দেশেই হোক মধুচন্দ্রিমা

শীত মানেই বিয়ের আমেজ আর সানাইয়ের সুর। বিয়ের পর নবদম্পতির খোশমেজাজে নিভৃত ভ্রমণে একে অন্যকে জানার চেষ্টাকেই আমরা মধুচন্দ্রিমা বলি। মধুচন্দ্রিমা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি এখন বিয়ে-পরবর্তী জীবন গোছানোর অন্যতম অনুষঙ্গ। তাই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মধুচন্দ্রিমার সুখকর অভিজ্ঞতা দিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে চায় সবাই। তবে বাজেট, সময়, আর ঘোরার মানসিকতা- সব মিলিয়ে মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য হতে পারে দু’ধরনের। দেশে আর দেশের বাইরে- এখানে দেশের ভেতরের খোঁজখবর জানানো হলো।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত

মধুচন্দ্রিমা উদযাপনের জন্য দেশের মধ্যে সর্বপ্রথম যে জায়গাটির কথা আসবে তার নাম হলো কক্সবাজার। প্রেয়সীর হাতে হাত রেখে গল্প আর খুনসুঁটি করার ছলে দৌড়ে বেড়ানোর মতো চমৎকার এক সাদা বালির সৈকত। জোয়ারে মন মাতিয়ে তুলবে আর ভাটার সময় যত দূর চোখের দৃষ্টি যায়, শুধুই দেখা যাবে হাজারো-লাখো ছড়িয়ে থাকা প্রবাল, জীবন্ত সেই প্রবাল পাথরে বসে শুভ্র ফেনা তোলা ঢেউয়ে পা দুলিয়ে ভেজাতে ভেজাতে করে নিন আগামী দিনের সাংসারিক পরিকল্পনা। কক্সবাজার তার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্রসৈকত, যা কক্সবাজার শহর থেকে বদরমোকাম পর্যন্ত একটানা ১৫৫ কিলোমিটার (৯৬ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক হোটেল ও রিসোর্ট। সবচেয়ে জনপ্রিয় রিসোর্ট হচ্ছে মারমেইড সি-বিচ রিসোর্ট। নবদম্পতির জন্য এই রিসোর্টটি খুবই ভালো। এখানে তারা সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সময় পার করতে পারবে। এখানে থাকা খাওয়ার খরচ ১৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকার মধ্যে।

সাজেক ভ্যালি

মধুচন্দ্রিমা উদযাপনের জন্য স্মৃতির আঙিনায় জলজল করবে তা হলো বর্তমানে সেরা পর্যটন স্পট- ঢেউ খেলানো পাহাড়ের গায়ে গড়ে তোলা সাজেক ভ্যালি। সাজেক রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ি থেকে। যদি বাসে যান তাহলে প্রতিজনে খরচ পড়বে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা। সাজেকে একটা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হচ্ছে এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তিনটা রূপ দেখা যায়। কখনো খুবই গরম, একটু পরই হঠাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিকে ঢেকে যায় মেঘের চাদরে; মনে হয় যেন একটা মেঘের উপত্যকা। সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়ে যাওয়া যায়। কংলাক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। এখানে বিভিন্ন পরিসরের রুমের ব্যবস্থা আছে। ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত রুম পাওয়া যায়।

সেন্ট মার্টিন আর ছেঁড়া দ্বীপ

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। স্থানীয়রা নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও ডেকে থাকেন। কারণ সেখানে রয়েছে প্রচুর নারিকেল গাছ। জোছনা রাতে সেই গাছের নিচে বসে ঝিরঝির বাতাস আর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে- নববধূর কোলে মাথা রেখে, নানান গল্পে মেতে থাকার মুহূর্তগুলো আজীবন স্মরণীয় হয়ে রবে। সেন্ট মার্টিনের সৈকত বেশ মোহনীয়। টেকনাফ থেকে জাহাজে করে যেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। যাওয়ার পথে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিভক্তকারী নাফ নদের ওপর নানা ধরনের সামুদ্রিক পাখির ওড়াউড়ি আর দুই পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারবেন। সেন্ট মার্টিনে গেলে দিনে দিনে ঘুরে আসতে পারবেন দেশের সর্বদক্ষিণের স্থান ছেঁড়া দ্বীপ থেকে। এখানে পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব রিসোর্ট ছাড়াও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন হোটেল-কটেজ গড়ে উঠেছে।

বান্দরবান কিংবা খাগড়াছড়ি

চট্টগ্রাম থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি জনপদ বান্দরবান। পাহাড়ের বুকে ভাসা ভাসা মেঘের খেলা আর প্রিয়জনের সঙ্গে সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে চলে যেতে পারেন সেখানে। নীলগিরি ছাড়াও দেখতে পাবেন স্বর্ণমন্দির, মেঘালয়সহ অনেক কিছু। যেতে পারেন খাগড়াছড়ির নাফাখুম ঝরনা কিংবা বগা লেকেও। পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব রিসোর্ট ছাড়াও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন হোটেল-কটেজ গড়ে উঠেছে এখানে। তবে যাওয়ার আগে অবশ্যই বুকিং দিয়ে যাবেন।

রাঙ্গামাটি

মধুচন্দ্রিমার আরেকটি গন্তব্য হতে পারে রাঙ্গামাটি। এখানকার কাপ্তাই লেক, ঝুলন্ত সেতু, ঝরনা আপনার হানিমুনকে আরো মধুর করবে। থাকার জন্য পর্যটন করপোরেশনের মোটেলসহ অনেক রিসোর্ট রয়েছে। রাঙ্গামাটিতে থাকার জন্য হোটেল প্রিন্স, হোটেল সুফিয়া, আরণ্যক কটেজ, পর্যটন মোটেলসহ বেশকিছু হোটেল ও মোটেল আছে। যাওয়ার আগে বুকিং দিয়ে যেতে পারলে ভালো।

সুন্দরবন

রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণের আবাস সুন্দরবন মধুচন্দ্রিমায় গন্তব্য হিসেবে মন্দ নয়। নিসর্গ উপভোগ, লঞ্চ থেকে নেমে নৌকায় সূর্যোদয় দেখা, কুমির, বানর, হরিণ, সাপ, হাজারো পাখি দেখার আনন্দই আলাদা। সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ আর বাগেরহাটের মোংলা এজন্য আদর্শ। মোংলায় পর্যটনের পশুর হোটেলে রাত কাটিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন করমজল, হাড়বেড়িয়ার মতো জায়গাগুলো। খুলনা-মোংলা হয়ে সুন্দরবন যাওয়া যায়; মোংলা থেকে কিছুদূর গেলে কচিখালী হয়ে যাওয়া যায় কটকা পর্যন্ত। আবার সাতক্ষীরার বুড়ি গোয়ালিনী রেঞ্জ দিয়ে সুন্দরবনের অনেক গভীরে জামতলা পর্যন্ত। দূরের গন্তব্য কটকা আর হিরণ পয়েন্ট। সাতক্ষীরায় বর্ষা রিসোর্ট আর এনজিওগুলোর রেস্ট হাউজে রাত কাটিয়ে গভীর অরণ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন অনায়াসে। তবে এখানে বেড়াতে অবশ্যই কোনো ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যেতে হবে।

সিলেট

আপনার মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য হতে পারে একটি কুঁড়ি দুটি পাতার সিলেট। চায়ের দেশে সিলেটে-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজারে ঘোরাঘুরির জন্য আদর্শ সময় বর্ষা হলেও শীতকাল এখানে উপভোগ্য। হালকা শীতে ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে শ্রীমঙ্গলের টি-রিসোর্টের বারান্দায় প্রিয়জনকে নিয়ে বসে থাকা বেশ রোমান্টিক দৃশ্যই হবে। মাধবকুণ্ডের ঝরনা, জাফলং, জৈন্তা, খাসিয়াপল্লী। শীতের সময়ে সিলেটে এলে অন্যতম আকর্ষণ ভোলাহাট, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, পানথুমাই, লক্ষণছড়া মিস করবেন না নিশ্চয়ই। শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ টি-রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রিসোর্ট বুকিং দিতে হয় বেশ আগে। শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্ট, মৌলভীবাজারে দুসাই রিসোর্ট, সিলেট লালা খালের পাশে নাজিমগড় রিসোর্টসহ ভালো মানের আরো অনেক হোটেল-মোটেল। চাইলে থাকতে পারেন শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেস্ট হাউজেও।

কুয়াকাটা, পটুয়াখালী

সাগরকন্যা কুয়াকাটা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ সৈকত অন্যতম নৈসর্গিক জায়গা। এটিই বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটিই দেখা যায়। থাকা-খাওয়ার জন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের রিসোর্ট পর্যটন হলিডে হোমস রয়েছে। আছে পর্যটন ইয়ুথ ইন। বেসরকারি কিছু হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup