মঞ্চটাই সবসময় আমাকে বেশি টানে- সারা যাকের

সারা যাকেরকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি একাধারে মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, নির্দেশক, অনুবাদক ও উদ্যোক্তা। গত বছর তার নাট্যদল ‘নাগরিক’ পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করেছে। দর্শনের বিনিময়ে নাটক চর্চা যেটা ‘নাগরিক’ শুরু করেছিল, সেটার ছেচল্লিশ বছর পূর্ণ করল। গত বছর পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে ‘নাগরিক’ ঘোষণা দিয়েছিল, তারা নতুনদের নিয়ে একটা উৎসব করবে এবং প্রণোদনা দেবে। এটা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজন কথা বলেছেন কিন্তু যে কোনো কারণে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। ‘নাগরিক’ এটা করে দেখিয়েছে। এই উৎসব সফল হয়েছে এবং নতুন মাত্রা পেয়েছে, কারণ অপেক্ষাকৃত সাতটি নাটক নিয়ে অনুষ্ঠান হয়েছে এবং যারা নবীন তারাই এর নির্দেশনা দিয়েছেন। সারা যাকের এই উৎসবের আহ্বায়ক ছিলেন।

রাফি হোসেন : উৎসবের আইডিয়াটা কি আপনারই, না নাগরিকের সবার?

সারা যাকের : সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে করেছিলাম। যখন উৎসবের জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুদান পেলাম, তখন বুঝতে পেরেছিলাম এই অনুদানে হবে না। সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলাম নতুন নাটকের উদ্বোধনী প্রদর্শনী দিয়ে উৎসবটা করব। পরে একটা বিষয় অনুভব করেছি এই উৎসবটা কীভাবে দর্শকদের এবং নাট্যকর্মীদের উপকৃত করেছে। আমরা ভেবেছিলাম উৎসবটাই নতুন কিছু করছি, নতুন নির্দেশকদের সুযোগ তৈরি করছি। তবে তারা সবাই যে একেবারে নতুন তা কিন্তু না। শুধু একজন ছিল একেবারে নতুন আর বাকি ছয়জনের কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিল। যারা এখন নাটক দেখছে, তারা সবাই প্রায়ই নাটকের লোক। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যারা নতুন নির্দেশক এবং ভালো কাজ করছে তাদের সামনে নিয়ে আসা। মনে হচ্ছিল আমরা তাদের প্রণোদনা দিচ্ছি বা কৃতার্থ করছি। কিন্তু তারাই আমাদের প্রণোদনা দিয়েছে। একনাগাড়ে সাতদিন যখন নাটকগুলো দেখেছি। তখন মনে হয়েছে নাটকের মধ্যে একটা ধরন এসেছে। নাচ-গানের ব্যাপারটা একটু বেশি আছে। এটা কোনো সমস্যা না, কারণ ওইটা তাদের চরিত্র। পরিচালক যেভাবে বলেছেন, তারা সেভাবেই করেছে। মঞ্চ নাটকে আমরা যেটাকে ড্র্যামাটিক্যাল থিয়েটার বলি, সেটা করতে অনেকে হয়তো সাহস করতে পারে না। তাই একটু নাচ-গানটা থাকে।

রাফি হোসেন : আমার মনে হয় এখন শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী একটু কম দেখা যাচ্ছে, আপনার কী মনে হয়?

সারা যাকের : নির্দেশকরা সেটা নিশ্চয়ই বলবে না। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা চ্যালেঞ্জ। নাম বলতে চাই না কিন্তু যেসব নাটক খুব অভিনয়নির্ভর ছিল, সেখানে একটু মার খেয়েছে। যে হলে আমরা নাটকগুলো করেছি সেখানকার সব মাইক্রোফোন ঠিক ছিল না। যার কারণে অনেক ডায়ালগ শোনা যাচ্ছিল না। এসব কারণে সূক্ষ্ম অভিনয় করা যায় না। সংলাপনির্ভর নাটকগুলো টেকনিক্যাল কারণে পিছিয়ে ছিল।

রাফি হোসেন : বাংলাদেশে নাট্যচর্চার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আপনি রয়েছেন। থিয়েটারের এখন সংকটটা কোথায়?

সারা যাকের : সংকটটা হচ্ছে দর্শকের। এই যে সাতজন নির্দেশক, তাদের কাজ মঞ্চে নিয়ে এলো কেউ বলবে না যে কোন নাটক কোনটার চেয়ে কোনো অংশে কম। আমরা যখন সত্তর, আশি, নব্বইয়ের দশকে নাটক করেছি, তখন ঘুরেফিরে পাঁচটা দলকেই আমরা সুযোগ দিতাম। অন্যদের দেয়া যাচ্ছে না, কারণ তাদের নাটক সেই মানের না। কিন্তু বর্তমানে অনেক পাণ্ডুলিপি পেয়েছি, অনেক নির্দেশক তাদের দিতে পেরেছি। ঢাকা শহরে এখন তিন কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যা, তারপরও আমরা দর্শক সংকটে ভুগছি এটা আমার কাছে খুব দুঃখজনক মনে হয়।

রাফি হোসেন : ঢাকা শহরের একটা বড় সমস্যা যানজট। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে নাটক দেখাটাও সমস্যা। আমার মনে হয় যদি বিভিন্ন্ স্থানে প্রদর্শনী করা হয়, তাহলে হয়তো ভালো কিছু হতে পারে।

সারা যাকের : এটা একটা সমাধান। সবচেয়ে বড় বিষয় নাটকটা ভালো হতে হবে। শিল্প-সংস্কৃতির পাতায় যখন যাই, তখন দেখি সব অগ্রাধিকার পাচ্ছে, টেলিভিশন নাটক ও সিনেমা। আর মঞ্চ নাটকটা এক কোনায় পড়ে আছে, না দিলেই নয় এমন একটা বিষয়। আমাদেরও কিছু সমস্যা রয়েছে, আমরা ভাবি না যে আমাদের কোন অনন্য দিকটা আমরা তুলে ধরলে সবার মনোযোগটা পাব, দর্শক পাব।

রাফি হোসেন : এখন যারা থিয়েটার করছে তারা কি মার্কেটিংয়ে কম জোর দিচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

সারা যাকের : এখন যেমন সবকিছু ডিজিটাল হচ্ছে। আমরা এবার কিছু খরচও করেছি, কারণ প্রথম আলো বা অন্য কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন না দিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে অর্ধেক খরচ করেছি আর অর্ধেক পত্রিকায়। ওইটাকে বুস্টও করছি। যাতে করে সব মাধ্যমেই প্রচারটা হয়।

রাফি হোসেন : কেমন প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন?

সারা যাকের : ভালো প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে কীভাবে করব আবার যখন একটা নতুন যুগ আসবে। সত্তরের দশকে আমরা যেমন একটা নতুন যুগ এনেছিলাম মঞ্চ নাটকের। আমি মনে করি দলগতভাবে কাজ করার যে মানসিকতা সেটা মঞ্চ নাটক আমাদের দেয়। এখানে সবার সঙ্গে মিলে দুই-তিন মাস ধরে রিহার্সাল করে একটা নাটক তৈরি হয়। আমাদের অনেক ভাবতে হবে, কী করলে আমাদের কাজগুলো দর্শকের কাছে পৌঁছাবে এবং দর্শক বলবে যেভাবেই হোক আমি যাব। যখন গ্যালিলিও হলো আলি যাকের, আসাদুজ্জামান নূর মঞ্চে এলেন, তখন মানুষ তো ভিড় ঠেলেই সেটা দেখতে গিয়েছিল। এ জায়গাটা আবার তৈরি করতে হবে।

রাফি হোসেন : তরুণ প্রজন্মরা আগের নাটকগুলো ওইভাবে দেখেনি।

সারা যাকের : আগে দেখেনি কিন্তু এখন নতুন দর্শক আমরা পাই ওরা এগুলো দেখে আনন্দ পায়। শুধু এটাতে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। ঢাকা শহরে তিন কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যা আমি চাই পঞ্চাশ লাখ মানুষ নাটক দেখবে। পঞ্চাশ না হলেও পঁচিশ লাখ মানুষ নাটক দেখবে। সেই জায়গাটা আমরা এখনো তৈরি করতে পারছি না। হয়তো গ্ল্যামারটা কম।

রাফি হোসেন : আপনি এত দীর্ঘদিন থেকে অভিনয় করছেন মঞ্চ, টেলিভিশন ও সিনেমায়।

সারা যাকের : টেলিভিশনকে আমি কখনো অগ্রাধিকার দিইনি।

রাফি হোসেন : কেন?

সারা যাকের : পেরে উঠতাম না ছেলে-মেয়ে ছোট ছিল। মনে হতো আমিও খুব ফিট না, ক্লোজআপ ক্যামেরার জন্য। এখন চাইলেই করতে পারব। কিন্তু সময়ের অভাব আছে। তাছাড়া আমার যে বয়স তাতে ওই রকম ভালো চরিত্র ও পাওয়া যায় না।

রাফি হোসেন : সিনেমা আপনাকে কতটা টানে?

সারা যাকের : একজন ভালো পরিচালক যদি আমাকে প্রস্তাব দেয়, হাতে সময় থাকলে আমি সেটা করব। যেমন তারেক মাসুদের ‘অন্তর্যাত্রা’ করলাম। এখন আমি অনেক বেশি সিরিয়াস। অল্প বয়সে সেটা বোঝা যায় না কোথায় কতটুকু দেয়া প্রয়োজন।

রাফি হোসেন : ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ ছোটদের কাছে বেশ জনপ্রিয় একটা ছবি।

সারা যাকের : হ্যাঁ। কিন্তু আমি জানি ‘অন্তর্যাত্রায়’ আমি যত খেটেছি ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’তে তত বেশি শ্রম দিইনি।

রাফি হোসেন : থিয়েটারের প্রতি আপনার আগ্রহ জন্মালো কীভাবে?

সারা যাকের : থিয়েটার করতে করতে থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। এখন আমাকে একটু আস্তে চলতে হচ্ছে। সব পেরে উঠছি না কিছু ব্যক্তিগত কারণে। একটা নাটক রূপান্তরিত করা আছে এখন একজন লেখকের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সেটাকে আর একটু সমৃদ্ধ করব। এই ধরনের কাজ এখন আমার পক্ষে করা সম্ভব। আমি যখনই কোনো কাজের কথা ভাবি, সেটা মঞ্চকে ঘিরেই ভাবি। মঞ্চটাই সবসময় আমাকে বেশি টানে।

রাফি হোসেন : সাংগঠনিক কাজ এখন বেশি টানছে, না অভিনয়?

সারা যাকের : মঞ্চের ওপরে গত বছরও কাজ করেছি। বিদেশেও গিয়েছি। আমার জন্য এটা বড় কথা না, আমি মঞ্চের ওপরে আছি কিনা সেটাই বড় কথা। পর্দার পেছনে থাকলেও সেটা আমাকে ভালো অনুভূতি দেয়। কখনো মনে হয় না যে মঞ্চের ওপরেই থাকতে হবে, চেহারাটা দেখাতে হবে।

রাফি হোসেন : তারপরও এমন হয় না যে অভিনয়টা খুব টানে?

সারা যাকের : টানে কিন্তু এখন অন্য জায়গায় সময় দিতে হচ্ছে। টানার ব্যাপারটাকে যদি বেশি অগ্রাধিকার দিই, তাহলে বাসায় সময় দিতে পারব না।

রাফি হোসেন : আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি খুব ব্যালান্স?

সারা যাকের : আমি তো লিব্রা। ব্যালান্স করব না?

রাফি হোসেন : আমার মনে হয় না সব লিব্রারাই এমন। মৌলিক একটা চরিত্র থাকে। এটা কি আপনি নিজে নিজেই আয়ত্ত করেছেন?

সারা যাকের : বাসাবাড়ি ছেড়ে অনেক বছর করলাম এসব। সবাই বলে এত কিছু তুমি কীভাবে কর? এগুলো নিয়ে আমি তেমন কিছুই বলি না। শুধু ফেসবুকে একধরনের স্ট্যাটাস দিই। কেন মানুষ ভাবে আমি এত ব্যস্ত? এমন অনেক কিছু করি। আমি চাইও না সেভাবে মানুষ আমাকে দেখুক। যেটা আমার রুটিরুজির জন্য করা প্রয়োজন সেটা করি। এত মানুষের দায়িত্ব আমার ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ। তাদের কেউ কাজের মধ্যে নিয়ে আসা। এটা একটা দিক আর অন্যটা নাটক। এখন যদি আমি টেলিভিশনে অভিনয় করতে যাই, সিনেমা করতে যাই তাহলে নিজেকে কত জায়গায় ছড়াব। এত কিছু একসে করা সম্ভব না। যতটুকু সম্ভব ততটুকুই করি। তাই মঞ্চকে বেশি প্রাধান্য দিই।

রাফি হোসেন : আপনার এখন নতুন আর একটা পরিচয় হয়েছে, কেমন উপভোগ করছেন?

সারা যাকের : অনেক বেশি উপভোগ করি। এখন একটা সুবিধা হয়েছে, এখনকার ছেলে-মেয়েরা নিজেদের বাচ্চাদের নিজেরাই বড় করতে চায়। তাই আমি বেঁচে গিয়েছি। তবে দারুণ অনুভূতি।

রাফি হোসেন : আপনার নাতি-নাতনিরা স্টেজে অভিনয় করছে, সেটা দেখার ইচ্ছা কি কখনো জাগে?

সারা যাকের : না, এত বেশি আশা করি না। কারণ ওরা বড় হতে হতে আমি কোথায় থাকব? আমাদের তো অনেক বয়স হয়েছে, মানুষ পঞ্চাশ বছর বয়সেই নানি-দাদি হয়ে যায়। আমি একটু দেরিতেই হলাম।

রাফি হোসেন : দীর্ঘ এতদিনের ক্যারিয়ারে আমার মনে হয় আপনি সব দিক থেকেই পূর্ণ। তারপরও কি আপনার মনে হয় যে কোনো অপূর্ণতা রয়েছে?

সারা যাকের : একটা মজার কথা বলতে পারি। জানি না মজার কথা আমার সঙ্গে মানাবে কিনা এখন যে পরিস্থিতি বা আমার যা বয়স সবকিছু মিলিয়ে। আমি একধরনের দেখতে ভালোই ছিলাম। আজকাল সহজেই যেমন সব মোটা হয়ে যায়। আমাদের সময় মেয়েরা অত সহজে মোটা হতো না। তখন ফার্স্টফুড ছিল না। খাবার নিয়ে আমাদের এত ব্যতিব্যস্ততা ছিল না। এখন যেমন একটা মেয়ে তার দেহ সৌন্দর্যকে উপভোগ করে নানা রকম পোশাক পরে সাজগোজ করে। আমি কোনোদিনই এসবের ওপর মনোযোগ দিইনি। এখন এগুলো মিস করি।

রাফি হোসেন : এখনো পারেন।

সারা যাকের : এখন তো আমাকে আর ওইরকম লাগবে না।

রাফি হোসেন : এখনো আপনি নিজেকে শারীরিকভাবে অনেক সুন্দর করে রেখেছেন।

সারা যাকের : কিন্তু অল্প বয়সের সৌন্দর্য আলাদা।

রাফি হোসেন : আমার মনে হয় যত বয়স হবে, তত বেশি সাজগোজ করা উচিত।

সারা যাকের : আমার মনে হয় যখন বয়সটা বাড়ে। তখন ওই চামড়ার ওপর মেকআপ দিলে বয়সটা আরো বেড়ে যায়। অল্প বয়সে মেকআপ না দিলেও সুন্দর লাগে, দিলেও ত্বক সেটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে।

রাফি হোসেন : আপনার ভক্ত ও দর্শকদের জন্য কিছু বলতে চান?

সারা যাকের : আমরা ডিজিটাল হচ্ছি। কিন্তু দয়া করে আপনারা প্রিন্টেড ও হাতে লেখা বিষয়গুলো পড়ুন, এটা খুব জরুরি। আমরা বিশেষ জায়গায় দাঁড়িয়ে বলব দর্শক হিসেবে আপনারা মঞ্চের দিকে একটু মনোযোগী হন। যখন দর্শকের আসনে বসে একটা নাটক দেখবেন তখন একটা গল্পের, চরিত্রের খুব কাছাকাছি চলে আসা যায়। তাই মঞ্চে এসে নাটক দেখুন। আশা করি অনেক ভালো লাগবে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।