অপার সৌন্দর্যের মায়াজাল- কালিম্পঙ

অপার সৌন্দর্যের মায়াজাল কালিম্পঙ। দার্জিলিং জেলার একটি শহর, জেলা সদর থেকে যার দূরত্ব সাড়ে ৪ ঘণ্টার পথ। দূর থেকে মেঘের আড়াল ভেঙে দৃষ্টিসীমায় ধরা দেয় তিস্তা নদী। সুদূর তিব্বতের মাঝ দিয়ে বয়ে আসা তিস্তা, তারই এক পাশের পাহাড়ে গড়ে উঠেছে গোর্খা জনগোষ্ঠীর শহর কালিম্পঙ। ঠিক তার অপর পাশের মিহি কালো পর্বতশ্রেণিটি সিকিমের অংশ। মাঝরাত থেকেই বৃষ্টি চলমান, সঙ্গে আদর-সোহাগ মাখা মেঘের দুর্দান্ত খেলা। তারই মাঝে দার্জিলিং বাসস্ট্যান্ড থেকে সকালের জিপে রওনা করি কালিম্পঙ-এর পথে। এই বৃষ্টি এই মেঘ, স্যাঁতসেঁতে পিচঢালা পথ মুহুর্মুহু মিশে যায় মেঘের আবরণে। ক্রমেই পিছে পড়ে অতীত হয়ে যায় দর্জিলিং শহর। চলছি বিশ্বকবির প্রিয় কালিম্পঙ-এ। যেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সামনে নিয়ে মুগ্ধ কবি লিখেছিলেন- আমার আনন্দে আজ/ একাকার ধ্বনি আর রঙ/ জানে তা কি এ কালিম্পঙ। পাইন গাছ ঘেরা অসাধারণ সুন্দর পথ, আট হাজার ফুট উঁচু থেকে কেবল নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। উন্মুক্ত বানরের দল লেজ ঝুলিয়ে বসে আছে গাছের ডালে, আবার কখনো শোরগোল করে পথের মাঝে। লম্বা লেজওয়ালা বনমোরগ ফরফর করে উড়ে যায় আশপাশ দিয়ে। ইতোমধ্যে তাপমাত্রা খানিক কমতে শুরু করেছে। পাইন গাছে বাঁধা দীর্ঘ দড়িতে পত পত করে উড়ছে শ্লোক লেখা লম্বা সব রঙিন কাপড়। স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা সেগুলোকে লাউচার বা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ বলে। তাদের বিশ্বাস বাতাস তার স্পর্শে প্রতিনিয়ত পবিত্র ও নির্মলতার মধ্য দিয়ে কল্যাণময় হয়ে ওঠে, যার পরশে নিঃশেষ হয়ে যায় সমস্ত অমঙ্গল।

ফুলের মৌসুম, তাই নানা বর্ণের ফুলের টবে সাজানো হাতে গোনা কয়েকটি ঘর নিয়ে ছোট্ট লপচু গ্রাম, আর এখানেই আমাদের যাত্রাবিরতি। দূর পাহাড়ের ঝরনা থেকে নল দিয়ে বয়ে আনা হয়েছে সুপেয় পানি। গন্তব্যের চেয়ে যাত্রা পথই মহোত্তর, তাই বোধহয় পথের বর্ণনার মাঝ দিয়ে বেরিয়ে আসে অভিজ্ঞতা, ফুটে ওঠে বাস্তবতার অনেকখানি। বড় পেয়ালায় ধোঁয়া তোলা টাটকা চায়ের ঘ্রাণ, সঙ্গে স্থানীয় খাবার থোপ্পা, তাতেই চমৎকার বিরতি নাশতা। জিপ চলল চা বাগানের মাঝ দিয়ে। এক পর্যায়ে পৌঁছে যাই তিস্তা নদীর কাছাকাছি। পারাপারের সেতুটি অনেক উঁচু। সেতু পার হয়ে চিত্রে নামক গ্রাম থেকে পথ ক্রমাগত উঁচুর দিকে, এর মাঝে রাস্তার ধার থেকে কিনে নিই ডাসা ডাসা এক কেজি পিস ফল, দামে সস্তা, মাত্র আশি টাকা। হাওয়া ঠাণ্ডা হতে শুরু করেছে আবারো, সঙ্গে মেঘের ঝাপটা। মেঘে ঢাকা শহর- কালিম্পঙ পৌঁছতে দুপুর পার হয়ে যায়।

শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে অল্প খানিকটা পথ নিচের দিকে অর্থাৎ পর্বতের শেষ প্রান্তে ফ্লাওয়ার প্যাচ নামক লজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। দুপুরের খাবার খেয়ে উঠে পড়ি ফুল গাছ ঘেরা লজের একেবারে উত্তরের কটেজটায়। খাবারের দাম তুলনামূলক বেশি। বড় থালির মাঝখানে বাটি উপুড় করে রাখা সামান্য ভাত, তার পাশে দুটি রুটি। ছোট সাইজের দুটি বাটিতে সাজানো আলাদা সবজি, টক জলে ভেজানো লম্বা করে কাটা শসা-গাজরের চার-পাঁচ ফালি সালাদ এবং সদ্য ভেজে তোলা মড়মড়ে একটি পাপড়। এই হলো খাবারের গড়পড়তা মেন্যু। তারা (গোর্খা) স্বল্পাহারী কিন্তু ভীষণ পরিশ্রমী। নিজেদের মাঝে কথোপকথনে স্থানীয় গোর্খা ভাষার একক প্রাধান্য লক্ষণীয়। এছাড়া হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজির চলও রয়েছে। চরিত্রে তারা সৎ এবং সহযোগী মানসিকতার। থাকার জায়গার খোঁজে এক হোটেলে গেলে আমাদের বাজেটের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি অনুমান করতে পেরে রিসেপশন থেকে স্ব-উদ্যোগে অকৃত্রিম সৌজন্যতার সঙ্গে জানিয়ে দেয়, অন্য হোটেলের ঠিকানা, যা কেবল মুগ্ধ করার নয় শিক্ষণীয়ও বটে।

দার্জিলিংয়ের মতো কালিম্পঙ শহরটিও ঘুমিয়ে পড়ে রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে। শহরের ট্র্যাফিক মোড়ে (কেন্দ্রস্থল) স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাত্র কয়েকটি দোকানে বিকেল থেকে জমে ওঠে পুরোদস্তুর বেচাকেনা। মমো, চাওমিন, ফেম্বি, থোপ্পা, সসেজ, আলুকা দম, এগরোল, ভেজপুরিসহ ইত্যাদি সেখানকার জনপ্রিয় খাবার। কটেজের সামনে খোলা সবুজ চত্বরের শেষ প্রান্তে পাহাড়ের খাদ, সেখানটা রেলিং দিয়ে ঘেরা। সামনে তাকালে শহরের বড় এক অংশের রঙিন বাতিগুলো দেখে মনে হয়, যেন রাতের আকাশে অজ¯্র তারার উঁকিঝুঁকি। ডান দিকে তাকালে দীর্ঘ পাহাড়ের প্রাচীরে চলন্ত গাড়ির হঠাৎ তির্যক আলো জানান দেয় সজাগ সিকিমের।

ভোরের শহর, মানুষের আনাগোনা তখনো শুরু হয়নি, নীরব পরিবেশে পায়ে হেঁটে এগোতে থাকলাম পর্যটক আকর্ষণের বিশেষ স্পট দুর্পিনের দিকে। সম্পূর্ণ পথ হালকা থেকে মাঝারি ওপরের দিকে। শহরে অপরাধমূলক ঘটনা নেই বললেই চলে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (ট্র্যাফিক সিস্টেম) অত্যন্ত সুসংহত। একপর্যায়ে আমাদের প্রায় আর্ধেকেরও বেশি পথের সহযাত্রী হলেন লায়ন্স ক্লাবের স্থানীয় প্রেসিডেন্ট মি. সিনহাল। প্রাতঃভ্রমণরত সদা হাস্যোজ্জ্বল সিনহাল সাহেব একে একে দেখিয়ে দেন চিত্রভানু ও পাইন ভিউ নার্সারির সহজ পথ। সবশেষে সন্ধ্যায় তার অফিসে কফি পানের নিমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি বিদায় নেন। পাহাড়ের খাদে চমৎকার সাজানো প্রতিটি বাড়ি। ঠিক তার পাশ দিয়ে পিচঢালা মজবুত পথ। আড়মোড়া ভেঙে বাসিন্দারা জানালা-কপাট খুলে দৈনন্দিন কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা হেঁটে চলছি গন্তব্যের দিকে। তকতকে ঝকঝকে প্রতিটি বাড়ি, ফুল গাছে সাজানো নয় হেন বাড়ি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অধিকাংশ বাড়ির সঙ্গে ছোট্ট একটি করে দোকান। রঙ চায়ের প্রচলন নেই। প্যাকেটজাত তরল দুধের চা, প্রতি অর্ডারের জন্য তৎক্ষণাৎ দুধ জ্বাল দিয়ে চা পরিবেশন সেখানকার রীতি। চায়ে গোলমরিচের মিহি গুঁড়ো ছিটিয়ে পান করা তাদের অত্যন্ত প্রিয়। এক পর্যায়ে পথ প্রবেশ করে সেনানিবাস এলাকায়। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের সেনানিবাস। সে সময়ের কিছু স্থাপত্য নিদর্শন আজো বিদ্যমান। সেনানিবাস এলাকা ছাড়িয়ে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি সুবৃহৎ বৌদ্ধ মন্দির বা গুম্ফা, যা মূলত দুর্পিন দারা হিল নামে পরিচিত। চারতলা মন্দিরের শেষতলা পর্যন্ত ওঠার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি তলায় ছড়ানো বারান্দা। পশ্চিম পাশের প্রাঙ্গণে উড়ছে হাজার হাজার প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। যতদূর চোখ যায় কেবল মেঘে ঢাকা পর্বত শ্রেণি। মূল মন্দির কক্ষের দরজা তখনো খোলা হয়নি। প্রথমে রাজি না হলেও বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে একজন লামা দরজা খুলে দেন। দেখান মন্দির গৃহের সবকিছু। একে একে পরিচয় করিয়ে দেন মন্দিরের নানা বিষয়বস্তুর সঙ্গে।

কবি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত চিত্রভানুর নাম অনেকেরই জানা, যা কালিম্পঙ-এ দেখার বেশ কয়েকটি জায়গার মধ্যে অন্যতম। ১৩৫০ বঙ্গাব্দ অনুযায়ী ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে কবি পুত্রবধূ শ্রীমতী প্রতিভা দেবী বাংলোটি নির্মাণ করান। ইউরোপীয় ধাঁচের আড়াইতলা বাড়ি। সম্মুখে সুনসান উপত্যকা, তার পরে এক পর্বত শ্রেণি, ঠিক তার পেছনে শির উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবছা কাঞ্চনজঙ্ঘা। প্রতিনিয়তই মেঘ এসে চিত্রভানুর শরীরে শীতল পরশ রেখে ফিরে যায় দূরের পর্বত শ্রেণির পর কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে। কবি মাঝেমধ্যেই কালিম্পঙ-এ এসে মেঘ-পাহাড়ের নীরবতায় কাব্য সাধনায় নিমগ্ন হতেন, মূলত সেই স্মৃতি রক্ষা করার জন্যই প্রতিভা দেবী গড়ে তোলেন চিত্রভানু। সন্নিকটেই রয়েছে পাইন ভিউ নার্সারি (ক্যাকটাস গার্ডেন), যা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা। ১৯৭১ সালে শ্রী মোহন সমশের প্রধান নামের এক ক্যাকটাসপ্রেমী বাগানটি গড়ে তোলেন। সংরক্ষিত রয়েছে সারা পৃথিবীর বহু প্রজাতির ক্যাকটাস। বিশেষ করে উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের প্রজাতিগুলো অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। উপমহাদেশের অদ্বিতীয় এই সংগ্রহশালায় বিরল কিছু প্রজাতিও রয়েছে। পরিদর্শনের পর বুঝতে পারি কালিম্পঙ দেখা বন্ধুরা বারবার কেন এই নার্সারির কথাই বলেছিল।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাস্তার উভয় পাশের ভবনগুলো দেখে হঠাৎই মনে হবে এশিয়ার বাইরে কোথাও। ট্র্যাফিক মোড় থেকে ক্রোশখানেক দূরে অবস্থিত সনাতন ধর্মের মন্দির মঙ্গলধাম। মন্দিরের এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় ভালোভাবে ঘুরে দেখার সুযোগ মেলে, অত্যন্ত পরিপাটি এবং অনেক বড় জায়গা। মিটমিটে রঙিন আলোয় সাজানো মন্দিরের মূল কক্ষ। গুরুগম্ভীর পরিবেশ, সন্ধ্যার পর থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বসে সমস্বরে চলে কীর্তন। ভেতরে প্রবেশের জন্য মানতে হয় সংস্কারমূলক কিছু নিয়ম-কানুন, এই যেমন- পা ধৌত করা, মাথার চুল মুছে নেয়া ইত্যাদি। শহরের পাশে শনিবারের বাজারটিও দেখার মতো, ভোর থেকে শুরু করে বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাহাড়িরা নিজস্ব উৎপাদিত ফসল ও হস্তশিল্পের দোকান নিয়ে বসে। ডেলো হিল, জং ঢং পালরি ফো ব্রাং মন্দির, গ্রাহামস হোম, থংসা গুম্ফা, সায়েন্স সেন্টারসহ কালিম্পঙ-এ আরো কিছু দেখার জায়গা রয়েছে। অধিকন্তু গোর্খাদের সংস্কৃতি ও জীবনাচার সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা লাভের জন্য শহরসহ আশপাশটা পদব্রজে পরিভ্রমণ করে নেয়াটা সর্বোত্তম।

যেভাবে যেতে হবে : ঢাকার কল্যাণপুর থেকে দৈনিক রাত ৮টায় লালমনিরহাট বুড়িমারী স্থলবন্দরের উদ্দেশে এসআর, শ্যামলী ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের বাস ছেড়ে যায়, ভাড়া- এসি ৮০০, ননএসি ৬০০ টাকা। সীমান্তের ওপার চেংরাবান্ধা থেকে প্রতিনিয়তই শিলিগুড়ির বাস পাওয়া যায়, এছাড়াও জিপ বা অ্যাম্বাসাডর রিজার্ভ করা যেতে পারে। শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি কালিম্পঙ-এর জিপ পাওয়া যায় অথবা দার্জিলিং হয়েও যাওয়া যেতে পারে। কালিম্পঙ শহরে ৮০০ থেকে ১৫০০ রুপির মধ্যে হোটেল রুম বা কটেজ পাওয়া যায়।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup