কুড়ি বছর পর নতুন মঞ্চে নতুন নাটকে -আসাদুজ্জামান নূর

একজন আসাদুজ্জামান নূর, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অভিনেতা। একাধারে মঞ্চ ও টেলিভিশনের অনেক নাটকে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান দর্শকদের মাঝে। প্রায় ২০ বছর পর তিনি নতুন মঞ্চে নতুন নাটকে অভিনয় করলেন। এত লম্বা সময় পর মঞ্চে তার ফিরে আসা নিয়ে কথা বললেন আনন্দধারার সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে...

রাফি হোসেন : কতদিন পর নতুন নাটকের জন্য মঞ্চে উঠলেন?

আসাদুজ্জামান নূর : প্রায় ২০ বছর পর নতুন মঞ্চে নতুন নাটকে অভিনয় করলাম। যদিও এর মধ্যে গ্যালিলিওতে বেশ কয়েকবার অভিনয় করেছি। এটা ছিল আমাদের পুরনো নাটক।

রাফি হোসেন : এত লম্বা সময় পর নতুন নাটকে অভিনয় করার অনুভূতি কেমন ছিল?

আসাদুজ্জামান নূর : সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করলাম। মঞ্চ, গ্রিনরুম, সহঅভিনেতা, সারিতে সারিতে বসে থাকা দর্শকদের সমন্বয়ে যে একটা পরিবেশ তৈরি হয়, সেটা আর কোনোকিছুতে আমার পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। এসব কিছুকে আমার অনেক আপন মনে হয়।

রাফি হোসেন : নাটক থেকে ২০ বছর দূরে থাকলেন কীভাবে?

আসাদুজ্জামান নূর : দূরে থাকতে অবশ্যই কষ্ট হয়েছে। মাঝে মাঝে নাটক দেখতে গিয়ে সেই কষ্টটা আরো তীব্র হয়েছে এটা ভেবে যে, আমি অভিনয় করতে পারছি না। কাজ না করার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া। পুরো সময়টা আমাকে ব্যস্ততায় কাটাতে হয়েছে। সেই সময় আমি আমার এলাকার মানুষদের জন্য কাজ করতে চেষ্টা করেছি। অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের এলাকায় একটি ইপিজেড করে দিয়েছিলেন। অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে সেটা কিছুদিন বন্ধ ছিল। তারপর নানা ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে সেটা এগিয়ে চলছে। এখন সেখানে ৪০০০০ মানুষ কাজ করছে। এটিকে ঘিরে এই সংখ্যার বাইরেও আরো বহু মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে। এই ইপিজেড আমাদের এলাকার চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। এইদিক দিয়ে বলব, নাটক ছেড়ে থাকতে কষ্ট হলেও মানুষের জন্য কাজ করে, তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে, একদিক দিয়ে যেমন তৃপ্তি, আনন্দ পেয়েছি, অন্যদিক দিয়ে নাটকের কষ্টটাও লাঘব হয়েছে।

রাফি হোসেন : অভিনয় করার সময় নেতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন, অভিনেতা থেকে নেতা হওয়ার মধ্যে কি কোনো যোগসাজশ দেখতে পান?

আসাদুজ্জামান নূর : যোগাযোগ একটা জায়গায় তো রয়েছেই। অভিনয় তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। অভিনেতাদের একটা চেতনার মধ্যে কাজ করতে হয়। দেশকে ভালোবাসা, মানুষকে ভালোবাসা, চিন্তা-ভাবনায় প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের না হলে প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মী হওয়া যায় না। এই বিষয়গুলো যদি একজন রাজনীতিকর্মীর মধ্যে না থাকে, তিনিও একজন প্রকৃত রাজনীতিকর্মী হতে পারবেন না। ফলে আমি দুটোর মধ্যে কোনো সংঘাত দেখি না। আমার বিশ্বাস, একই চেতনার দুটি ধারা প্রবহমান।

রাফি হোসেন : অর্থাৎ আপনি বলছেন, কোন সংস্কৃতিকর্মী যদি রাজনীতি করতে চায়, সেই ক্ষেত্রে এই চেতনা সহায়ক হিসেবে কাজ করে?

আসাদুজ্জামান নূর : কোনো মানুষই সংস্কৃতি চেতনার বাইরে নয়। সংস্কৃতি চর্চাটা থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নয়, চেতনাটাই জরুরি। যেকোনো রাজনীতিকর্মীর সেই চেতনা থাকাটাই আবশ্যক। আর সংস্কৃতিকর্মীর ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

রাফি হোসেন : আপনি মুখভর্তি দাড়ি নিয়েই একের পর এক জনপ্রিয় নাটক আমাদের উপহার দিয়েছেন এবং কিছু চরিত্র এই শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলের জন্যই কালজয়ী হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এখনো এই মুখভর্তি দাড়ি রাখার কারণটা কী?

আসাদুজ্জামান নূর : দাড়িটা রাখার পর সবাই বলল, আমাকে বেশ মানিয়েছে। যদিও সেই সময় আমার জন্য সেটা অনেক চ্যালেঞ্জের ছিল। অনেক সিনিয়র, প্রডিউসার বলত দাড়ি রেখে কীভাবে নানান চরিত্রে অভিনয় করব? আমি বলতাম, সব চরিত্রই তো দাড়ি রাখে। রিকশাচালক, কামার-কুমোর, শিক্ষক, উকিল, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে সবাই। তাহলে আমি কেন দাড়ি রেখে চরিত্র রূপায়ণ করতে পারব না?

এখন তো বেশিরভাগ অভিনেতাই দাড়ি রেখে অভিনয় করছেন। এটা এখন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমাকে সেই সময় অনেক কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।

রাফি হোসেন : তারপর দর্শক যখন আপনাকে গ্রহণ করল, সেটা নিয়ে কেউ আর প্রশ্ন তোলেনি। আপনার কিছু চরিত্র এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল, সেই নামে এখনো আপনাকে অনেকে ডাকে-

আসাদুজ্জামান নূর : আমি খুবই আনন্দিত হই এটা ভেবে যে, এই প্রজন্মের অনেকে আমাকে চেনে। তারা এখন আমাদের নাটকগুলো দেখছে। শুধু আমার অভিনীত নাটকই নয়, সেই সময়ের জনপ্রিয় ও ভালো নাটকগুলো দেখছে। এটা থেকে প্রমাণিত হয়, ভালো কাজ সবসময় থেকে যায়। এই বিশ্বায়নের যুগেও নতুন প্রজন্ম আমাদের কাজ দেখছে, এটা ভীষণ আনন্দের ব্যাপার।

রাফি হোসেন : আপনি মঞ্চ, টেলিভিশন, সিনেমা তিন মাধ্যমেই অভিনয় করেছেন, এই তিন মাধ্যমে চরিত্র নির্মাণের পদ্ধতিতে কোনো ভিন্নতা দেখতে পান?

আসাদুজ্জামান নূর : চরিত্র নির্মাণের পদ্ধতি তিন মাধ্যমেই একই রকম। চরিত্র নির্মাণের ভাবনাটা কোনো বিমূর্ত পৃথিবী থেকে আসে না। আমি আমার চারপাশে যে পৃথিবী দেখি সেখান থেকেই আসে। যে চরিত্রটাকে আমি তৈরি করি, সেটা আমার জীবনের নানা অভিজ্ঞতার ফসল। এরপর বৈচিত্র্য আনার জন্য অনেক কিছু যোগ করি কিন্তু সেটাও কারণ ছাড়া না। বেশিরভাগ চরিত্রই বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসা।

রাফি হোসেন : তিন মাধ্যমে অভিনয়ের ধরনের কি তারতম্য আছে?

আসাদুজ্জামান নূর : টিভি আর মঞ্চে অভিনয়ের কিছু তারতম্য তো রয়েছেই। মঞ্চে শেষের দর্শককে শোনানোর ব্যাপারটা থাকে, যেটা টিভিতে দরকার হয় না। প্রত্যেকটা মাধ্যমেই অভিনয়ের নিজস্ব একটা ভাষা রয়েছে। সেই ভাষা অনুযায়ী অভিনয় করতে পারলে সেটা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। যেমন টিভি একটা ঘনিষ্ঠ মাধ্যম। মানুষ খুব সামনে থেকে টিভি দেখছে। আর বড়পর্দায় দূরে থেকে। এখানে অবশ্যই তারতম্য আছে। অন্যদিকে থিয়েটারে সেটা নির্ভর করে নাটকের ধরনের ওপর। ক্ল্যাসিক্যাল নাটকে একরকম অভিনয় হয় আবার জীবনঘনিষ্ঠ নাটকে অন্য ধরনের।

রাফি হোসেন : আপনি কি নির্দেশকের ধারণা অনুযায়ী চরিত্রটাকে ভাবেন নাকি নিজস্ব ভাবনাও এর মধ্যে জুড়ে দেন?

আসাদুজ্জামান নূর : নির্দেশকের নিজস্ব ধারণা অবশ্যই থাকে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে তো সেই ধারণাকে অন্ধভাবে অনুকরণ করা যায় না। যখন আমি একটি ক্রিপ্ট পড়ি, সেখানে আমি চরিত্রের প্রতিবিম্বকে আমার মতো করে দেখতে পাই। তারপর নির্দেশকের সঙ্গে আমার ভাবনাও শেয়ার করি। যেমন ‘কালো জলের কাব্য’, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ থেকে রূপান্তরিত হওয়ার আগে। একভাবে আমি চরিত্রটাকে নিয়ে চিন্তা করেছি। রূপান্তরিত হওয়ার পর স্ক্রিপ্ট পড়ে সেই চিন্তা থেকে সরে আসতে হয়েছে। টেলিভিশনে অভিনয়ের সময়ও বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে। হুমায়ূন আহমেদের স্ক্রিপ্টে কাজ করার সময় এটা বেশি ঘটেছে। আমাদের অভিনয়ের উপাদান নিয়ে উনি দৃশ্য রচনা করেছেন। ‘অয়োময়’ নাটকে আমার একটা আংটি ছিল। সংলাপ বলার সময় আংটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম। এই আংটিকে কেন্দ্র করে তিনি আরো কিছু দৃশ্য রচনা করেন।

রাফি হোসেন : আপনার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুত্ব কি আগে থেকেই ছিল, না কাজ করতে গিয়ে হয়?

আসাদুজ্জামান নূর : হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার নাটকের মধ্য দিয়ে পরিচয়। টিভিতে আমার কোনো একটা নাটক দেখে তার ভালো লেগেছিল। তারপর তার নাটকে করার জন্য আমাকে ডাকা হলো। এরপর তো প্রচুর কাজ করা হলো তার সঙ্গে।

রাফি হোসেন : কোনো চরিত্র তৈরি করার সময় কি কোনো অভিনেতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, যারা এর আগে ওই রকম চরিত্রে অভিনয় করেছেন?

আসাদুজ্জামান নূর : সচেতনভাবে না হলেও তবে আমার মনে হয় অবচেতনভাবে হই। আমি সাধারণ দর্শকদের মতো নাটক, সিনেমা, থিয়েটার শুধু বিনোদনের জন্য দেখি না। এর পাশাপাশি আমার শিক্ষাগ্রহণ চলে। যেটা প্রতিটা অভিনয়শিল্পীর মৌলিক কাজের মধ্যে পড়ে বলে আমি মনে করি। যখন ভালো অভিনয় দেখি, তার বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্যগুলো লক্ষ করি। সেগুলো কিছু আমার অভিনয়ে অবশ্যই প্রতিফলিত হয়।

রাফি হোসেন : আপনার পছন্দের অভিনয়শিল্পী কে?

আসাদুজ্জামান নূর : একজনের নাম বলা যাবে না। জাস্টিন হফম্যানের খুব ভক্ত আমি। টম হ্যাংকস, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, সোফিয়া লরেন, মার্সেলো মাস্তেরিনি, পিটার ওটনরা ছাড়া আরো অনেকের অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করে। তাদের দ্বারা কিছুটা হলেও আমি প্রভাবিত।

রাফি হোসেন : অনেক মাধ্যমে আপনি কাজ করেছেন, এদেশের অন্যতম জনপ্রিয় নাটক ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’র অনুবাদক ও নির্দেশক আপনি। এরপর আর অনুবাদ আর নির্দেশনা দিলেন না কেন?

আসাদুজ্জামান নূর : নির্দেশনার ক্ষেত্রে অনেক টেনশন কাজ করে। আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজটি করতে পারি না। এর চ্যালেঞ্জটা অন্যরকমের। অনেক ভেবেচিন্তে নতুন কিছু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার ধৈর্য আমার নেই। তাই অভিনয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অনুবাদের ক্ষেত্রে যদি বলতে হয়, মঞ্চের জন্য তিনটি নাটকের অনুবাদ করেছিলাম। এছাড়া টেলিভিশনের কিছু নাটক লিখেছিলাম। এর মধ্যে একটা ছিল আমার মৌলিক নাটক। যেটা একুশের পটভূমিতে লেখা হয়েছিল। আবদুল্লাহ-আল-মামুন ভাইয়ের চাপে পড়ে আমাকে লিখতে হয়েছিল। উল্লেখ্য, ওই নাটকে অভিনয় করে মনোজ সেনগুপ্ত সেই বছরের সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান।

রাফি হোসেন : আপনি গদ্য খুব ভালো লেখেন, সেক্ষেত্রে গল্প বা উপন্যাস লিখলেন না কেন?

আসাদুজ্জামান নূর : লেখালেখির জন্য সময়টা দিতে পারিনি। আমি আড্ডা দিতে পছন্দ করি। সেক্ষেত্রে সৃজনশীল কথাবার্তা বলতে পারলেও লেখালেখিটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

রাফি হোসেন : এখন কি কোনো ইচ্ছা আছে লেখালেখি নিয়ে?

আসাদুজ্জামান নূর : আমার স্মৃতিকথা লেখার ইচ্ছে আছে। টুকরো টুকরো করে কিছু লেখা হয়েছে কিন্তু একটানা লেখা হয়নি। এটা লেখার কারণ হচ্ছে আমরা যারা আমাদের সময়ে ছিলাম, তারা অসাধারণ একটা সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি। পাকিস্তান সময়ে আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ চোখের সামনে দেখেছি। অনেক বড় বড় লেখক, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। অনেক কিছু শিখেছি তাদের কাছ থেকে। এগুলো লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই স্মৃতিকথা লেখার মূল উদ্দেশ্য।

রাফি হোসেন : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে?

আসাদুজ্জামান নূর : না। তবে দূর থেকে সব সময় দেখেছি। হয়তো উনি বেঁচে থাকলে তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতাম। আমাদের বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য তাকে অনেক তাড়াতাড়ি হারালাম।

রাফি হোসেন : আপনার কি মনে হয়েছে, আমার যে কাজে আগ্রহ বেশি, সে কাজ আপনার ছেলেমেয়ে করলে ভালো লাগত?

আসাদুজ্জামান নূর : ছেলেমেয়েদের দিকনির্দেশনা দিয়ে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া, সেই সময়টা আমি ওদের দিতে পারিনি। নানা কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন পর্যাপ্ত সময়ের অভাব এর মূল কারণ। এ ব্যাপারে আমার আক্ষেপ রয়েছে। যদিও আমার স্ত্রী পুরো ব্যাপারটা দেখেছেন। তবে চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে আমার ছেলেমেয়েরা প্রগতিশীল ও সৃজনশীল। তারা দু’জনই লেখালেখি করে। দু’জন একসঙ্গে ডেইলি স্টারে কাজ করেছে। আমার মেয়ে সুপ্রভার অভিনয়ের আগ্রহ ছিল এবং বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার আগে নাটকে অভিনয় করেছে। সে সম্ভাবনাময় অভিনয়শিল্পী ছিল। কিন্তু আমার ছেলের অভিনয়ের ব্যাপারে কোনো আকর্ষণ নেই। সে লাজুক ও অন্তর্মুখী। তবে ভালো সিনেমা, নাটক, বই পড়াতে তার জুড়ি নেই।

রাফি হোসেন : আপনি কখনো উৎসাহিত করেননি ওদের নাটকের ব্যাপারে?

আসাদুজ্জামান নূর : ওদের কোনো ব্যাপারে আমি জোর করি না। এখন তো বড় হয়েছে, নিজের সিদ্ধান্ত ওরা নিজেরাই নেয়। আমাকে মাঝে মাঝে পরামর্শর জন্য ডাকে।

রাফি হোসেন : আপনার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আপনার ব্যাপক জনপ্রিয়তা, এই জনপ্রিয়তার এক্স-ফ্যাক্টরটা কী?

আসাদুজ্জামান নূর : আমি সুনির্দিষ্টভাবে দুটি নাম বলতে চাই হুমায়ূন আহমেদ ও আলী যাকের। আবদুল্লাহ-আল-মামুন আমাকে প্রথম টিভিতে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। তার প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। এছাড়া অসংখ্য সেই সময়ের প্রডিউসার যারা ছিলেন, তারা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন।

রাফি হোসেন : একজন মানুষ হিসেবে হুমায়ূন আহমেদকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আসাদুজ্জামান নূর : মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন খুব আবেগপ্রবণ ও বন্ধুবাৎসল্য। তিনি আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন। হাজার কাজকে উপেক্ষা করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় বের করতেন। রাজনীতিতে প্রবেশ করে নাটক ছেড়ে দেয়ার পর তিনি আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এরপরও আমি তার বেশকিছু নাটকে অভিনয় করেছি। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার পাগলামীর শেষ ছিল না। টাকা-পয়সা নিয়ে তার ভাবনা কখনোই ছিল না। কখন তিনি রেগে যান ঠিক নেই, আবার রাগ হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেও সময় লাগত না।

রাফি হোসেন : আপনার আর হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুত্বের রসায়ন কী?

আসাদুজ্জামান নূর : আমি উনাকে লেখক হিসেবে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতাম এবং উনি আমাকে। এই দুটোই মূল কারণ আমি মনে করি।

তার যে কোনো বিশেষ উপলক্ষে আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আসতে বলতেন এবং আমাকে আসতেই হতো। তার দ্বিতীয় বিয়ের সময় আমাকে উকিল বাপ হিসেবে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। এতে হুমায়ূন আহমেদের আমাকে পছন্দ করার একটি নিদর্শনও বলা যায়। যদিও আমাকে এই বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্য অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

রাফি হোসেন : আপনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বন্ধুত্বের খাতিরে সেখানে উপস্থিত ছিলেন?

আসাদুজ্জামান নূর : অনিচ্ছা সত্ত্বেও কথাটা বলা ঠিক হবে না। কারণ মানুষ তার জীবনে নানা রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই পারে। তার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে, যেটা আমরা জানি না। আমি এটা নিয়ে সমালোচনা করতে চাই না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের প্রয়োজনে তার পাশে আমার থাকা দরকার।

রাফি হোসেন : আমাদের সংস্কৃতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, আমরা কি সবকিছু হারাতে যাচ্ছি?

আসাদুজ্জামান নূর : সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে আমরা দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয় সারা পৃথিবীর সমস্যা। এত দ্রুত এই প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষের এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সমস্যা হচ্ছে। সবকিছুতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কৃতিও তার বাইরে নয়। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, সংকট আসলে আমরা সবাই একসঙ্গে হয়ে যাই। যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শাহবাগে আন্দোলন, লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলাতে আমি লাখ লাখ মানুষের ঢল দেখেছি। সেখানে মানুষের আবেগের জায়গাটা ভোলার মতো নয়। আমরা যতই বলি না কেন, অপসংস্কৃতি সব বিনাশ করে ফেলছে, সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ, বাংলা সংস্কৃতি, সাহিত্য তার নিজ নিজ গতিতে এগিয়ে চলছে। বইমেলা, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারিতে মানুষের স্রোতে সবকিছুকে মিথ্যা প্রমাণিত করে দেয়। তবে যারা তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তারা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে কিনা। এর মূল কারণ হতে পারে আমরা তরুণ প্রজন্মকে ঠিকভাবে লক্ষ নির্ধারণ করে দিতে পেরেছি কিনা। এই দায়িত্বটা যারা সমাজ ও দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের। আমার মনে হয় এই জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup