টুকরো কাপড় দিয়ে কাজ করতে খুব আনন্দ হতো

উর্মিলা শুকলা, যিনি টুকরো কাপড় নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। পেশাগত জীবনে তিনি একাধারে একজন সফল ফ্যাশন ডিজাইনার, একজন আর্টিস্ট ও একজন উদ্যোক্তা (ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক সন্তানের জননী এবং সংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দের স্ত্রী)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি স্বনামধন্য স্কলাস্টিকা স্কুলের অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন বেশকিছু সময়। তারপর দীর্ঘ ১১ বছর কাজ করছেন একটি ফ্যাশন হাউজে। এখন তিনি নিজে একজন সফল ফ্যাশন ডিজাইনার এবং উদ্যোক্তা। তার উদ্যোগের নাম ‘খুঁত’। তার এই পথচলা নিয়েই কিছু গল্প হয়েছিল আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : চারুকলায় পড়াশোনা করার পর ফ্যাশন ডিজাইনার কীভাবে হলেন?

উর্মিলা শুকলা : আমি যখন চারুকলায় পড়ি, তখনো আমার প্ল্যান ছিল না যে আমি একজন ফ্যাশন ডিজাইনার হব। আমি সবসময় ভাবতাম, আমি বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করব। বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখাব বা তাদের নিয়ে যেকোনো ধরনের কাজ করার ইচ্ছা ছিল আমার। তাই প্রথম কর্মজীবন শুরু করি আমি বাচ্চাদের সঙ্গেই। স্কলাস্টিকা স্কুলে বাচ্চাদের ছবি আঁকার শিক্ষকতা করেছি তখন। 

আমার আগ্রহের একটা বিষয় ছিল বিভিন্ন ধরনের কাপড় দিয়ে কিছু না কিছু বানানো। বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার পথে আমার টুকরো কাপড় দেখে পছন্দ হলেই কিনে ফেলতাম। পরে বাসায় বসে বসে এসব টুকরো কাপড় দিয়ে বিভিন্ন কিছু বানাতাম। কাউকে কিছু গিফট দিতে হলেও নিজ হাতে বানানো কিছু গিফট করতাম। সেগুলো আমি এসব টুকরো কাপড় দিয়েই বানাতাম। বাড়িতে বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রীও আমি তখন হাতে বানাতাম। যেমন কুশন কভার, টেবিল ম্যাট এসব জিনিস। আবার আমি চারুকলায় পড়াকালে একধরনের সাইড ব্যাগ ব্যবহার করতাম। সেটা আমি নিজ হাতে তৈরি করতাম বিভিন্ন ডিজাইনে। টুকরো কাপড় দিয়ে এসব কাজ করতে খুব আনন্দ হতো আমার।

তারপর একসময় রাহুল আমার এই আগ্রহটা খেয়াল করল। ওই সময়টাতে ‘যাত্রা’তে একজন ফ্যাশন ডিজাইনার নেয়ার কথা চলছিল। তখন যাত্রা থেকে রাহুলকে ডাকা হলো ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার জন্য। তখন রাহুল আমাকে বলল, এই কাজটা আমি ভালো করতে পারব। যেহেতু সে দেখেছে আমার এই দিকে বেশ আগ্রহ। আবার ওই সময় রাহুল তার নিজের কাজেও ব্যস্ত ছিল। তাই তার মনে হয়েছে ‘যাত্রা’তে কাজ করতে গেলে সে নিজের কাজে ঠিকমতো সময় দিতে পারবে না। তখন রাহুল অনুশেহ আনাদিল আপুকে আমার কথ বলল, তারপর যাত্রা থেকে আমাকে ডাকা হলো। তখন আমি অলরেডি স্কলাস্টিকাতে কাজ করছি। আমি আমার ঘরে নিজ হাতে বানানো যা যা ছিল, তা নিয়ে অনুশেহ্ আপুর কাছে গেলাম। আনুশেহ্ আপু আমার কাজ দেখে পছন্দ করলেন এবং তখন থেকেই ডিজাইনার হিসেবে আমার কাজ শুরু।

আনন্দধারা : আপনার তো বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল? ডিজাইনার হওয়ার পর ইচ্ছাটা কি পরিবর্তন হয়েছে?

উর্মিলা শুকলা : প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখানোর বা যেকোনো বিষয়েই বাচ্চাদের জন্য কাজ করার। স্কলাস্টিকা ছেড়ে যাত্রায় যাওয়ার পর আনুশেহ্ আপু আমাকে বললেন, যাত্রাতে নতুন করে বাচ্চাদের জন্য কিছু করার প্ল্যান হচ্ছে এবং উনি চান আমি যেন বাচ্চাদের জন্য কিছু ভাবি। আমার পছন্দমতো কাজ আমি পেয়ে গেলাম আবারো। যেহেতু বাচ্চাদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা ছিল, তাই শুধু জামা-কাপড়ের ডিজাইনিং ছাড়াও আরো অনেক কিছু ভাবতে পেরেছি তখন। বাচ্চাদের খেলনা, গিফট আইটেম ইত্যাদির কাজ দিয়ে শুরু করলাম। তারপর আস্তে আস্তে জামা-কাপড় ডিজাইন করতে করতে দীর্ঘ ১১ বছর আমি যাত্রায় কাজ করলাম এবং প্রায় পাঁচ বছর আমি যাত্রার চিফ ডিজাইনার ছিলাম।

আনন্দধারা : প্রথম আপনি পুরোদস্তুর একজন ডিজাইনার। তাহলে আপনার পড়াশোনা চারুকলার ওপর কি কিছু করবেন ভেবেছেন?

উর্মিলা শুকলা : আমি চারুকলায় পড়াকালে ছোট ছোট কিছু বানাতাম। টুকরো কাপড় জোড়াতালি দিয়ে বা বিভিন্ন ধরনের সেলাই করে। সুই-সুতা নিয়ে কাজ করতে অনেক আগে থেকেই ভালো লাগত। তাই আমার সব কাজেই খেয়াল করবেন সুই-সুতার কোনো না কোনো ব্যবহার আছে। একটু সুই-সুতা চলেই আসে। আমি আমার আর্টের মাধ্যম হিসেবে রংতুলির চেয়ে বেশি পাতা আর সঁই-সুতাকে বেছে নিয়েছি। অনেক আগে থেকেই সবসময় পাতা কুড়ানোর শখ  আমার। পাতা কুড়িয়ে বইয়ের ভেতর রেখে দিই। সেই পাতাতে বিভিন্ন ধরনের সুতার কাজ করি। এভাবে করতে করতে আমি পাতা নিয়ে দু’বার দুটি প্রদর্শনীও করি।

ঝরে যাওয়া পাতাকে লেইস ফিতার কাচের বাক্সে বন্দি করে আমি একটা কাজ করেছি অনেক আগে। যেসব পাতা আর থাকবে না এমন প্রচুর পাতা সংগ্রহ করে আমার এ কাজটি করেছিলাম। আর ২০১৬ সালে আমি বিভিন্ন ধরনের পাতায় সুই-সুতার কাজ করে সেগুলো ফ্রেমবন্দি করে তার একটা প্রদর্শনী করেছিলাম। ভবিষ্যতেও আমি পাতা, সুই-সুতা, রং নিয়ে আরো কাজ করব।

আনন্দধারা : ‘খুত’-এর শুরুটা কীভাবে হলো?

উর্মিলা শুকলা : ‘খুঁত’ আমার এবং আমার সহকর্মী আন্ডির একটা উদ্যোগ। আন্ডি এবং আমি দু’জনই যাত্রায় কাজ করেছি আগে। তারপর যখন যাত্রা থেকে চলে আসি, তখন দু’জন একসঙ্গে কাজ করার কথা ভাবি। দু’জনেরই ইচ্ছা ছিল আমাদের নিজেদের কিছু হবে। একসঙ্গে করব দেখেই ‘খুঁত’ শুরু করতে পেরেছি। একা হলে হয়তো সেই সাহসটা হয়ে উঠত না। তখন থেকেই এখন পর্যন্ত তিন বছর ধরে আমাদের উদ্যোগ ‘খুঁত’ চলছে এবং সামনে আরো অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে আমাদের। আর শুরুটা একসঙ্গে এজন্য হয়েছিল যে আমার এবং আন্ডির কিছু আগ্রহের জায়গা ছিল অভিন্ন। আমাদের দু’জনের একটা জায়গায় খুব মিল ছিল যে, যেসব প্রিন্টের তাঁতের শাড়ি মানুষ আগে পরত কিন্তু এখন খুব একটা পরে না, ওই শাড়িগুলো নিয়ে নতুন করে কিছু একটা করব। তারপর এভাবেই শুরু করে দিই পুরনো ডিজাইনের প্রিন্টের শাড়িগুলোকে টুকরো করে প্যাঁচওয়ার্ক করা। প্যাঁচওয়ার্কের প্রত্যেকটা কাজই একটা থেকে আরেকটা আলাদা। কারণ আমরা এলোমেলো করে রঙের মধ্যে একট মিল রেখে কাজগুলো করি। তাই আমাদের প্রত্যেকটা কাপড়ই হয় অনন্য।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অনেক ধরনের কাজ করেছি। একটু একটু করে করতে গিয়ে দেখলাম আমাদের অন্যান্য দিকেও আগ্রহ আছে যেমন- শাড়ি, গহনা, গৃহস্থালি জিনিসপত্র, বিভিন্ন ফ্যাশনেবল ড্রেসের প্রতিও আমাদের আগ্রহ আছে। তখন এসব কাজও করতে থাকলাম। এভাবে আস্তে আস্তে এখন আমরা খুঁতের একটা শোরুম করেছি ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে। আরো অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন আছে।

আনন্দধারা : নামটা ‘খুঁত’ কেন?

উর্মিলা শুকলা : ‘খুঁত’ কারণ হাতের তৈরি কোনো কাজই নিখুঁত হয় না। কোনো না কোনো খুঁত থাকে। কাপড়ের টুকরোগুলোও একদম একরকম থাকে না সব। প্রতিটা হ্যান্ডমেইড জিনিসই এ রকম খুঁতযুক্ত হয়। আমাদের ইচ্ছা আমরা সবকিছু হ্যান্ডমেইডই করব। ওই জায়গাটা থেকেই আমাদের উদ্যোগের নাম করেছি ‘খুঁত’।

আনন্দধারা : ‘খুঁত’কে নিয়ে দেশের বাইরে কাজ করার ইচ্ছা আছে কী?

উর্মিলা শুকলা : ‘খুঁত’-এর বয়স এখনো অনেক কম। মাত্র তিন বছর হয়েছে আমার ‘খুঁতের’ বয়স। ‘খুঁত’কে আরো অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে আমাদের। আমাদের দেশি ক্রাফটসম্যানদের কাজগুলোকে নিয়ে ‘খুঁত’ দেশ এবং দেশের বাইরে ছড়িয়ে যাবে সামনে- এই আশায় বুক বাঁধি।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।