হুইসেল কুইন অবন্তি সিঁথি

‘হুইসেল কুইন’ বলতেই শ্রোতারা অবন্তি সিঁথিকে এখন একনামে চেনেন। গান নিয়ে প্রতিনিয়ত স্বপ্ন আঁকেন তিনি। কলকাতার সারেগামাপা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে গানের সঙ্গে শিস আর কাপ বাজিয়ে মুগ্ধ করেছেন। সিঁথির গানের যাত্রা, গানে সাময়িক বিরতি, নতুন গানের খবরসহ অনেক না-বলা কথা বলেছেন আনন্দধারার সঙ্গে। তারই অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য...

আনন্দধারা : যে স্বপ্ন নিয়ে গানের যাত্রা করেছিলেন, তার কতটা কাছাকাছি এখন?

অবন্তি সিঁথি : গান নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না যে, এই জায়গায় যেতে চাই। সবসময় নিজের আবেগ থেকে আমার কাজগুলো করি। প্রতিনিয়তই আমার নতুন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং সেগুলোর পেছনে ছুটে বেড়াই।

আনন্দধারা : নতুন বিষয়ের প্রতি দুর্বলতা, এটা কি ছোটবেলা থেকেই ছিল?

সিঁথি : হ্যাঁ, এটা ছোটবেলা থেকেই ছিল। যেমন ছোটবেলা থেকেই শিস বাজাতাম। কিন্তু এটা যে গানে পরিবর্তন করা যায়, সেটা আমি বড় হয়ে জানলাম। স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় ছেলেরা কিন্তু শিস বাজাত- এই আওয়াজটা আমার খুব ভালো লাগত। তারপর আমরা দুই বোন যখন এক সঙ্গে হতাম, তখন বলতাম কে এই আওয়াজটা ভালোভাবে করতে পারে। এই রকম করতে করতে শুরু এবং আস্তে আস্তে আমি বিভিন্ন সুর তুলতে পারতাম।

আনন্দধারা : গানের সঙ্গে কীভাবে পথচলা?

সিঁথি : ছোটবেলা থেকে আমার গানের প্রতি একটা ঝোঁক তৈরি হয়। কারণ তখন আমার দিদি অদ্বিতি দেব গান করতেন। এরপর সুশান্ত দেব ছিলেন গুরু। তিনি যখন গান শেখাতে আসতেন, দিদি মাঝে মাঝে ভুল করলে আমি তাকে বলে দিতাম যে, এটা এভাবে কর। তারপর একটা সময় আমার বড় বোন গান ছেড়ে দেয়। গানটা আমি চালিয়ে যেতে থাকি। যতদিন জামালপুরে ছিলাম, ততদিন তার কাছেই শিখেছি। তারপর বাবা মারা গেলেন, অনেকদিন গান-বাজনা বন্ধ ছিল।

আনন্দধারা : কেন গানটা বন্ধ ছিল?

সিঁথি : বাবার স্বপ্ন ছিল গান করি। বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে অডিশন দেয়ার জন্য বাবা আমাকে বলতেন। ২০০৬ সালে আমি ক্লোজআপ ওয়ানে অংশগ্রহণ করি এবং খুব তাড়াতাড়ি বাদ পড়ে যাই। তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। তার দুই মাস পর বাবা মারা যান। একদিকে আমার এসএসসি পরীক্ষা, অন্যদিকে পারিবারিক একটা চাপ। তার জন্য অনেকদিন গান থেকে দূরে থাকলাম। পড়াশোনায় মনোযোগ দিলাম। এরপর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন আবার শুরু করলাম। ২০১১ সালে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং ২০১২ সালে আমি আবার ক্লোজআপ ওয়ানে অংশগ্রহণ করি। যেহেতু বাবার স্বপ্ন ছিল এবং আমার বন্ধুরা অনুপ্রাণিত করত। তাই আবার সেখানে অংশগ্রহণ করা এবং সেখানে নিজেকে আবার নতুনভাবে খুঁজে পাই। সেখানে গিয়ে শিস বাজিয়েছিলাম। সেখান থেকেই আমার নাম হয়ে যায় ‘হুইসেল কুইন’।

আনন্দধারা : শিস নিয়ে টেলিভিশনে বা কোনো অনুষ্ঠানে কবে যাওয়া হয়েছিল?

সিঁথি : শিস বাজিয়ে গানের পাশাপাশি কিছু করা যায়, সেটা আমার ২০১২ থেকে শুরু হয়েছে। ক্লোজআপের প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে শিস বাজানোটা আমার স্বাক্ষর হিসেবে ব্যাবহার করতাম।

আনন্দধারা : সারেগামাপা-তে যাওয়ার আগে আপনার বেশকিছু গান রেকর্ড করেছিলেন। রেকর্ডিং কবে থেকে শুরু হয়েছিল?

সিঁথি : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন চলার সময় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্যারের ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’ গানের হুইসেল ভার্সন রেকর্ড করি। ক্লোজআপের পর এটাই আমার প্রথম রেকর্ড। এরপর বেশকিছু সিনেমার গানে প্লেব্যাক করেছি। ২০১৪-তে আমি আমার প্রথম মৌলিক গান প্রকাশ করি। গানটির নাম ছিল তোমার জন্য। গানটি লিখেছিলেন সুহুদ সুফিয়ান এবং সুর-সংগীত করেছিলেন সজীব দাস। ২০১৬-তে আবার চিন্তা করলাম নতুন কিছু করা যায় কিনা। তারপর ‘কাপ সং’ নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু।

হুইসেল কুইন হিসেবে তখনো সেভাবে পরিচিতি পাইনি। ২০১৬ সালে তখন আমার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন চলছে। পাশাপাশি আমি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। এসবের মাঝে যতটুকু সময় পেতাম, সেটা আমি গানের পেছনে ব্যয় করতাম।

আনন্দধারা : কাপ সং করা শুরু করলেন কবে?

সিঁথি : ‘কেন এই নিঃসঙ্গতা’ গানটা যখন ফেসবুকে পোস্ট করলাম, তখন দেখলাম বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই বিষয়টা একেবারে নতুন। তারপর সবার কাছে এই ব্যাপারটা ছড়িয়ে যেতে লাগল। মনে হলো যেহেতু সবার কাছে এটা নতুন, তাই আর একটু চেষ্টা করি। তারপর আমার ইউটিউব চ্যানেলে এগুলো দিতে থাকলাম। এক সময় আমার মনে হলো কাপ দিয়ে যেমন মিউজিক করা যায়, তেমনি আরো অন্যান্য বস্তু দিয়েও এটা করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গানের সঙ্গে বিভিন্ন জিনিস যুক্ত করে আমি করা শুরু করলাম। তখন এই ভিডিওগুলো ভাইরাল হতে শুরু করল। ২০১৬-তে যেখানে সীমান্ত তোমার এই গানটা কভার করি। সেখানে কাপের পাশাপাশি ফয়েল পেপার এবং কয়েন ব্যবহার করেছিলাম। এই জিনিসটা কলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। সেখানকার রথিজিৎ স্যারের চোখে পড়ে ভিডিওটা। তিনি আমাকে সারেগামাপায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন।

আনন্দধারা : সারেগামাপার যাত্রাটা সম্পর্কে জানতে চাই?

সিঁথি : অনেক ভালো ছিল। সারাজীবনে যতটা না শিখতে পেরেছি, তার চেয়ে বেশি এখান থেকে শিখেছি। ২০১২ সালের পর আমার যে ভুলগুলো ছিল, যেমন এইটা শুনতে খারাপ লাগলেও বলি, কেউ ধরিয়ে দেয়নি। একটা গান কীভাবে গাইতে হবে, কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে? একেকটা লাইনে কিন্তু একেক রকম কাজ থাকে। এগুলো আমি সেখানে শিখেছি।

আনন্দধারা : সারেগামাপায় শান্তুনু মৈত্র, শ্রীকান্ত আচার্য, মোনালী ঠাকুরের মতো বিচারকদের কাছ থেকে কতটা শিখলেন?

সিঁথি : বিচারকদের কাছ থেকে আমরা খুব বেশিকিছু শিখতাম না। তারা শুধু আমাদের এপিসোডগুলোতে এসে মন্তব্য করতেন। আমরা শিখতাম গ্লুমারদের কাছে। একটা পর্বের আগে অনেকবার একটা গান গাইতে হতো। মঞ্চে গাওয়ার আগে গানগুলো গ্লুমারদের অনেকবার শোনাতে হতো। গ্লুমাররা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত হাতে ধরে ধরে সব শেখাত।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় শিল্পী কারা?

সিঁথি : রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, ন্যান্সি, শায়ান, আশা ভোসলে, শ্রেয়া ঘোষাল, মিনার, হাবিব, কুমার বিশ^জিৎ, সুবীর নন্দী এদের গান আমার অনেক প্রিয়। তবে শায়ানের গানের প্রতি আলাদা একটা মুগ্ধতা রয়েছে।

আনন্দধারা : গান নিয়ে কী ধরনের স্বপ্ন দেখেন? ভবিষ্যতে গান নিয়ে কী করতে চান?

সিঁথি : সারেগামাপা থেকে আসার পর আমার মনে হলো ভিন্ন কিছু করা যায় কিনা। কাপ সং নিয়ে অনেকদিন থেকে কাজ করছি। মঞ্চে যখন গান করতে উঠি, তখন অনেকে কাপ সংয়ের কথা বলে কিন্তু মঞ্চে তো আর এটা করা সম্ভব না। তাই একটা যন্ত্র বানিয়ে নিয়েছি। ওইটার নাম ‘বুজন’, এটার ডিজাইন করেছেন আশিকুর রহমান। কিছু মেয়ে নিয়ে যদি একটা ব্যান্ড দল করতে পারি, তাহলে ভালো কিছু করা সম্ভব হতো। এখন ‘অবন্তি এইমস’ নামের ব্যান্ড করেছি। ‘নাগরিক’ নামে একটি গান করেছি। গানটি আগামী কিছুদিনের মধ্যে প্রকাশিত হবে।

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup