লতাজির মতো মানুষের কাছ থেকে আশীর্বাদ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার -রুনা লায়লা

সংগীত জীবনের ৫০ বছর পেরিয়ে এসেছেন কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী রুনা লায়লা। সম্প্রতি ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবির গানের জন্য সংগীত পরিচালক হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বহুবার এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। রুনা লায়লা এবার উপমহাদেশের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে, হরিহরণ, রাহাত ফতেহ আলি খান, আদনান সামির জন্য গানের সুর করেছেন। ‘লিজেন্ডস ফরএভার’ শিরোনামে গানগুলো ১৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। গানগুলো তৈরির নেপথ্য কথা আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন কিংবদন্তি এই কণ্ঠশিল্পী।

 

রাফি হোসেন : রুনা লায়লা আপনাকে অভিনন্দন জানাই এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার জন্য। এটি আপনার কততম পুরস্কার?

রুনা লায়লা : গানের জন্য আমি বহুবার এই পুরস্কার পেয়েছি। এবারেরটা প্রথম পেলাম সংগীত পরিচালক হিসেবে। ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবিতে আলমগীর সাহেবের নির্দেশনা, পরিচালনা, প্রযোজনায় সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেলাম, এটা বিরাট একটা পাওয়া।

রাফি হোসেন : তাহলে এবারের এই পুরস্কারটা আপনার জন্য একটা বিশেষ পুরস্কার?

রুনা লায়লা : সত্যিই এটা আমার জন্য একটা বিশেষ পুরস্কার। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, আমার এই সুর করা গানের জন্য প্রথম সেরার পুরস্কারটি পেলাম।

রাফি হোসেন : আলমগীর সাহেবও এবার পুরস্কার পেয়েছেন।

রুনা লায়লা : উনি আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। উনার ছবিও অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছে।

রাফি হোসেন : আপনি সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পেয়েছেন। কিন্তু আরো একটা চমক রয়েছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের চারজন শিল্পী- তানি লায়লা, আঁখি আলমগীর, লুইপা, হৈমন্তী রক্ষীমানের জন্য চারটা গানের সুর করেছিলেন। সেটা আপনারা জানেন। এবার যেটা বড় চমক সেটা হচ্ছে- আশা ভোঁসলে, হরিহরণ, রাহাত ফতেহ আলি খান, আদনান সামি ও রুনা লায়লা নিজের জন্য পাঁচটা গানের সুর করেছেন। আপনাদের এই জার্নিটা নিয়ে শুনতে চাই?

রুনা লায়লা : একটা কোম্পানির জন্য এখানে আমি পাঁচটা সুর করলাম। এত বড় একটা প্রজেক্টে কারো সহযোগিতা না থাকলে করা সম্ভব হতো না। পরবর্তী সময়ে কবির বকুলের সঙ্গে আলাপ করলাম এবং সে তিনটি গান লিখেছে। ওকে বললাম প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে আমাদের একটা মিটিং করিয়ে দাও। তিনি আমাদের খুব কাছের। তার সঙ্গে বসলাম, উনাকে আমার স্বপ্নের প্রজেক্টের কথা বললাম। কিছুদিন পরই উনি বললেন এটা করা যাবে। আপনি যেভাবে চাচ্ছেন সেভাবেই হবে। সিটি ব্যাংকের একটা স্পন্সর পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলাম কাজটি করব।

রাফি হোসেন : তারপর কি শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন?

রুনা লায়লা : গায়ক-গায়িকাদের বিষয়ে আমি আগে থেকেই চিন্তা করে রেখেছিলাম। একটা আশাজি গাইবেন, আদনান সামির সঙ্গে একটা ডুয়েট করেছি, রাহাত ফতেহ আলি গেয়েছেন একটা, একটা সোলো গেয়েছি। সোলো গানটা আমি লতাজির জন্য বানিয়েছিলাম। খালি গলায় গেয়ে গানটি উনাকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি সেটা পছন্দ করেছিলেন। উনি আমাকে জানিয়েছিলেন গানের সুরটা শুনে আমার আগেকার দিনের কথা মনে পড়ে গেছে। আগে যে ধরনের সুর হতো, মিউজিক হতো। যদি আমার শরীর ঠিক থাকে, তাহলে আমি অবশ্যই গাইব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উনার শরীর ভালো ছিল না। তারপর উনি বললেন, আমি একটা ভয়েস মেসেজ করে দেব। তিনি একটা ভয়েস মেসেজ দিয়েছেন। যখন গানগুলো শেষ হবে তখন সেটা থাকবে। এটাও একটা বিরাট পাওয়া যে লতাজির মতো একজন বড় মাপের মানুষের কাছ থেকে আশীর্বাদ পাওয়া। প্রত্যেক শিল্পী আমার সঙ্গে অনেক সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করেছেন। নিজেরা ফোন করে আমাকে বলেছেন কবে করবেন কাজটা। আমরা এটার মধ্যে একটু এমন করলে কেমন হয়। আদনান সামি যেমন বলল, আপনি যদি বলেন তাহলে আমি মিউজিকের আয়োজন করতে পারি। ট্র্যাকগুলো করেছি লন্ডনে এবং আয়োজন করেছে রাজা ক্যাশপ। আগের গানগুলোও রাজা করেছিল। ভিডিও করা হয়েছে, এগুলো করেছে শাহরিয়ার পলক।

রাফি হোসেন : নতুন গানগুলোর কি ভিডিও হয়েছে?

রুনা লায়লা : হ্যাঁ হয়ে গেছে। ১৩ ডিসেম্বর এটা প্রকাশ পাবে। সব কাজ শেষ। আদনান সামি আমাকে ফোন করে বলল আমি একটা পিস বাজিয়ে দিই। ও তো পিয়ানোর মাস্টার। গিনেজ বুকে ফাস্টেস পিয়ানোকুলার। আমি বললাম এটা তো আর বলার কিছু নেই। ওর জন্য একটা জায়গা রাখা হলো, ও সেখানে বাজাবে। সে ট্র্যাকটা আগে আমাকে পাঠিয়ে দিতে বললেন। আমি আগেই এটা বাজিয়ে তৈরি করে রাখব। আশাজি অনেক বাংলা গান গেয়েছেন কিন্তু হরিহরণ, আদনান সামি, রাহাত ফতেহ আলি কোনোদিন বাংলা গান গাননি। প্রথম তারা আপনার জন্য গাইলেন। তারা সবাই একটু চিন্তিত ছিলেন বাংলা উচ্চারণ নিয়ে। আমি বললাম পারবেন, অসুবিধা নেই। এত ভালোবাসা, সম্মান, শুভকামনা পেয়েছি ওদের কাছ থেকে, এগুলো  আসলে টাকা দিয়ে কেনা যায় না। রাফি তোমাকে অনেক ধন্যবাদ এমন আইডিয়াটা আমাকে দেয়ার জন্য।

রাফি হোসেন : আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে আপনি সব জায়গায় আমার নাম বলছেন।

রুনা লায়লা : এখানে তোমার নাম না বললে বেইমানি করা হয়ে যাবে। কারণ এই আইডিয়াটা তুমিই আমার মাথায় দিয়েছ এবং ওইটা নিয়ে তুমি-আমি অনেক চিন্তাও করেছি। যা-ই হোক কাজটা ভালোভাবে শেষ হয়েছে এটাই বড় কথা।

রাফি হোসেন : বাংলা গানের ক্ষেত্রেও এটা একটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। লিজেন্ডারি শিল্পীরা আপনার সুরে গান গেয়েছেন- সবকিছু মিলিয়ে এটা একটা বড় সংযোজন হয়ে থাকবে।

রুনা লায়লা : এটা অনেক কঠিন একটা ব্যাপার কিন্তু আমি এত সহজভাবে ওদের পেয়ে যাব ভাবিনি। এটা নিয়ে ওরা আগে থেকেই প্র্যাকটিস করছে, গান তুলছে। এগুলো আসলে অবিশ্বাস্য। গানগুলো শোনার পর বুঝবে কী গেয়েছে তারা। জানপ্রাণ দিয়ে গেয়েছে।

রাফি হোসেন : অফিশিয়ালি কীভাবে এটা মুক্তি পাবে?

রুনা লায়লা : সিটি ব্যাংক ও প্রথম আলোর মাধ্যমে এটা অনলাইনে যাবে। মূলত সিটি ব্যাংক এটা উদ্যোগ নিয়েছে এবং ১৩ ডিসেম্বর এটা মুক্তি দেয়া হয়েছে।

রাফি হোসেন : সেদিন তো হরিহরণও আসছেন?

রুনা লায়লা : তাকে আমি বলেছি তুমি গানটা মুখস্থ করে এসে গেয়ে দিও।

রাফি হোসেন : গান নিয়ে আপনার আর কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

রুনা লায়লা : এই প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে বেশি উৎসাহী। দেখা যাক ওইরকম সুযোগ হলে তাদের নিয়ে কাজ করব। আরো কিছু লিজেন্ডারি শিল্পীকে নিয়ে কাজ করতে চাই। এই গানগুলো বের হওয়ার পর আমার মনে হয় আরো অনেকে এগিয়ে আসবে।

রাফি হোসেন : আপনার সুর করা এই গানগুলোর কারণে বাংলা গান এখন আন্তর্জাতিকভাবে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

রুনা লায়লা : আশা করছি এই গানের মাধ্যমে আমরা একটা বিরাট সাফল্য অর্জন করব। ভালো গান অবশ্যই হচ্ছে। কিন্তু যে ধরনের গান করেছি, একটু সেমি ক্ল্যাসিক্যাল ধরনের। আমি চাই এই ধরনের গানগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। তারা এটাকে গ্রহণ করুক এবং মেলে ধরুক। এর মধ্যে একটা ফাস্ট গানও রয়েছে, যেটা আমি আর আদনান সামি গেয়েছি। সেটা শুনেও মানুষ মজা পাবে। আর বাকি যে গানগুলো রয়েছে, সেগুলো মেলোডিয়াস ক্ল্যাসিক্যাল।

রাফি হোসেন : আমি নিশ্চিত যে আমাদের শ্রোতাদের গানগুলো অনেক ভালো লাগবে। রুনা লায়লার ভক্তরা তো আছেই, সঙ্গে সঙ্গে আদনান সামি, রাহাত ফতেহ আলি খান, আশা ভোসলে ও হরিহরণ আছেন।

রুনা লায়লা : এটার পেছনে আমরা অনেক খেটেছি। মিউজিক থেকে ট্র্যাক, রেকর্ডিং, গান, বসে এগুলো ঠিকঠাক করা, ভিডিও করা। রাত-দিন সবাই কাজ করেছি। এগুলো আসলে টিমওয়ার্ক। একা কিছু করতে পারতাম না। সবাই অনেক উৎসাহ নিয়ে মনপ্রাণ থেকে কাজ করেছেন।

রাফি হোসেন : মিউজিক ভিডিও কি মুম্বাইতে করা হয়েছে?

রুনা লায়লা : না, সব এখানেই হয়েছে। সব তরুণ ছেলে-মেয়েরা কাজগুলো করেছে। তাদের উপস্থাপনা ও কাজ অনেক সুন্দর। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। আশা করি এরা ভবিষ্যতেও ভালো কাজ করে যাবে।

রাফি হোসেন : এ রকম দারুণ দারুণ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করেন। বাংলা গান সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাক- এই প্রত্যাশাই করি।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup