তারুণ্যের ক্যারিয়ার ভাবনা

 

নাবিল আহমদ

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি

আমি নাবিল আহমদ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মার্কেটিং বিভাগের শেষ সেমিস্টারে পড়ছি। আমরা সাধারণত ক্যারিয়ার নির্বাচন করার ক্ষেত্রে শুধু অর্থনীতির বিষয়টি বিবেচনা করি। যেসব চাকরি বা পেশায় রোজগার বেশি আমরা সেসব চাকরি বা পেশাকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে নির্বাচন করে থাকি। এক্ষেত্রে নিজের পছন্দ, ভালোলাগা-মন্দলাগা, পারিবারিক অবস্থান, ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক অবস্থা এবং সার্বিক পারিপার্শ্বিক সবকিছুকে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করি। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে হলে আত্মবিশ্বাস জরুরি। মানুষ যেখানে স্বস্তিবোধ করে না, সেখানে বিশ্বাস আনতে চায় না। কারো ওপর বিশ্বাস আনতে হলে তার সংস্পর্শকে নিরাপদ মনে হতে হবে। সফল ক্যারিয়ারের চারদিকে শক্ত ভিত্তি গড়তে লাগে আত্মবিশ্বাস। ক্যারিয়ার প্ল্যানিং শুরু করা উচিত মাধ্যমিক বা তারও আগে থেকে। তখন থেকে রিসার্চ করা উচিত কোন ফিল্ডের ডিমান্ড ৪-৫ বছর পর অনেক ভালো থাকবে। সে ফিল্ডে যে কাজ করতে হবে, সেসব কাজে আগ্রহ আছে কিনা, কাজগুলো পছন্দ কিনা। যেহেতু আমি মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র আমার ইচ্ছা এ সেক্টরেই কাজ করার বিশেষ করে বিজ্ঞাপন সংস্থায়। এর কারণ হলো এই সেক্টরে নতুন কিছু করার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। সমাজে নতুন কিছু দেখানোর জন্য এই বিভাগের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইতোমধ্যে আমার দেশের নামকরা দুটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাই আমি মনে করি ডিজিটাল মার্কেটিং এই সময়ের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার। চারদিকে একে একে ডিজিটাল মিডিয়ার যে বিপ্লব চলছে, তাতে ধরে নেয়া যায় মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম হতে যাচ্ছে করপোরেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় টার্গেট। প্রায় প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের মার্কেটিং কমিউনিকেশনকে ডিজিটাল আত্মপ্রকাশ নিয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস। বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের দেশও এগিয়ে চলেছে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে অন্য দেশগুলোর মতো না হলেও ইতোমধ্যে এর চর্চা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রদর্শন ও প্রচারণার কাজে বিজ্ঞাপনের জন্য অন্য সব মাধ্যমগুলোর তুলনায় খরচ ৭০ শতাংশ কম। এছাড়াও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বড় সুবিধা হলো- এর অডিয়েন্স শনাক্ত করা যায়। কোন বয়সের বা কোন এলাকায় বা কোন অডিয়েন্সের কাছে আমি আমার পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করাতে চাই তা চিহ্নিত করা যায়। ভবিষ্যতে এই সেক্টরে আরো বড় হবে তাই আমিও এই সেক্টরে আরো বড় পরিসরে কাজ করতে চাই এবং নতুন কিছু দেখাতে চাই।

 

মোহাম্মদ নাফি

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন এমন আশা নিয়ে আসি যে, আমি মনে হয় সবচেয়ে ভালো কম্পিউটার বিজ্ঞানী হব। আমি ভাবতাম কম্পিউটার চালাতে জানতাম বলে কম্পিউটার সায়েন্স পড়া আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু পড়া শুরু করার পর দেখি আসলে তা না। কম্পিউটার চালাতে পারলেই যে সহজে সব পারা যাচ্ছে সেটি ভুল। অনেকেই দেখতাম আগে থেকে খুব ভালোভাবে প্রোগ্রাম করতে পারছে কিন্তু আমি তার কিছুই জানি না। হতাশায় পড়ে গেলাম। হতাশাতেই পড়ালেখা একদম কমে গেল। প্রথম সেমিস্টারে ফল হলো খুবই খারাপ। একটু ভেঙে পড়েছিলাম সেসময়। শুধু আমি নই, আরো অনেকের একই অবস্থা। আবার অনেকেই খুব ভালো করেছে। একজনকে একবার জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম, ‘আচ্ছা তুমি কীভাবে এত সুন্দর করে সব বোঝো? এত সহজে কীভাবে প্রোগ্রামগুলো সমাধান করো?’ তার উত্তর ছিল, এগুলো মাথায় এমনিতেই চলে আসে। আমি তো আরো হতাশ হয়ে গেলাম। আমার মাথায় তো এমনি এমনি সমাধান চলে আসে না। তাহলে কি এই বিষয় আমার জন্য না? কী করা যায়! আবার শুনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইরা একই বিষয়ে খুবই সফল হয়ে গুগল, ফেসবুকে কাজ করছে। আমি এমন এক বড়ভাইয়ের ফেসবুকে জানতে চাইলাম, ‘ভাইয়া আপনি কীভাবে এত সফল? আমি এত স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলাম, অথচ শুরুতেই মনে হচ্ছে আমাকে দিয়ে হবে না।’ ভেবেছিলাম তিনি ব্যস্ততার কারণে উত্তর দেয়ার সময় পাবেন না। কিন্তু তিনি ঠিকই জানালেন, ‘ভাইয়া, আমার এ পর্যন্ত আসতে কিন্তু অনেক কষ্ট করতে হইসে, এত সহজে কিন্তু আসি নাই। প্রথমদিকে আমিও কিছুই বুঝতাম না। তবে পরে সব ঠিক হয়ে গেছে। তুমি সুন্দর করে অনেক অনুশীলন করো, বেশি বেশি জানার চেষ্টা করো, দেখবা একটা সময় তোমার সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।’ আমি তার উত্তরে খুব সাহস পেলাম। পরের সেমিস্টারে সিরিয়াসলি স্টাডি করলাম। গুগল, বই ঘেঁটে উত্তর বের করতাম, জানতাম, বুঝতাম, মনে রাখতাম। পরে এসব অনেক কাজে লেগেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মাঝামাঝি এসে দেখি, আমি অনেকের থেকে ভালো করছি। তাই কম্পিউটার বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন এখনো আছে, তবে নতুন করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নও মাথায় চেপেছে।

 

রুমান হাফিজ

স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তারপর থেকে ‘কী করতে চাও, কী হতে চাও?’ এ ধরনের প্রশ্নের মাত্রা বেড়ে যায়! বেশ চিন্তায় পড়লাম। এর আগে যে এ রকম প্রশ্ন কেউ করেনি বা শুনিনি তা কিন্তু নয়। তবে তখন সেটাকে আর দশটা প্রশ্নের মতো একটা কিছু বলে দিতাম। এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। চারপাশে বড়-ছোট সবাইকে দেখছি ভবিষ্যৎ নিয়ে মাতামাতি, দৌড়াদৌড়ি করতে। এর পেছনে অবশ্য অনেকগুলো কারণ আছে। আমাদের খুব সাধারণ ধারণা হয়ে গেছে যে, পড়ালেখা করেই চাকরি করা। সে সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি। কিন্তু আমি তো সে রকম কোনো পরিবেশে বেড়ে উঠিনি। আমার পরিবার আমি যা চেয়েছি তাই দিতে চেষ্টা করেছে। তবে পরিবার চায় পড়ালেখা করে একজন সত্যিকারের মানুষ হওয়া। নিজের জায়গা থেকে ভালোলাগার কাজে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করছি সবসময়। বড় হওয়ার সঙ্গে স্বপ্নের পরিবর্তনটা আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। মেজো ভাই পুলিশের চাকরি করত বলে একসময় সেনাবাহিনীতে যাওয়ার কথা বলতাম নিজেই, তারপর আরো কত কী...! বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে এসে পরিচয়, জানা এবং শেখার পরিধি বাড়ল। নতুন করে বুঝতে পারলাম নিজেই নিজের স্বপ্নপূরণে নামতে হলে অবশ্যই উদ্যোক্তা হতে হবে। উদ্যোগ দুই রকমের হতে পারে ব্যবসায়িক আর সামাজিক। আর আমি ব্যবসায়ী না হয়ে সামাজিক উদ্যোক্তা হতে চাই। কারণ শুধু নিজের সুখ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারব না বলেই সমাজ, মা, মাটি এবং মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাই। আমাদের দেশ থেকে সবাইকে আমরা শুধু শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাঠাতে চাই। বিশেষ করে আমাদের এলাকায় (সিলেট) এই প্রবণতা বেশি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে আমাদের অর্থনীতি সচল হচ্ছে। কিন্তু প্রবাসে এই নিঃসঙ্গ শ্রমিকদের জীবন কী আনন্দময় নাকি দুঃসহ সেটি কখনো ভেবে দেখি না। কিন্তু দেশের বিশাল একটা অংশ এই তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য আলাদাভাবে সাহায্য করার সুযোগ থাকত, তাহলে হয়তো তারাও একেকজন নিজ দেশেই মায় স্নেহে বাবার সাহসে ভাইয়ের সহায়তায় বোনের ভালোবাসায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের দেশে এ ধরনের তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। এদের মধ্যে অনেকে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা তাদের বিভিন্ন সময় এ সাফল্যের স্বীকৃতিও দিয়েছে। যার ফলে দেশের বিভিন্ন খাতে এখন নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হতে শুরু করেছে। কারণ উদ্যোক্তা এমন একটা পেশা, যা কিনা শুধু নিজের নয়, বরং আরো অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে।

 

রাফিউল হাসান রবিন

পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটি

ভার্সিটি জীবনের প্রথম সময়টা প্রায় আট-দশজনের মতোই ছিল। সকাল-সন্ধ্যা ক্লাস, ফেসবুক, মুভিস এসব করেই দিন চলে যেত। তারপর একদিন মামার ফোন এলো, কেমন আছি, কী করি এসব জিজ্ঞাসা করল। এখনো কোনো কিছু শুরু করেছি কিনা? আগেই বলে রাখা ভালো, আমি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছি, আর আমার মোটিভটাও আমার মামা, তিনিও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। মামা সেদিন আমাকে উপদেশ দিল শুরু থেকেই এটার সঙ্গে লেগে থাকতে, নতুন নতুন কাজ শিখতে। আমারো একটা নেশা ছিল টেকনোলজি নিয়ে কাজ করা, আর টেকনোলজির অন্যতম হলো কম্পিউটার। এর মধ্যেও অনেক ভাগ আছে। মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলো নিয়ে আমার আলাদা একটা নেশা রয়েছে। এগুলো নিয়েই কাজ করতে চাই, এটায় যেমন বিভিন্ন ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে জানা হবে, শেখা হবে, ঠিক তেমনি উপার্জনও হবে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাও হবে। আমরা যতই সামনের দিকে যাচ্ছি, ততই ডিজিটাল হচ্ছি, আর তার একটা বড় অংশ হচ্ছে কম্পিউটার, কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনস এসব। এগুলোর গুরুত্ব এতই বেশি এখনকার সময়ে, তা বলে শেষ করা যাবে না। নিজের স্বপ্ন আর পেশা এ দুটোকে এক করার মতো দুঃসাহসটাকেই জীবনের বড় লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করেছি।

 

বর্ষণ ভৌমিক

ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটি

‘ক্যারিয়ার’ এই শব্দটা সবার জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়, আরো গুরুত্বপূর্ণ যখন আপনি ইউনিভার্সিটির শেষ সেমিস্টারে পড়ছেন। ছোটবেলায় অনেক কিছু হব ভাবতাম। জীবনের লক্ষ্য নিয়ে রচনা লেখায় ডাক্তার থেকে শুরু করে পাইলট পর্যন্ত সব হয়েছিলাম। কিন্তু বড় হওয়ার পর স্বপ্নটা ভিন্ন ছিল। খেলাধুলাতে ভালো ছিলাম আর আমার মা-বাবাও অনেক সাপোর্ট করত। তার কারণেই ঠিক করলাম প্লেয়ার হব। কিন্তু ইনজুরি আমার জীবনের বড় বাধা হিসেবে দাঁড়াল, সেখান থেকে আর এগোতে পারলাম না। কমার্স নিয়ে পড়ালেখা করার কারণে ঠিক করলাম এমন কিছুকে বেছে নেব যেটা ইকোনমিক্সের সঙ্গে সংযুক্ত। আমার স্বপ্ন ফাইন্যান্সিয়াল এনালিস্ট হওয়ার। কারণ আমার মতে একটা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ভর করে সে দেশের অর্থনৈতিক প্ল্যান অ্যান্ড সঠিক অ্যানালিস্টের মাধ্যমে তা কাজে লাগানোয়। দেশের প্রতিটি খাতে সঠিকভাবে অর্থ ব্যবহার করাও অনেক বড় কাজ, যেটায় নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যৎ। নিজেকে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে গড়ে তোলাই আমার জীবনের স্বপ্ন এবং এটিকেই আমি পেশা হিসেবে নিতে চাই।

ছবি : হৃদয় তানভীর, সংগ্রহ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup