‘জীবনের বিশাল সমুদ্রে আমরা প্রত্যেকে এক-একটা ঢেউ মাত্র’- সৈয়দ জামিল আহমেদ

সৈয়দ জামিল আহমেদ বাংলাদেশের থিয়েটারের নন্দিত মুখ। নিজের কাজ দিয়ে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন নিজেকে। তার পরিচালনায় নাটকগুলো দারুণভাবে সাড়া ফেলে দর্শকদের মাঝে। এখনো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। থিয়েটারের অস্থির সময়েও তিনি কাজ দিয়ে মানুষকে থিয়েটারমুখী করেছেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে তার পথচলার সূচনা। তার উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিষাদ সিন্ধু, চাকা, রিজওয়ান, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। ডেইলি স্টার ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আয়োজনে জীবনের জয়গান ২০১৯ সালে তাকে দেয়া হচ্ছে আজীবন সম্মাননা। আগামী ২৫ অক্টোবর তুলে দেয়া হবে সেই পুরস্কার। তার আগে আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে একান্ত আলাপনে বলেছেন থিয়েটার নিয়ে নিজের বিশ্বাসের কথা। তারই অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য...

রাফি হোসেন : শুরুতেই আপনার জন্য একটি আনন্দের খবর; এই বছর ডেইলি স্টার এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের যৌথ আয়োজন জীবনের জয়গান ২০১৯-এ আপনাকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। তার জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাই।

সৈয়দ জামিল আহমেদ : আমাকে এভাবে সম্মানিত করার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ। আপনারা আমার কাজকে মূল্যায়ন করে এই সম্মাননা দিচ্ছেন। যে কোনো সম্মাননা কিন্তু একজন মানুষের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আবার এখানে একটা ভয়ের ব্যাপারও আছে। এই যে সম্মান দেয়া হচ্ছে, সেটাকে ধরে রাখাটাও দরকারি। এদিকে আপনি বললেন ফ্যান-ফলোয়ারের কথা; তারা কী পছন্দ করবে সেটা ভেবে যদি কাজ শুরু করা হয়, তাহলে গ-গোল লেগে যাবে। তাই সবসময় কাজ নিয়ে সিরিয়াস। আমার কাছে কাজটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেদিকে মনোযোগী হতে চাই।

রাফি হোসেন : ভক্তরা কী পছন্দ করবে তা ভেবে আপনি কাজ করেন না, নিজের মতো করে কাজ করেন। আপনার দীর্ঘ থিয়েটার জীবনে আপনি সিলেকটিভ ছিলেন। আবার শিক্ষক হিসেবে যেসব কাজ করেছেন, সেগুলোও দারুণ ছিল। আপনার কাজ আপনাকে উচ্চতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। আমরা গুণীদের সমাদর করতে কার্পণ্য করি। বাংলাদেশে একজন মানুষকে যোগ্য সম্মান হয়তো সময়মতো দেয়া হয় না। আমরা চেয়েছি একজন গুণী মানুষ যেন বেঁচে থাকতেই তার সম্মানটুকু দেখে যেতে পারেন। সেটাই সম্মানের। এ বছর আপনাকে সম্মান দিতে পেরে আমরা নিজেরাও সম্মানিত বোধ করছি। এছাড়া আপনি এটাকে গ্রহণ করায় আমরা গর্বিত। আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেখেছি মানুষের অনেক আগ্রহ। সবাই জানতে চায়, জামিল আহমেদ কী কাজ করছেন। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাতেও কিন্তু সেটাই স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের থিয়েটারের সংকটময় সময়ে আপনার ‘রিজওয়ান’ ব্রেকথ্রু এনে দিয়েছে। ঈদের সময় ঊনিশটা শো করে আপনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রোডাকশন ভালো হলে মানুষ দেখতে আসে। আপনার কাছে জানতে চাইব, আপনার দীর্ঘ যাত্রা, বাংলাদেশের থিয়েটারের বর্তমান অবস্থা এবং আমাদের কোথায় যাওয়া উচিত।

জামিল আহমেদ : আসলে আমাদের কোথায় যাওয়া উচিত, সেটা মনে হয় কেউ আগাম বলতে পারে না। মিশেল ফুকোর কথায় বলতে গেলে, এটা সবাই মিলে করি এবং আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হয়। আগাম বলা যাবে না, কারণ আমাদের স্বপ্ন থাকতে পারে কোথায় যেতে পারি। আমার যাত্রা নিয়ে বলতে গেলে বলব, আমার কাছে মনে হয়েছে জীবনটা খুব অ্যাক্সিডেন্টাল। এখানে আমার ইচ্ছা যেমন কাজ করে আবার অবকাঠামো ও পরিকাঠামোও কাজ করে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময় ১৯৭২ সাল, তখন বাংলাদেশকে আমার কাছে মনে হতো অসম্ভব কিছু নেই। এমন একটা খোলা সময় মনে শরীরের নিঃশ্বাস থেকে শুরু করে সবকিছু সম্ভব। একটা বিশাল আশাজাগানিয়া সময় ছিল সেটা। ওই সময় মানুষ ঝুঁকি নিতে, নতুন কিছু করতে কার্পণ্যবোধ করেনি। সবকিছুতে তারুণ্যের শক্তি ছিল, কাজের ইচ্ছা ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, সবাই নরমালাইজড হয়ে যাচ্ছে। নরমাল কিছু না, স্বাভাবিক স্বভাবগত কিছু থাকে না পৃথিবীতে। আমি স্বাভাবিকভাবে এমন নয়, আমার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যও নয়। মানুষ হিসেবে আমরা অনেক কিছু চিন্তা করি। সেই চিন্তা থেকেই কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়। যে পরিস্থিতিতে আমরা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাই। এটা স্বাভাবিকভাবে জামিল কিছু বলতে চাচ্ছে না। আপনি আমাকে কিছু প্রশ্ন করেছেন এবং সেই প্রশ্ন থেকে আমি আজকে কী করছি সেটাই চিন্তা করে। কাজেই এটা এমন না যে দীর্ঘ স্বপ্ন আছে, কোনো ফিলোসফি আছে বা কোনো লক্ষ্য আছে; যেখানে আমাকে যেতে হবে। আপনি বলছিলেন আমার যাত্রার কথা। এই প্রশ্নের উত্তরে আমার জন্য দুটো-তিনটে জায়গা হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আমি যখন ভারতে পড়েছি মনে হয়েছে ভারতের রয়েছে অসাধারণ দেশজ নাট্যরীতি। সেখানে ইবরাহীম আল কাজী আমার শিক্ষক ছিলেন। তাকে ইউরোপীয় থিয়েটার চর্চায় ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করতে দেখেছি। আমাকে দুই বছর ধরে তা দেখিয়েছিলেন এবং শিখিয়েছিলেন। আমি পরে বানসিকল এবং ডিভি কারানকে দেখেছি দেশজ নাট্যচর্চায় পুরো ভারতের ব্যাপক আগ্রহ। থিয়েটার দিয়ে ভারতের পরিচিতি তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। সেজন্য তারা বেছে নিয়েছিলেন দেশজ নাট্যচর্চাকে। আগ্রহ জেগেছিল তখন থেকেই। দেশে ফিরে ভাবতে লাগলাম কীভাবে দেশি নাটকের ফেরি করা যায়। আমি চেয়েছিলাম ইউরোপীয় নাট্যরীতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের নিজস্ব নাট্যরীতি তৈরি করার। আমার শুরুর চিন্তাটা এমনই ছিল। তারপর যখন ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে ছিলাম, তখন দেখলাম সেলিম আল দীন, নাসিরউদ্দীন বাচ্চুরা এই কাজটাই করছেন। ফলে ওই ¯্রােতের সঙ্গে খুব সহজেই আমার যাত্রা হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, দেশজ চিন্তা থেকে। যে কারণে ‘বিষাদ সিন্ধু’ করেছিলাম। আমি ভাবতাম আমরা যে ভাষা তৈরি করেছি, সেই ভাষাতেই কেন দেশজ থিয়েটার হবে না। কাজেই প্রথম দিককার কাজ এখানেই দাঁড়িয়ে। তৃতীয়ত, আমরা মুসলিম। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটা নিয়ে মাতামাতি করারও কিছু নেই।

 ১৯৭৪ সালে ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে আমার যে চর্চা শুরু হয়, কখনোই মনে করিনি থিয়েটার ছেড়ে অন্য কোথাও যাব। ফিল্মও ভালো লেগেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে থিয়েটারের পাশাপাশি ফিল্ম চর্চা করলেও ভালো হতো। কারণ ফিল্মে একবার ক্যামেরাবন্দি করতে পারলে অভিনেতাকে দ্বিতীয়বারের জন্য বলতে হয় না, আপনার অভিনয় যেন ঠিক থাকে। সেটা ভিন্ন কথা। কখনোই থিয়েটার ছেড়ে আসতে চাইনি, কারণ থিয়েটার আমাকে শিখিয়েছে থিয়েটার কখনো নরমালাইজ করে না। থিয়েটার বলে না এটা নর্ম, এটা এমন হওয়া উচিত না। বৌদ্ধ ধর্ম থেকে আমরা শিখেছি, পৃথিবী সবসময় পরিবর্তিত হচ্ছে। এ দুটো জিনিস যদি পরিষ্কার থাকে, তাহলে মনে হয় আমার কথা বোঝা সহজ হবে বা আমাকে বুঝতে পারা সহজ হবে। জীবনে কখনো মনে করিনি সত্য কোথাও আছে, সত্য নির্মাণ করি আমরা। আমরা বুঝি আমরা কীভাবে নির্মাণ করব। থিয়েটার আমাকে একটা ভাষা দিয়েছে, উপস্থিত থেকে বা সামনাসামনি থেকে আদান-প্রদান করা। যে আদান-প্রদান হয় একটি কল্পিত ভুবন নির্মাণের মাধ্যমে। মানে একটি কল্পিত ভুবন নির্মাণ করে ফিকশনের ভেতরে ঢোকা। এ ফিকশনটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফিকশন আমাকে সুযোগ দেয়, অধিকার দেয় চিন্তা করার জন্য। ফলে আমার মনে হয় এ রকম না হয়ে বা এমন হলে কেমন হতো? যদি এমন হতো তাহলে কেমন হতো? ওই যদির ওপরে আমাকে অনেক কিছু নির্মাণ করার সুযোগ দিই। সব ফিকশন তাই। থিয়েটার আমাকে মানুষের সামনে ত্রিমাত্রিক আকারে এই উপস্থাপনের সুযোগ দেয়। এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করার সময় ফিকশনের ভেতর থেকে আমি জীবনকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। আমি আমার থিয়েটারে জীবনকে অনুকরণ করতে চাই না, কখনোই না। এটা অনুকরণ সম্ভব না। জীবনটাকে মঞ্চে নিয়ে আসা সম্ভব না। জীবন সবসময় প্রতি রূপায়িত হয়। থিয়েটারের সঙ্গে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার দারুণ মিল আছে। ক্রিকেটে ক্যাচ উঠলে সেটা ধরার জন্য হাতটা উঠে যায়। সেটা ফসকে গেলে হাতটা নেমে যায়। থিয়েটারও তেমনই। এই ভাষা বোঝা দরকার। বুঝতে পারলেই দারুণ কিছু করা সম্ভব। সেই ভাষা বুঝতেই আমার থিয়েটারের সঙ্গে যাত্রা হয়। যে ভাষা কখনোই নির্মিত ছিল না। থিয়েটারের ভাষাটা নির্মাণ করতে হয়।

রাফি হোসেন : এই দীর্ঘ যাত্রায় আপনি সেই ভাষাটার কতটা কাছাকাছি যেতে পেরেছেন?

জামিল আহমেদ : এই ভাষা কখনো নির্মিত হয়ে থাকে না। সবসময় পুনর্নির্মিত হয়। যে ভাষাটা আমি ‘রিজওয়ান’-এর মধ্যে পেয়েছি। এজন্য এটা পুনঃউপস্থাপনে ভয় পাই। মনে হয় ওইটার কপি কখনো সম্ভব না। এখন যদি আবার এটার মঞ্চায়ন হয়, মনে করি তার ভাষা ভিন্ন হওয়া উচিত। আজকের মতো করে, এখনকার মতো করে তা নির্মিত হওয়া উচিত। এজন্য আমাদের হাসপাতাল, বাজারে যাওয়া, মানুষের কাছে যাওয়া, খবরের কাগজ পড়া উচিত। তাহলেই আমরা বুঝতে পারব আমরা কোথায় যাচ্ছি। তার ওপর ভিত্তি করেই ভাষা তৈরি হয়। ভাষা নির্মিত থাকে না, কিন্তু উপাদানগুলো যদি আমি বুঝি; যেমন জীবন্ত মানুষ, জীবন্ত উপস্থাপন, ত্রিমাত্রিক পরিবেশনা। তাহলেই কিন্তু ভাষা নির্মিত হবে। এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবনের ছন্দকে বুঝতে পারা। এখানের চ্যালেঞ্জ হলো হরফের লেখাকে প্রতিরূপায়ণ করা। সবসময় মনে রাখতে হবে, এটা ফিল্ম না। এখানে সমুদ্রের জন্য ফিল্মের মতো সমুদ্র দেখাতে হবে না, তবে দর্শককে ফিল করাতে হবে সমুদ্রকে। যেটা ‘রিজওয়ানে’ সম্ভব হয়েছিল। নতুন নাট্যকার ও পরিচালককে বলব, আপনি ভয় পাবেন না। অনেকেই ভয় পান। সেই ভয় থেকেই অনেকে অনুকরণ করেন। এটা হয়তো ঝুঁকি নিতে সাহসিকতার অভাব।

রাফি হোসেন : তাহলে থিয়েটার উপভোগ করতে হলে একজন দর্শক বা পরিচালকের কী করণীয় বলে মনে করেন?

জামিল আহমেদ : প্রথম কথা দর্শকের বিষয়ে। আমার শিক্ষক বলতেন থিয়েটার সবসময় ইনোসেন্ট। যদি সমুদ্রে যান, তাহলে সমুদ্র কীভাবে উপভোগ করতে হবে এটা কিন্তু শিখতে হয় না। এটা নির্ভর করে আপনাকে আকর্ষণ করে কিনা। এটা শুধু ধরে নিলেই হবে না থিয়েটার মনে হয় এ রকম, উনি মনে হয় ভালো অভিনেতা, যা করবেন তা তো ভালো হবেই। এজন্য সেটাকে ভালো বলতে হবে। আপনার ভালো না লাগলে সেটাকে বলতেই হবে, এটা ভালো হয়নি। তিনি যত বড় বা মহৎ অভিনেতাই হোন না কেন। খাবারের স্বাদ পরীক্ষায় খেতে মজা লাগে, জিভ যদি বিচিত্র খাবারের স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা রাখে, তাহলে খেয়ে বুঝুন খাবারের স্বাদ কেমন। কে রান্না করেছে বা কোন হোটেল থেকে এসেছে, এসব বিবেচনায় খাবারকে ভালো খাবার বলা যাবে না। এই দুটি জিনিস পরিষ্কার থাকলে যে কোনো দর্শক যে কোনো জায়গায়, যে কোনো থিয়েটার উপভোগ করতে পারবেন। আর তা না পারলে বিভিন্ন খাবার খেয়ে খেয়ে আপনার জিভকে কার্যক্ষম করে তুলুন। অভিনেতা বা পরিচালকের ক্ষেত্রে একদম পরিষ্কারভাবে বলব, এটা কোনো সিক্রেট বা গুপ্ত কিছু নয়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার অনেক ব্যর্থতা রয়েছে, যা শিখিয়েছে কোনটা আমার জন্য ভালো আর কোনটা ভালো না। কিছু নাটক দেখেছি, যা দেখে মনে হয়েছে তাতে কিছু ভুল ছিল। এখন অভিনেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অভিনয় কী? এই প্রশ্ন কাউকে করা হলে সে ভড়কে যায় এবং কিছু জায়গায় চুপ করে থাকে বা ভয় পাবে অথবা অনর্গল কিছু কথা বলে যাবে। যার কোনো মানে দেখি না। আমি একবার আমার দলের দু’জনের কাছে এই প্রশ্ন করেছিলাম। এ কারণে তারা অনেক রেগে গিয়েছিল। তারা হয়তো ভেবেছিল আমার উদ্দেশ্য অসৎ। কিন্তু আসলে তা না। আমি পরিচালক হিসেবে দুটো জিনিস দেখি যে সত্যি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা। নাকি ওখানে ভান আছে। তার মানে যুক্ত হওয়া। যখন যুক্ত হয় বা লেনদেন করি, দেয়া-নেয়া করি, তখনই কিন্তু দর্শক কিছু খুঁজে পায়। তখনই কিছু ঘটে। জীবনের ছন্দ থাকে আর সেটাকে দর্শক যদি গ্রহণ করে, তখনই সেটা অভিনয় হয়ে ওঠে।

রাফি হোসেন : আপনি কিছু কাজ করলেন, কিছু লোক সেটাকে ভালো বলছেন। কিছু লোকের ভালো লাগেনি। দর্শকের এ দুই রকম মন্তব্যকে একজন পরিচালক হিসেবে কীভাবে দেখেন?

জামিল আহমেদ : বৌদ্ধ ধর্মের ওপর কিছু কাজ করেছি। এটা নিয়ে আমার একটা বইও আছে। সেবার আমি ভুটানে গিয়েছিলাম, সেখানে কিছু বৌদ্ধ উপাসকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তারা আমাকে বলেছিলেন, তোমরা বন্ধুদের কথা শোনো না, শত্রুদের কথা শোনো। তোমাকে যারা অপছন্দ করে, তাদের কথা শোনো। ওই কথাগুলোই তোমাকে পরিষ্কার করে দেবে, কোথায় তোমার যাওয়ার পথ। যদি পেছনে তাকাই, যখন প্রথমে ডিজাইন করা শুরু করেছিলাম, অনেকে ভীষণ প্রশংসা করত। বলত ভিন্ন রকম পথ তৈরি করেছি, এই পথ অনেক ভারী, আমি হয়তো বহন করতে পারব না। এই কথাগুলোই গুরুত্ব দিয়েছিলাম। যার কারণে ‘বিষাদ সিন্ধু’ বা ‘চাকা’ করতে পেরেছি। ওখানে খেয়াল করলে দেখবেন বড় বড় প্লাটফর্ম নেই। আবার ক্রিটিসিজমও কিন্তু আসে। যারা সমালোচনা করেন, এটা বোঝাতে গিয়ে কোনোকিছু পরিষ্কার করে না, তখন ঝামেলা হয়ে যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও এই চর্চাটা নেই। যেটা আমার ছাত্র থাকাকালীন শিখেছিলাম। একজন শিক্ষক কেন মেরুদণ্ড সোজা করে বলতে পারবেন না এটা ঠিক না। কেন আমাকে চিন্তা করতে হবে এটা বলা যায় না?

রাফি হোসেন : আপনি বলছেন ভালোলাগা বা না লাগাটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমন কী কখনো হয়েছে, কেউ আপনার সমালোচনা করল এবং যুক্তিসংগত, আপনি পরে সেগুলো পরিবর্তন করেছেন?

জামিল আহমেদ : এমন তো অবশ্যই হয়েছে। এই জায়গাটা অবশ্যই খোলা রাখা উচিত। যেমন- রিজওয়ানের দুটো জায়গা নিয়ে অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। একজন বলেছিলেন, সেট বদলের সময় খুব আওয়াজ হয়। খেয়াল করলাম ব্যাপারটা সত্যি এবং এই আওয়াজের কোনো দরকার ছিল না। পরে সেটা সংশোধনের চেষ্টা করেছি। তবে পুরোপুরি আওয়াজ বন্ধ করতে পারিনি। কিন্তু আওয়াজের মাত্রা কমেছিল। বুঝেছি, চেষ্টা করেছি সমস্যা খুঁজে বের করার। আমি ভেবেছি নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে, না হলে কথাটা কেন বলবে?

রাফি হোসেন : আপনি কী মনে করেন, বাংলা নাট্যরীতির নিজস্ব ধারায় হয়েছে, নাকি শুধু যাত্রাই আমাদের নিজস্ব ভাষা?

জামিল আহমেদ : ২০১০ সালের পর যে কাজগুলো করেছি, সেখানে আপনি দেখবেন না দেশজ নাট্যাঙ্গনে আমার কোনো আগ্রহ আছে। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে আমি কাজ করেছি। আমার গবেষণা একদম ফিল্ড পর্যায় থেকে। তার ওপরেই আমার পিএইচডি। কাজেই আমাকে বলতে পারবেন না ঘরে বসে কাজ করেছি। ৩-৪টা কাজ কিন্তু দেশজ নাট্যরীতি নিয়ে করেছি। তারপর মনে হয়েছে আমাকে এখান থেকে বের হওয়া দরকার। তার পেছনে অবশ্য দুটো কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হিসেবে বলব, জাতীয়তাবাদকে আমার খুব সমস্যাজনক মনে হয়েছে। জাতীয়তাবাদের চিন্তা বেশি বিভাজন রেখা তৈরি করে এবং আমরা-তোমরা তৈরি করে। আর এতে লাভবান হয় পুঁজিপতিরা। কারণ পুঁজিপতিরা একটা বাজার খোঁজে, যা তৈরি করে দেয় একটি দেশের সীমা। ফলে একটু ঝামেলা তৈরি হচ্ছে। এই জাতীয়তাবাদ বেশি প্রভাব ফেলেছে ক্রিকেটে। ম্যাচ জিতলে সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। আবার সেই ক্রিকেট খেলোয়াড়দের নিয়ে বিজ্ঞাপন দিলে যে কোনো পণ্য বিক্রি করতে সুবিধা হয়। এখানে বিচিত্র রকমের তর্ক হোক। সেটা নাটকে, খবরের কাগজে বা সমাজে। সবাই সবার মতো করে নিজেকে উপস্থাপন করুক। তাহলে কিন্তু গণতন্ত্রের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং গণতন্ত্রের চর্চা বাড়বে। মানুষকে কথা বলতে দিতে হবে। তবেই সবাই সবার চিন্তা তুলে ধরতে পারবে। তখনই আমরা কিছু অর্জন করতে পারব। আমাদের বাংলাদেশ তো এভাবেই তৈরি হয়েছে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ছিল তেমনই একটি আন্দোলন। আমাদের নিজের ভাষায় কথা বলতে দেয়নি বলেই ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। স্বাধীনতাও এভাবে এসেছে। আমরা নিজেদের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। সেজন্যই যুদ্ধ করেছি, স্বাধীন হয়েছি। তবে আমার যুক্তিও আপনাকে শুনতে হবে। তবেই আমরা বিচিত্র নাট্যাঙ্গন পাব। যেখানে নানাজনের নানা চিন্তা থাকবে। শুধু দেশজ নাট্যরীতি বা শুধু আমার মতো করে কিছুই থাকবে না।

রাফি হোসেন : আপনার কাজে ভিজ্যুয়ালের বেশি প্রভাব থাকে। আপনি যখন শুরু করেছিলেন, তখনকার চেয়ে এখন অনেক স্কোপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রচুর অডিও ভিজ্যুয়াল ব্যবহার করা হচ্ছে। আপনি বললেন, আপনার কাজ এখন শুধু দেশজরীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিন্তু আপনি এখন আপনার কাজে কতটা অডিও ভিজ্যুয়াল বা অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেন?

জামিল আহমেদ : প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে আমি ভিজ্যুয়ালি কাজ করতে চাই কেন। আমার কাছে থিয়েটার শুধু মুখের ভাষা না। কীভাবে বসে আছি সেটাই হলো থিয়েটার। তার মানে মুখের কথাটা শরীর থেকে নির্গত হয় থিয়েটারে। তাই শরীর ঠিক না থাকলে কথাগুলো বের হবে না। শরীর কীভাবে আছে, তার ওপর নির্ভর করবে কথাগুলো। সেজন্য আমার কাছে ভিজ্যুয়াল খুব গুরুত্বপূর্ণ, অভিনেতার শরীর খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে কিন্তু মঞ্চের আলো ও রঙও কথা বলে। সেই রঙ আমার হাতের ভেতরে আছে, তাহলে তাকে কেন ব্যবহার করব না। দ্বিতীয়ত, আমি জাতীয়তাবাদের চিন্তায় নেই। যেমন- রিজওয়ান এবং জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। এখানে কিন্তু কোনো জাতীয়তাবাদের চিন্তা করে না, জাতীয়তাবাদের কথা বলে না। আমাদের এখানে যে মেটান্যারেটিভের চর্চা হচ্ছে। সেই ন্যারেটিভকে প্রশ্ন করে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ন্যারেটিভ কিন্তু সরলরেখায় অগ্রসর হয় না। যেটা আমার কাছে খুব গণ্ডগোলের মনে হয়। যেটা জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ক্ষেত্রে হয়েছে। অনেকের কাছেই প্রথমদিকে শুনেছি গল্প বুঝছে না। এখন আর সেটা শোনা যায় না। আমি টেকনোলজি ব্যবহার করব কিনা? অবশ্যই আমি টেকনোলজি ব্যবহার করব। আমি কিন্তু টেকনোলজি ব্যবহার করছিই। যেমন আলো কিন্তু একটা টেকনোলজি। আমার হাতে যা রসদ আছে, অবশ্যই তার ব্যবহার করব। সেটা যদি আমার থিয়েটারের ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে, তাহলে কেন ব্যবহার করব না। এটাও তখন থিয়েটারের একটি অংশ হয়ে যাবে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে অভিনেতার মাধ্যমে দর্শকের কাছে যাওয়া। তবে আমার কাছে থিয়েটারের মৌলিক উপাদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা চিরকাল থাকবে এমনও নয়। এই তিনটি উপাদান হলো- অভিনেতা, যার মাধ্যমে আমি দর্শকের কাছে পৌঁছাব। জীবন্ত দর্শক, যার মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হবে এবং ত্রিমাত্রিক আয়তন। দর্শকের কাছে একটা কাজকে অর্থবহ করে তোলেন। তাকে জীবন্ত করতে যদি টেকনোলজি বা অন্যকিছু ব্যবহার করতে হয় অবশ্যই তা করব।

রাফি হোসেন : থিয়েটার কর্মী, দর্শক এবং আপনার ভক্তদের জন্য কিছু বলুন-

জামিল আহমেদ : আমি সবসময় চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। তাই স্বার্থপরের মতো বলব, আমার সঙ্গে ঝগড়া করার দরকার নেই। আমি বাহাস পছন্দ করি, কিন্তু বেয়াদবির দরকার নেই। আমাকে যদি বলেন, এই এই কারণে আপনার থিয়েটার পছন্দ না, তাতে আমি খুব খুশি হব। আপনাকে আমার উপদেশ দেয়ার কিছু নেই। নিজেও উপদেশ অপছন্দ করি। আমার বাবা যখন আমাকে উপদেশ দিতেন, আমি খুব বিরক্ত হতাম। তাই আপনাকে আমি উপদেশ দেব না। তবে আপনাকে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে নিতে হবে কোনটা ভুল এবং কোনটা ঠিক। জীবন সর্বদা পরিবর্তনশীল। জীবনের বিশাল সমুদ্রে আমরা প্রত্যেকে এক-একটা ঢেউ মাত্র।

অনুলিখন : রবিউল কমল

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup