একজন কণ্ঠ জাদুকর

কিছু সুর চির অম্লান, কিছু কণ্ঠ চির অমলিন। সেসব সুরের কণ্ঠ জাদুকর মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। যিনি দরদমাখা কণ্ঠে গান গেয়ে চলেছেন আজ পর্যন্ত। মাগো মা ওগো মা, চঞ্চল দুনয়নে, আজকে না হয় ভালোবাসো, ও দুটি নয়নে স্বপন চয়নে, চুমকি চলেছ একা পথেসহ অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৪৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন।

আনন্দধারা : সংগীতের সঙ্গে যেভাবে পথচলা শুরু-

মো. খুরশীদ আলম : আমার সেজো চাচা আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। তিনি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ছিলেন। তবে আমার দাদা কিছুতেই চাইতেন না যে ফ্যামিলিতে কেউ গান-বাজনা করুক। দাদার কথা ছিল, তুমি যদি আমার ছেলে হয়ে থাকতে চাও, তাহলে গান-বাজনা কোরো না। সেজন্য তিনি গানকে প্রফেশন হিসেবে নেননি। গান করতেন এবং করাতেন। নাচ করতেন এবং করাতেন। সৈয়দ হাসান ইমাম ভাইয়ের ওয়াইফ লায়লা হাসান তার ছাত্রী। চাচা আমাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কেবল ম্যাট্রিক পাস করেছি তখন। তিনি বলেছিলেন, তিন ডব্লিউ থেকে দূরে থাকবে, ওয়েলথ, ওয়াইন ও ওমেন। কোনো চাচা তার ভাতিজাকে এভাবে বলে কিনা, আমার জানা নেই। রয় হাউস বলে একটা বাড়িতে একটা গার্লস স্কুল ছিল। প্রতি শুক্রবার চাচা সেখানে গান শেখাতেন। আমিও গান গাইতাম। বিভিন্ন স্কুল থেকে ছেলেরা সেখানে আসত। আবৃত্তি, গল্প, কৌতুক, ভ্রমণকাহিনি বলত তারা। স্কুল ব্রডকাস্টিং অনুষ্ঠান হতো একটা। সে সময় আমি রবীন্দ্রসংগীত গাইতাম। তখন ঢাকার প্রত্যেক স্কুলে গান, ড্রয়িং ও পিটির জন্য আলাদা শিক্ষক ছিল। উর্দু ও সংস্কৃতি পড়ানোর শিক্ষক ছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে পরপর দুবার শিক্ষা সফরের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীতে প্রথম হই আমি। আধুনিক গানে প্রথম হই, পল্লিগীতিতে দ্বিতীয়। তখনো বাংলাদেশের কোনো সিনেমার গান জানতাম না। তখন থেকেই শুরু, আর এখনো চলছে।

আনন্দধারা : আপনার অনুপ্রেরণা?

খুরশীদ আলম : আমার মূল অনুপ্রেরণা বললাম সেজো চাচা ছিল। এরপর যখন ভালো করতে শুরু করলাম, দাদাও মেনে নিলেন। তিনিও অনুপ্রেরণা দিতেন। বাবা-মা পাশে ছিলেন। এছাড়া আমার তখনকার প্রতিবেশীরা আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করত।

আনন্দধারা : কোনো প্রতিবন্ধকতা এসেছিল?

খুরশীদ আলম : আমার সংগীতজীবনের শুরুতেই বিরাট প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় ১৯৬৫ সালে। তখন পর্যন্ত আমি শুধুই রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছি। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খান রবীন্দ্রসংগীত ব্যান করলে পড়ে গেলাম বিপদে। না বেতারে গাইতে পারি, না মঞ্চে গাইতে পারি। তবে রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী হতে না পারি, শিল্পী হয়েছি। আমি মনে করি, একজন মানুষ চেষ্টা করলে তার টার্গেটের পুরোটা না পারুক, ৭৫ শতাংশ অর্জন করতে পারে।

আনন্দধারা : একটা মজার স্মৃতি বলুন-

খুরশীদ আলম : একবার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলাম। আমার তো গাড়ি ছিল না, তাই বেশির ভাগ সময় হেঁটে চলাফেরা করতাম। ছিনতাইকারী কোমরে অস্ত্র দেখিয়ে বলেছিল, আপনাকে এখানে মেরে রেখে গেলে একটা গাড়িও থেমে দেখতে আসবে না। আপনার একটা গান আমার অনেক ভালো লাগে। দুই লাইন গেয়ে শোনাবেন? আমি ছিনতাইকারীকে গান শুনিয়েছিলাম। পরে সেই ছিনতাইকারী আমাকে কিছু পথ এগিয়ে দিয়েছিল। এই স্মৃতির কথাটা আমি প্রায় বলি। কারণ এই ঘটনা আমার এখনো মনে পড়ে।

আনন্দধারা : প্রথম গাইলেন কবে?

খুরশীদ আলম : ১৯৬৬ সালে বেতারে অডিশন দিই। অডিশন নেন গুণী সুরকার রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ আবদুল আহাদ সাহেব। শান্তিনিকেতন থেকে পাস করা। ছিলেন সমর দাস আর ফেরদৌসী আপা। গান শোনার পর সমর দাস বললেন, গলা খুব ভালো, কিন্তু তুমি একজনকে নকল করো। আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ওই শিল্পী যত দিন আছে, তোমার গান কেউ শুনবে না। সবাই বলবে, খুরশীদ আলম গান গায় অমুক শিল্পীর মতো। সমর দাস বললেন, কোথায় থাকো? বললাম কাজী আলাউদ্দিন রোড। তিনি লক্ষ্মীবাজার থাকতেন। প্রতিদিন সকাল ৭টায় তার বাসায় যেতে বললেন। বললেন, হাফ অ্যান আওয়ার আমি তোমাকে শেখাব। তিনি পিয়ানোতে ‘সা’ ধরে থাকতেন। গান শেখাতেন না, সা রে গা মা পা ধা নি সা শেখাতেন। একদিন বললেন, যা, ১০টা ছেলেমেয়ের সঙ্গে গাবি। সবার থেকে তোর গলা আলাদা। সমরদা ইজ নট মাই রিলেটিভ। দেয়া-নেয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। কোনো টাকা নিতেন না। ওনার বাবা বলতেন, ছেলেটাকে মেরে ফেলবে? তিনি বলতেন, মানুষ করছি। এরপর প্রথম গান করলাম ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশ বেতারে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম। আমার দুটি গান আজাদ রহমান করেছিলেন। একটির গীতিকার কবি সিরাজুল ইসলাম, সুরকার আজাদ রহমান, ‘তোমার হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম/ থাকব তোমারই আমি কথা দিলাম’। আরেকটি জেবুন্নেসা জামান লেখেন, সুর করেন আজাদ রহমান, ‘চঞ্চল দুনয়নে বলো না কি খুঁজছ/ চম্পা-না করবী-না পলাশের গুচ্ছ’। প্রথম গানটি অল ওভার পাকিস্তান ডিস্ক সেল হতো।

আনন্দধারা : গান গেয়ে প্রথম পারিশ্রমিক?

খুরশীদ আলম : আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। জীবনের প্রথম প্লে­ব্যাকের জন্য তিনদিন গানের রিহার্সেল করেছিলাম। প্রথম যেদিন গানটির রেকর্ডিং করতে যাই, সেদিন রেকর্ডিং হলো না। কারণ গানটি নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে যাবে। ছয়দিন পর রাজ্জাক ভাই উনার বাসায় আমাকে নিয়ে গেলেন, উনি কীভাবে স্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তা বলেন সেগুলো দেখার জন্য। তিনদিন পর গানটির রেকর্ডিং হলো। ‘আগন্তুক’ ছবির গানটি করে আমি ১০০ টাকা পেয়েছিলাম। সেই সময়কার ১০০ টাকা বিরাট ব্যাপার।

আনন্দধারা : আপনার টার্নিং পয়েন্ট ছিল কোনটা?

খুরশীদ আলম : আমি যখন সিনেমার গানে অফার পেলাম, তখন আমাকে কেউ শিল্পী হিসেবে মানতেই পারছিল না। আজাদ রহমান বেঁকে বসলেন। ওই ছবির হিরো ছিলেন রাজ্জাক সাহেব। তিনি আমাকে বললেন, কাম টু মাই হাউজ। তার বাসায় গিয়ে শিখলাম- রাজ্জাক সাহেব কীভাবে রাগে, কথা বলার ঢংটা কেমন, হাসলে কীভাবে হাসেন, রোমান্টিক হলে কীভাবে কথা বলেন। তারপর বললেন, আমি তোমার গানে লিপসিং করব। এটাই ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

আনন্দধারা : এখন পর্যন্ত কতগুলো গান করেছেন?

খুরশীদ আলম : এখন পর্যন্ত ৪৫০টি ছবিতে গান করেছি। আমার গানে সবচেয়ে বেশি লিপ রাজ্জাক, ওয়াসিম, মাহমুদ কলি, আলমগীর সাহেব, জাভেদ সাহেব। ডুয়েট গেয়েছি কনকচাঁপা, বেবি নাজনীন, রিজিয়া পারভীন, রুনা, সাবিনা, শাহনাজ রহমতউল্লাহ, জুলিয়া রহমান, মৌসুমী কবির, শাম্মী আখতার, শাকিলা জাফর এদের সঙ্গে।

আনন্দধারা : আপনার গাওয়া কোন গানটি এখনো হৃদয়ে গেঁথে আছে?

খুরশীদ আলম : আমার গাওয়া অনেক গানই হৃদয়ে গেঁথে আছে। তবে ও দুটি নয়নে, আলতো পায়ে, বাপের চোখের মণি, চুরি করেছো আমার মনটা, ধীরে ধীরে চল ঘোড়া, চুমকি চলেছে একা পথে, বন্ধু তোর বারাত নিয়া আমি যাব, আজকে না হয় ভালোবাস আর কোনোদিন নয়, এই আকাশকে সাক্ষী রেখে, পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার, বন্দি পাখির মতো গানগুলো মাঝে মাঝে হৃদয়ে নাড়া দেয়।

আনন্দধারা : জীবনের সেরা গান কোনটি?

খুরশীদ আলম : ‘সমাধান’ ছবির ‘মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’ গানটি আমার জীবনের সেরা একটি গান। গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুরকার ছিলেন সত্য সাহা। এই গানটা এখনো মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। স্টেজে যখনই আমি গান গাইতে যাই, তখনই এই গানটার প্রচুর অনুরোধ আসে।

আনন্দধারা : বর্তমানে গানের শিল্পীরা বেশি আসছেন বিভিন্ন চ্যানেল ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত রিয়েলিটি শোয়ের মাধ্যমে, এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

খুরশীদ আলম : ‘রিয়েলিটি শোতে আমি নিজেও থাকি। অতএব দোষটা আমার ঘাড়েও পড়ে। রিয়েলিটি শোতে যে শিল্পীদের আনা হয়, ওই শিল্পীকে যদি প্রপার গাইড করা না হয় তারা টিকবে না। শুধু অডিও সিডি বের করে আর বিদেশ ঘুরিয়ে আনলে শিল্পী তৈরি হয় না। যারা মনে করেন অডিও সিডি বের করলাম কয়টা আর কয়বার বিদেশ ঘুরে এলেই শিল্পী হওয়া যায় না। সেসব শিল্পী বেশিদিন টিকতেও পারে না। আমার দেখা মতে, বাংলাদেশে বহু শিল্পী যেমন তাড়াতাড়ি তারকা হয়েছেন আবার তেমনি হারিয়েও গেছেন। এই শিল্পীদের যদি আগের একটি গান করতে বলা হয়, তারা সেটা পারবে না। আমরা একটা গান ৩০ বার, ৪০ বার গেয়ে ফাইনাল রেকর্ড করেছি। এখন দু-একবার গেয়েই রেকর্ড করে। বাকিটা ফিনিশিং করে মেশিনে। এভাবে তো আর একজন ভালো শিল্পী তৈরি হয় না।

আনন্দধারা : আপনাদের সময়টাকে স্বর্ণযুগ বলা হতো কেন?

খুরশীদ আলম : আসলেই আমাদের সে সময়টা স্বর্ণযুগ ছিল। ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে যে গানগুলো হয়েছিল সেগুলো ছিল অসাধারণ। কারণ সে সময় সবার মাঝে কমিটমেন্ট ছিল, মূল্যবোধ ছিল। তখন বাণিজ্যিকীকরণের চর্চা শুরু হয়নি। পরবর্তী সময়ে ’৮০-এর দশকে এ প্রক্রিয়াটা শুরু হলো। তখনো ভালো, সবাই চাকচিক্যকে গুরুত্ব না দিয়ে সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিত। এছাড়া প্রয়াত খান আতাউর রহমান, সত্য সাহা, আনোয়ার পারভেজ, আলাউদ্দিন আলী, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আলম খানের মতো গুণী মানুষ ছিলেন, যারা সারাক্ষণই চিন্তাভাবনা করতেন কীভাবে ভালো গান করা যায়। যার ফলে সে সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল অসাধারণ কিছু গান।

আনন্দধারা : নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ...

খুরশীদ আলম : এখনকার প্রজন্ম অনেক মেধাবী, অত্যন্ত ফাস্ট। প্রচুর জানে, অনেক কিছু তাড়াতাড়ি ক্যাচ করতে পারে। তবে তাদের কোনো অভিভাবক নেই। আমরা যখন গাইতাম, ১০-১২ জন লোক সামনে বসা থাকত। তারা বলতেন, তাল কেটেছে, উচ্চারণ ঠিক হয়নি, উল্টো গেয়েছ। এখন এসব নেই। এখন সবাই গীতিকার, সবাই কম্পোজার। আমি কাউকে ছোট করছি না, কিন্তু একজনকে সবকিছু কেন করতে হবে? গান-বাজনা চর্চার ব্যাপার, গুরুমুখী বিদ্যা। যে যত শিখবে, সে তত টিকবে। যে যত শিখবে, সে তত জিতবে। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। এখন কেউ না শিখে এই জগতে এলে সে ফাঁকিতে পড়বে। গান-বাজনা একটা পবিত্র জিনিস। যার যার জায়গায় সিনসিয়ারলি কাজ করলে পারবে। অভিভাবক থাকতে হবে। আমার থেকে কেউ বেশি বোঝে না এমন মানসিকতা ছাড়তে হবে।

আনন্দধারা : অবসরে কী করেন?

খুরশীদ আলম : অবসরে গান-বাজনা করি। টেলিভিশনে খবর দেখি আর ক্রিকেট খেলা দেখি।

আনন্দধারা : সংগীত জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া?

খুরশীদ আলম : আমার একাধিক হিট গান লিপসিং করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক। শুধু রাজ্জাক কেন, ওয়াসিম, জাফর ইকবাল, সোহেল রানা, ইলিয়াস কাঞ্চনসহ বিভিন্ন নায়কের প্লেব্যাকে কাজ করেছি। প্রয়াত অভিনেতা রহমান ছাড়া আশির দশকের জনপ্রিয় গানের গায়ক ছিলাম আমি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা পাওয়া।

আনন্দধারা : কোনো অপ্রাপ্তি আছে?

খুরশীদ আলম : আসলে আমি একক প্রচেষ্টায় খুরশীদ আলম হইনি। আমার শিক্ষকরা, গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রশিল্পী, টেলিভিশন, রেডিও, সিনেমার প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, দর্শক সবাই মিলেই আমাকে তৈরি করেছে। টাকা-পয়সা নেই, বাড়ি-গাড়ি নেই তাতে আফসোস নেই। তিনবেলা খেতে পারছি, এতেই আমি খুশি। শিল্পী হতে চেয়েছিলাম, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হতে পারলাম না, কিন্তু আধুনিক গানের শিল্পী হয়েছি। এতেই আমি খুশি। আমার কোনো অপ্রাপ্তি নেই।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup