সৌন্দর্যের স্বর্গ দেবতাখুম

প্রকৃতির এক ভয়ংকর সৌন্দর্যের নাম দেবতাখুম। সেখানে নেই কোনো নেটওয়ার্ক, নেই বিন্দুমাত্র কোনো শব্দ, যেখানে নিজের আওয়াজ প্রতিধ্বনি করে নিজের কাছেই ফিরে আসে। মোটামুটি অল্প ট্রেকিংয়ে ভালো কিছুর অভিজ্ঞতা কে না চায়। ট্রেকিং, ভেলায় কায়াকিং, অ্যাডভেঞ্চার সবকিছু মিলেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা হতে পারে অন্যতম পছন্দের জায়গা। দেবতাখুমের নামকরণের পেছনেও একটা গল্প আছে। একবার এক বৃদ্ধা নাকি বিশাল আকৃতির মাছ দেখেছিলেন এই খুমে, বৃদ্ধা এই বিশাল আকৃতির মাছকে দেবতা নাম দেন। সেখান থেকেই এই খুমের নাম হয় দেবতাখুম। স্থানীয়দের মতে, এই খুমের গভীরতা প্রায় ৬০ মিটারের বেশি। এক ঘণ্টার বালি-পাথর আর ঝিরিপথ ট্রেকিং শেষে যখন বাঁশের ভেলা নিয়ে সামনে এগোতে থাকবেন, দু’পাশের উঁচু দুই পাহাড়ের ভেতরের সরু আঁকাবাঁকা গর্ত বা গুহাপথ, যেখানে সরাসরি সূর্যের আলো পৌঁছায় না, শুধু ওপর থেকে পানি পড়ার মৃদু শব্দ, বরফশীতল পানি। এমন পরিবেশ আমরা সাধারণত মুভিতেই দেখে থাকি, দেবতাখুমে সেটা বাস্তবে উপলব্ধি করতে পারবে যে কেউ। দেবতাখুম বর্ষাকালে আর শীতকালে দুই রকম থাকে। শীতকালে পানি স্বচ্ছ সবুজ রঙের হয়, যা এর সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে। প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারবেন।

আমরা সবাই চাকরিজীবী। বেশিদিন ছুটি না থাকায় অনেকদিন থেকেই আমরা বন্ধুরা মিলে একদিনের ট্যুরের চিন্তা করেছিলাম, দেবতাখুমে দিনে গিয়ে দিনেই (মানে ১ দিন ২ রাতে) ঘুরে আসা যায়। তাই আমরা আটজন মিলে ঠিক করলাম ২৫ ডিসেম্বরের বড়দিনের ছুটিতেই যাব দেবতাখুম ঘুরতে। যেই কথা সেই কাজ, প্ল্যান রেডি করে ফেললাম। আগে থেকে টিকিট না করার কারণে আমরা সরাসরি ঢাকা-বান্দরবানের টিকিট পাইনি। তাই আমাদের চট্টগ্রাম হয়ে বান্দরবান যেতে হয়। যদিও এর জন্য আমাদের এক ঘণ্টার মতো সময় বেশি প্রয়োজন হয়েছে বান্দরবান পৌঁছাতে। ২৪ তারিখ রাত ১১টা ৩০ মিনিটের সময় এনা পরিবহনের বাসে ঢাকা থেকে রওনা দিলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশে, ভোর ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে আমরা পৌঁছাই চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে। সেখান থেকে লোকাল বাসে করে যাই বহদ্দারহাট। বহদ্দারহাট থেকে চট্টগ্রাম-বান্দরবানের বাসে করে চলে যাই বান্দরবান শহরে। চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান যেতে সময় লাগে ২ ঘষবচার মতো। আমরা আনুমানিক ৭টায় পৌঁছলাম বান্দরবান শহরে। সকালে হাত-মুখ ধুয়ে শহরেই নাশতা করে নিলাম। নাশতার ফাঁকে বান্দরবান থেকে ঢাকায় ফেরার টিকিটও করে নিলাম ২৫ তারিখ রাত ৯টার বাসের। আমরা আটজন হওয়ায় ঢাকা থেকেই মাহেন্দ্র (গাড়ি) ও গাইড ঠিক করে যাই।

কেউ চাইলে বাসে করেও যেতে পারে রোয়াংছড়ি উপজেলা পর্যন্ত, সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে কচ্ছপতলী।

বান্দরবান থেকে কচ্ছপতলী আসা-যাওয়ার জন্য ভাড়া পড়ে ২০০০ টাকা। তবে এই মাহেন্দ্র (গাড়ি) আসলে ছয়জনের জন্য উপযোগী। গাইডের ফি সবার জন্যই ফিক্সড ১০০০ টাকা। ২৫ তারিখ সকাল ৯টার দিকে আমরা দেবতাখুমের জন্য যাত্রা করি, দেড় ঘণ্টা আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় রোয়াংছড়ি উপজেলা। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল আমাদের গাইড বান্দরবানের স্থানীয় পলাশ দা। পলাশ দার সঙ্গে দেখা করে আমরা হালকা কিছু নাশতা করে নেই আর এই ফাঁকে পলাশ দা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করে নেয় (আপনাকে সঙ্গে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্রের দুই কপি ফটোকপি রাখা লাগবে)। রোয়াংছড়ি বাজার থেকে আবার যাত্রা করি। মাঝে রোয়াংছড়ি থানা থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কচ্ছপতলী বাজারে যেতে সময় লাগে ৩৫ মিনিট। তারপর লিরা গাও আর্মি ক্যাম্পে সব কাগজপত্র (এনআইডি) জমা দিয়ে এন্ট্রি করতে হবে। আমরা যখন খাতায় এন্ট্রি করি, তখন সময় ১১টা ১০ মিনিট (*** আর্মি ক্যাম্পে বিকাল ৫টায় রিপোর্ট করা লাগবে)। আমাদের সবার সঙ্গে থাকা জামাকাপড়ের ব্যাগপ্যাক আমরা মাহেন্দ্রতেই রেখে যাই (ট্রেকিংয়ের সময় সঙ্গে বোঝা যত কম থাকবে. ট্রেকিং আপনার জন্য ততই সহজ হবে)।

এবার শুরু হাঁটার পথ এবং আমাদের গন্তব্য দেবতাখুম। ট্রেকিংয়ের সময় বেশিক্ষণ না, এক ঘণ্টার মতো পথ, যা এই শীতকালে মোটেও কষ্টদায়ক নয়। যাওয়ার পথে পরিষ্কার পানি আর গহিন জঙ্গল আপনাকে মুগ্ধ করবেই। প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছে যাবেন শীলবাধা পাড়া, এখানের লেবু চা ট্রাই করতে পারেন অন্যরকম একটা টেস্ট। চা আর কলা খেয়ে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয় আমাদের ট্রেকিং, এখান থেকে আর মাত্র ১০ মিনিট হাঁটলেই কাক্সিক্ষত সেই দেবতাখুম যাওয়ার নৌকার স্টপ। এখানে ছোট একটা খাবারের দোকান আছে। দেবতাখুমের দিকে যাওয়ার আগেই খাবারের দোকানে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা চলে যাই ভেলার রিসিট করতে। যেহেতু খুম প্রায় ৬০ মিটার গভীর, তাই আর কেউ রিস্ক না নিয়ে ভেলার সঙ্গে লাইফ জ্যাকেটও ভাড়া করি। ভেলা আর লাইফ জ্যাকেটের ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা করে পড়ে (গাইডের ভেলার চার্জও আপনাকে দিতে হবে)। টাকা-পয়সা নিজের কাছে পলিথিন ব্যাগে রেখে দিই। একটা ব্যাগে আমাদের সব জিনিসপত্র রেখে তা খাবারের দোকানে রেখে দিলাম। কারণ দেবতাখুম যাচ্ছেন আর ভিজবেন না তা হবে না।

সামান্য কিছু পথ নৌকায় পাড়ি দিয়ে ভেলা পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়। এরপর স্বচ্ছ সবুজ পানিতে ভেলা চালিয়ে কেউ বো আবার সাঁতরে উপভোগ করে দেশের সবচেয়ে বড় এই খুম। এক ভেলায় দু’জন করে আমরা মোট চারটি ভেলা নেই এবং নিজেরা ভেলা চালিয়ে খুম উপভোগ করতে থাকি। যেহেতু আমরা ভেলা চালাতে কেউই পারদর্শী না, তাই আমাদের একটু সমস্যা হয় শুরুর দিকে। তবে সেটা ৫ মিনিট পর একটা ভারসাম্যে চলে আসে। এ শীতের মাঝে পানিতে ভেজাটা খুব আনন্দের ছিল। যদিও আবহাওয়া অফিসের মতবাদ অনুযায়ী ২৫ তারিখ বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু আমরা পেয়েছিলাম একটা রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। আমি ও আমার ভেলার সাথী কিছু সময় খুমের মাঝে ভেলা না চালিয়ে বসে ছিলাম। এ মুহূর্তটা আমি লিখে প্রকাশ করতে পারছি না। প্রায় ২ ঘণ্টা খুমে ঘুরে এবার সেই ভেলার রিসিট কাউন্টারে ফেরার পালা। কারণ আমাদের আর্মি ক্যাম্পে ৫টার মধ্যে রিপোর্ট করা লাগবে। খুমের কাছাকাছি সেই খাবারের দোকান থেকেই আলুভর্তা, ভাত, ডাল আর পাহাড়ি মুরগি দিয়েই দুপুরের খাবার শেষ করি। জনপ্রতি প্লেট ২০০ টাকা করে। খাবার খেয়ে কিছু সময় পাথরের ওপর বসে পাহাড় এবং আশপাশের পরিবেশ অপলক দৃষ্টি দিয়ে উপভোগ করে নিলাম। আমাদের ব্যাগ ফেরত নিলাম। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকাল ঘড়িতে ৪টা বেজে গেছে। এবার ফেরার পালা। আমরাও ফেরা শুরু করলাম, সূর্যটাও ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে চলে যেতে শুরু করল। হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসি কচ্ছপতলী বাজারে। সেখানে আবার আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। আমাদের ভেজা কাপড় ছেড়ে ভালো কাপড় পরে নেই লোকাল মোটেলে। সন্ধ্যা ৬টায় কচ্ছপতলী থেকে সেই মাহেন্দ্রতে চড়ে বান্দরবানের উদ্দেশে যাত্রা করি। মাঝপথে আমাদের গাইড পলাশ দা-ও বিদায় নিয়ে চলে যান। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটের কাছাকাছি এসে পৌঁছাই বান্দরবান শহরে। শহরের হোটেলেই রাতের খাবার সেরে নেই। সেদিন রাত ৯টার বাসেই ঢাকার দিকে রওনা হই। ভোর ৪টা ২০ মিনিটে আরামবাগ পৌঁছে যাই।

এখানে আমাদের ৩০ ঘণ্টার ঝটিকা সফরের সমাপ্তি।

বি.দ্র. যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না। প্রকৃতি পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও আপনার-আমার-সবার। মনে রাখবেন ধনী-গরিব যে-ই হোক না কেন প্রকৃতির কাছে সবাই সমান এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন। তাহলে তাদের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পাবেন।

 

ছবি ও লেখক : ইশতিয়াক হোসেন নির্মল

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।