চলচ্চিত্র আমাদের আশাবাদের জায়গা -জাকির হোসেন রাজু

ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত পরিচালক জাকির হোসেন রাজু। চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি একজন কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচয়িতা। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে সফলভাবে যুক্ত রেখেছেন চলচ্চিত্রের সঙ্গে। রোমান্টিকধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাতা খ্যাত জাকির হোসেন রাজু অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সর্বশেষ তার মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি, চলচ্চিত্রের নানান দিক এবং অন্যান্য আরো বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে। 

আনন্দধারা : সর্বশেষ আপনার পরিচালিত ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এই ছবিটি আশানুরূপ দর্শক সাড়া পেতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার কারণ কী? এবং এর দায়ভার কার?

জাকির হোসেন রাজু : ছবিটি নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু ছবিটিতে সাড়া না পাওয়ার কোনো কারণ দর্শিয়ে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেয়া উচিত। সাড়া না পাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। হয়তো আমার কোনো ভুল বা কোনো ব্যর্থতাই দায়ী। সবকিছু একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েই বলছি, ঈদে ছবি মুক্তি পেয়েছে এবং মুক্তির পরপর ছবিটির ভালো রেসপন্সও ছিল। কিন্তু ছবি মুক্তির পর থেকে একনাগাড়ে কয়েকদিন টানা বৃষ্টি এবং তার আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছিল বন্যাকবলিত। পাশাপাশি ছবি মুক্তির সময় থেকে শুরু করে দেশজুড়ে ডেঙ্গু একটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। যেখানে দিনের বেলায় ঘরের মধ্যে মানুষ মশারি টানিয়ে থাকে, সেখানে এই অবস্থায় সিনেমা হলে মানুষ যাবে সে আশা করাটাই তো বোকামি। কারণ আমাদের সিনেমা হলগুলোর অবস্থা তো সবারই জানা। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ছবিটি পরিস্থিতির শিকার হয়েছে বলে আমি মনে করি। তা যদি না হতো, তাহলে ছবিটি নিয়ে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, তা অতিক্রম করে আরো ২ থেকে ৩ কোটি টাকা ব্যবসা করত বলে আমাদের বিশ্বাস ছিল। এখন হয়তো লাভ না করলেও লোকসান হবে না।

আনন্দধারা : এই ছবিটি নিয়ে অনেক সমালোচনাও হয়েছে। এই সমালোচনা আপনার কাছে কতটা যুক্তিযুক্ত?

জাকির হোসেন রাজু : সমালোচকরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকেও কাঁদিয়েছে। সে সময় থেকে আজ অবধি তাদের নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ, ড. আহমদ শরীফ ক’দিন আগে মারা গেলেন, তারা পর্যন্ত নজরুলকে চামড়া খুলে খুলে লবণ লাগিয়েছেন। সমালোচকরা নজরুল ও রবীন্দ্রনাথকে কাঁদিয়েছে কিন্তু জনগণ যখন তাদের ব্যাপকভাবে নিয়েছে, সমালোচকরা তাদের ভোল পাল্টেছে। তাহলে সমালোচকরা কী করেছে? তারা ভুল সমালোচনা করেছে। তারা রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বুঝতে পারেনি। কারণ তাদেরকে বুঝতে হলে ওই মাত্রায় যেতে হবে। সমালোচনা হচ্ছে এক ধরনের বিচার। আদালতে যেমন বিচার হয়। আদালতে কিন্তু উভয় পক্ষের চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে। কিন্তু সমালোচনায় দুই পক্ষ থাকে না। তাই সমালোচনা করতে গেলে সমালোচককে অতীব বিচক্ষণ হতে হবে। নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করলে সেটা পরিপূর্ণ না-ও হতে পারে। আমার সর্বশেষ ছবি নিয়ে যারা সমালোচনা করছে আমার মনে হয় না তারা আমাকে বুঝতে পেরেছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে যেভাবে আঙুল তোলা হয়েছে, অপরাধ, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় যেভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। সে বিষয়গুলো নিয়ে তো কেউ কিছু বলেনি। এই বিষয়গুলো নিয়ে লিখলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যেত। তা না করে গৎবাঁধা মন্তব্য করে দিয়েছে যে, আমি আর্ট আর কমার্শিয়ালের মিশেলে একটা ছবি বানিয়েছি। যুক্তিযুক্ত সমালোচনা আমি পছন্দ করি, কিন্তু বিষয়বস্তু বুঝতে না পারাটা সমালোচকদের ব্যর্থতা। এ রকম সমালোচনা শুধু এই ছবি নয়, আমার পূর্ববর্তী অনেক সিনেমার বেলায়ও দেখেছি।

আনন্দধারা : আমাদের চলচ্চিত্র বর্তমান যে সংকটের সঙ্গে সন্ধি করে চলছে, ভবিষ্যতে সেটা কি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

জাকির হোসেন রাজু : আমাদের চলচ্চিত্রে যে সমস্যা সেটা আজকের নয়। গত ১৫-২০ বছর ধরে এই ধরনের সমস্যা চলছে। বর্তমানে চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমে গেছে, পাশাপাশি কমেছে হলের সংখ্যাও।  সিনেমা হলগুলোর অবস্থা একেবারেই ধ্বংসের দিকে। তবে বর্তমানে মফস্বলে যে সিনেমা হলগুলো রয়েছে, সেগুলো আর থাকবে না। সরকারি উদ্যোগে ৬৪টি জেলাতে ৬৮টি সিনেপ্লেক্স তৈরি করে দেয়া হবে এবং সেটার কার্যক্রম ইতোমধ্যে পাস হয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদের সিনেমার মার্কেট ৫০ কোটি টাকার ওপরে। যদি ৬৪ জেলায় ৬৮টি সিনেপ্লেক্স হয় এবং ঢাকার হলগুলো থাকে, আমার মনে হয় মুক্তিপ্রাপ্ত মানসম্মত প্রতিটি ছবিই আশানুরূপ ব্যবসা করবে এবং আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে আমাদের সিনেমা একটা ভালো অবস্থানে চলে যাবে।

আনন্দধারা : সারাদেশে সিনেপ্লেক্স তৈরি হলেই কী দর্শক হলমুখী হওয়া শুরু করবে?

 জাকির হোসেন রাজু : আমাদের চলচ্চিত্র আমাদের আশাবাদের জায়গা। সেজন্য আমি একটা পরামর্শ দিতে চাই, চলচ্চিত্র বাঁচাতে আমাদের নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। যারা সিনেমা ব্যবসায়ী আছেন অথবা যারা সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশন করেন, তাদের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ হলো ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে কিন্তু আমাদের সিনেমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এত এত টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, সে সময় চলচ্চিত্র ছাড়া বিনোদনের অন্য কোনো মাধ্যম ছিল না। বর্তমানে সিনেমার অনেকগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে। হাতের মোবাইলটা সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। পৃথিবীর যা কিছু দেখার ইচ্ছা হয়, সবকিছুই কিন্তু এখন মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছে। সিনেমার যারা কনজিউমার মানে ভোক্তা, তাদের জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একটা বিদেশি কোম্পানি আমার দেশে এসে একটা পণ্য বিক্রি করে ভোক্তাদের সুবিধার জন্য কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। আমরা আমাদের সিনেমার দর্শকদের জন্য গত ৩০ বছরে কী দিয়েছি? কিছুই দিইনি। আমাদের সিনেমার দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য এবং তাদেরকে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করার জন্য তাদের জন্য নানারকম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। হলে এসে সিনেমা দেখলে দর্শকদের জন্য পাঁচটা টিকিটের সঙ্গে দুটো টিকিট ফ্রি দেয়া, বিভিন্ন ধরনের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা। পরিবার নিয়ে কেউ এলে তাদের জন্য আকর্ষণীয় গিফট আইটেমের ব্যবস্থা করা। আবার তিন প্রজন্মের ১০ জন একসঙ্গে সিনেমা হলে এলে তাদের জন্য স্পেশাল গিফটের ব্যবস্থা করা এবং সেটা টিকিটের মূল্যের চেয়ে বেশি কিছু হওয়া। কারণ আমরা সেখানে ব্যবসাই করব না। কারণ নতুনভাবে ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন চালু করার জন্য আমি এই পদ্ধতিটিকে ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে দেখব। এ রকম আরো নানা ধরনের পদ্ধতি হতে পারে। এভাবে সিনেমার কনজিউমার বা ভোক্তা কিংবা দর্শক যা-ই বলি না কেন তাদের উৎসাহ দিয়ে সিনেমা দেখার জন্য হলমুখী করার ক্ষেত্রে এটা একটা দারুণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমি মনে করি।

আনন্দধারা : বর্তমানে আমাদের যে চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে গল্পের চেয়ে নায়ককেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। নায়কের নামেই চলছে সিনেমা। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালকের ভূমিকা থাকে নিষ্ক্রিয়। সেটা কি আপনি পরিচালকের ব্যর্থতা হিসেবে মনে করেন?

জাকির হোসেন রাজু : আসলে চলচ্চিত্রের মাধ্যমটা হচ্ছে পরিচালকের। সিনেমা পরিচালকের কিন্তু পরিচালকের নেতৃত্বটা হারিয়ে গেছে। আমাদের এই মূলধারার চলচ্চিত্রে প্রধানত সব পরিচালক-প্রযোজক তারকা কিংবা তারকাদের চেহারার মূল্য বিক্রি করে। সেই রাজ্জাক, কবরী, জাফর ইকবাল, ফারুক, রিয়াজ, শাবনূর, শাকিব খানসহ সবার চেহারা বিক্রি করেছে ডিরেক্টর। একজন পরিচালক নিজেকে বিক্রি করেনি। চিন্তা করেনি যে আমার ছবিতে কে আর্টিস্ট সেটা বিষয় না, আমার ছবি চলতে হবে ছবির গল্প দেখেই এবং মানুষ ছবি দেখবে ছবির গল্প দেখে, নায়ক-নায়িকা দেখে নয়। এ রকম আত্মবিশ্বাস একটা সময় পরিচালকদের ছিল। কিন্তু সেটা হারিয়ে গেছে। পরিচালকের ইন্টেলেকচুয়াল যে বিষয়টা, সেটার কথা যদি বলি তাহলে পরিচালক কী বলতে চেয়েছে বা কী বোঝাতে চেয়েছে সেটা তার মতো করে দেখাবে, সে বিষয়টা যেমন আগেও ছিল বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে যখন আবদুল জব্বার খান, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, কামাল আহমেদদের মতো পরিচালকরা ছিলেন, তখন মূলধারা বা বাণিজ্যিক ধারার সিনেমাতে পরিচালকের নেতৃত্বের জায়গা বা ক্ষমতাটুকু ছিল। যত বড় তারকাই হোক না কেন, তখন পরিচালকের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। পরিচালকদের সেই যোগ্যতা ছিল, তাদের সেই শিক্ষা ছিল, মেধা ছিল কিন্তু বর্তমানে যার হাতে টাকা সে-ই এখন সব, সে-ই সবকিছু বোঝে। এটা হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি। আমার দেশও বিশ্ব পরিস্থিতির বাইরে নয়। আর চলচ্চিত্র তো অবশ্যই নয়। এই অবস্থার কারণেই পরিচালকের নেতৃত্বটা ছুটে গিয়েছে। এখন দেশে বিদ্বান এবং বুদ্ধিজীবীদের তেল মেখে চলতে হয়, নতজানু হয়ে চলতে হয়। যখন পরিচালকের হাত থেকে নেতৃত্বদানের ক্ষমতাটা চলে গেছে তখন যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। নায়ককে প্রধান করেই ছবি বানাতে হচ্ছে। যার চেহারার মূল্য আছে, যার পরিচিতি আছে, কাস্টিং মূল্য আছে, তাকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্কটাকে কীভাবে চিন্তা করেন?

জাকির হোসেন রাজু : আমি দর্শকের কথা ভাবি না। দীর্ঘদিন বিভিন্ন বিষয় মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে একটা গল্প তৈরি হয়। সে গল্পটাকে অনেকদিন ধরে লালন করি। একটা গল্প পর্দায় আনতে গেলে ৮০ থেকে ৯০টি দৃশ্য লিখতে হয়। এ দৃশ্যগুলো আস্তে আস্তে তৈরি হতে থাকে। দর্শকের কথা চিন্তা করি না এই কারণে যে, দর্শককে জিজ্ঞেস করা যাবে না যে ছবিটা বা গল্পটা আপনারা গ্রহণ করবেন কিনা। দর্শকের কাছ থেকে তো এমন মতামত গ্রহণ করা সম্ভব না। দর্শক জরিপ কীভাবে বুঝব বা দর্শকের পালস কীভাবে বুঝব, তার জন্য সবচেয়ে আগে যেটা প্রয়োজন সেটা হলো কমন সেন্স। আমি মনে করি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেন্স হচ্ছে কমন সেন্স। নিজের কমন সেন্সে যেটা যৌক্তিক মনে হবে, সেটা সবার কাছে যৌক্তিক মনে হবে। তাই যৌক্তিকভাবে কোনো কিছু করলে সেটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। তবে একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। আমি প্রথম সিনেমা থেকে আজ পর্যন্ত আমার সিনেমাতে কখনো উগ্রতাকে প্রশ্রয় দিইনি। আমার সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ দেখলে সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমি হয়তো গতানুগতিকভাবে পর্দায় হিরোর মাঝে নায়কসুলভ আচরণ দেখাতে পারতাম, কিন্তু তা না করে এবং উগ্রতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সমাজের যে সমাজব্যবস্থা সেটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি।

আনন্দধারা : আপনার প্রথম পরিচয় আপনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। কিন্তু একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেও সেটা নির্মাতা হিসেবে নন। এই বিষয়ে নির্মাতা হিসেবে পুরস্কার না পাওয়ায় কি কোনো আক্ষেপ কাজ করে?

জাকির হোসেন রাজু : যে ছবিতে আমি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি, সেই ছবিতে পরিচালক হিসেবে আমারই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল। প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম এবং আমি এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের টকশোতে ছিলাম। তখন চাষী ভাই এ কথাটা বলেই ফেলেছিলেন যে, একটা বাবুর্চির সব রান্নাই ভালো, যতগুলো রান্না করেছে সবগুলো আইটেম অদ্ভুত হয়েছে কিন্তু বাবুর্চিটা ভালো না। এ কথা বলার কারণ হচ্ছে যে ছবির কাহিনী, সংলাপ, নায়ক, গায়ক, গায়িকা, নায়িকা, সংগীত সবই শ্রেষ্ঠ তাহলে পরিচালক কেন শ্রেষ্ঠ নয়। আমার প্রধান পরিচয় আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। নির্মাতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলে নিশ্চয়ই ভালো লাগত। কিন্তু কোনো আক্ষেপ নেই এ কারণে যে, আমাদের দেশের সবকিছুর পেছনে একটা তদবির থাকে। ওই তদবিরের পুরস্কার আমি জীবনে নিইনি এবং কখনোই নেব না। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের যে স্বীকৃতি সেটা আত্মতৃপ্তির জায়গা। একটা বড় জায়গা যে, আমি সেরা হয়েছি বলেই আমাকে

স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু যখন আমি তদবির করে পুরস্কার নেব, তখন নিজের কাছে আমি জানব যে, আমি চোর! আমি এটার যোগ্য নই। জনগণ জানবে ঠিকই আমি পুরস্কার পেয়েছি কিন্তু আমি জানব যে, আমি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না, তদবির করে আমি নিয়েছি, আমি চুরি করেছি। এই তদবির করে পুরস্কার নেয়ার মাঝে কোনো

আত্মতৃপ্তি আমি পাব না। যারা পায় পাক। এ ধরনের  পুরস্কার আমি চাইব না, যদি এমনিতে কাজের ওপর কোনো পুরস্কার আসে, তাহলে আসবে।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে জড়াবেন বা চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন কখন থেকে দেখা শুরু করেছেন?

জাকির হোসেন রাজু : চলচ্চিত্র মাথায় ঢুকেছে যখন, তখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। হাইস্কুলে যখন পড়ি তখনই ছড়া লিখতাম, গান লেখার চেষ্টা করতাম। হয়তো সুপ্ত প্রতিভা ভেতরে ছিল। স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতা করতাম এবং আবৃত্তিতে ফার্স্ট হতাম। যখন ইন্টারে ভর্তি হই, তখন প্রচুর পরিমাণে সিনেমা দেখতাম, আমার জেলা শহর মাদারীপুরে। যে ছবি ভালো লাগত পাঁচবার-দশবার করে দেখতাম। তখনই মাথায় গেঁথে গিয়েছিল যে সিনেমার গল্প লিখব। নির্মাতা হব, তখন সে ভাবনা ছিল না। নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে গেল। লেখাপড়া বিরতি দিয়ে আবার শুরু করা। সরকারি চাকরি ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। অল্প দিনে বুঝলাম যে কাহিনী লিখে লাভ হবে না, কারণ আমার কাহিনী আমার মতো করে পর্দায় যাবে না। কারণ কাহিনী পর্দা পর্যন্ত নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র ডিরেক্টরের। তার মতো করে গল্প যাবে। ডিরেক্টর যেভাবে ভাবেন সেভাবে গল্পটা পর্দায় দেখা যায়। তখনই সিদ্ধান্ত পাল্টে গেল যে আমি পরিচালকই হব। তারপর থেকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করি। তখন দেখেছি যারা পরিচালনা করছেন তাদের অনেকেরই নিজস্বতা নেই, স্বকীয়তা বলতে কিছু নেই। দুই-একজন ব্যতিরেকে সবাই নকল কিংবা কপি এই দোষে দুষ্ট। যখন সহকারী পরিচালক ছিলাম তখন মাথায় ঢুকেছে, আমি নিজের গল্প নিজে লিখব এবং আমার একটা স্বকীয় ধারা তৈরি করব। তারপর যখন প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পরপর তিনটা ছবি নির্মাণ করেছি, সেগুলোর কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা করে আমি আমার একটা নিজস্ব স্বকীয়তা তৈরি করেছি এবং সেই ধারাবাহিকতায় এখনো রয়েছি। ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই একবাক্যে স্বীকার করে, জাকির হোসেন রাজু একজন নিজস্ব স্টাইলের সক্রিয় নির্মাতা।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্রে আসার জন্য আপনার অনুপ্রেরণা হিসেবে কে বা কারা ছিলেন?

জাকির হোসেন রাজু : আমার অনুপ্রেরণা বলতে তেমন কেউ ছিল না। হয়তো আমার ভেতরে সে স্বপ্নটা ছিল যে একদিন আমি পারবই। ছোটবেলা থেকে লেখালেখির যে বীজ সেটা ভেতরে ছিল। সেই থেকে আস্তে আস্তে নিজের আত্মবিশ্বাসই আমার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

আনন্দধারা : আপনার অবসর সময় কাটে কীভাবে?

জাকির হোসেন রাজু : আমার অবসর নেই। কারণ যখন আমার সিনেমার কাজ থাকে না, সে সময়টাকে আমি প্রচুর উপভোগ করি। তখন আমার হাতে প্রচুর সময় থাকে। তখন আমি পড়ার জন্য অনেক সময় পাই। বই পড়া আমার নেশা। আমি সারারাত জেগে বই পড়ি। যখন আমার কাজ থাকে, তখনো বাসায় ফিরে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অন্তত তিন পৃষ্ঠা হলেও বই পড়ি।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় লেখক?

জাকির হোসেন রাজু : আমার সব লেখাই ভালো লাগে। আমি কাউকে হেয় করি না আবার কাউকে একেবারে তুঙ্গেও তুলি না। রবীন্দ্রনাথ তো তুলনাবিহীন, জীবনানন্দ দাশের কবিতা আমার ভালো লাগে। শামসুর রাহমানকে আমার ভীষণ ভালো লাগে। বাংলাদেশের আরো একজন লেখক যদিও অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিত, তবুও হুমায়ুন আজাদকে ভালো লাগে। তবে আমার শান্তি এবং আশ্রয়ের জায়গা হচ্ছে কবিতা। এই কারণে যে অনেক সময় অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করলেও সামাজিক চাপে, ভয়ে কিংবা লজ্জায় বলতে পারি না। তখন ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। আর তখন আমি আশ্রয় নেই কবিতার। যখন কবিতার সাগরে ডুব দিই, তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ অনেক কমে যায়।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় পরিচালক?

জাকির হোসেন রাজু : বাংলাদেশের প্রিয় পরিচালকের তালিকায় আছেন জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, এ জে মিন্টু। পরবর্তী জেনারেশনের কাজী হায়াৎ-এর ছবি আমার খুব ভালো লাগে। এছাড়া মূলধারার নির্মাতা জেমস ক্যামেরুনকে আমার ভালো লাগে। কারণ তার চিন্তার সঙ্গে আমার চিন্তা মিলে যায়। আর ইন্টেলেকচুয়াল ছবির দিক থেকে সত্যজিৎ রায়কে আমার ভালো লাগে। জীবনে বহু ছবি দেখেছি কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী ভুলতে পারি না।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় অভিনয়শিল্পী?

জাকির হোসেন রাজু : প্রিয় অভিনয়শিল্পী অনেকেই আছেন। সবার নাম হয়তো বলা সম্ভব হবে না। তবে সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে সোহেল রানা, কবরী আপাকে ভালো লাগত। এই প্রজন্মের শাকিব খুব ভালো অভিনেতা। তাছাড়া আনিসুর রহমান মিলনের অভিনয় আমার খুব ভালো লাগে। যদি একেবারে ক্ল্যাসিক অভিনয়ের কথা বলি, তাহলে নাজমা আনোয়ারকে আমার খুব ভালো লাগত। আমার চলচ্চিত্র জীবনে যত শিল্পী পেয়েছি, সবচেয়ে আধুনিক মনে হয়েছে গোলাম মোস্তফাকে। আর একজন খান আতাউর রহমান।  যিনি পেশাদার অভিনেতা ছিলেন না কিন্তু পেশায় ছিলেন পরিচালক, গীতিকার, লেখক, সুরকার। তিনি অভিনয়ও করেছেন। খান আতাউর রহমান সম্পর্কে গোলাম মোস্তফা বলেছেন, একটি ছবিতে ক্লোজআপের তিনি যে এক্সপ্রেশন দিয়েছেন ২০ বছর চেষ্টা করলেও আমি সেটা পারব না এবং সেই একটা ক্লোজআপে তিনি যে অভিব্যক্তি দিয়েছেন ৫ পৃষ্ঠা সংলাপে তা প্রকাশ করা কঠিন। খান আতাউর রহমান পেশাদার অভিনেতা ছিলেন না কিন্তু অনেক বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় সংগীতশিল্পী?

জাকির হোসেন রাজু : প্রিয় সংগীতশিল্পীদের তালিকায় অনেকেরই নাম রয়েছে। সাবিনা ইয়াসমীন, শাহনাজ রহমাতুল্লাহ, রফিকুল আলম, কনকচাঁপা, সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোর, মনির খান, এসআই টুটুল, বেবী নাজনীনসহ আরো অনেকে রয়েছেন। সবার নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। ক্লোজআপের নিশিথা বড়–য়া, ক্ষুদে গানরাজের ঝুমা এবং সজীবকে আমার ভালো লাগে। প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে আবদুল আলীম আমার পছন্দের। আমার মনে হয় না তার মতো ভরাট কণ্ঠের শিল্পী এখনো সংগীতে কেউ এসেছে।

আনন্দধারা : দীর্ঘ পথচলায় আপনার কোনো মজার স্মৃতি?

জাকির হোসেন রাজু : অনেক মজার স্মৃতি আছে এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। তবে একটা ছোট্ট স্মৃতির কথা শেয়ার করি। প্রেমী ও প্রেমী ছবির শ্যুটিং করছি আউটডোর লোকেশনে। আরিফিন শুভ ও নুসরাত ফারিয়া হচ্ছে নায়ক-নায়িকা। তারা দু’জনে আমার এমন ভক্ত হয়ে গেল যে, ছবির শ্যুটিং শেষে আমি যদি শুভর গাড়িতে উঠতাম, তাহলে নুসরাত ফারিয়া মন খারাপ করত। আর যদি নুসরাত ফারিয়ার গাড়িতে উঠতাম, তখন শুভ মন খারাপ করত। দু’জনের সঙ্গে এটা নিয়ে মান-অভিমান হতো। এছাড়া আমার পোড়ামন ছবিতে অভিনয় করছে বিপাশা কবির। ছবি চলাকালীন ওর অভিনয় ভালো লেগেছে এবং মেয়েটা খুবই দুঃসাহসিক। অন্য ছেলেরা হয়তো বলবে না কিন্তু বিপাশা কবির টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছে, আমি যত নাটক-সিনেমা করেছি,  পরিচালক হিসেবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে জাকির হোসেন রাজুকে। ৭১ টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে শাকিব খান বলেছে, আমার একজন প্রিয় পরিচালক জাকির হোসেন রাজু, বিশেষত তার লেখা, তার সংলাপ- প্রথম চট করে লাগে যে কী বলল, তারপর ভাবায়, এরপর বুকে মোচড় মারে। আমাদের চরিত্রাভিনেতা আফজাল শরীফ চ্যানেল আইতে এক ইন্টারভিউতে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, একজন শিক্ষিত, রুচিবান, ভদ্র, বিনয়ী, ভালো পরিচালক এবং ভালো মানুষ বলতে যা বোঝায় জাকির হোসেন রাজু সেটাই। এটা আমার অনেক বড় প্রাপ্তি। এ রকম ভালো মুহূর্তগুলো এখনো আনমনে ভাবনায় চলে আসে।

আনন্দধারা : আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কোনো অপ্রাপ্তি?

জাকির হোসেন রাজু : আমার মতো করে আমি এখনো একটা ছবি বানাতে পারিনি। ছবির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি যেভাবে চাই, যা চাই সেভাবে বানাতে পারিনি। সেটা কবে হবে তা-ও জানি না। আমার মাঝে অপ্রাপ্তি বলতে এটাই কাজ করে।

ছবি : জাহিদ হাসান

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।