​তারুণ্যের ক্যারিয়ার ভাবনা

ক্যারিয়ার নিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে সবাই যে বিষয়ে পড়ত শুধু সেই বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাইত। তবে সেই ট্রেন্ড থেকে বের হয়ে এসেছে বর্তমান সময়ের তরুণরা। এখনকার তরুণরা বিষয়ভিত্তিক পেশা ছাড়াও নানামুখী পেশা নিয়ে ভাবছে। আনন্দধারার করা ছোট্ট এক জরিপে এসব তথ্যই জানা গেছে। আনন্দধারার পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের পছন্দের পেশা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, উত্তরে তারা তাদের পছন্দের কথা জানিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে এসব শিক্ষার্থী তাদের পড়ার বিষয় সম্পর্কিত ক্ষেত্র ছাড়াও আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে চায়। সেখান থেকে ২১ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর পছন্দের ক্যারিয়ার সম্পর্কিত মন্তব্যের বিস্তারিত এখানে তুলে ধরা হলো।

 

শিশির মনির

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এখানে আমি ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পড়াশোনা করছি। ভাষা নিয়ে যে অভিনব ক্যারিয়ার হতে পারে, তা আমার আগে জানা ছিল না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদেশি ভাষার ওপর সম্মান ডিগ্রি একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে। এই বিভাগে পড়ে আমার ক্যারিয়ার কী হবে এটা নিয়ে প্রথম দিকে নিজের মধ্যে সংশয় কাজ করেছে। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পারলাম, আমি এমন একটি বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করতে যাচ্ছি বিশ্ববাজারে যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নিজ দেশেও রয়েছে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ। এখানে আমরা ভাষাকে এমনভাবে অধ্যয়ন ও চর্চা করি, চার বছরের মধ্যে আমরা ফরাসি ভাষা বলা, শোনা, লেখা ও পড়ায় সমান পারদর্শী হয়ে উঠব। তারপর ভাষাই আমাকে ক্যারিয়ার গড়ে দেবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠিত বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানে আমার ভাষার দক্ষতা অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে মূল্যায়ন পাবে। জাতিসংঘ, ওআইসিসহ পৃথিবীর প্রায় সব সংস্থায় ফরাসি ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ফরাসি ভাষা জানা থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে। আরো আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে শান্তিরক্ষা মিশনে দোভাষী হিসেবে কাজ করাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ। এছাড়াও অনুবাদক সংস্থা, ট্রাভেল ও ট্যুরিজম এজেন্সি, হোটেল- মোটেল-রিসোর্ট, বিমান ও পরিবহন কোম্পানিতে আছে বিদেশি ভাষা জানা মানুষের অনেক চাহিদা। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন প্রকল্পে দক্ষ দোভাষীর ব্যাপক কদর রয়েছে। এগুলোর যেকোনো একটিতে আমি সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারব। আমার চাওয়া হলো, আমি ফরাসি ভাষার দক্ষতাকে যেখানে ব্যবহারের বেশি সুযোগ পাব, সেখানেই আমি আমার স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়ব। ভাষাতেই হোক ভালোবাসার ক্যারিয়ার।

 

সাগর ফরায়জী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ব্যাংকিং পেশাটা এখন বহুমুখী হয়ে গেছে। দেখা যায় বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা ম্যাষে অনার্স-মাস্টার্স এবং এমবিএ করে ব্যাংকের পিওতে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছে। আবার এমনো আছে, পরিসংখ্যানে বিএসসি করে এমটিওতে নিয়োগ পাচ্ছে। তাই নির্দিষ্ট করে কমার্সে কিংবা হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং কিংবা ফিন্যান্সে পড়লে ব্যাংকার হওয়া যাবে এমনটা আর নেই। যে কোনো সাবজেক্টে পড়–ন সমস্যা নেই, তবে আমি সাজেস্ট করব বিজ্ঞানের কোনো বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করুন। এতে সুবিধা হলো ম্যাথে স্ট্রং থাকবেন। আরেকটা কথা হলো, ইংরেজিতে ভালো ব্যাসিক তৈরি করুন, ব্যাংকার আপনি তখনই হতে পারবেন, যদি নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। আর বর্তমানে ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং। তাই কোন বিভাগে পড়বেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইচ্ছা থাকলেই ব্যাংকার হওয়া সম্ভব।

 

 

আবু হেনা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যাল

ছোটবেলায় মা-বাবা ঠাট্টাচ্ছলে জিজ্ঞেস করত, তুমি বড় হয়ে কী হবে? চার-পাঁচ বছরের শিশুর কাছে এই প্রশ্নের সীমা-পরিসীমা নেই। তখনো বুঝতাম না, তবুও বলেছিলাম বড় হয়ে পুলিশ অফিসার হব। বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা! যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে স্বদেশের প্রতি দেশাত্মবোধকে ধারণ করে মাটি ও মানুষের সেবা করতে চাই। পুলিশ বাহিনী হচ্ছে একমাত্র, যাদের মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সমষ্টি পর্যায়ে জনগণের সেবা করার সুযোগ আছে। সমাজ থেকে সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চাই। বাবা স্বপ্ন দেখত আমি একদিন পুলিশ অফিসার হব। একজন পুলিশ অফিসার হওয়ার জন্য যে গুণাবলি দরকার, তার সবগুলো আমার মধ্যে রয়েছে বলে আমি মনে করি। সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করছি। আমি সায়েন্স নিয়ে পড়ছি। কিন্তু সায়েন্স আমার ভালো লাগে না। তবুও পরিবারের ইচ্ছাতেই ফিজিক্স নিয়ে অনার্স করছি। বাবা বাদে পরিবারের সবাই চায়, আমাকে একজন বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেখতে। তবে আমার ওসবে তেমন আগ্রহ নেই। তবুও যদি পুলিশ হতে না পারি, তাহলে বিসিএসের জন্য চেষ্টা করব। আপাতত প্ল্যান হচ্ছে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এসআই পদে পরীক্ষা দেব। যদি সেখানে টিকতে পারি, তাহলে তো ভালোই। আর না পারলে বিসিএসের জন্য চেষ্টা করতে হবে। যদি বিসিএসে টিকতে পারি, তাহলেও আমি প্রশাসনের দিকেই যাব। সেক্ষেত্রেও আমি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে পারব। দেশের সেবা করতে পারব। সব মিলিয়ে আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। আমার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা আপাতত এগুলো ঘিরেই। আমিও সেই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। বাবার লালিত স্বপ্নকে পূরণ করতে থেমে নেই পথচলা।

 

মাহবুব এ রহমান

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সেই ছোট্টকালে আমাদের কত কিছুই না হতে ইচ্ছে করত। কেউ ডাক্তার হতে চাইতাম, কেউ ইঞ্জিনিয়ার আবার কেউ পাইলট ইত্যাদি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিন্তাভাবনায় আসে পরিবর্তন। আমরা বুঝতে শিখি চারপাশের সব পারিপার্শ্বিকতা। সেসবের সঙ্গে বদলাতে থাকে আমাদের স্বপ্নের গতিপথও। আমি যখন প্রাইমারিতে পড়তাম তখন বিভিন্ন পত্রিকায় ভাইয়ার লেখা প্রকাশিত হতো। ভাইয়া সেসব বাড়িতে আসার সময় নিয়ে আসতেন। ভাইয়ার ওসব লেখালেখি দেখে আমার মাঝেও লেখালেখির প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়। তখন ক্লাস ফোরে থাকতে একটা ছড়া লিখে ফেললাম। আবার সেটা ছাপাও হলো একটা স্থানীয় পত্রিকায়। শুরুটা এভাবেই। তারপর মাধ্যমিক পরীক্ষার পর মোটামুটি নিয়মিতই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছড়া ও গল্প লেখা শুরু। এভাবে করে উচ্চমাধ্যমিক শেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় দীর্ঘ বিরতি লেখালেখি থেকে। তখন টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পড়ার। কিন্তু ঢাবিতে আর পড়া হয়নি। পরে চান্স হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হয়ে প্রথম বর্ষেই শুরু করি সাংবাদিকতা। একটা অনলাইন পোর্টালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করি। এখন কাজ করছি একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে। সমকাল, জনকণ্ঠ, যায়যায়দিন, অনন্যা ম্যাগাজিন এবং রাইজিং বিডিতে ফিচার লিখছি। ভবিষ্যৎটা এ পেশাতেই ক্যারিয়ার গড়তে চাই। জানি, পেশাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। তবুও স্রেফ নিজের ভালোলাগা থেকেই এখানে থাকতে চাই। কাজ করতে চাই দেশ এবং দশের জন্য। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সৃজনশীল লেখালেখিতেও যুক্ত রাখতে চাই নিজেকে।

 

কাজী সৌরভ আহমেদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রজীবন হচ্ছে একটি পরিণত জীবনের প্রস্তুতি পর্ব। প্রতিটি মানুষের ছাত্রজীবনের পরবর্তী জীবন আবর্তিত হয় তার পেশাকে কেন্দ্র করে। তাই কম-বেশি সব মানুষেরই পছন্দের একটি পেশা থাকে। আমিও এই গতানুগতিক ধারার ব্যতিক্রম নই। বন্ধুমহলের বাকি সবার মতোই ছোটবেলায় আমিও ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। তবে সে স্বপ্নের পথ বন্ধ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই। তাই বর্তমানের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় আমার পছন্দের পেশা হচ্ছে ব্যাংকের চাকরি। কারণ ব্যাংকের চাকরিতে সুযোগ-সুবিধার পরিমাণ নিঃসন্দেহে অন্যান্য চাকরির চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। যেমন- বছরে দুটি আনুষ্ঠানিক ভাতা, চাকরিজীবী ঋণ, কম্পিউটার ঋণ, বাইক ঋণ, গৃহ ঋণ, গাড়ি ঋণ ইত্যাদি, প্রতি বছর ২-৩টি লভ্যাংশ বোনাস, অবসর নেয়ার পর বিভিন্ন প্রকল্প, বেসরকারি কোম্পানি, অন্যান্য ব্যাংকে চাকরির সুযোগ ইত্যাদি। একঘেয়েমি কাজের বিড়ম্বনা থাকলেও ব্যাংকের চাকরিতে কর্মবিরতি পাওয়া যায়। তাই চাকরির ফাঁকেই অবসর সময়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত থাকা যায়। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ বেতন, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি বিবেচনায় আমার পছন্দের পেশা হচ্ছে ‘ব্যাংকার’। বর্তমানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৫৬টি ব্যাংক রয়েছে। কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও আলাদা নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমেই ব্যাংকের চাকরির সুযোগ মেলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লোভনীয় এই চাকরির সুযোগ পেতে হলে প্রয়োজন অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, শ্রম ও একাগ্রতা। তাই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সৃষ্টিকর্তার কাছে একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করি, হে বিধাতা আমাকে সাহস দাও, সামর্থ্য দাও, প্রাণে দাও অপরাজেয় উৎসাহ।

ছবি : হৃদয় তানভীর ও সংগ্রহ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup