‘আমার তেমন অতৃপ্তি নেই’-সৈয়দ আব্দুল হাদী

বাংলাদেশের প্রথম সারির অন্যতম কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী এবার ডেইলি স্টার ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আয়োজনে জীবনের জয়গান ২০১৯ সালের আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন। আসছে ২৫ অক্টোবর তুলে দেয়া হবে সেই পুরস্কার। এছাড়া চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন এ কণ্ঠশিল্পী। তার গাওয়া শ্রোতাপ্রিয় অসংখ্য গানের মধ্যে কয়েকটি হলো- যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে, সূর্যোদয়ে তুমি, চোক্ষের নজর এমনি কইর‌্যা, এমন তো প্রেম হয়, কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিল না, সখী চলো না, একবার যদি কেউ ভালোবাসত, যেও না সাথী, চলে যায় যদি কেউ, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, আছেন আমার মোক্তার, মনে প্রেমের বাত্তি জ্বলে, চোখ বুজিলে দুনিয়া আন্ধার। পুরস্কার পাওয়ার আগে আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে এক আড্ডায় বলেছেন চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের নিয়মকানুন, নতুন কণ্ঠশিল্পীদের নিয়ে তার ভাবনাসহ সংগীত জীবনের অনেক কথা। তারই অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য...

রাফি হোসেন : আপনাকে পেয়ে আমরা সত্যিই খুব আনন্দিত এবং গর্বিত। এই বছর আমাদের জীবনের জয়গানের ১২তম আসরে আমরা আপনাকে আজীবন সম্মাননা দিতে যাচ্ছি। এটা নেয়ার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এজন্য সত্যিই আমরা গর্বিত। বাংলাদেশের প্রথম সারির শিল্পীদের মধ্যে আপনি অন্যতম একজন। এতদিনের দীর্ঘ পথচলা সেই যাত্রায় আপনি কি তৃপ্ত?

সৈয়দ আব্দুল হাদী : তৃপ্ত বলাটা খুবই মুশকিল। আমি মনে করি কোনো শিল্পীই তৃপ্ত হয় না। কারণ তৃপ্তি হয়ে গেলে তো সবই শেষ হয়ে গেল। সামনে যাওয়ার আর আকাঙ্ক্ষা থাকে না। বরং উল্টো করেই বলি, আমার তেমন অতৃপ্তি নেই।

রাফি হোসেন : কারণ সম্মান-পুরস্কার যা যা পাওয়ার তার সবটাই পেয়েছেন।

আব্দুল হাদী : হ্যাঁ, রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রায় সবই পেয়েছি। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বড় হলো মানুষের ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা পেয়েছি, তৃপ্তি বললে এটাকেই বলা যায়।

রাফি হোসেন : অনেক বছর ধরে গান করেন কিন্তু মানুষের মুখে মুখে তাদের গানের সংখ্যা কম। কিন্তু আপনার অগণিত গান রয়েছে, যেগুলো মানুষের মুখে মুখে এখনো শোনা যায়। এই বিষয়টা কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আব্দুল হাদী : এটা বিশ্লেষণ করা খুব মুশকিল, কারণ এগুলো বিশ্লেষণ করে হয় না। কোন গানটা কখন মানুষের কাছে ভালো লাগবে তারা পছন্দ করবে, এক কথায় জনপ্রিয় হবে তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না।

রাফি হোসেন : আপনার গাওয়া অনেক ভালো গান জনপ্রিয় হয়নি, এমনো তো হয়েছে?

আব্দুল হাদী : এই রকম অনেক গান রয়েছে। যেগুলো নিয়ে আশা করেছিলাম এগুলো জনপ্রিয় হবে, হয়নি। আবার যেগুলো নিয়ে আশা করিনি সেগুলো হয়েছে। গানটা যখন আমার কথা সবার কথা হয়ে যাবে, বেদনা হয়ে যাবে, সবার আনন্দ হয়ে যাবে, তাহলে সেই গান মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে যায়।

রাফি হোসেন : কীভাবে হয়ে যায় সেটা কেউ বলতে পারে না।

আব্দুল হাদী : ঠিক তাই। তবে চলচ্চিত্রের গানের একটা ব্যাপার আছে। চলচ্চিত্রটি যদি মানুষের ভালো না লাগে, জনপ্রিয় না হয় এবং যে গানটি ব্যবহার করা হয় সেটি যদি সঠিক জায়গায় ব্যবহার না করা হয়, চিত্রায়ণ যদি সঠিক না হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গানের জন্য চলচ্চিত্র অনেক ওপরে উঠে যায়।

রাফি হোসেন : এই রকম অনেক চলচ্চিত্র আছে, যেগুলো গানের কারণে হিট হয়ে যায়।

আব্দুল হাদী : এসব নিয়ে কিছু বলা যায় না। তবে গানের মধ্যে ভালো সুর থাকাটা আবশ্যক। আমাদের বাঙালির মন তো একটু নরম, তাই সুরটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসব গানে ভালো সুর রয়েছে সেসব গান কম-বেশি জনপ্রিয় হয়েছে।

রাফি হোসেন : একসময় আমরা দেশের গান জনপ্রিয় হতে দেখেছি। কিন্তু অনেক লম্বা হয়ে গেছে দেশের গান। এখনো তৈরি হচ্ছে কিন্তু আগে যেমন সবার মুখে মুখে শোনা যেত এখন আর তেমন দেখা যায় না। এটার কী কারণ বলে আপনার মনে হয়?

আব্দুল হাদী : এটা হচ্ছে আবেগের ব্যাপার। সেই গানগুলো হয়তো মুক্তিযুদ্ধের সময় বা কিছু পরের। তখন মানুষের মনে আবেগ, শিল্পীদের মন আবেগ ছিল। স্বাধীনতার পর তখন শ্রোতাদের মনও কিন্তু এসব গান গ্রহণ করার জন্য তৈরি ছিল। এখন সেই সময়টা থেকে দূরে চলে এসেছি।

রাফি হোসেন : সংকট নিয়ে কিছু গান হয়েছে, আমাদের এখানে সেগুলো কিন্তু জায়গা করে নিতে পারেনি।

আব্দুল হাদী : সংকট নিয়ে যেসব গান হয়, সেগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্লোগান থাকে। স্লোগান দিয়ে কিন্তু মানুষের কাছে বেশিদিন থাকে না। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় হয়। কিন্তু লম্বা সময় ধরে সেটা থাকে না।

রাফি হোসেন : আপনার পছন্দের শিল্পী কারা? কাদের গান বেশি শোনা হয়?

আব্দুল হাদী : এক সময় খুব বেশি ইংরেজি গান শুনতাম। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের যে ইংরেজি গানগুলো হতো। সেই গান কিন্তু আমাদের আধুনিক বাংলা গানকে অনেক প্রভাবিত করেছে। তারপর আমাদের উপমহাদেশে যে কয়জন ছিলেন মোহাম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ তারা সেই সময় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। একটা সুবর্ণ যুগ ছিল। তারপর মেহেদি হাসান, গোলাম আলি, আশা ভোশলে, লতা মঙ্গেশকরের মতো শিল্পী সব যুগে জন্ম নেয় না।

রাফি হোসেন : আমাদের দেশের কার গান শুনতেন?

আব্দুল হাদী : ষাটের দশকে গান শুরু করি। তখন আলাউদ্দিন খান, মোহাম্মদ আসাফুদ্দৌলা, আবু বকর খান, তারা আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। তারপর আমরা যখন এলাম আব্দুল জব্বার, মাহমুদুন নবী, খন্দকার ফারুক আহমেদ, বশির আহম্মেদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী এবং আমি মাতিয়ে রেখেছিলাম।

রাফি হোসেন : একটা লম্বা সময় ধরে আছেন, আপনার সমসাময়িক যারা ছিলেন তারা অনেকেই নেই।

আব্দুল হাদী : ফেরদৌসী রহমান আছেন কিন্তু উনি আর গাইছেন না। মোস্তফা জামান আব্বাসী, আসাফুদ্দৌলা আছেন, তারাও আর গাইছেন না। আমার সৌভাগ্য, এখনো গাইতে পারছি। সংগীতের সঙ্গে পথচলা ষাট বছর হয়ে গেল।

রাফি হোসেন : কবে থেকে ভাবলেন একজন সংগীত শিল্পী হতে চান?

আব্দুল হাদী : কখনো কল্পনাও করিনি একদিন গায়ক হব। কিন্তু গলায় তো গান ছিল, কী করা যাবে। তাই ভাগ্য আমাকে ওইদিকে নিয়ে গেছে। আমার জীবন শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। আমার দ্বৈত পেশা বলা যায়, কারণ একদিকে সরকারি চাকরিও করেছি। তবে একটা চাকরি ছেড়েছি, অন্যটা ধরেছি। কিন্তু আমার জীবনে একটা জিনিস ছাড়তে পারিনি, সেটা হলো গান।

রাফি হোসেন : খুব সুন্দর একটা নিয়মানুবর্তিতার জীবন পরিচালনা করেছেন। শিক্ষকতা, গান এবং চাকরি করেছেন। একজন শিল্পীর জন্য এই নিয়মানুবর্তিতা জীবন কতটুকু প্রয়োজন?

আব্দুল হাদী : খুব ভাগ্যবান একজন এখনো গাইতে পারছি এবং শ্রোতারা গ্রহণ করছে। শুধু শিল্পীদের ক্ষেত্রেই না, প্রত্যেক মানুষেরই নিয়মের সঙ্গে চলা উচিত। মান্না দের জীবনী পড়ছিলাম। তিনি সবসময় বলেছেন, একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনী পড়েছি সুশৃঙ্খল মানুষ ছিলেন। সে জন্যই তারা দীর্ঘদিন গান করে গেছেন। তবে এই পেশার সঙ্গে যারা আছেন তাদের সবসময় নিয়মকানুন মেনে চলা সম্ভব হয় না। কিন্তু তারপরও যতটুকু সম্ভব সেটা মেনে চলা প্রয়োজন।

রাফি হোসেন : অফিস থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছিলেন?

আব্দুল হাদী : অফিস থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছিলাম। একটা মজার কথা বলি, যেটি শুনলে সবাই হাসবে, সবাই প্রমোশনের জন্য তদবির করে, আমি প্রমোশন না হওয়ার জন্য তদবির করতাম।

রাফি হোসেন : আপনার গাওয়া জনপ্রিয় অনেক গান আছে তার মধ্যে আপনার সবচেয়ে পছন্দের গান কোনগুলো? স্টেজে যখন গান করেন তখন কোন গানগুলো বেশি করা হয়?

আব্দুল হাদী : স্টেজে খুব কমই গান করি, বেছে বেছে কিছু গান করি। শুধু গান শোনার শ্রোতা পেলে করি। সেক্ষেত্রে যারা গান শুনতে এসেছেন, তাদের পছন্দটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার পরও আমার পছন্দমতো কিছু গান করি, যদিও এটা বলা খুবই কঠিন। ভালো হোক মন্দ হোক নিজের সন্তান তো সন্তানই।

রাফি হোসেন : অনেক গান করেছেন, তার সংখ্যা কি পাঁচ-ছয় হাজার হবে নাকি তারও বেশি?

আব্দুল হাদী : গানের কোনো হিসাব রাখিনি। তাই আমার কাছে কেউ জানতে চাইলে বলি এই সংখ্যা পাঁচশও হতে পারে বা পাঁচ হাজারও হতে পারে।

রাফি হোসেন : সিনেমার প্লেব্যাক করলে শ্রোতাদের বেশি কাছে পৌঁছানো যায় কি?

আব্দুল হাদী : একটা সময় একজন শিল্পী যদি সিনেমায় গান না করত, তাহলে তার উঠে আসা সম্ভব হতো না। আমাদের সময় সবাই প্লেব্যাকের মাধ্যমে উঠে এসেছে। চলচ্চিত্রে যেসব গান হয়েছে, সবই জনপ্রিয় হয়েছে। চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার জন্য কণ্ঠের একটি ব্যাপার আছে।

রাফি হোসেন : আপনারা যখন প্লেব্যাক করছিলেন, তখন কি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে না নিজেরাই করতেন?

আব্দুল হাদী : প্রশিক্ষণের কোনো সুযোগ ছিল না। আমার বিষয়টা হচ্ছে গাইতে গাইতেই গায়ক। নিয়মের সঙ্গে দীর্ঘদিন গান শেখার সৌভাগ্য হয়নি।

রাফি হোসেন : গানের প্রতি ভালোলাগাটা কবে থেকে?

আব্দুল হাদী : যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকেই। আমাদের বাড়িতে বাবার একটা গ্রামোফোন ছিল, সেটাতে গান শুনেছি। আগে সিনেমা শুরুর আগে হলের সামনে গান বাজাত, তখন সেখানে বসে বসে গান শুনতাম। বাবা কিন্তু খুব চমৎকার গাইতেন। সৌখিন গায়ক ছিলেন। অবসর সময়ে উনি প্রায়ই গান করতেন। বাবার কাছে সেগুলো শুনতে শুনতে কণ্ঠস্থ হয়ে গেছে।

রাফি হোসেন : কোনো শিক্ষকের কাছে গান শেখেননি?

আব্দুল হাদী : শিখেছি, নিয়মতান্ত্রিকভাবে শেখা হয়নি। আমার সৌভাগ্য যে দেশের অনেক গুণী শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছি। ওস্তাদ কাদের জামেরি, ওস্তাদ পি সি গোমেজ- এদের কাছে গান শিখেছি। কমল দাসগুপ্তা আমাকে দিয়ে গান করিয়েছিলেন। এদের সঙ্গে কাজ করে নিজের মেধা প্রয়োগ করে স্বশিক্ষিত হয়েছি।

রাফি হোসেন : আপনার অভিজ্ঞতা থেকে কী মনে হয় শোনা একটা বড় বিষয়?

আব্দুল হাদী : যারা লেখক তাদের যেমন পড়তে হবে, তেমন যারা গায়ক তাদের গান শুনতে হবে।

রাফি হোসেন : নিজে কী রেওয়াজ করতেন?

আব্দুল হাদী : গান গাওয়াটাই একটা রেওয়াজ ছিল। তাদের কাছ থেকে শিখে নিতাম। যেমন আব্দুল আহাদ আমার রবীন্দ্র সংগীতের গুরু ছিলেন। তার কাছ থেকে বাংলা গান কীভাবে উচ্চারণ করতে হয় সেটা শিখেছিলাম। যখন যাকে পেয়েছি শিখেছি।

রাফি হোসেন : প্লেব্যাকের জন্য যে কৌশলের ছিলেন, ওখান থেকেও অনেক কিছু শিখেছিলেন?

আব্দুল হাদী : অবশ্যই। একজন শিল্পী প্রতিনিয়তই শেখে। এক্ষেত্রে নিজের মেধাকে প্রয়োগ করতে হবে, কোনটা নিতে হবে আর কোনটা বাদ দিতে হবে। কণ্ঠস্বর বড় পর্দায় গান করলে সেটা চরিত্রের সঙ্গে মেলাতে হবে। যার কণ্ঠে গান চলচ্চিত্রে তার যে চরিত্র বা অবস্থান সেটাও তাকে বুঝতে হয়।

রাফি হোসেন : আপনার গলায় কোন নায়কের গান বেশি হয়েছে?

আব্দুল হাদী : আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, আলমগীর, ফারুক মোটামুটি বাংলাদেশের সব নায়কের সঙ্গে আমার কাজ করা হয়েছে। মজার কথা হুমায়ুন ফরীদির কণ্ঠেও আমার গান আছে, অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল।

রাফি হোসেন : বর্তমানে যে রিয়েলিটি শোগুলো হচ্ছে, সেখানে অনেক আয়োজন করে শিল্পীদের বের করে আনা হচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বেশিদিন থাকতে পারছে না, হারিয়ে যাচ্ছে। এটার কারণ কী মনে হয়?

আব্দুল হাদী : যে দু-একজন শিখে এসেছে, তারা টিকে গেছে। অথবা টিকে যাওয়ার পর শিখেছে তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছে। কিন্তু যারা হঠাৎ করে তারকা হয়ে গেছে, তাদের তারকা হওয়ার যে তৃপ্তি সেটা পূরণ হয়ে যাওয়ার ফলে তারা টেকেনি। যারা তাড়াতাড়ি এসেছে, তারা তাড়াতাড়ি চলে গেছে।

রাফি হোসেন : আপনি কি সমর্থন করেন?

আব্দুল হাদী : না, এটাকে সমর্থন করি না। সমর্থন করি না এজন্য হঠাৎ করে একটি ছেলেকে বা মেয়েকে তারকা করে দেয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের শেখার আগ্রহ কমে যায়। তারা মনে করে তো সব হয়ে গেছি, সব পেয়ে গেছি। যার ফলে তারা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এটা ঠিক না, শিল্পী হতে হলে সাধনার বিকল্প নেই। এটাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতে হবে।

রাফি হোসেন : আমাদের সংস্কৃতি বর্তমানে সংকটময় অবস্থানে রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলা গান হারিয়েই যাচ্ছে। এখন শোনার চেয়ে দেখার বিষয়টা বেশি হচ্ছে। কার গানে কতগুলো লাইক, কমেন্ট হলো সেটাও বিবেচনায় আসছে। এই বিষয়গুলো আপনি কীভাবে দেখেন?

আব্দুল হাদী : আমি এটাকে সংকট বলব না, এটা হচ্ছে অবক্ষয়। এই অবক্ষযের কারণ হচ্ছে সংগীতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন হয়েছে। আগে যে কোনো শিল্পের প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল এর শিল্পমান ধরে রাখা। এখন হয়ে গেছে সেটা শুধু আমোদ। এটি হয়েছে প্রযুক্তির কারণে। প্রযুক্তি আমাদের দিয়েছে অনেক কিন্তু নিয়েছে তার চেয়ে বেশি। অনেক ভালো শিল্পী অনেক ভালো গান সামনে আসতে পারছে না।

রাফি হোসেন : অনেকে বলে আপনারা তো বুড়ো হয়ে গেছেন। এখনকার কিছুই আপনাদের ভালো লাগে না। শুধু আপনাদের সময়ই সব ভালো ছিল। এ ধরনের কথা অনেকেই বলে, এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখবেন?

আব্দুল হাদী : খুব ভালো কথা। ক্ল্যাসিক বলে একটা কথা আছে। আমাদের যুগটা ছিল ক্ল্যাসিক যুগ। ক্ল্যাসিক যুগ যদি না-ই হবে, তাহলে এতগুলো গান কেউ মনে রাখত না। আবার এখনো সেগুলো করা হচ্ছে। তাহলে কেন এখনো তোমরা সেটা গাইছ, রিমেক করছ? আমরা তো এই প্রশ্ন তাদের করতে পারি।

রাফি হোসেন : এই থেকে উত্তরণের কী উপায়?

আব্দুল হাদী : পেছনের দিকে ফিরে যাওয়া যাবে না। আর এসবের মূল কারণ প্রযুক্তি। আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তার কোনো সীমানা নেই। হয়তো শিল্প-সংগীতের সংজ্ঞাই বদলে যাবে।

রাফি হোসেন : পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আপনি এখনো গান করেন। বর্তমান অবস্থায় আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন?

আব্দুল হাদী : সর্বক্ষেত্রেই মূল বিষয় প্রযুক্তিকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি। কারণ আমরা এখন প্রযুক্তির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যুক্ত, তাই সেটাকে কীভাবে ব্যবহার করছি, কীভাবে গ্রহণ করব তার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। প্রযুক্তির কারণে রেকর্ডিংয়ের মান অনেক উন্নত হয়েছে।

রাফি হোসেন : এত কিছুর পরও কোনো একদিন হয়তো ভালো কেউ বের হয়ে আসবে যে আমাদের শিল্পটাকে অনেক ওপরে নিয়ে যাবে।

আব্দুল হাদী : অসম্ভব না। অবশ্যই আসবে কেউ, যদি বর্তমানে তারা শিল্পকে উন্নত করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারটা যথাযথভাবে ঘটায়, তাহলে অবশ্যই সম্ভব।

রাফি হোসেন : আপনার কি পছন্দের এমন কেউ আছে, যার সঙ্গে গান করার ইচ্ছা আপনার রয়েছে?

আব্দুল হাদী : আমার একটি ইচ্ছা ছিল কিন্তু সেটা পূরণ হওয়া এখন আর সম্ভব না। কারণ তিনি চলে গেছেন। তিনি হলেন সলিল চৌধুরী। তার সুরে আমার একটি গান করার খুব ইচ্ছা ছিল।

রাফি হোসেন : আগামীতে যারা শিল্পী হতে চায়, তাদের জন্য সংক্ষেপে কিছু বলার অনুরোধ করছি।

আব্দুল হাদী : শ্রোতাদের উদ্দেশে আমার একটাই কথা, আমি যে এতদিন ধরে পথ চলেছি, আমাকে এত ভালোবাসা দিয়েছেন, এখনো দিচ্ছেন এটা বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। যারা নতুন আসছে, তাদের আমি একটা কথাই বলব, সংগীত অভিমানী প্রিয়ার মতো, ভালোবাসার এতটুকু ঘাটতি হলে দূরে চলে যাবে। তাই সেটাকে সেভাবেই আগলে রাখতে হবে।

রাফি হোসেন : আবারো আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা যে আপনি আমাদের সময় দিয়েছেন। সুস্থ-সুন্দরভাবে আরো অনেক দিন বেঁচে থাকুন। ভালো ভালো গান উপহার দিন

আব্দুল হাদী : তোমাকে এবং আমার শ্রোতাদের অনেক শুভেচ্ছা।

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup