চীন বিলা

চীন দেশ নিয়ে ছোট থেকেই আমার খুব আগ্রহ ছিল। হঠাৎ করেই ২০১৮ সালের শেষদিকে চীন যাওয়ার সুযোগ চলে এলো। গার্ডেন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে চীন যেতে হবে। ওখানের একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে কয়েকটি স্কুলের অরিগামি ট্রেইনার হিসেবে আমাকে কাজ করতে হবে। অরিগামি হলো জাপানি শিল্প হলেও চায়নাতে এর বহুল চর্চা হয়। প্রতি বছরের নভেম্বরে স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে চায়নাতে অরিগামি উৎসব উদযাপন করা হয়। কোলকাতা থেকে যাবে আরো চারজন। মোট পাঁচজনের টিম আমাদের।

বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার চীনের ভিসা পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। তবে আমাকে বেগ পেতে হলো না। কোলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে আমাদের টিমকে নেয়া হলো মুম্বাই। সেখান থেকে চায়না ইস্টার্নের ফ্লাইটে চেপে বসলাম। ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট আর খাবারের মেন্যু দেখে আমরা নিশ্চিত হলাম, এটা চাইনিজ এয়ারলাইন্স। মুম্বাই টু কুনমিং ফ্লাইট ডিউরেশন হলো আড়াই ঘণ্টার মতো। সন্ধ্যার দিকে আমরা কুনমিংয়ে ল্যান্ড করলাম। ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস সেরে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই আমাদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হলো।

আমরা পাঁচজনই বাঙালি ছিলাম, সবাই ইংরেজি জানি। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ওখানকার স্থানীয় লোকজন ইংরেজি খুব একটা বোঝে না। বাধ্য হয়েই আমরা একজন বাংলাদেশি গাইড নিলাম। আমরা জানতাম চীনের মুদ্রার নাম ইউয়ান, কিন্তু ওখানের সবাই বলে আরএমবি। পুরো নাম হচ্ছে রেনমিনবি (Renminbi)।

আমাদের জন্য আয়োজকরা দেশীয় খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিল আগে থেকেই। সকালে রজত বলল, ‘চলেন এখানকার বাজারটা ঘুরে দেখি।’ আমাদের হোটেলের পাশেই বাজার, তাই হেঁটেই চলে গেলাম। প্রথমেই ঢুকলাম মাছের বাজারে। নানা রকমের মাছ। ছোট, বড়, মিঠা পানির, সামুদ্রিক সব আছে। কাঁকড়া, ব্যাঙের অভাব নেই। দুই রকমের সাপ বিক্রি হয় সেখানে। একটি চামড়া ছাড়া এবং অন্যটি চামড়াসহ। তবে ব্যাঙের দোকানেও মোটামুটি ভিড় ছিল। জ্যান্ত ব্যাঙ বা ড্রেসিং করা দুই ধরনের ব্যাঙই বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

কুনমিংয়ে আমাদের কোনো কাজ ছিল না। আমাদের ওয়ার্কশপ ছিল ঝুজি এবং ইয়ু অঞ্চলে। কুনমিং থেকে প্লেনে এবং ট্রেনে দুই উপায়েই সেখানে যাওয়া যায়। আমরা ট্রেনেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। টিকিট কাটতে কাউন্টারে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপদে। কাউন্টারের মেয়েটাকে কোথায় যাব এটা বোঝাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম। পরে গুগল থেকে ম্যাপ দেখালে তিনি বুঝতে পারলেন আমরা কোথায় যেতে চাই। আসলে আমরা কোনোভাবেই বোঝাতে পারি না কোথায় যাব। আমরা সবাই জানি চীনের রাজধানী বেইজিং। কিন্তু ওরা বলে পেইচিং। তাই আপনি যদি পেইচিং না বলেন, ওরা বুঝতেই পারবে না।

লাউড স্পিকারে ঘোষণা করা হলো ‘চ্যাং উং ইয়ুই চুছি ’। আমরা ব্যাগেজ নিয়ে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনটা অনেক সুন্দর ছিল। একেবারে ঝকঝকে-তকতকে। গার্ড, সার্ভিস গার্ল সবাই ইউনিফর্ম পরে আছে। ‘নিহাও’ বলেই কোমর নুইয়ে আমাদের স্বাগত জানাল। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। সবাই যে যার ছোট ছোট চায়ের মগ বের করে তাতে এক মুঠো করে সবুজ চা ঢেলে গরম পানি ভরতে যাচ্ছেন। প্রতিটা বগির সংযোগ স্থানে একটি করে গরম পানির মেশিন বসানো আছে। যে যার মতো সেখান থেকে পানি নিয়ে আসছেন। চীনারা প্রচুর সবুজ চা পান করে। কেউ কেউ বই পড়ছে, সূর্যমুখী ও শিমের বিচি খাচ্ছে। কারো মুখ বন্ধ নেই। এভাবেই রাত হয়ে এলো, ঘড়ির  কাঁটা ন’টার ঘরে। হঠাৎ দেখি সবাই ডিনার করতে শুরু করেছে। আমরা তো অবাক! সবাই কেন এভাবে একসঙ্গে খেতে শুরু করল। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম রাত ১০টায় ট্রেনের বাতি বন্ধ হয়ে যাবে, তাই সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে নিচ্ছে। ঠিক ১০টায় গার্ড এসে সব বাতি বন্ধ করে দিল, শুধু ওয়াকওয়ের ছোট বাতিগুলো ছাড়া। একটু একটু শীত লাগছে, কম্বল টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। সকালে হকারের শব্দে ঘুম ভাঙল। আমি ট্রেনের জানালা দিয়ে সকালের চীন দেখতে শুরু করলাম। কখনো শহর, কখনো গ্রাম। সকালের সবুজে বর্ণিল চীন দেখে মুগ্ধ হলাম। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ট্রেন চলছে, খুবই চমৎকার ছিল সেই সকালটা।

আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম বিকালের দিকে। ওখানেও আগে থেকেই আমাদের জন্য সব প্রস্তুত ছিল। তবে সমস্যা খাবারে। এখানকার সবজিও মুখে দেয়া যায় না। সব স্যুপ টাইপের। আর কোনোটাতেই ঝাল নেই। ভাত খেতে চাইলাম, সেটাও গলা। মানে ভাত স্যুপের মতোই। মুশকিল ওটা চামচ দিয়ে খাওয়া যাবে না। খেতে হবে চপস্টিক দিয়ে। আমি কয়েকবার চামচ চাইলাম। ওরা প্রতিবারই আমাকে কাঠি দিয়ে গেল। পরে উপায় না দেখে হোটেলের কাছেই ম্যাগডোনাল্ডসের বার্গার খেয়ে এলাম। সেখানে গিয়ে বলেছিলাম, ‘ওয়ান বার্গার প্লিজ, নো চু রো’। আমি আগেই গাইডের মাধ্যমে দুটো চাইনিজ শব্দ শিখেছিলাম। ‘ইয়ো রো’ মানে গরুর মাংস এবং ‘চু রো’ মানে শূকরের মাংস। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে এসে আবার সেই ম্যাগডোনাল্ডস এবং বার্গার উইথ নো চু রো খেলাম। ওরা বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও আমি বাজার দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। ছোট বাজার, সুন্দর সুন্দর দোকান। দোকানে সুন্দর লাবণ্য মাখা সেলস গার্লস বসে আছে। তাদের হাসি আরো চমৎকার।

বাজার ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম। চীনে ফেসবুক ব্যবহার করা যায় না। সময় কাটাতে পারছি না। তাই টিভি ছেড়ে দিলাম। সব চ্যানেলই চাইনিজ। কুনমিংয়ে অবশ্য কিছু ভারতীয় চ্যানেল দেখা যেত। ক্ষুধা লেগে গেছে, খাবারের জন্য গেলাম। কিন্তু সেখানে সবকিছুই সিদ্ধ খাবার। তাতে তেল-ঝাল কিছুই দেয়া নেই। আমাকে শামুক ভর্তা খেতে অফার করা হলো, সঙ্গে গলা ভাত।

পরের দিন দিনের বেলা আবার ঘুরতে বের হলাম। অবশ্য তার আগে আমরা ৪ ঘণ্টার ওয়ার্কশপ শেষ করে এসেছি। ঘুরতে গিয়ে দেখলাম বিশাল বিশাল কাঁচের ভবন, সুসজ্জিত দোকান, বাজার, ছোট ছোট কারখানা, গাড়ি, গাছপালা আর মানুষ। মাঝে মাঝে ফসলের জমি। ধান, গম বা যবের ক্ষেত। ঝুজি মুক্তার জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলে প্রচুর মুক্তার খামার আছে। গ্রামের দিকের লোকজন ঘরে ঘরে মুক্তার চাষ করে। ঝুজিতে আমাদের ওয়ার্কশপ শেষ করে আমাদের গন্তব্য ইয়ু। পুরো দুইদিন মোটামুটি না খেয়ে ক্ষুধায় পেট চো চো করছিল। তবে ইয়ুতে পেলাম ভাতের দেখা। গলা ভাত না, হালকা তেলে ভাজা ঝরঝরে। সঙ্গে রান্না করা চিংড়ি মাছ। খাবার দেখে জিভে পানি চলে এলো। চিংড়িগুলো মনে হয় পরিষ্কার করেনি। তবে খেতে খারাপ লাগল না।

আমরা আর ঘোরার সুযোগ পাইনি। কারণ এবার আমাদের মূল কাজ শুরু হলো। প্রতিদিন স্কুলে সময় দিতে হতো। সারাদিন স্কুলের বাচ্চাদের অরিগামির কাজ শেখাতে হতো। চীনারা যে কত পরিশ্রম করে, তা তখনই বুঝেছিলাম। ছোট শিশুরাও কত পরিশ্রমী। আর সময় মেপে মেপে কাজ। ওখানের স্কুলগুলো দারুণ। শিশুদের স্কুলগুলো খুবই চমৎকার। চীনে পরীক্ষায় অনিয়ম করলে শিশুদের বহিষ্কারের নিয়ম নেই। কেউ অনিয়ম করলে তার পরীক্ষার মোট নম্বর থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা করা হয়, যা তার ফাইনাল রেজাল্ট তৈরির সময় মাইনাস করা হয়। আবার সব শ্রেণির শিশুর জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই ও ম্যাগাজিন পড়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া সবাইকে অরিগামি, ছবি আঁকা, নাচ ও গানের ক্লাস করতে হবে। চীনা শিশুদের ইংরেজি পড়ানো হয় না। তবে আট ক্লাস পর কোনো শিক্ষার্থী চাইলে ইংরেজি বিষয়কে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রাখতে পারে। সেজন্য অভিভাবকের অনুমতিপত্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমা দিয়ে আবেদন করতে হয়।

ভিসা আবেদন

চীনের ভিসা পেতে গেলে আপনাকে কিছু জটিলতায় পড়তে হবে। সাধারণত ফ্রেশ পাসপোর্টের জন্য ওরা ভিসা দিতে চায় না। মোটামুটি আগে দুটি দেশ ভ্রমণ করা থাকলে চীনের ভিসা পাওয়া সহজ হয়। এই দুটি দেশ আবার ভারত ও নেপাল বাদ দিয়ে হতে হবে। তবে কিছু শর্তের বিনিময়ে ফ্রেশ পাসপোর্টে ভিসা মিলবে। চীনা ভিসা পেতে যেসব ডকুমেন্টস লাগবে- পাসপোর্টের ন্যূনতম মেয়াদ ছয় মাস থাকতে হবে। ব্যাংকে ন্যূনতম ব্যালান্স থাকতে হবে ১ থেকে ২ লাখ টাকা এবং বিগত ছয় মাসের ব্যাংক স্টেটম্যান্ট ও ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট। ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ইংরেজিতে অনুবাদসহ নোটারি কপি, কোম্পানি প্যাড ও ভিজিটিং কার্ড থাকতে হবে। চাকরিজীবীদের জন্য অফিস থেকে এনওসি লেটার, ভিজিটিং কার্ড ও অফিসের আইডি কার্ডের কপি। ২ কপি ৩৩ x ৪৮ সাইজ রঙিন, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড, ম্যাট প্রিন্ট।

খরচ

এম্বাসি ও প্রসেসিং ফি ১০,০০০ টাকা (আগে চীন যাওয়া থাকলে) আর আগে যাওয়া না থাকলে খরচ পড়বে ১২০০০ টাকা (ভারত ও নেপাল বাদে দুই দেশ ভ্রমণ থাকতে হবে)। চীনের ছয় মাস মেয়াদি ডাবল এন্ট্রি ভিসার জন্য খরচ হবে ১৩,০০০ টাকা (আগে যাওয়া থাকলে)। এক বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার খরচ ২২,০০০ টাকা (আগে ডাবল এন্ট্রি ভিসা থাকতে হবে)। দুই বছরের মাল্টিপল ভিসা ৩২,০০০ টাকা (আগে এক বছরের মাল্টিপল ভিসা থাকতে হবে)।

সময়

ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য ৫ থেকে ১০ দিন সময় লাগে এবং ৩০ দিনের মধ্যে ভিসা পাওয়া যাবে। তবে আর্জেন্ট ডেলিভারি নিতে চাইলে অতিরিক্ত ৩,০০০ টাকা দিতে হবে (সময় তিনদিন)।

সতর্কতা

ভিসা প্রসেসের জন্য দেয়া যে কোনো ডকুমেন্টস ভুয়া অথবা জাল প্রমাণিত হলে ভিসার আবেদনটি নিশ্চিতভাবে বাতিল হবে। এমনকি তাকে চীনা এম্বাসি তাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে পারে।

যেখান থেকে আবেদন করতে হবে

চীনা ভিসার জন্য ঢাকায় অবস্থিত চাইনিজ এম্বাসিতে যোগাযোগ করতে হবে। তাদের ঠিকানা- প্লট নম্বর-২ ও ৪, এম্বাসি রোড, ব্লক-১, বারিধারা, ঢাকা। ওয়েবসাইট ঠিকানা- http://bd.china-embassy.org/eng/

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup