বইমেলা দেশে দেশে

বিশ্বের প্রথম বইমেলা শুরু হয় জার্মানিতে। কারো কারো মতে, জার্মানির লিপজিগ শহরে বিশ্বের প্রথম বইমেলা হয়েছিল। আবার কেউ বলেন, প্রথম বইমেলা শুরু হয়েছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরেই। সেই বইমেলা জার্মানি থেকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমগ্র বিশ্বে। খ্রিস্টীয় ১৭ শতকের পর থেকে ইউরোপের আরো বিভিন্ন দেশ জার্মানির বইমেলার আদলে আয়োজন করতে থাকে মেলার। ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে বইমেলা। দেশে দেশে নানান বেশ-বৈচিত্র্যে এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বইমেলা। তেমনই দেশ-বিদেশের বেশকিছু বইমেলার কথা তুলে ধরা হলো এখানে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো। শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতকে। জার্মানিতে বইয়ের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য মেলা হলো এটি। প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝিতে আয়োজন করা হয়ে থাকে এ মেলা। মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারক ইয়োহানেস গুটেনবার্গ থাকতেন ফ্রাঙ্কফুর্টের সামান্য দূরের মেঞ্জ শহরে। তার আবিষ্কৃত ছাপাখানার যন্ত্র বইয়ের জগতে নিয়ে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিনি নিজের ছাপাখানার যন্ত্রাংশ এবং ছাপানো বই বিক্রির জন্য ফ্রাঙ্কফুর্টে আসেন। গুটেনবার্গের দেখাদেখি ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের স্থানীয় কিছু বই বিক্রেতাও তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে বসতে থাকে। আর এগুলো কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষও আসতে শুরু করে। সেই আসা-যাওয়া থেকেই জমে উঠতে থাকে ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা। বইয়ের আন্তর্জাতিক বাজার তৈরিতে এ মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। গেস্ট অব অনার হিসেবে প্রতি বছর কোনো একটি দেশকে বেছে নেয়া হয়। সে দেশের সাহিত্যের ওপর আলোকপাত করা হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়। অতিথি দেশের জন্য বিশেষ প্রদর্শনী হলের ব্যবস্থাও করা হয়। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালে এ মেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় জার্মান প্রকাশক সমিতি। আর ১৯৬৪ সাল থেকে এ মেলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। এ মেলার সময়কাল পাঁচদিন। মেলার আয়োজক জার্মান পাবলিশার অ্যান্ড বুক সেলার অ্যাসোসিয়েশন। প্রতি বছরই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার প্রকাশক, বিক্রেতা, লেখক, পাঠক, দর্শক ও সাংবাদিকের অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা।

লন্ডন বইমেলা

প্রকাশনার দিক থেকে লন্ডন বইমেলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলার অন্যতম। তবে আয়তনে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মতো বড় না হলেও এ মেলার গুরুত্ব অনেক। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। সাধারণত বছরের মার্চ মাসে এ মেলার আয়োজন করা হয়। মেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। সব মিলিয়ে মেলার মেয়াদ ১২ দিন। তবে মেলা আয়োজনের প্রথমদিকে এর মেয়াদ ছিল সাতদিন। জনপ্রিয়তার কারণে পরবর্তী সময়ে মেলার মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে কখনো কখনো অক্টোবরেও মেলার তারিখ পরিবর্তন হয়, সেই সঙ্গে পাল্টে যায় মেলার স্থানও। যেমন ২০০৬ সালে মেলাটি হয়েছিল লন্ডনের অলিম্পিয়া এক্সিবিশন সেন্টারে আবার পরের বছর হয় ডকল্যান্ডের আর্ল কোট এক্সিবিশন সেন্টারে। গত বছর এ মেলায় বিশ্বের প্রায় একশরও বেশি দেশ থেকে ২৩ হাজার প্রকাশক, বই বিক্রেতা, সাহিত্য প্রতিনিধি, লাইব্রেরিয়ান, সংবাদমাধ্যম কর্মী অংশ নিয়েছিলেন। প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচারের জন্য, অন্য প্রকাশক থেকে বইয়ের স্বত্ব অথবা বইয়ের অনুবাদ স্বত্ব কেনা-বেচার জন্য প্রকাশকরা এ মেলায় অংশ নেন। ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলার সঙ্গে এ মেলার বড় পার্থক্য হলো এটি প্রকৃত অর্থে প্রকাশকদের মেলা। এখানে সাধারণ পাঠকের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এখানে ভিড় করেন বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা।

কলকাতা বইমেলা

ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং লন্ডন বইমেলার পরের স্থানটি কলকাতা বইমেলার। সে হিসেবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। মেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। মেলা অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারির শেষ বুধবার থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম রোববার পর্যন্ত। সব মিলিয়ে মেলার মেয়াদ ১২ দিন। তবে মেলা আয়োজনের প্রথম দিকে এর মেয়াদ ছিল সাতদিন। জনপ্রিয়তার কারণে পরে মেলার মেয়াদ বাড়ানো হয়। বইমেলা ছাড়া কলকাতাকে কল্পনা করতে পারে না কলকাতাবাসী। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মেলায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষের সমাগম হয়। সবদিক বিবেচনায় ২০০৫ সালে মেলার মেয়াদ সাতদিন থেকে বাড়িয়ে ১২ দিন করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট ও লন্ডন এ দুটি বইমেলার সঙ্গে কলকাতার বইমেলার পার্থক্য হলো- এখানে পাঠকদের গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। বই ব্যবসা এ মেলার মূল উদ্দেশ্য নয়। সেদিক থেকে কলকাতা বইমেলাকে বলা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অব্যবসায়িক বইমেলা। কলকাতা বইমেলার অফিশিয়াল নাম কলকাতা বইমেলা বা কলকাতা পুস্তকমেলা। এছাড়াও ভারতের জয়পুরে সাধারণত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হয় জয়পুর সাহিত্য উৎসব। ভারতের আর একটি বড় বইমেলা হলো নয়াদিল্লি বইমেলা। এ মেলা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালে। নয়াদিল্লির বইমেলার আয়োজক এনবিটি (ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট)। মেলা শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে। এ মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক।

বোলোগনা শিশুদের বইমেলা

ইতালির বোলোগনাতে প্রতি বছর মার্চ কিংবা এপ্রিলে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বোলোগনা শিশু সাহিত্যের বইমেলা। ১৯৬৩ সাল থেকে চলে আসছে এ মেলা। শিশুদের বইয়ের লেখক প্রকাশকসহ আরো অনেক পেশাদার লোকজনের আগমন ঘটে এ মেলায়। অনুবাদের জন্য এবং বই থেকে অন্য মাধ্যমের শিল্প তৈরির জন্য এখানে বইয়ের স্বত্ব কেনাবেচা হয়। শিশুদের বই থেকে যারা শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তারা মূলত এখান থেকেই বইয়ের স্বত্ব কিনে থাকেন।

তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা

মে মাসের মাঝামাঝি ইতালির তুরিনে অনুষ্ঠিত হয় তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা। এটাই ইতালির সবচেয়ে বড় বইয়ের বাণিজ্য মেলা। এ বইমেলা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। সে বছরের ১৮ মে উদ্বোধন করা হয় মেলা। উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী রুশ কবি যোসেফ ব্রডস্কি। ব্যবসায়ী গিদো আকোনেরো এবং বই বিক্রেতা আনজেলো পেজানা বইমেলার নাম দেন মেলোন দেল লিব্রো। পরবর্তী সময়ে নাম রাখা হয় তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ যাবত বেশ কয়েকবার নাম বদল করা হয়েছে এ মেলার। ২০১৫ সালে এখানে ১ হাজার ৪০০ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সে বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজারের ওপরে।

ব্রুকলিন বইমেলা

২০০৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে আয়োজিত হচ্ছে ব্রুকলিন বইমেলা। অন্যান্য বইমেলার মতো এখানেও বড়দের পাঠের দিকেই প্রধানত নজর দেয়া হয়। তবে বাড়তি আয়োজনও থাকে শিশুদের জন্য। শিশুদের বইয়ের আয়োজনসহ থাকে তাদের জন্য নানা কর্মপ্রক্রিয়া। ব্রুকলিন বইমেলায় চলে বড়দের পাঠচক্র, সাহিত্য আলোচনা, বই বিকিকিনি এবং লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকদের চুক্তি স্বাক্ষর।

কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা

এটি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বইমেলা। এর আয়োজক জেনারেল মিসরীয় বুক অর্গানাইজেশন। এ বইমেলাটি শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালে। কায়রোর ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার গ্রাউন্ডসে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য শিশু সাহিত্যে আগ্রহী লেখক ও প্রকাশকদের ফোরাম তৈরি। প্রতি বছর এ মেলায় প্রায় ৩ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী আসেন।

হংকং বইমেলা

ওয়েলসের ব্রেকনকশায়ার ডিস্ট্রিক্টের ছোট বাজার শহর হে-অন-ওয়ে; সেটারই ছোট নাম হলো ‘হে’। হে-কে বলা হয়ে থাকে বইয়ের শহর। আসলে এটা ওয়েলসের জাতীয় বইয়ের শহর। শহরটি ওয়ে নদীর দক্ষিণ-পূর্ব তীরে অবস্থিত। হংকং বইমেলা শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে। প্রতি বছর মধ্য জুলাইয়ে এ মেলা শুরু হয়। হংকং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত মেলার উদ্দেশ্য হংকংয়ের জনগণের জন্য কম দামে দেশি বা বিদেশি বই পৌঁছে দেয়া। এ মেলা মূলত আন্তর্জাতিক বই ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। ১০ দিনব্যাপী চলা এ আসরে প্রায় আশি হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। হংকং বইমেলার প্রথম আসর বসে ১৯৯০ সালে। হংকংয়ে বছরের একটি প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এ বইমেলা। প্রতি বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

টোকিও আন্তর্জাতিক বইমেলা

২৫টি দেশের প্রায় ১৬ হাজার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে ১৯৯৩ সাল থেকে জাপানে চলছে টোকিও আন্তর্জাতিক বইমেলা। টোকিওর বিগ সাইট কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ বইমেলা। বইয়ের বাণিজ্যিক কাটতি এবং প্রচার বাড়ানোই মূলত এ মেলার উদ্দেশ্য।

তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা

তেহরানে বিগত ২৪ বছর ধরে আন্তর্জাতিক এ বইমেলার আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতি বছর মে মাসের ৪ তারিখ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। লেখক-পাঠক আর গ্রন্থানুরাগীদের ভিড়ে বইমেলা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কয়েক মিলিয়ন ইরানি পাঠক বার্ষিক এ বইমেলায় এসে বই কেনাকাটা করেন। এ মেলা ইসলামের ইতিহাস, ইরান ও বিশ্বের ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস এবং পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ সংক্রান্ত বইয়ের জন্য বিখ্যাত।

আবুধাবি আন্তর্জাতিক বইমেলা

২০০৭ সালে আবুধাবির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কর্তৃপক্ষ এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ‘কিতাব’ নামের একটি সংগঠন দাঁড় করায়। এ কিতাবই এখন আয়োজন করছে আবুধাবি বইমেলা। মার্চের ১৫ থেকে ২০ তারিখে এ মেলা শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বইমেলা এটি।

সাংহাই সাহিত্য উৎসব

চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত হয় সাংহাই সাহিত্য উৎসব। স্বল্প পরিসরে হলেও আন্তর্জাতিক আবহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ উৎসব। বুকারজয়ী লেখক এলিনর ক্যাটন থেকে শুরু করে বেস্ট সেলিং এমি ট্যান পর্যন্ত ঘুরে গেছেন এ উৎসব।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বইমেলা

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আগস্টে চলে দেশটির জাতীয় বইমেলা। এটি আয়োজন করে লাইব্রেরি অব কংগ্রেস। এ বইমেলায় সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে প্রেসিডেন্টকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় এ বইমেলার বিশেষ সম্মানিত অতিথির চেয়ারে বসেছিলেন। এ মেলায় আলোচনাসভাসহ চিত্রপ্রদর্শনীর ব্যবস্থাও থাকে।

এসব বইমেলা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী আরো কিছু বইমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে স্কটল্যান্ডের উইগটন বইমেলা, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের পিইএন ওয়ার্ল্ড ভয়েসেস ফেস্টিভ্যাল, যুক্তরাজ্যের ওয়ার্ডস বাই দ্য ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল, সিডনি রাইটার্স ফেস্টিভ্যাল উল্লেখযোগ্য।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।