হয়তো সাংবাদিক হতাম- আজাদ আবুল কালাম

মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে সমানভাবে অভিনয় করে চলেছেন দর্শকনন্দিত জনপ্রিয় গুণী অভিনেতা আজাদ আবুল কালাম। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্কৃতির সঙ্গে সফলভাবে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সফল গুণী এই শিল্পী। মঞ্চ দিয়ে শোবিজ অঙ্গনে পথচলা শুরু হয় তার। সেই শুরুর গল্প, মঞ্চের বর্তমান অবস্থান, নিজের ভালোলাগাসহ আরো অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে।

আনন্দধারা : আপনার অভিনয়ের শুরুর গল্পটা...

আজাদ আবুল কালাম : বন্ধু মাসুদ আলি খানের কারণেই মূলত আমার অভিনয়ে আসা। ওর অনেক গুণ ছিল। ও ভালো অভিনয় করত, গান গাইত এবং ভালো গিটার বাজাতে পারত। আর ঘটনাচক্রে ও আমাদের বাসাতেই থাকত। আমি তখন এইচএসসি শেষ করেছি। সে সময় আমরা লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখি করতাম। ও তখন আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার কাছ থেকে নাটকের বিভিন্ন গল্প শুনতে শুনতে পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে এসে ১৯৮৫ সালের অক্টোবরের ২০ তারিখ আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হই। তাছাড়া অভিনয় করা নয়, নাটকসংশ্লিষ্ট লেখা কিংবা নাটক লেখা হয়তো আমি পারব সেই ভাবনা নিয়েই আরণ্যকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে আরেকটা কারণ ছিল।

আনন্দধারা : অভিনয়ে আপনার অনুপ্রেরণা?

আজাদ আবুল কালাম : অভিনয় ভাবনাচক্রে আমার অভিনয়টা শুরু হয়েছে। অনুপ্রেরণার আগে ঘটনাচক্রেই আমি অভিনয়ে এসেছি। আমি যখন নাটকের দলের সঙ্গে কাজ শুরু করি, তখন কেউ না থাকলে নাটকের প্রক্সি দিতাম। একটা সময় যখন ঢাকার বাইরে শো করতে যাই, তখন নাটকের একজন অভিনেতা আমাদের সঙ্গে যেতে পারেননি। প্রক্সি দেয়ার কারণে আমার সংলাপগুলো মুখস্থ ছিল। কিন্তু সংলাপ মুখস্থ থাকলেও অভিনয়টা পারতাম না। নির্দেশক তখন আমাকে বললেন, ওই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। আমি বাধ্য হয়ে অভিনয়টা করি। কোনো ধরনের ইচ্ছা ছিল না আমার। ভেবেছিলাম এই অভিনয়টুকু করলেই হয়তো শেষ আর আমাকে অভিনয় করতে হবে না। হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, মামুনুর রশিদ উনাদের অভিনয় সেই সময় ভালো লাগত, মনে হতো, উনারা চিন্তা করে অভিনয়টা করেন। অনুপ্রেরণার চেয়ে বড় কথা, উনাদের অভিনয় দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করত।

আনন্দধারা : বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কি পছন্দের অভিনয়শিল্পীর পরিবর্তন এসেছে?

আজাদ আবুল কালাম : নিজেও যেহেতু অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভালোলাগার বিষয়টা বিশ্লেষণাত্মক হয়ে ওঠে। একই পেশায় কাজ করার কারণে ভালো লাগার চেয়ে এখন অভিনয়ের ধরনের দিকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। বিশেষভাবে দেখা কেউ ভুল কিংবা খারাপ অভিনয় করছে কিনা। পছন্দ এখন প্রতিদিনই পরিবর্তন হচ্ছে।

আনন্দধারা : আমাদের মঞ্চ নাটকের বর্তমান অবস্থা কী সন্তোষজনক?

আজাদ আবুল কালাম : মঞ্চ নাটকের বর্তমান যে অবস্থা তা অবশ্যই সন্তোষজনক নয়। আমরা যদি পুরো দেশের কথাই বলি, তাহলে সেখানে থিয়েটার খুবই ছোট্ট একটি ভূমিকা পালন করছে। আমাদের মঞ্চ নাটকের প্রদর্শনীর স্থান, নাটকের মান, দর্শক- সব জায়গাতেই সংকট রয়েছে।

আনন্দধারা : মঞ্চ নাটককে কী কখনো পেশা হিসেবে নেয়া সম্ভব হবে বলে আপনি মনে করেন?

আজাদ আবুল কালাম : আমাদের থিয়েটার প্রথম থেকেই আচরণের দিক দিয়ে শতভাগ প্রফেশনাল। ঠিক সন্ধ্যা ৭টায় বেল বাজলেই নাটক শুরু হবে। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের শতভাগ প্রস্তুতি নিয়ে কাজটা করেন। প্রফেশনাল থিয়েটার কিংবা প্রফেশনাল অভিনয়শিল্পীরা যেভাবে কাজ করেন, আমাদের মঞ্চেও ঠিক সেভাবেই কাজ হয়। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে, আমাদের থিয়েটারের লোকজন কোনো টাকা-পয়সা পায় না। এ সংকট খুব সহজে কাটবে বলে আমি মনে করি না। থিয়েটার একটা সেবামূলক কাজ। সরকারের উচিত যারা নিয়মিত থিয়েটার করছে, তাদের একটি নির্দিষ্ট হারে বেতন প্রদান করা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করতে পাবলিকের কোনো টাকা খরচ হয় না। কারণ সেটা চালায় সরকার। থিয়েটারকেও সে রকম জায়গায় সরকারের নিয়ে যাওয়া উচিত। সব সংকটের সমাধান নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। থিয়েটার একটি জাতির অক্সিজেন, দর্পণ ও পরিচিতি। সুতরাং সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে হলেও থিয়েটারকে সেভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।

আনন্দধারা : মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র কোন মাধ্যমে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

আজাদ আবুল কালাম : অভিনেতার স্বাচ্ছন্দ্য বলতে আসলে কিছু নেই। তিনটা মাধ্যমই হচ্ছে তিন রকম। মঞ্চে আমরা দীর্ঘদিন মহড়া করে একটা কাজ করি। টেলিভিশনে খুব স্বল্প প্রস্তুতি নিয়ে খুব দ্রুত কাজ করতে হয়। সিনেমার বাস্তবতা অন্যরকম। সেখানে বড় পরিসরে কাজ করতে হয়। তিনটা মাধ্যমেই কিছু পার্থক্য রয়েছে কিন্তু একজন অভিনেতার জন্য সর্বোপরি অভিনয়টাই করতে হয়।

আনন্দধারা : অভিনেতা না হলে কী হতেন?

আজাদ আবুল কালাম : তা তো জানি না। হয়তো সাংবাদিক হতাম। কারণ আমার পড়াশোনা সাংবাদিকতায়।

আনন্দধারা : অভিনয়ের বাইরে অন্য কোনো শখ?

আজাদ আবুল কালাম : শখ বলতে আসলে কিছু নেই। আমি যখন পড়ি তখন পড়ি শখে, কিন্তু সেটাও আমার জানার জন্য, শেখার জন্য। আবার কখনো কখনো বিনোদিত হওয়ার জন্য। সর্বোপরি প্রতিনিয়তই নতুন নতুন জিনিস শিক্ষার মধ্য দিয়ে শেখাটাও শিক্ষায় পরিণত হয়ে যায়।

আনন্দধারা : আপনার মজার কোনো স্মৃতি?

আজাদ আবুল কালাম : অনেক অনেক মজার স্মৃতি রয়েছে। সবচেয়ে বড় মজার স্মৃতি হচ্ছে, প্রায় ১০-১২ বছর আগে একজন বয়স্ক মহিলা টেলিভিশনে আগের দিন আমার একটি নাটক দেখে আমাকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। একদিন একজন লোক মসজিদের সামনে আমাকে দেখে দোয়া করে ফুঁ দিলেন। আর বললেন ‘তুমি বেঁচে থাকো আরো অনেক ভালো কাজ করো।’

আনন্দধারা : আপনার কোনো অপ্রাপ্তি?

আজাদ আবুল কালাম : এই অপ্রাপ্তি নিয়ে ভাবাটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। একজন মানুষ জীবনে সবকিছু পাবে না। কিছু হয়তো পাবে কিছু হয়তো পাবে না, এটাই তো বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতা মেনে নেয়ার মতো স্মার্টনেস আমার আছে বলে আমি মনে করি।

আনন্দধারা : অবসর সময় কাটে কীভাবে?

আজাদ আবুল কালাম : আমার কোনো অবসর সময় নেই। আমি সবসময় কাজের মধ্য থাকতে ভালোবাসি। কাজের সুবাদে অনেক দেশে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু একবার থাইল্যান্ডে সাতদিনের জন্য ঘুরতে গিয়েও আমাকে একটি কর্মশালা করতে হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে অবসর বলতে কিছু নেই।

আনন্দধারা : প্রিয় লেখক?

আজাদ আবুল কালাম : দেশ এবং দেশের বাইরে আমার প্রিয় লেখকের সংখ্যা অনেক। ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলা গদ্য সাহিত্যে যে বড় পরিবর্তনগুলো হয়েছে, সে সময় অনেক লেখকের লেখাই আমাকে আন্দোলিত করেছে। যদি বলি সুবিমল মিশ্র, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী এদের নাম বলতে হবে। আবার সব লেখকই যে প্রিয় তা কিন্তু নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদারের অনেক লেখা পড়ে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।

আনন্দধারা : আরণ্যক ও প্রাচ্যনাটে আপনার অভিনীত মঞ্চ নাটক?

আজাদ আবুল কালাম : যে থিয়েটারটা করে আমি আনন্দ পাই ওটাই আমার পছন্দের এবং ভালো ওটাই করতে আমার ভালো লাগে। আরণ্যকের কথা যদি বলি তাহলে লালখাঁর পালা, ইবলিশ, জয় জয়ন্তি, আমি নিজে নির্দেশনা দিয়েছিলাম আগুন মুখা- ওটাও আমার খুব পছন্দের। এছাড়া প্রাচ্যনাটের ‘সার্কাস সার্কাস’, ‘কইন্যা’, ‘এ ম্যান ফর অল সিজনস’- এগুলো আমার খুব পছন্দের নাটক। এগুলো কাজ করতে আমি খুব এনজয় করি।

আনন্দধারা : ‘আরণ্যক ছেড়ে প্রাচ্যনাট’- এর পেছনে কারণ কী?

আজাদ আবুল কালাম : এটা তেমন কোনো বিষয় না। এটাও একটি ঘটনাচক্র মাত্র। এমনটা ঘটতে পারে এটাও স্বাভাবিক। তাই বলে এমন নয় যে আরণ্যকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। আরণ্যকের যে স্কুল আছে, সে স্কুলে আমি ক্লাস নেই এখনো। আরণ্যকের কোনো নাটক খারাপ হলে আমি ভীষণভাবে বেদনার্ত হই। আরণ্যকের কোনো কাজ ভালো হলে আমি ওটাকে নিজের মাঝে ধারণ করি। মনে হয় ওটা আমারই নাটক। আরণ্যকের নাটক দেখতে গেলে কখনোই মনে হয় না আমি ওই দলে ছিলাম না। এখনো মনে করি আমি আরণ্যকেরই সদস্য। আরণ্যকের সবার সঙ্গে এখনো আমার খুব ভালো সম্পর্ক। কারণ আরণ্যক আমার ঘর এবং আমি এই ঘর থেকেই তৈরি হয়েছি।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় অভিনয় শিল্পী?

আজাদ আবুল কালাম : দেশ এবং দেশের বাইরে অনেক অভিনয় শিল্পী রয়েছেন যারা আমার অনেক পছন্দের। তবে নির্দিষ্ট করে এমন কেউ নেই। যেহেতু আমি নিজে অভিনয় করি, তাই আমার পক্ষে সম্ভব না কারো অন্ধভক্ত হয়ে যাওয়া।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।