‘অনেক গল্প বলতে চাই’

সাদাত হোসাইন সময়ের জনপ্রিয় তরুণ লেখক, উপস্থাপক ও নির্মাতা। তার লেখা উপন্যাস ‘আরশিনগর’, ‘অন্দরমহল’, ‘একদিন আমি নিখোঁজ হবো’, ‘নিঃসঙ্গ নক্ষত্র’ ও ‘নির্বাসন’ পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। আসছে ২০২০ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হবে ‘মেঘেদের দিন’, ‘ছদ্মবেশ’ , ‘অর্ধবৃত’  , ‘মরণোত্তম’ ও ‘ তোমাকে দেখার অসুখ’ নামের  মোট পাঁচটি বই । এছাড়া তার পরিচালনায় ‘গহীনের গান’ নামের একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে সম্প্রতি। লেখালেখি ও পরিচালনা নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে-

আনন্দধারা : লেখালেখির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?

সাদাত হোসাইন : আমি ছবি তুলতে পছন্দ করি। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হতো। সে পত্রিকার ফিচার সম্পাদক আমাকে বললেন, ছবির সঙ্গে ছবির গল্প লিখে দিতে। তখন তিনি আমাকে উৎসাহ দিলেন ছবি ও ছবির গল্প নিয়ে বই প্রকাশ করতে। ২০১৩ সালে ছবি ও তার সঙ্গের গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই গল্পছবি। সেই বইটি আমাকে লেখার জন্য উৎসাহী করে। এরপর ছোটগল্প লেখা শুরু করি। ২০১৪ সালে ‘জানালার ওপাশে’ প্রকাশিত হয়। বইগুলো পাঠক ভালোভাবে গ্রহণ করে।

আনন্দধারা : যতটা জানি আপনি ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত আছেন।

সাদাত হোসাইন : মূলত ফটোগ্রাফি দিয়ে শুরু। আসলে আমি সবসময়ই গল্প বলতে চাই। গল্প পাঠও করতে চাই। সেই পাঠ কেবল বইপত্র থেকে নয়। চারপাশের মানুষের জীবনের গল্পও আমি রোজ পড়তে চাই। ফলে নিজের ভেতর নানা গল্প জমে গল্প বলার এক তীব্র উদ্দীপনা বোধ করতাম। তখন ভাবনাজুড়ে আসে ফটোগ্রাফি। ছবির মাধ্যমে গল্প বলা। সৃজনশীল তিনটি মাধ্যমেই আমি গল্প বলতে চাই।

আনন্দধারা : অন্য কোনো পেশায় যুক্ত আছেন কি?

সাদাত হোসাইন : অ্যাশ প্রোডাকশন নামে আমার একটি হাউজ আছে। আমরা বিজ্ঞাপন, তথ্যচিত্র, চলচ্চিত্র, নাটকসহ সবধরনের প্রফেশনাল ভিডিও কনটেন্ট নির্মাণ করি।

আনন্দধারা : কার অনুপ্রেরণায় এ পেশায় এলেন?

সাদাত হোসাইন : আলাদা করে আমার কোনো অনুপ্রেরণা নেই। যদি কিছু থাকে তবে সেটি আমার সেই গল্প বলার উদ্দীপনা। তবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার জীবনের হতাশা। আমি কোনো কাজ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে একধরনের প্রবল হতাশায় ভুগি। সেই হতাশা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। গভীর রাতে আমি বিছানা থেকে উঠে যাই। তারপর ভাবি, আমি কেন ব্যর্থ হলাম। আমাকে আরো কী করতে হবে! আরো কীভাবে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ফলে আমার রাগ চেপে যায়, আমাকে কাজটি করতেই হবে। তখন আমি নতুন করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

আনন্দধারা : একজন উপস্থাপক হিসেবেও আপনাকে দেখা যায়?

সাদাত হোসাইন : ‘ইয়াং নাইট’ মূলত করা মুন্নী আপুর কারণে। তিনি একদিন জানতে চাইলেন আমি উপস্থাপনা করতে চাই কিনা? আমি দ্বিধান্বিত ছিলাম। ভয় হচ্ছিল যে পারব কিনা! তিনি বললেন, ‘তুমি পারবে। আমি জানি।’ তার এই কথাটুকু খুব আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই শুরু। আসলে এই প্রযুক্তির যুগে ইচ্ছা থাকলেই প্রশিক্ষিত হওয়া যায়।

আনন্দধারা : যারা আপনার মতো হতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

সাদাত হোসাইন : ‘হাল ছেড় না বন্ধু, বরং কণ্ঠ ছাড় জোরে।’ কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়া যাবে না। জগতে খারাপ এবং ভালো কোনোটিই নিরবচ্ছিন্ন নয়। সুতরাং হাল ছাড়া মানে খারাপ পরিস্থিতির শেষে যে ভালো অপেক্ষায় ছিল, সেই ভালোকে উপেক্ষা করা। আর স্বপ্ন থাকতে হবে। স্বপ্ন সফল করতে চেষ্টা থাকতে হবে। সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও সততা থাকতে হবে। একটুতেই হতাশ হলে চলবে না। আর কোনো অজুহাত দেয়া যাবে না। বরং ভাবতে হবে যা-ই ঘটুক আমাকে পারতেই হবে, আমি পারবই।

আনন্দধারা : আগামী দিনের পরিকল্পনা কী?

সাদাত হোসাইন : সাধারণত সবার মধ্যে বইমেলা কেন্দ্রিক লেখার প্রবণতা থাকে। আমি এখন থেকে বছরজুড়েই লিখব। পাঠকের কাছে আমার দায়বদ্ধতা আছে, সেজন্য লিখব।

আনন্দধারা : সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনা কেমন?

সাদাত হোসাইন : আমি বয়সে তরুণ। তরুণদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি। অসংখ্য সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাদের উৎসাহ দেয়া জরুরি, পরিচর্যা করা জরুরি। কিন্তু কেন যেন আমাদের দেশে একটা নেতিবাচক সংস্কৃতি চালু হয়েছে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। এখানে কেউ কাউকে উৎসাহ দিতে চায় না। অনুপ্রেরণা দিতে চায় না। বরং কেউ ভালো কিছু করলে তা নিয়ে অন্যরা উচ্ছ্বসিত হওয়ার বদলে সংশয় প্রকাশ করতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই জায়গাটিতে ভাবনার বদল খুব চাই। যারা সাহিত্যচর্চা করবেন, তাদের কাছ থেকে বিশাল হৃদয় চাই, উদার মানসিকতা চাই।

আনন্দধারা : আপনি কোন লেখকের লেখা পছন্দ করেন?

সাদাত হোসাইন : আমি সবার বই পড়ি। তবে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা আমার বেশি পছন্দ। এছাড়াও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদের লেখাও আমার পছন্দের।

আনন্দধারা : আপনার সাফল্যে পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন?

সাদাত হোসাইন : আমার বাবা সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিকের চাকরি করতেন, তার ইচ্ছা ছিল আমি আর্মি অফিসার হব। কিন্তু সেটি তো হলো না। আমি লেখালেখি করি, সেটা তারা জানেন, তবে গুরুত্ব দেন না। তারা চান চাকরি করে নিশ্চিত জীবনযাপন করি। কিন্তু অন্দরমহল লিখতে গিয়ে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।

আনন্দধারা : সফলতা বলতে আপনি কী বোঝেন?

সাদাত হোসাইন : আমার কাছে সফলতা মানে সন্তুষ্টি, তৃপ্তি, শান্তি। আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ হতে পারেন, কিন্তু তাতে আপনার সন্তুষ্টি, তৃপ্তি, শান্তি না-ও থাকতে পারে। ফলে অর্থ-বিত্ত নয়, আমার কাছে সন্তুষ্টি, তৃপ্তি, শান্তিটাই সফলতা।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।