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এখন অনেক মানুষ লেখে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো লেখে। অনেক ধরনের লেখক এখন তৈরি হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় মেয়েরা এখন লিখছে। পাঁচ বছর আগেও এসব বিষয়ে লেখার কথা কল্পনা করতে পারত না এখন তারা সেটা করে দেখাচ্ছে। যেহেতু তারা একটা পাবলিক প্লাটফর্মে লিখছে তার মধ্যে থেকে অনেকে বইও করছে। এখান থেকে সাহিত্যে কিছু পরিবর্তন আসছে বলে আমার মনে হয়। শাহাদুজ্জামনের কথা বলতেই হবে। কিন্তু সমসাময়িক যারা লেখেন তাদের লেখা আমার পড়া হয় না।

রাফি হোসেন : একজন লেখক হয়ে যদি সমসাময়িক লেখকদের লেখা না পড়েন, তাহলে সাধারণ পাঠকরা কেন আপনাদের লেখা পড়বে?

পারমিতা হিম : পাঠক পড়বে এজন্য লিখি না। আমার লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। সমসাময়িকদের লেখা পড়ি কিন্তু প্লাটফর্মটা আলাদা।

রাফি হোসেন : ফেসবুকে লিখলেই কি সেটা সাহিত্য হবে? ফেসবুক একটা মুক্ত জায়গা, যেখানে সবাই লিখতে পারে। একজন সাহিত্যিক হিসেবে আপনার পড়াটা, আপনার দৃষ্টিটা অন্যরকম হওয়া উচিত না?

পারমিতা হিম : উচিত-অনুচিত না। যেমন সর্বশেষ আমি যে বইটা পড়লাম সানিয়া রুশদির হসপিটাল। এটা সীমিত সংস্করণের একটা বই। বাংলায় মনে হয় এই ধরনের বই লেখা হয়নি। শাগুপ্তা শারমিন তানিয়া, উম্মে ফারহানা, সানিয়া রুশদি, নওয়াজ ফারিন অন্তরা এদের লেখা আমার ভালো লাগে।

রাফি হোসেন : ধন্যবাদ সবাইকে, আমাদের আমন্ত্রণে অংশ নেয়ার জন্য।

 

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।