পার্বত্য বাজার দীঘিনালা

ভ্রমণ হোক জানার, ভ্রমণ হোক শেখার। সদা বৈচিত্র্যের অনুসন্ধান করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আর সেই প্রবৃত্তির টানে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন পর্যটক। আদিমকাল থেকে চলে আসা এই প্রবৃত্তি আমাদের মাঝে সর্বদাই ক্রিয়াশীল। কালক্রমে শুধু বদল এসেছে তার মাধ্যম বা অর্জনের পদ্ধতিতে। আদিম শিকারি মানুষ শিকারের সন্ধানে ছুটত বন থেকে বনে। কৃষি বা চাষাবাদ আবিষ্কারের পর চাষযোগ্য ভূমির খোঁজে মানুষ পাড়ি দিল শত শত মাইল পথ। পশু পালক সমাজ পশুর জন্য উন্নত চারণভূমির সন্ধানে পাড়ি দিয়েছে হাজার হাজার মাইল পথ। ভূমি দখলে সদলবলে মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ছুটল। আধুনিক সভ্য যুগে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বা সা¤্রাজ্য বিস্তারে আমরা পাড়ি দিলাম সাগর, মহাসাগর। এখন ছুটছি এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে। সুতরাং, দিন শেষে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন পর্যটক। আমরা কত কিছুই না দেখছি; বাঘ, ভাল্লুক, প্রাসাদ, সমুদ্র অথবা নদী, পর্বত, পালাপার্বণ, কৃষ্টি-কালচার ইত্যাদি। আমরা দেখি আর প্রতিনিয়ত শিখি এবং অনুভব করি। দেখার সেই শিক্ষা ও অনুভূতি থেকে চর্চা করি শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান আরো কত কী। এই পর্বে আমাদের দেখার বিষয়টা একটুখানি ভিন্ন, খাগড়াছড়ি জেলাধীন দীঘিনালা বাজার।

ঢাকা থেকে একদিন আগেই গিয়ে উপস্থিত হই। থাকার ব্যবস্থা হয় উপজেলা ডাকবাংলোয়। ব্রিটিশ আমলের কাঠামো, টিনের চালার নিচে পাকা ভিত্তির ওপর বাঁশের চেগাড়ের শক্ত বেড়া। লাগোয়া কয়েকটা আমগাছ শীতল ছায়ায় ঢেকে রেখেছে। লোকজন তেমন থাকে না, ভেতরে কেমন পুরনো গন্ধ। একটা সময় এসব এলাকায় কোনো বাঙালি ছিল না। পরে পার্বত্য অন্যান্য জেলার মতো সেখানেও বেশ কিছুসংখ্যক বাঙালিকে নিয়ে পুনর্বাসন করা হয়, যারা সেটেলার বলে পরিচিত। বর্তমানে বাজারকে কেন্দ্র করে চারপাশে সেটেলার ও স্থানীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসতি বা ঘরবাড়ির সংখ্যা প্রায় সমান সমান।

উপকরণ সবই বন্য/দূর হবে কোষ্টকাঠিন্য। এক ফাইল-ই যথেষ্ট/বিদায় করতে জ্বালা-পোড়া  কষ্ট। পরের দিন ঘুম ভাঙে ওষুধ বিক্রেতার এমন ক্যানভাসের শব্দে। ডাকবাংলোর সামনে দিয়ে পাকা রাস্তা। বাজারের এক অংশ চলে এসেছে রাস্তায়। ওষুধ বিক্রেতা বসেছে ডাকবাংলোর সদর দরজায়। ভোর থেকে শুরু করে বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে বাজার শেষ হয়ে যায়। রক্ষা পাই ক্যানভাসারের কল্যাণে, নয়তো ঘুমেই পার হয়ে যেত সব। পাহাড়িরা পাহাড়-জঙ্গলের অনেক কিছুই খায়, যা আমাদের কাছে অখাদ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ওসব গাছ-গাছড়া ও অন্যান্য বন্য খাদ্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাদের সঞ্জীবনী শক্তি। বলা যায়, সে জন্যই তাদের সহজে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয় না। বেশিরভাগ দোকানি নারী। আগের দিন পাহাড়-জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা জিনিস নিয়ে তারা বাজারে বিক্রির জন্য হাজির হয়। বাজারের পথে পথে চোখে পড়ে ছোট ছোট এক ধরনের হলুদ ফুল। অগয্যা নামের এই ফুল মাছের সঙ্গে এক অনন্য ব্যঞ্জনা। কোনো পাহাড়ির মুখে অগয্যা ফুলের সঙ্গে মাছের তরকারির কথা শুনতে চাইলে দেখা যায় কথা বলতে বলতে তার মুখে এক ধরনের তৃপ্তির রস জমে গেছে। রাস্তার দু’ধারে চাকমা মেয়েরা বিছিয়ে বসেছে অনেক দোকান। নানা ধরনের লতাপাতা, জুমের সবজি, সুগন্ধি গাছ সাবরাং, বিন্নি চাল, বাঁশপ্রোল, তারা ডাটা, তিতবেগুন, বয়লা শাক, ইয়েরিং শাক, কয়দা, তিদেগুলা, কচি কাঁঠাল এবং কলার মোচা দোকানগুলোর প্রধান পণ্য।

বর্ণিল সাজের দীঘিনালা বাজারে যেন উৎসবের আমেজ। রাস্তা ছেড়ে মূল বাজারে প্রবেশ করে প্রথমে দৃষ্টি কাড়ে দোকানে চাকমা নারীদের এক আড্ডার আসর। কারো হাতে ধাবা (বাঁশের তৈরি ধূমপানের লম্বা সরঞ্জাম) তো কারো আঙুলের চিপায় আস্ত তামাক পাতা মোড়ানো বিড়ি। বাজারে আসতে দূরদূরান্তের বসতি থেকে তারা ভোর হওয়ার আগেই রওনা করে। বাজার তো নয় যেন সপ্তাহান্তের মিলনমেলা। টিনের পাত্রে কলাপাতায় মোড়ানো শক্ত কাদার মতো জিনিসটা দেখে মনে হবে নিশ্চয় কোনো খাদ্য। কিন্তু কী সেই খাদ্য, তার উত্তর খুঁজতে আপনাকে কথা বলতে হবে স্থানীয় যে কারো সঙ্গে? নানান জাতের শুঁটকি মাছ চূর্ণ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বানানো। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ঘরে এই নাপ্পির গন্ধ একটি সচরাচর বিষয়। প্রতিটা পদ রান্নায় অন্যতম অনুষঙ্গ নাপ্পি। এই জিনিস ছাড়া তাদের খাবার অকল্পনীয় ব্যাপার। তেলের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যা ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে বলে তাদের বিশ্বাস। দুই বৃদ্ধা ঝাঁকিতে করে সাদা গোল গোল ডালের বড়ার মতো কী যেন নিয়ে বসেছে। চালের গুঁড়া দিয়ে তা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বানানো, যা থেকে তাদের নিত্যদিনের পানীয় দোচোয়ানি প্রস্তুত হয়ে থাকে। দূরের দোকানির সামনে ভিড়, এগিয়ে দেখি একধরনের কালো কালো টুকরো স্তূপ করে রাখা। বাংলা ভাষা ভালো না বোঝায় একজন বাঙালির কাছে জানতে চাইলে নাক সিঁটকে বলে, মহিষের চামড়া, ওরা রেঁধে খায়। কথায় আছে, এক দেশের যা খাদ্য আর এক দেশের তা অখাদ্য। এই দোকান উপরোক্ত কথার এক বাস্তব উদাহরণ।

পাহাড়ি কমলা লেবু মাত্র ১০ টাকা হালি। স্বাদে সামান্য টক হলেও একেবারে টাটকা এবং খেতেও মন্দ নয়। ছবি তুলতে ক্যামেরা বের করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় জমে গেল এবং যে যার জায়গা থেকে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল। বাজারের কোনাটায় বাঁশের তৈরি ঝুরি, ডালা, টুকরি, ভাণ্ডারের দোকানগুলো পেরিয়ে দেখা মেলে বিন্নি চাল দিয়ে তৈরি নানা পদের পিঠার দোকান। সকালের নাশতায় বিন্নি চালের পিঠা হতে পারে আপনার পছন্দের উপকরণ। নাশতার সময় আলাপ হওয়া চাকমা যুবকের নাম মং চাকমা, সে ঘুরে ঘুরে পরিচয় করায় আরো কিছু শাকসবজি ও ফলমূলের সঙ্গে। হলুদের ফুলের তরকারি বা আদা ফুলের ভর্তার পদ হলে বাড়িতে সেদিন ভাত বেশি রাঁধতে হয়, কারণ দুটোই তাদের অত্যন্ত প্রিয়। শাম্বো কচু, কনর সম্বার, শিমে আলু, কাঁকড়া গুলা, চিনল, গোমাইত্যাসহ বহু সবজি ও ফলমূল। এছাড়াও প্রতি মৌসুমে রয়েছে হরেকরকম মৌসুমি ফল ও সবজি। অন্য এক কোণে চোখে পড়ে কাঁকড়া ও শামুক বিক্রেতাদের সমাগম। পার্বত্য এলাকায় মাছ খুব একটা সহজলভ্য নয়। আমিষের প্রধান উৎস শিকার করা বিভিন্ন প্রাণীর মাংস, যা কেবল কালেভদ্রেই মিলে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ঝিরি বা খাল থেকে শিকার করা কাঁকড়া বা শামুকের বেশ কদর, দামেও কম। সুতরাং, আমিষের চাহিদা পূরণে কাঁকড়া এবং শামুকের ওপর স্থানীয়দের বিশেষ আগ্রহ। ভোর থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টার মধ্যে বাজার শেষ হয়ে গেলেও খাবারের দোকানগুলো প্রায় সারাদিনই খোলা থাকে। অতএব, বাঙালি বা পাহাড়ি যে কোনো দোকান হতে পারে আপনার দুপুরের খাবারের উপযুক্ত জায়গা। আপনার কৌতূহল সায় দিলে চেখে দেখতে পারেন পাহাড়িদের খাবার। সেক্ষেত্রে জুম চালের ভাতের সঙ্গে নাপ্পি দিয়ে বাঁশপ্রোলের তরকারি, হলুদ ফুলের তরকারি ও আদা ফুলের সালাদের স্বাদ নিতে ভুল করা অনুচিত।

প্রয়োজনীয় তথ্য

দীঘিনালা বাজার দেখতে চাইলে প্রথমে যেতে হবে জেলা শহর খাগড়াছড়ি অথবা সরাসরি দীঘিনালা। ঢাকা থেকে বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল করে। ভাড়া পড়বে ৫২০ টাকা। এছাড়া সরাসরি দীঘিনালা যেতে চাইলে শান্তি পরিবহনের বাস যায়। ভাড়া ৫৮০ টাকা। এছাড়াও সরাসরি খাগড়াছড়ির এসি বাসের মধ্যে রয়েছে বিআরটিসি ও সেন্টমার্টিন সার্ভিসের বাস।

সেন্টমার্টিন পরিবহন : আরামবাগ-০১৭৬২৬৯১৩৪১, ০১৭৬২৬৯১৩৪০, খাগড়াছড়ি-০১৭৬২৬৯১৩৫৮। শ্যামলী পরিবহন : আরামবাগ-০২৭১৯৪২৯১, কল্যাণপুর-০২৯০০৩৩৩১। শান্তি পরিবহন : আরামবাগ-০১১৯০৯৯৪০০৭।

থাকার জায়গা

খাগড়াছড়ি সদর থেকে দীঘিনালা যেতে যেহেতু ১ ঘণ্টারও কম লাগে, সেহেতু খাগড়াছড়ি জেলা সদরে রাতযাপন করা সুবিধাজনক।

পর্যটন মোটেল-০৩৭১৬২০৮৪, ০৩৭১৬২০৮৫। হোটেল শৈল সুবর্ণ-০৩৭১৬১৪৩৬, ০১৮৩১১৪৭৩১০।

ফেরদৌস জামান

ছবি : লেখক

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup