‘কার্টুনিস্ট পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি’

আহসান হাবীব। কার্টুনিস্ট ও রম্য লেখক। শিশু-কিশোর তো বটেই, প্রায় সব বয়সী মানুষের কাছেই তিনি বেশ প্রিয়। সম্প্রতি আনন্দধারার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন তিনি। কিন্তু আলাপচারিতা শুধু লেখালেখি বা বাংলাদেশের কার্টুন নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। চলে এসেছে তার ব্যক্তিজীবন, সাহিত্য, সাহিত্যিক দুই বড় ভাই ও পরিবারের কথাও।

আনন্দধারা : লেখালেখিতে এলেন কীভাবে?

আহসান হাবীব : আমাদের পরিবার তো লেখক পরিবার। আব্বা লিখতেন, আম্মা লিখতেন, বড় দুই ভাই লিখতেন। স্বাভাবিকভাবেই আমিও লিখি। ওদের দেখে আমিও লিখতাম আর কী। লেখালেখির ব্যাপারটা আসছে এভাবেই। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণেই হয়তো লেখক হতে পেরেছি। আমি মূলত রম্যই লিখি। মাঝেমাঝে একটু শিশুদের জন্য লিখি, সায়েন্স ফিকশন লেখার চেষ্টা করি।

আনন্দধারা : আপনাকে সবাই কার্টুনিস্ট হিসেবেই চেনে, আপনি নিজেকে কার্টুনিস্ট নাকি লেখক পরিচয় দিতে পছন্দ করেন?

আহসান হাবীব : আমি নিজেকে কার্টুনিস্ট পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। লেখালেখি ব্যাপারটা বাইপ্রোডাক্ট। যদিও অনেক বই বের হয়ে গেছে।

আনন্দধারা : কার্টুনে এলেন কীভাবে?

আহসান হাবীব : আসলে আমার বড় ভাই (হুমায়ূন আহমেদ) ভালো ছবি আঁকতেন। মেজো ভাই (ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল) তো আঁকিয়েই ছিলেন। জনকণ্ঠে কার্টুন আঁকতেন মেজো ভাই। ওদের দেখে দেখেই আমি কার্টুন আঁকা শিখেছি। অফিশিয়ালি এখন আমিই আঁকি।

আনন্দধারা : অর্থাৎ আপনাদের শিল্পসাহিত্যের ব্যাপারটা জেনেটিক?

আহসান হাবীব : আমার তাই মনে হয়। আমার মা ও বাবা দু’জনেই লিখতেন। দু’জনেই ক্রিয়েটিভ ছিলেন। দু’জনের জিনে হয়তো মিলেছে। যে কারণে এটা আমাদের মধ্যে এসেছে। আমার মা ওই সময়ে বই পড়তেন নিয়মিত। চিঠি লিখে কীভাবে কীভাবে যেন ইন্ডিয়া থেকে বই কিনে আনাতেন। বই পড়তেন আম্মা তার বান্ধবীদের নিয়ে। আমার দাদা-চাচারাও অনেক ক্রিয়েটিভ ছিলেন।

আনন্দধারা : আপনার বড় দুই ভাই বাংলাদেশের সেলিব্রিটি লেখক। এটা আপনার জন্য কতটা সহায়ক হয়েছে?

আহসান হাবীব : আমি ব্যাপারটা উপভোগ করি। আমি সবসময় বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছি। আসলে আমার মূল কাজ হচ্ছে কার্টুন। আমি ওই জায়গাটায় থাকি। আর সাহিত্যে আমার ফিল্ড হলো রম্য। রম্য রচনা লিখি। ওই জায়গায় আমি সফল। অনেক প্রকাশনা, পত্রিকার ঈদ সংখ্যা আমার কাছ থেকে রম্য চেয়ে নিয়ে ছাপছে। তার মানে আমি আমার জায়গায় সফল। আমার বড় ভাই প্রধানত উপন্যাস লিখত। মেজো ভাই সায়েন্স ফিকশন লেখে। আর আমি লিখি রম্য। তিনজনের ধারা কিন্তু আলাদা। আমি বলব, আমার ভাইদের একটা গুণ আছে। ভারতে যে পূজা সংখ্যাগুলো বের হয়, দেখবেন ওখানে সব ধরনের লেখা আছে। শীর্ষেন্দু গল্প লিখছে তো সমরেশ সায়েন্স ফিকশন লিখছে। বাংলাদেশে যখন ঈদসংখ্যা বের হচ্ছে, দেখবেন যে ভ্যারিয়েশনটা নেই। সেখানে আমার ভাইয়েরা কিন্তু আলাদা। তারা নানারকমের লেখা লিখেছে। সায়েন্স ফিকশন, গল্প, উপন্যাস সব ধরনের লেখাই লিখেছে। ছোটদের জন্যও লিখেছে। একজন লেখকের তো তাই হওয়া উচিত। সব ধরনের লেখায় তার হাত থাকা উচিত। আমার দুই ভাই এদিক থেকে ঠিক আছে।

আনন্দধারা : বড় ভাই হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবাল কেমন ছিলেন?

আহসান হাবীব : আমার ভাই-বোনেরা তো খুবই ভালো। বড় ভাই বয়সে অনেক বড় ছিল। মেজাজ একটু কড়া। প-িত লোক, একাডেমিশিয়ান ছিলেন তো। মেজাজ যখন ভালো থাকত তখন বয়সের দূরত্ব থাকত না। পড়াশোনার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস। আমাদের যখন পড়াশোনার ব্যাপারে ধরত, তখন খুব বিপদে পড়তাম। ইংরেজি ধরত, অংক ধরত, ফিজিক্স ধরত, মানে মাস্টারি ভাবটা তার মধ্যে ছিল আর কী। বিশেষ করে আমি আর আমার বড় বোন, এই দু’জন একটু বেশি বিপদে পড়তাম। আমাদের দু’জনকে নিয়ে হতাশ ছিল সে। আর মেজো ভাই ছিল সবসময় বন্ধুর মতোই। তার কাছ থেকে গল্প শুনতাম। আমি একদিক দিয়ে ভাগ্যবান। ছোটবেলায় বড় ভাইয়ের মাথাব্যথা থাকত বেশি। তার মাথা মালিশ করে দিতাম। মাথা মালিশ করে দিলে সব থেকে বেশি গল্প করত সে। আর ওনার মতো গল্প বলতে আমি কাউকে দেখিনি। বড় ভাইয়ের কাছে গল্প শোনার লোভে আরো বেশি মাথা মালিশ করে দিতাম। আর মেজো ভাইয়ের একটা ব্যাপার ছিল, তার বিছানা ঝেড়ে দিতে হতো। বিছানা সুন্দর করে ঝেড়ে দিলে সে একটা গল্প বলত। আমার বড় বোনও আমাকে গল্প শোনাত। সে অবশ্য কোনো কন্ডিশন ছাড়াই শোনাত।

আনন্দধারা : ৪১ বছর ধরে উন্মাদ বের করছেন, এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

আহসান হাবীব : আমি তখন একটা ব্যাংকে চাকরি করতাম। তখন দেখলাম ব্যাংকের চাকরিটা যদি করতে থাকি উন্মাদটা বন্ধ হয়ে যাবে। প্রথমে ভেবেছিলাম দুটোই একসঙ্গে করব। দেখলাম এটি সম্ভব না। পরে ব্যাংকের চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। উন্মাদকেই আঁকড়ে ধরলাম। উন্মাদ তখন ত্রৈমাসিক ছিল। ত্রৈমাসিক থেকে মাসিক করে এটাকেই পেশা হিসেবে নিলাম। সমস্যা হয়েছে অনেক। কিন্তু সামলে নিয়েছি। উন্মাদ এখনো এভাবেই চলছে।

আনন্দধারা : নতুনদের উৎসাহ দেন কীভাবে?

আহসান হাবীব : উন্মাদ একটি প্লাটফর্মের মতো। এখানে যারা আসে সবাই অনুশীলন করে। কারো ভুল-ত্রুটি হলে আমি দেখিয়ে দিই। বলে দিই এভাবে এভাবে করো, হিউমারটা এভাবে আনো। এই জিনিসের চর্চাটা কিন্তু এখানেই হয়। আমরা কার্টুন শেখানোর জন্য আটটা-নয়টা ওয়ার্কশপ করেছি। ওইসব ওয়ার্কশপ থেকে অনেক কার্টুনিস্ট তৈরি হয়েছে। তবে শুধু কার্টুন আঁকলে তো হবে না। তাকে কমিকসও আঁকতে হবে। গ্রাফিক নভেল আঁকতে হবে। আমরা ওই জায়গাটাতে যাচ্ছি।

আনন্দধারা : বাংলাদেশে কার্টুনিস্ট ও রম্য লেখকের সংখ্যা কম। তাহলে কি বাংলাদেশে সেন্স অব হিউমারঅলা মানুষ কম?

আহসান হাবীব : একদম না। বাংলাদেশের মানুষ খুবই রসিক। আপনি খেয়াল করলেই দেখবেন, এখানে সবাই কিন্তু অনেক মজার মজার কথা বলে। সবার সেন্স অব হিউমার খুব প্রখর। ইন্টেলেকচুয়ালিটির হয়তো একটু অভাব আছে। আসলে রম্য লিখতে বা কার্টুন আঁকতে আইডিয়ার গুরুত্ব বেশি। সিক্সটি পার্সেন্ট আইডিয়া আর ফোরটি পার্সেন্ট ড্রয়িং। ভালো আইডিয়াবাজরা এখন ক্যারিয়ার গড়ছে এটি নিয়ে। আমাদের একজন বিখ্যাত আইডিয়ানিস্ট আছে। ওর নাম বাপ্পি। ও এখন কানাডায় আছে। গেম অব থ্রোনসে কাজ করে। ক্যাপ্টেন আমেরিকায় কাজ করছে। সে এখন ফিল্ম মেকিংয়ে চলে গেছে। খুব ভালো একটা পজিশনে চলে গেছে। মাঝেমাঝে আসে।

আনন্দধারা : উন্মাদ নিয়ে কোনো স্মরণীয় ঘটনা শুনতে চাই-

আহসান হাবীব : অনেক ঘটনা আছে। আবার অনেক ঝামেলাও হয়েছে। একবার এক জাজ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। এক কোটি টাকার মানহানি মামলা। পরে আমরা ক্ষমা-টমা চেয়েছি। বুঝিয়েছি যে ব্যাপারটা আসলে তো আইন না, সিস্টেমের বিরুদ্ধে। তখন বুঝেছে। একবার আমাদের অফিসে হামলা করেছিল। আগে আমরা সিনেমা নিয়ে ব্যঙ্গ করতাম। কোনো সিনেমা মুক্তি পেলেই ওটা দেখে ব্যঙ্গ করতাম। ও রকম এক ছবির প্রযোজক-পরিচালকের লোকজন অফিসে হামলা করেছে। আমাদের কারো ক্ষতি হয়নি। এ রকম টুকটাক ঘটনা তো আছেই।

আনন্দধারা : আপনি নাকি আদিভৌতিক ব্যাপার নিয়ে প্র্যাকটিস করতেন-

আহসান হাবীব : আসলে, আমাদের ফ্যামিলিতে আমার বাবার এসব নিয়ে অনেক আগ্রহ ছিল। হাত দেখা, অ্যাস্ট্রনমি করা, ভৌতিক ব্যাপার, আত্মা আনা এসব আমার বাবা খুব পছন্দ করতেন। বাবার থেকেই আমরা এটা পেয়েছি। হুমায়ূন ভাই, মেজো ভাইও অনেক প্ল্যানচ্যাট করেছে। পারিবারিকভাবে আমিও করেছি আর কী। ব্যাপারটা এ রকম। এখন আর ওসব করি না।

আনন্দধারা : পরিবারের উন্মুক্ত জ্ঞান চর্চাই কি আপনাদের তিন ভাইকে প্রভাবিত করেছে?

আহসান হাবীব : অবশ্যই করেছে। আমার বাবা তো খুবই আলাদা রকমের মানুষ ছিলেন। তিনি সেই সময় ফটোগ্রাফি করতেন। পারিবারিক ছবি না। প্রকৃতির ছবি তুলতেন। চাকরির কারণে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন। তখন ছবিও তুলতেন। অনেক ছবি ছিল। আদিবাসীদের ছবি, হাতির ছবি, এই ছবি। খুবই ক্ল্যাসিক্যাল ছবি সব। একাত্তরে লুট হয়ে গেছে। আব্বাকে মেরে ফেলল, বাসা লুট হয়ে গেল। বাবা মাঝেমাঝে ছবি আঁকার প্রদর্শনী, গল্প বলা প্রতিযোগিতা, এ রকম নানা ক্রিয়েটিভ কর্মকাণ্ডের আয়োজন করতেন। শুধু আমরা না, পাড়ার অন্য ছেলেরাও অংশ নিত। আর আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ প্রতি ঈদে অনুষ্ঠান করত। পাড়ার ছেলেদের নিয়ে বারান্দায় স্টেজ বানিয়ে গান-বাজনা, গিটার বাজানো, নাটক এসব করত। ভালো মজা হতো। পাড়ার সবাই যুক্ত থাকত। আমরা অভিনয় করতাম। যে নাচতে জানত, সে নাচত। ওইসব কারণেই হয়তো আমরা লেখক হয়েছি। শিল্পের পথে এসেছি।

আনন্দধারা : আপনার বোনরা কেন শিল্পসাহিত্যের জগতে এলো না?

আহসান হাবীব : বাবার ইচ্ছা ছিল আমাদের বড় বোনকেই লেখক হিসেবে গড়ে তুলবেন। সেজন্য বাবা তাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা সাহিত্যে ভর্তি করিয়েছিলেন। বাংলায় পড়াশোনাও করেছে বড় বোন। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিন্সিপাল হিসেবে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অবসর নিয়েছে। কিন্তু বড় বোন কিছু লেখেনি। আবার মেজো বোন লিখেছে। মেজো বোনের দুই-তিনটা বই আছে। সে আবার আমার বড় ভাইকে নিয়েও একটি বই লিখেছে। বড় বোনকে আমি মাঝেমাঝে খুব উৎসাহ দিই লিখতে।

আনন্দধারা : আপনি কাদের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়েছেন?

আহসান হাবীব : আমার বড় দুই ভাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে আমার জীবনে। মেজো ভাইয়ের সায়েন্স ফিকশন পড়ে মনে হয়েছে, এভাবে যদি লিখতে পারতাম! বড় ভাইয়ের উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে এভাবে একটা লিখি। এভাবেই আমার লেখাগুলো হয়েছে। যদিও আমি রম্য লিখছি। কার্টুনেও মেজো ভাই ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল। উনি যদি শুধু কার্টুন আঁকতেন, দেশের সেরা থাকতেন হয়তো।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।