বছরের আলোচিত যত নাটক

বছর শেষ। এখন হিসাব-নিকাশের পালা। মানুষ যেমন বছর শেষে সারা বছরের কর্মপরিধি নিয়ে একান্তে বসে হিসাব মিলিয়ে দেখতে চান। শোবিজ অঙ্গনেও চলে তেমনই হিসাব-নিকাশের পালা। দর্শকপ্রিয়তা কিংবা কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রিয় শিল্পীর কাজের খবর জানতে কৌতূহল থাকে পাঠক মনে। সারা বছর টিভির রিমোট ঘুরিয়ে কিংবা অনলাইনে প্রিয় শিল্পীর কাজ দেখেছেন দর্শক। যার মধ্য থেকে দর্শক মনে ধরেছে বেশ কিছু নাটক-টেলিফিল্ম। বছর শেষে আনন্দধারার আয়োজনে আলোচিত নাটক নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রতিবেদন-

মিস শিউলী

বাড়িতে আগন্তুক এসে সমস্যা সমাধান করার ব্যাপারটি আমরা হুমায়ূন আহমেদের নাটক এবং সিনেমায় দেখেছি। আশফাক নিপুণের নির্দেশনায় ‘মিস শিউলি’তেও এমনই গল্প ফুটে উঠেছে, তবে সেটা ভিন্ন আঙ্গিকে। ‘মিস শিউলি’ চরিত্রে অপি করিম প্রাণবন্ত অভিনয় করে দর্শকদের মন জিতে নিয়েছেন। বাড়ির ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো। তোতলার চরিত্রে তিনিও দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। আবুল হায়াত, সাফা কবির, ইয়াশ রোহান, শিল্পী সরকার অপু এবং সুমন পাটওয়ারী প্রত্যেকেই নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন। আমাদের টিভি নাটক দেখা মানেই সপরিবারে উপভোগ করা। আগে এমন পারিবারিক গল্পের নাটক প্রচুর হলেও দিন দিন পরিবারকেন্দ্রিক নাটক একেবারেই কমে যাচ্ছে। সেই জায়গায় ‘মিস শিউলী’ টেলিফিল্মটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

 

জয়েন ফ্যামিলি

মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র। আপন সুখের সন্ধানে সবাই মরিয়া। যেখানে ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনেরও ঠাঁই নেই। বাস্তব জীবনের ঠিক তেমনই এক ছায়া নিয়ে নির্মিত নাটক ‘জয়েন ফ্যামিলি’। পারিবারিক ঘরানার এ নাটকে পিতা-মাতাহীন অবহেলিত এক মেয়ের গল্প তুলে ধরেছেন নন্দিত নাট্যকার বৃন্দাবন দাস। বৃন্দাবন দাস মানেই সাবলীলভাবে জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে মানুষকে আবেগতাড়িত করে ভাবনার উদয় ঘটানো। ‘জয়েন ফ্যামিলি’ নাটকটিতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। দীপু হাজরার পরিচালনায় নাটকটির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে শাহনাজ খুশির অভিনয় বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে দর্শকদের। শাহনাজ খুশির চোখ বেয়ে পড়া জল ভিজিয়েছে দর্শকদেরও অন্তর। নাটকটিতে চঞ্চল চৌধুরী ছিলেন বরাবরের মতোই অনবদ্য। পারিবারিক জীবনঘনিষ্ঠ এ নাটকে বৃন্দাবন দাস, নাজনীন হাসান চুমকি, নাদিয়া আহমেদ, দিব্য জ্যোতি, সৌম্য জ্যোতিসহ প্রত্যেকের অভিনয় নজর কেড়েছে দর্শকদের।

ব্লেড

‘ব্লেড’-এর কাহিনী একেবারেই আমাদের আশপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিরূপ। বাসে চড়ার সময় মাঝে মাঝেই মনে হয় আপত্তিকর কিছু একটা ঘটছে। হঠাৎ ধাক্কা লাগা, দেহের আপত্তিকর জায়গায় ছোঁয়া ইত্যাদি। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি প্রতিদিনই হতে হয় নারীদের। একদিন দেখা যায় বাসের মধ্যে একটি মেয়ের গায়ের কাপড়ের একটা অংশ ব্লেড দিয়ে কাটা। পাবলিক প্লেসে এ রকম ঘটনা ঘটছে আজকাল। যারা এসব ঘটনা ঘটায়, তাদের কি শাস্তি পাওয়া উচিত? তারা কি আদৌ শাস্তি পাচ্ছে? হ্যাঁ, খারাপ মানুষেরা শাস্তি অবশ্যই পায়। কেউ আইনের সাহায্যে পায় আর কেউ আপন মানুষের কাছ থেকে। নাটকের কাহিনী এই রকম অপরাধ এবং এর শাস্তি নিয়েই গড়ে ওঠা। মুশফিক আর ফারহান ও পরশা ইভানার অভিনয়ে দর্শকরা তৃপ্তি পেয়েছেন। মাবরুর রশিদ বান্নাহর প্রযোজনায়, তৌহিদ আশরাফের পরিচালনায় বছরের অন্যতম আলোচিত নাটক ‘ব্লেড’।

আঙুলে আঙুল

‘আমি ধর্ষক আর এটাই আমার পরিণতি’। কিছুদিন আগে ধর্ষক খুন হওয়ার পর এভাবেই তার গায়ে লিফলেট টাঙানো ছিল। কেউ জানত না কে তাদের খুন করেছে। ধর্ষণ ও তার শাস্তি নিয়ে সমসাময়িক সামাজিক সমস্যার নাটক ‘আঙুলে আঙুল’। তিশা রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ পড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে। বাড়ির লজিং মাস্টার তাহসান তাকে উৎসাহ দেয়। তিশার বিয়ে ঠিক হলে তাকে স্বপ্ন দেখানো তাহসানের সঙ্গে রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। তাদের নতুন জীবন শুরু হয়। সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু একটি রাত এক পলকে সব ওলট-পালট করে দেয়। আবির্ভাব ঘটে এক অজ্ঞাতনামার। কে এই অজ্ঞাতনামা? তিশা বরাবরের মতোই অসাধারণ অভিনয় করেছেন বলে দর্শকদের মত। তাহসান তার চেনা গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার কিছু অভিব্যক্তি দর্শকদের নজরে পড়েছে। ‘আঙুলে আঙুল’ এ সময়ের সমাজ বাস্তবতার চিত্র বলে মনে হয়েছে দর্শকদের।

শিশির বিন্দু

মোস্তফা কামাল রাজের গল্প ও পরিচালনায় অবয়ব সিদ্দিকী মিডির রচনায় এ বছরের অন্যতম নাটক ‘শিশির বিন্দু’। অপূর্ব ও তানজিন তিশা অভিনীত নাটকটি দর্শকদের কাছে ভালো লেগেছে। নাটকের সংলাপগুলো বেশ জোরালো যেন সেটা নিজের সঙ্গেই ঘটছে, এমন মন্তব্য দর্শকদের। অপূর্ব ও তানজিন তিশা ছাড়াও নাটকের অন্য অভিনেতারাও দর্শকদের চোখে লেগেছেন। শতাব্দী ওয়াদুদ ও সুষমা সরকারের অভিনয় দর্শকরা উপভোগ করেছেন। নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড প্রশংসিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ঘোর তৈরি করে রাখা নাটকটি আলোচিত নাটকগুলোর মধ্যে একটি। এমন একটা জায়গায় এসে নাটকটা শেষ হয়, যেখানে বেরিয়ে আসে দর্শকদের দীর্ঘশ্বাস আর এটাই পরিচালকের মুন্সিয়ানা।

২২শে এপ্রিল

চোখে আঙুল দিয়ে বাস্তব দেখিয়ে দিল ‘২২শে এপ্রিল’। আমাদের দেশে বড় বড় যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেই তারিখগুলোকে মানুষ মনে রাখে। বিশেষ করে যারা সেসব দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়েছে, তাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। গুলশানের হোলি আর্টিজান, চকবাজারের আগুন, বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন এ ঘটনাগুলো কেউ কি ভুলতে পারবে! এ বাস্তব ঘটনাগুলোকে মাথায় রেখে মিজানুর রহমান আরিয়ান নির্মিত সময়ের সাহসী নাটক ‘২২শে এপ্রিল’। অপূর্ব তার ছোট্ট মেয়েকে বুঝিয়ে খালার কাছে রেখে শহরে এসেছে কাজে। মেয়ের জন্য এটা-ওটা কিনেছে। ইরেশ যাকের মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে কথা দিয়ে অফিসে গেছে। ভালোবাসার জুটি মনোজ কুমার-তানজিন তিশা আর মেহজাবিন-তামিম মৃধা আলাদা দুটি গল্পে আছে। আফরান নিশোর গল্পটিও আলাদা। শহীদুজ্জামান সেলিম অফিসের বস যার মাথা গরম। তাকে সামাল দিতে ইরেশ ও নাবিলা ব্যস্ত। গল্পগুলো একটা জায়গায় এসে মেশে। অর্থাৎ দুর্ঘটনাস্থলে। এ ধরনের নাটক নির্মাণের জন্য পরিচালক মিজানুর রহমান আরিয়ান প্রশংসার দাবিদার।

আমাদের দিনরাত্রি

আমাদের দিনরাত্রি নাটকটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন মাবরুর রশীদ বান্নাহ। অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম, অপর্ণা ঘোষ। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা আর জীবনযাপনে সততার মূল্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকের গল্প। এ নাটকের শেষটা দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়। সুন্দর নির্মাণ, কাহিনীর গাঁথুনি এবং সাবলীল অভিনয়- এসব কারণে নাটকটি দেখা যেতে পারে।

উবার
বাবারা বটবৃক্ষের মতো। পরিবারকে নীরবে ছায়া দিয়ে যান। কিন্তু কখনো সন্তান সেটা বুঝতেই পারে না। উপরন্তু তাদের ভুল বোঝে সব সময়। বাবারা অনেকটা নারিকেলের মতো। বাইরেরটা শক্ত খোলসে ভরা হলেও ভেতরে অমৃতরূপী জল। তৌসিফ-সাবিলা পালাতে যায়। সাবিলার ধারণা বাবা-মা তাকে ভালোবাসে না। কিন্তু সে জানে না তার বাবা-মা তাকে কতটা ভালোবাসে। বাবা নামের মানুষটি বট বৃক্ষের মতো নীরবে ছায়া দিয়ে যায়। মেয়ের স্কুটি কেনার জন্য টাকা জোগাড় করতে অফ ডেতে উবার চালায়। তৌসিফ-সাবিলা যে গাড়িটিতে করে পালাতে যায়। সে গাড়ির ড্রাইভার সাবিলার বাবা। এমনই এক গল্পে নির্মিত হয়েছে এ বছরের আলোচিত নাটক ‘উবার’। গৎবাঁধা গল্পের ভিড়ে এমন ভিন্ন গল্পে নাটকটি নির্মাণ করেছেন সাজিন আহমেদ বাবু। যেটির চিত্রনাট্য করেছেন তিনি নিজেই। নাটকটি দেখার পর দর্শক মনে ভাবনার উদয় হবে।

লেডি কিলার

মাবরুর রশীদ বান্নাহর পরিচালিত ‘লেডি কিলার’ নাটকটিতে অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা ও তাহসান। নাটকে তিশার চরিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। পাড়ার সহজ-সরল ছেলেকে ভালোবাসে সেই পাড়ার মহিলা মাস্তান। অর্থাৎ, আমাদের সমাজে যা চলে তারই বিপরীত রূপ দেখা যায় এই নাটকে। তবে বিপরীত চরিত্রায়নের আড়ালে নাটকে ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান পাওয়া যায়। আর এটিই নাটকের বিশেষত্ব।

প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা

বাংলা নাটকের জনপ্রিয় জুটি নিশো-মেহজাবিনের অভিনয়ে নাটকটি সমাজের এক বিশেষ সমস্যার কথা তুলে ধরে। অপূর্ণ রুবেলের রচনা এবং মিজানুর রহমান আরিয়ানের পরিচালনায় দাম্পত্য জীবনের টানাপড়েন, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের জন্য ভালোবাসা- এসব কিছুই উঠে এসেছে নাটকটিতে। নাটকটির আরেকটি বিশেষ দিক এর জোরালো সংলাপ।

সুইজারল্যান্ড

নবদম্পতির সুইজারল্যান্ড হানিমুন নিয়ে তৈরি এ নাটক। কৃপণ বর আর স্বপ্নবিলাসী স্ত্রীর যুগলবন্দির এ নাটকটি রচনা করেছেন মাসুম শাহরিয়ার এবং পরিচালনা করেছেন চয়নিকা চৌধুরী। এই নাটকে জুটি হয়ে অভিনয় করেছেন রিয়াজ ও অপি করিম

আমাদের সমাজবিজ্ঞান

আমাদের সমাজের বিজ্ঞানটা অনেক আগে থেকেই একদম বাঁধাধরা, যেখানে মুক্ত চিন্তার কোনো অবকাশ নেই, যেখানে বাঁচতে হয় অন্যরা কী বলবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। পারিবারিক শেকলের নির্মমতার সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এখানে, যেমন : ছেলেধরা, ধর্ষণ, ডেঙ্গু ইত্যাদি। এই সমাজের বিষ বাতাসে কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যেতে হয়, সেটা অসাধারণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে শাফায়েত মনসুর রানার ‘আমাদের সমাজবিজ্ঞান’-এ। দেখতে দেখতে কোনো এক সময় স্ক্রিনে আপনি হয়তো নিজেকেই দেখবেন, আর এখানেই পরিচালকের সাফল্য। এতে অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনেতা ইয়াশ রোহান, ফখরুল বাশার, মিলি বাশার, তারিক আনাম খান, তানজিকা আমিন, তানিয়া আহমেদ প্রমুখ।

এই শহরে

ব্যস্ত এই শহরে অনেকের জীবন যাপিত হয় একটু ভিন্নভাবে, অপরাধের মাধ্যমে। অপরাধ কখনো কেউ একা করে, কেউ কাউকে নিয়ে করে। নির্মাতা আশফাক নিপুণ এই শহরের একটি গল্প বলেছেন একটি অপরাধী পরিবারের মাধ্যমে। স্ত্রী হাসপাতালের নার্স। হাসপাতালে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া বাচ্চাকে সে চুরি করে এনে দেয় স্বামীর হাতে। স্বামী তুলে দেয় দালালের হাতে। আর দালাল তুলে দেয় বিভিন্ন পার্টির হাতে। ঘটনাক্রমে একটি বাচ্চাকে কয়েকদিনের জন্য নিজের কাছে রাখতে হয় আর তখনই মাতৃত্ববোধের কাছে গ্রাস হয়ে যায় অপরাধ করার ইচ্ছা। আশফাক নিপুণের পরিচালনায় ‘এই শহরে’ নাটকে নিজের সেরাটা দিয়েছেন মেহজাবিন চৌধুরী ও আফরান নিশো।

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

এক জাদুকর তার জাদুর খালি বাক্সে জাদু দিয়ে আপেল, কবুতর এগুলো আনত। হঠাৎ করেই একদিন তার জাদুর বাক্সে একটি ছোট্ট মেয়েকে আবিষ্কার করে। সবাই তার এই জাদুর প্রশংসা শুরু করে, ভালোলাগা তৈরি হয় সেই জাদুকরের মনে। তবে আস্তে আস্তে মিথ্যা ভালোলাগাটা যেন জাদুকরের মনে বিদ্রোহ শুরু করে দেয়। এভাবে শুরু হয় ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’-এর গল্প। ইফতেখার আহমেদ ফাহমি ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ দিয়ে ফিরলেন দীর্ঘদিন পর। আবারো দেখিয়েছেন নিজের মুন্সিয়ানা। যাদের জন্য নাটকটি শেষ করে দর্শক মুগ্ধতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়, তারা হলেন চঞ্চল চৌধুরী আর নুসরাত ইমরোজ তিশা। এছাড়া সোহেল খান এবং গুলশান আরার কমেডি দেখে মন থেকে হাসতে বাধ্য প্রতিটি দর্শক। এভাবেই নির্মাতা ফাহমি হাসি আর রহস্যের ধূ¤্রজালে দর্শকদের কিছু সময়ের জন্য আটকে রেখেছিলেন স্ক্রিনের সঙ্গে।

পতঙ্গ

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে ‘পতঙ্গ’ নির্মাণ করেছেন পরিচালক রাফাত মজুমদার রিংকু। কিছু পতঙ্গ আছে যারা ক্ষণিকের সুখের জন্য নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ঝাঁপ দেয় আগুনে। কোনো না কোনোভাবে আমরা মানুষরাও অনেকটা পতঙ্গের মতোই। আরো সুখের কামনায় সারাটা জীবন ঘুরে ফিরি অচেনা মোহের পিছে পিছে, বেশির ভাগ সময় যার শেষটা হয় আগুনে ঝাঁপ দেয়া পতঙ্গের মতোই। মানবজীবনের এমন চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য নিয়েই নির্মিত হয়েছে ‘পতঙ্গ’। নাটকটিতে অভিনয় করে দ্যুতি ছড়িয়েছেন মেহজাবিন আর আফরান নিশো। তাছাড়া এই নাটকের ‘জামদানি শাড়ি’ গানটা মুগ্ধ করবে সবাইকে।

আশ্রয়

আমরা সাধারণত সন্তান অ্যাডপ্ট করার কথা জানি বা করি কিন্তু কখনো কোনো নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাকে বাবা-মা হিসেবে অ্যাডপ্ট করার কথা চিন্তা করেছি? মনে হয় না! তরুণ নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ পরিচালিত ‘আশ্রয়’ নাটক মূলত বাবা-মা অ্যাডপ্ট করার এই থিমের ওপর বেজ করেই বানানো। নাটক শেষ করে ভাবতে হবে দর্শকদের। যদি সত্যিই বাবা-মা অ্যাডপ্ট করা যেত, তাহলে আর কোনো বৃদ্ধাশ্রমের বাতাসে হাহাকার উড়ে বেড়াত না, ক্লান্ত দুপুরে কোনো সন্তানহীন বাবার মনে অব্যক্ত বিষাদ জমাট বাঁধত না! যারা পরিবার নিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের সঙ্গে একটি সুন্দর সময় কাটাতে চান, তাদের কাছে বেস্ট চয়েজ হতে পারে ‘আশ্রয়’। এখানে আছে নির্মাতার একটি মেসেজ, যে মেসেজটি বর্তমানে প্রতিটা পরিবারে খুব বেশি দরকার। এই নাটকে অভিনয় করেছেনÑ মোশাররফ করিম, তাহসান, নুসরাত ইমরোজ তিশা ও জাকিয়া বারী মম।

লাইফ ইন্স্যুরেন্স

একটি বেসরকারি ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠান, যাদের হাতে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের সবটুকু সম্বল বিশ্বাস করে তুলে দেয়। হঠাৎ মানুষদের সেই শেষ সম্বল নিয়ে পালিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। মানুষ তাদের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে কর্মকর্তাদের। ছেলেকে মিথ্যা ঋণের হাত থেকে মুক্ত করতে মা তার জীবন বিসর্জন দেন। ফলে মায়ের লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা পায় তার পরিবার, পরিবার মুক্ত হয় মিথ্যা ঋণের বোঝা থেকে। আমাদের সমাজের এই চিরচেনা গল্পকে নিজস্ব ঢঙে ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ নামের নাটকে রূপান্তরিত করেছেন ভালোবাসার গল্পকথক মিজানুর রহমান আরিয়ান। নির্মাতার অন্যান্য নাটকের মতো এই নাটকটিতেও রয়েছে মন ভালো করে দেয়া কিছু ডায়লগ। এখানে অভিনয় করেছেন অপূর্ব ও মিথিলা।

লাইফ অব জলিল

৪৬ বছর আগে লেখা গল্পের সঙ্গে হুবহু মিলে যায় ৪৬ বছর পরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা! এটাকে আপনারা কী বলবেন? বাস্তব জীবনে কি তেমন কো-ইন্সিডেন্স হয়? হয়তো হয়, আমরা জানি না বা বুঝতে পারি না! তেমনই একটি আড়ালে থেকে যাওয়া কো-ইন্সিডেন্স নিয়ে এগিয়েছে ‘লাইফ অব জলিল’-এর কাহিনী। নিশোর সঙ্গে সম্পর্ক করে সাফা তার বাবার চিকিৎসার কথা বলে টাকা নেয়। সেই টাকা দিয়ে অন্য একটা ছেলের জন্য বাইক কেনে। সাফা প্রতারণা করে সহজ-সরল নিশোর সঙ্গে। দগদগে একটা ঘা নিয়ে জীবন কাটাতে থাকে নিশো। অনেক দিন পর ঘটনাক্রমে নিশো বিয়ে করে সাফাকে, কিন্তু এই বিয়ে কি ভালোবাসার বিয়ে নাকি অন্যকিছু? এই প্রশ্নের উত্তরে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তরুণ নির্মাতা ভিকি জাহেদ। ভিকি জাহেদের নির্মাণ মানেই শেষে একটা জোর ধাক্কা, জলিলও খেয়েছে সেই ধাক্কাটি, আর জলিলের সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা খাবেন দর্শকও। দারুণ মেকিং, প্রেজেন্টেশন আর আফরান নিশো ও সাফা কবিরের অভিনয় মুগ্ধ করবে সব দর্শককে।

স্বপ্ন দেখি আবারো

স্বপ্ন দেখে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি মানুষের জীবনেই আছে কিছু না কিছু স্বপ্ন সত্যি করার ইচ্ছা। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত- সমাজের প্রতিটা স্তরের মানুষের জীবন যাপিত হয় সেই স্বপ্নকে সত্যি করার আকাক্সক্ষা নিয়ে। কিন্তু শুনতে তেতো লাগলেও এটা সত্য, উচ্চবিত্তদের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া নিম্নবিত্তদের স্বপ্ন পূরণ অনেক কঠিন! তাই হয়তো অনেক নিম্নবিত্ত মানুষ স্বপ্ন দেখাই ছেড়ে দিয়েছে! ‘স্বপ্ন দেখি আবারো’ নাটকটি মূলত নিম্নবিত্ত দু’জন স্বপ্নবাজ মানুষের গল্প, যাদের স্বপ্ন ভাঙে প্রতিটি ক্ষণে! তবুও তারা স্বপ্ন দেখে নতুন একটি ভোরের, যে ভোরের সূর্যকিরণ তাদের দেবে সুখের কোনো বার্তা।‘স্বপ্ন দেখি আবারো’ নির্মাতা মাহমুদুর রহমান হিমির সেরা কাজ বললে ভুল হবে না একদমই। অভিনয়ে ছিলেন মেহজাবিন, শ্যামল মাওলা। আর এই নাটকের গল্প মেহজাবিনের নিজের।

দরজার ওপাশে

আচ্ছা আন্টি, ধর্ষণ কী? বাচ্চা মেয়েটির মুখে কথাটি শোনামাত্রই তাকে বুকে টেনে ধরল তার আন্টি। কী উত্তর দেবে সে? ওই শব্দটি শোনামাত্রই অজানা শঙ্কায় কেঁপে ওঠে সে। সেদিন ট্রাফিক সার্জেন্টের দায়িত্ব পালনের সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক গাড়িতে একটি মেয়েকে হাত নাড়াতে দেখে সে। পিছু নেয়া হয়ে ওঠে না। পরের দিন সেই মেয়েটিকে ধর্ষণ করে হত্যার খবর সে দেখতে পায় টিভিতে। এই ঘৃণ্য কাজে যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। এগিয়ে যেতে থাকে ‘দরজার ওপাশে’ নামের দুর্দান্ত গল্পের নাটকটি। ড্রামাটিক ভাইবের সঙ্গে থ্রিলিং আবহটা বেশ ভালোই তৈরি করেছেন নির্মাতা অংশু। বক্তব্যধর্মী এই নাটকে পুলিশ হিসেবে আইন মানার ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ববোধ আর সাংসারিক জীবনে সংবেদনশীল নারীর ডাইমেনশনাল চরিত্রটিতে অপি করিম দারুণ অভিনয় করেছেন। সহচরিত্রেও দারুণ ছিলেন জয়রাজ।

মুগ্ধ ব্যাকরণ

 পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া শিশুদের ওপর কেমন ইফেক্ট ফেলে তা ফুটে উঠেছে এ নাটকে। মোশাররফ করিম আর মমের সংসারে আছে এক ছেলে। তারা সারাদিন দু’জনে ঝগড়া করে। কেউই কম্প্রোমাইজ করতে রাজি নয়। তাদের এ ঝগড়ার ইফেক্ট পড়তে থাকে তাদের বাচ্চার আচার-আচরণে। তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়ে যায়।

মাবরুর রশিদ বান্নাহর পরিচালনায় প্রতিটা পরিবারের প্রতি এ নাটক একটা বার্তা দিয়ে যায়। বিশেষ করে যে পরিবারে ছোট্ট শিশু আছে।

মধ্যে রাতের সেবা

মধ্যে রাতের সেবা নাটকটি ইউটিউবে প্রকাশের পরপরই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে দর্শক মনে। দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে প্রশংসা পেয়েছেন নাটকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই। এতে একজন পাঠাওয়ের যাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করে বেশ প্রশংসা পেয়েছেন নাজিয়া হক অর্ষা।

আশফাক নিপুণের ‘আগন্তুক’কে নিয়ে ছিল অনেক আলোচনা ও প্রশংসা। ভালোবাসার গল্পকথক মিজানুর রহমান আরিয়ান প্রথমবারের মতো বানালেন ‘কেস ৩০৪০’ নামের একটি থ্রিলারধর্মী নাটক, যা প্রচুর হাইপ তুলতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও এবার কমেডি নাটক হিসেবে আলোচনার শীর্ষে ছিল কাজল আরেফিন অমির ‘ব্যাচেলর ঈদ’,‘মিশন বরিশাল’ ও জিয়াউর রহমান জিয়া পরিচালিত ‘মধ্যরাতের সেবা’।

রোমান্টিক ও সিনেমাটিক নাটকের মধ্যে উল্লেখ করতে হবে মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘শিশির বিন্দু- পার্ট ২’ এবং রুবেল হাসান পরিচালিত ও জাফরিন সাদিয়া রচিত বিগ বাজেট ওয়েব সিরিজ ‘রাজকুমার’, সুমন আনোয়ারের ‘মায়া’ এর নাম। সোশ্যাল রোমান্টিক ড্রামা জনরাতে মহিদুল মহিম পরিচালিত ‘মোবাইল চোর’ দর্শকদের বেশ ভালো লেগেছে।

সব মিলিয়ে দর্শক যেমন গল্প চায়, নির্মাতারা এবার ঠিক তেমন গল্পের প্রতিই জোর দিয়েছেন। এর ফলাফল তো আমাদের চোখের সামনেই। নির্মাতাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটির দিকে যেন একটু দৃষ্টি থাকে; বাংলা নাটকের এই সুন্দর দিনগুলো যেন আবারো রাতের আঁধারে ঢেকে না যায়।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।