‘দর্শকদের ভালোবাসায় একাকার হয়েই কবরী হয়েছি’ -সারাহ কবরী

বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে খ্যাত অভিনেত্রী সারাহ কবরী এবার ডেইলি স্টার ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আয়োজনে জীবনের জয়গান ২০১৯ সালের আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন। আসছে ২৫ অক্টোবর তুলে দেয়া হবে সেই পুরস্কার। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- সুতরাং, আবির্ভাব, তিতাস একটি নদীর নাম, সারেং বৌ, সুজন সখী, ময়নামতি, যে আগুনে পুড়ি, দ্বীপ নিভে নাই, রংবাজ ও দেবদাস। পুরস্কার পাওয়ার আগে আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে একান্ত আলাপনে বলেছেন খ্যাতিমান পরিচালক সুভাষ দত্তের পরিচালনায় প্রথম সিনেমায় সুযোগ পাওয়া, ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে পরিচয়, কাজের অভিজ্ঞতাসহ চলচ্চিত্র ভ্রমণের অনেক অজানা কথা। তারই অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য...

রাফি হোসেন : প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই বছর ডেইলি স্টার-স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক আয়োজিত জীবনের জয়গানে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার গ্রহণে সম্মতি দেয়ার জন্য।

সারাহ কবরী : আমাকে সম্মানিত করার কথা চিন্তা করায় আমি অনেক আনন্দিত এবং আপনাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।

রাফি হোসেন : জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। সঙ্গে পেয়েছেন দর্শকের অনেক ভালোবাসা। তবুও যদি ছোট্ট করে জানতে চাই নতুন করে পুরস্কার প্রাপ্তিতে কেমন লাগে?

সারাহ কবরী : পুরস্কার পাওয়ার যে আনন্দ সেটা সব সময় অন্যরকম। রানী এলিজাবেথ জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন, যখন উনাকে নতুন করে কেউ কিছু উপহার দেন, তখন নিশ্চয়ই তার সেটা অনেক ভালো লাগে। তবে পুরস্কার বা সম্মাননা যা-ই বলি, যতবারই পাওয়া হয় মনে হয় এই বুঝি প্রথম নতুন কিছু পেলাম।

রাফি হোসেন : কখনো কি মনে হয় ‘আমাকে মানুষ ভুলে যায়নি তো’?

সারাহ কবরী : একদমই না। কখনোই কোনো কিছুতে কিংবা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে আফসোস করি না। তবে মনে হয় আমার চেয়ে যারা ভালো করেছেন তারা যেন বঞ্চিত না হন। আমি চাই আমাকে না দিয়ে জুরি বোর্ড এমন কাউকে খুঁজে বের করে, যারা কাজ করেছেন কিন্তু কাজের সে সম্মাননা পাননি। আমার মনে হয় নতুনদের সম্মাননার মাধ্যমে একটু সুযোগ করে দেয়া উচিত। এটা আমার ব্যক্তিগত চাওয়া। যদি নতুনদের সুযোগ না দিয়ে তাদের তৈরি না করি, তাদের উৎসাহ বা আনন্দ জোগাতে না পারি তাহলে তারা সে সুযোগটা পাবে কোথা থেকে?

রাফি হোসেন : আপনার পরিচালিত ‘আয়না’ ছবিতে নতুন একজন নায়িকাকে সুযোগ দিয়েছেন। এই ভাবনা থেকেই কাজটা করেছেন নাকি প্রতিষ্ঠিত শিল্পী না নিয়ে নতুনদের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি নিজের মাঝে কাজ করেছে।

সারাহ কবরী : বিষয়টা আসলে এমন না, গল্প বা চরিত্রের প্রয়োজনে যেমন শিল্পী প্রয়োজন, তাকে নিয়েই কাজ করব। সেটা হোক পুরনো কিংবা নতুন। তবে আমি নতুনদের নিয়ে কাজ করতে চাই। তার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অনেকদিন যারা কাজ করছেন তাদের কাজের মধ্যে একটা টাইপ চলে আসে। তখন দর্শকও নতুন কাউকে দেখতে চান। তখন নতুন কাউকে সুযোগ দেয়ার কথা মাথায় কাজ করে। যদি নতুনদের সম্ভাবনা এবং চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা মিলে ভালো কিছু তৈরি হয়। তখন মনে হয় নতুনদের সুযোগ দেয়াটাই ভালো। বর্তমানে পুরনোদের নিয়ে কাজ করা অনেক দুরূহ ব্যাপার। সবাই সম্মানীটাই নিয়ে বেশি কথা বলতে চায়। সহকর্মীদের সাহায্য করার মনমানসিকতা এখন আর তাদের নেই।

রাফি হোসেন : এই যে অবক্ষয় বা পরিবর্তন, তার জন্য আসলে দায়ী কে বা কারা?

সারাহ কবরী : যখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আরেকটা সময়ে গড়াতে থাকে, তখন মানুষের মনমানসিকতারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। সবকিছুর মধ্যে যদি পরিবর্তন আসে, তখন নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলতে হয়। হয়তো অনেকে ভাবেন, পরে যদি সুযোগ না পাই আগে যা সম্মানী পাই নিয়ে নিই। তবে এ রকম ভাবার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কারণ আমাদের দেশে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। কোনো প্রকার সহযোগিতা, যেমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্কুল বা অভিনয় নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতামূলক কিছু নেই। তাছাড়া সিনেমা হচ্ছে ব্যবসা। যার যৌবন শেষ তার মূল্য শেষ। বর্তমানে আমাদের সিনেমার আরো খারাপ অবস্থা চলছে। কারো কোনো ব্যবস্থা নেই। সুতরাং যে শিল্পীরা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে এতদিন দেশের সেবা করে গেল, তাদের এমন আচরণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রমিকের মতো কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে একজন শিল্পী তৈরি হন। আমাদের যারা পূর্বসূরি, তাদের কাছ থেকে অনেক শিখেছি। তাদের কাছ থেকে ভালোবাসা দেয়া-নেয়ার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। আমাদের সোনালি যুগের সেসব ছবি কিন্তু এখন চলবে না, সেটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এখনো কাজ করতে গেলে নিজেকে নতুন মনে হয়। মনে মনে প্রশ্ন জাগে, আমার ছবিটা কি ভালো হবে? দর্শক কি ছবিটা গ্রহণ করবেন? আমি কি সব ঠিকঠাকভাবে করতে পারব? এই যে বিষয়গুলো আমাদের মাথায় কাজ করে, তার কারণ আমরা বিষয়গুলো সেভাবেই শিখে এসেছি। তবে এ প্রজন্মের দর্শকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ভালোবাসা পাচ্ছি, সেটাই অনেক বড় অর্জন বা প্রাপ্তি। তবে পরিবর্তন এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় সময়ের পরিবর্তন।

রাফি হোসেন : আপনি তো ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো। তার ছবিতে কীভাবে কাজ করা শুরু হয়েছিল?

সারাহ কবরী : ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করা আমার জন্য সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। তার ছবিতে কাজ করার আগে আমাকে চরিত্রের জন্য স্ক্রিন টেস্ট দিতে হয়েছে।

আমাদের যে নির্মাতারা আছেন তার থেকে ওনার কাজের ধরন একটু আলাদা। যদি আরো কাজ করতে পারতাম, তাহলে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়ত। আরো ভালোভাবে তার সম্পর্কে জানা যেত। এক ছবির মাধ্যমে এত জানা যায় না। একজন নির্মাতার যে চিন্তা-ভাবনা, তার প্রতিটি জিনিসই ছিল হাতের মুঠোয়। প্রত্যেকটা অভিনয়শিল্পীর চরিত্র, মেকআপ, গেটআপ সবকিছু থাকত মাথার মধ্যে। তার সেটে নায়ক-নায়িকা কে তা বোঝার উপায় ছিল না। সবাইকে একইরকম মূল্যায়ন করতেন। কে কখন কী কস্টিউম পরব সব মাথায় থাকত। আমার অভিনীত চরিত্র সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করিনি। শট শুরু হওয়ার আগেদাদা বলতেন, তোর দৃশ্যটা এমন হবে। ঋত্বিকদার প্রতিটা ফ্রেম মনে হয় এক-একটা পেইন্টিং। অনেক কিছু শিখেছি এবং নিজের প্রতি নিজের আত্মবিশ্বাসও জন্মেছে। কাজ করার সময় বুঝতে পারিনি, যখন সিনেমা হলে ছবিটা দেখেছি তখন দেখলাম একটা মালো জাতির সুখ-দুঃখের যে মানবিক দলিল চিত্রায়ণ হতে পারে সিনেমায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। একটা বিশাল ক্যানভাসকে তিনি আড়াই ঘণ্টার ছবির মধ্যদিয়ে নিয়ে এসেছেন। কত বড় মাপের নির্মাতা বলে বোঝানো মুশকিল। একজন নির্মাতা কীভাবে শিল্পীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেন দেখেছি। ছবির পুরো বিষয়টা নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন এবং সেভাবেই প্রকাশ করেছেন।

রাফি হোসেন : ছবিটা করার আগেই কি ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আপনার পরিচয় ছিল?

সারাহ কবরী : দাদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় যুদ্ধের সময়। যুদ্ধের সময় যখন কলকাতায় ছিলাম, তখন ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে একটি ফোন আসে। ফোন রিসিভ করলে ওপাশ থেকে শব্দ আসে, ‘তুই কি কবরী?’ তারপর দাদা বলল, তোর সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমাকে উনার বাসার ঠিকানা দিয়ে বললেন, যেকোনো ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বললেই তোকে নিয়ে আসবে। বললাম, আমি আপনাকে চিনব কী করে। বললেন, আমি তোকে রিসিভ করব। যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন সেভাবেই গিয়েছি এবং ওনার সঙ্গে দেখা করি।দাদা খুবই আন্তরিক এবং ভালো মানুষ। দাদার ছবিতে অভিনয় করার ব্যাপারে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি তখন।

রাফি হোসেন : মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

সারাহ কবরী : যখন যুদ্ধ শুরু হয় আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ শুরু হয়েছে ১৯৭১ সালে ঠিকই কিন্তু তার আবহটা শুরু হয়েছে আগে থেকেই। আমি তখন একটি ছবির প্রযোজনা করেছিলাম। যুদ্ধের কারণে ছবির শ্যুটিং বন্ধ ছিল। স্বাধীনতার পর ছবিটির কাজ শেষ করতে হয়েছে। যুদ্ধের সময় আমরা চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিলাম। আমাদের যারা শুভার্থী ছিলেন, তারা বললেন ঢাকাতে থাকার কথা। তখন আমার রমরমা অবস্থান ছিল। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেয়া হয়েছে। টাকা-পয়সা, সোনা-দানা ফেলে এক কাপড়ে পালাতে হয়েছে আমাদের। ঢাকা ছেড়ে অনেকদিন চট্টগ্রামে ছিলাম। প্রতিনিয়ত মনে হতো এই বুঝি দেশ স্বাধীন হলো। ১৯ এপ্রিল দালালের সাহায্যে আগরতলায় পালিয়ে যাই। তারপর আগরতলায় ছিলাম এক রাত। আমার সঙ্গে অনেক সাংবাদিকের বন্ধুত্ব ছিল। সেখানকার সাংবাদিক অনিলদা আমাদের জন্য যা করেছেন, ভোলার মতো না। ওনার সাহসে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত হই। তখন এত কিছু বুঝতাম না। পরবর্তী সময়ে আমাদের কলকাতায় যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের হাইকমিশনার হোসেন আলী সাহেব ছিলেন। তখন তার সঙ্গে একটা মিটিং হয়। অনেক মানুষজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। সত্যজিৎ রায়, মৃণালদা সবার সঙ্গে পরিচয় হয়। সত্যজিৎ বাবুকে ওনার ছবিতে কাজ করার কথা বলি। আমাকে উনি বলেন, অবশ্যই আমরা একসঙ্গে কাজ করব। পরে উত্তম কুমারের বাড়িতে গেলাম, আমাকে অভয় দিলেন। ভারতবর্ষের মানুষ সত্যিই বন্ধু দেশ হিসেবে আমাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেছেন। তখন বোম্বেতে একটি ছবিতে কাজ করেছি, ‘জয় বাংলাদেশ’ নামে। ছবিটির পরিচালক ছিলেন এসআই যোহর। দুর্ভাগ্যবশত ছবিটি তেমন ভালো করতে পারেনি। হায়দরাবাদসহ অনেক জায়গায় কাজ করা হয়েছে। নয় মাস আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় যে নিরন্তর কষ্ট করেছি, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। হেঁটে হেঁটে মুক্তিযুদ্ধের জন্য টাকা সংগ্রহ করেছি। মানুষের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করেছি। বিবিসির মাধ্যমে জানতে পারি দেশ স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন হোসেন আলী সাহেব আমাকে ২০ হাজার রুপি দিয়েছিলেন, সেখান থেকে ১০ হাজার রুপি মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে জমা দিয়ে দিই। পরে ১০ হাজার রুপি পুঁজি করে ছবির শ্যুটিংয়ে বোম্বে চলে যাই। মুক্তিযুদ্ধের অনেক অনেক স্মৃতি রয়েছে, এক বসাতেই বলে শেষ করা যাবে না।

রাফি হোসেন : দেশ স্বাধীন হওয়ার কত দিন পর দেশে ফেরত এলেন?

সারাহ কবরী : বিবিসির মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর শুনতে পেলাম, তখন নিজের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করতে লাগল কখন দেশে যাব। দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর শুনে বোম্বে থেকে কলকাতায় চলে এসেছি। টিকিট পেতে যত সময় লেগেছে ততদিন। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশে চলে এসেছি। বোম্বে যা ছিল সবকিছু ফেলেই চলে এসেছিলাম দেশে। ইস্কাটনের বাসায় যা কিছু ছিল, সব লুট হয়ে গেছে। তারপর মন্টু ভাই, খসরু ভাই যারা পরিচিত ছিলেন, তাদের সঙ্গে দেখা করি। পরে হোসেন ভাইয়ের কাছ থেকে একটা গাড়ি ধার করি। ‘সুতরাং’ ছবির প্রযোজক এমএ খায়ের ভাইয়ের বাড়িতে তখন উঠেছিলাম।

রাফি হোসেন : দেশ স্বাধীন হওয়ার কতদিন পর আবার চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন?

সারাহ কবরী : দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কিছুদিন পর ছবিতে কাজ করি। তবে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফেরত আসাতে এফডিসির অনেকেই আমাকে অপছন্দ করতে লাগলেন। তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ফিল্মে আর অভিনয় করব না। আস্তে আস্তে অভিনয় কমিয়ে দিই। খুব কষ্ট নিয়ে চাহিদা থাকার পরও তখন অভিনয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই।

রাফি হোসেন : অভিনয়ের পাশাপাশি আগে থেকেই কী পরিচালনায় আসার ইচ্ছা ছিল?

সারাহ কবরী : না। অভিনয়ের পাশাপাশি কী আর ভাবা যায়? তখন খুব ছোট ছিলাম। অনেক পর মনে হলো, পরিচালনায় আসা দরকার। নিজের কাছে মনে হয়েছিল পরিচালনায় এলে কিছু করতে পারব। রাজনীতির বেলায়ও সেই চিন্তাই করেছি। যদি আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই, তাহলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির উপকার হবে। চলচ্চিত্রের স্বার্থেই রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং তার সবকিছুই আমার খুব ভালো লাগত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দু-একবার বিমানে দেখা ও কথা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমার বাবা খুব পছন্দ করতেন। তখন থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখে উদ্বুদ্ধ হতাম।

রাফি হোসেন : কখন মনে হয়েছে যে নির্মাণ শুরু করবেন?

সারাহ কবরী : নির্মাণ তো আর পরিকল্পনা দিয়ে হয় না। কারণ এর সঙ্গে অর্থ সম্পৃক্ত। অর্থ আমার হাতে নেই। নির্মাণে যাওয়ার আগেই ক্যামেরা, এডিট, ডিরেকশন ইত্যাদি নানা বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া শুরু করি। ২০০১ সালে সরকারি অর্থায়নে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি ডকুমেন্টারি করি। ভাবলাম যদি একটা সিনেমা বানাতে পারি তখন বুঝতে পারব। কারণ মাঠে না নামলে কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না। একটা অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষা আর একটা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শিক্ষা। চলচ্চিত্র নিয়ে যদি আমি একাডেমিকভাবে শিখতাম, তাহলে অন্য রকম একটা কিছু হতো। আমি কাজ করতে করতে অনেক কিছু শিখেছি কিন্তু কারিগরিভাবে আমি অত দক্ষ নই। আয়না সিনেমাটি করতে গিয়ে ধীরে ধীরে অনেক কিছু শিখেছি। ছবি দেখতে দেখতে লাইট, ফ্রেম, গল্পের কাঠামো, চিত্রনাট্য সম্পর্কে আমার ধারণা তৈরি হয়। একটি চলচ্চিত্রে গল্পের বিন্যাস থেকে শুরু করে সংলাপের বিন্যাস, চরিত্রের উপস্থাপন করা সহজ কথা নয়। ঋত্বিকদার সঙ্গে যখন কাজ করি, তখন তার ছবিতে যতগুলো চরিত্র সবগুলো চরিত্রই কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গুণী নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে ও কাজ দেখে শেখার চেয়ে বড় কথা আমার আত্মবিশ্বাস জন্মেছে। চেষ্টা করে দেখি হয়তো পারতেও পারি। সুভাষদাকে খুব ভয় পেতাম। ওনার বাড়িতে যাওয়ার পর উনি স্ক্রিপ্টটা পড়ে বললেন, আমার গেটআপ, পোশাক কেমন হবে? তখন বললাম,দাদা আপনি আমার চেয়ে অনেক ভালো বুঝবেন কীভাবে কী করলে ভালো হয়। যখন আমার ছবিতে কাজ করতেন, তখন আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি, আমার ডিরেকশন নিয়ে উনি কোনোদিন কোনো কথাই বলেননি। কবরী এই শটটা এভাবে না ওইভাবে নাও। যেমনভাবে দৃশ্য সাজানো হয়েছে, উনি তেমনভাবে কাজ করেছেন। গুরু-শিষ্যের যে শ্রদ্ধা আর সম্মান তা পুরো বহাল ছিল। দাদার হাত ধরেই আজকে কবরী আমি। শ্রদ্ধার সঙ্গে দাদাকে স্মরণ করি, ওনার কাছ থেকে আমি শিখেছি এবং দাদাই আমার অনুপ্রেরণা।

রাফি হোসেন : সুভাষ দত্ত আপনাকে কীভাবে খুঁজে পেলেন?

সারাহ কবরী : সুভাষদা তখন তার ছবির জন্য নতুন একটি নায়িকা খুঁজছিলেন। আমার পরিবার ছিল সাংস্কৃতিক পরিবার। আমার বড় বোন গান করতেন, ভাই তবলা বাজাত। চট্টগ্রামের সবাই জানতেন। আমার বাবাকে সবাই চিনতেন। কামাল নামে বাবার একজন বন্ধু ছিলেন। তিনি খুবই সংস্কৃত অনুরাগী ছিলেন। উনাকে আবার সত্যদা চিনতেন। সত্যদার সঙ্গে আবার সুভাষদার পরিচয় ছিল। সুভাষদা সত্যদাকে বললেন, তোমাদের এলাকায় নতুন কোনো মেয়ের খোঁজ পাও কিনা দেখো। তখন সত্যদা সুভাষদাকে আমার কথা বললেন। পরে সত্যদা আর কামাল আঙ্কেল আমাদের বাসায় এসে আমার ছবি তুললেন। সুভাষদাকে আমার ছবি দেখালেন, পরে আমাকে ডাকলেন, আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমার একটা মাত্র সমস্যা ধরা পড়ল, সেটা হলো চট্টগ্রাম ভাষার আঞ্চলিকতার সুর। পরে অনেক মহড়া করে নাচ, গান, অভিনয়, ভাষা সবকিছুর অবদানে সে সমস্যা দূর করতে হয়েছে। দাদাই আমাকে প্রথম সুযোগ দিয়েছেন। যার কারণে আজকের কবরী আমি। দাদার সঙ্গে ‘সুতরাং’ ছাড়াও ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রে কাজ করা হয়েছে।

রাফি হোসেন : প্রতিটি শিল্পী তার ভালোবাসা থেকেই প্রতিটা কাজ করেন। তারপরও আমি যদি আপনার দর্শকদের জন্য আপনার অভিনীত প্রিয় ছবির কথা জানতে চাই কোন ছবির কথা বলবেন?

সারাহ কবরী : দর্শকদের জন্য আলাদাভাবে বলার অবকাশ নেই। তাদের ভালোবাসা পেয়েই তো আমি অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাতে পেরেছি। আমার যে ছবিটা দর্শকদের ভালো লেগেছে সেটা আমারও ভালো লেগেছে। দর্শকদের ভালো লাগাই আমার ভালোলাগা।

রাফি হোসেন : আপনি যেমন উদাহরণ টানতে গিয়ে ঋত্বিক ঘটক এবং সুভাষ দত্তের ছবিতে অভিনয় করার কথা বললেন?

সারাহ কবরী : প্রত্যেকেই নিজস্ব স্বকীয়তা একজন ভালো নির্মাতা। আরেকটা বিষয় হলো মানুষের মাইন্ড সেট। যে গল্প লিখে আমরা হয়তো বলি ওই গল্পটা ভালো লেগেছে বা গল্পটা ভালো লাগেনি। কিন্তু যে লিখেছে সে তো তার শতভাগ মন-প্রাণ উজাড় করেই গল্পটা লিখেছে। ভালোলাগা না-লাগা এটা একান্তই মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সুতরাং সব ছবি যে ভালো হবে তার যেমন কথা নেই। আবার সব ছবি যে খারাপ সেটাও কিন্তু ঠিক নয়। আমি একটা জিনিস বুঝি আর সেটা হলো অবশ্যই যারা ভালো নির্মাতা অনেক জানেন এবং বোঝেন এককথায় যারা বোদ্ধা তাদের ছবিতে অভিনয় শিল্পীরা ভালো কাজ করতে পারে না। কারণ সিনেমা একটা টিমওয়ার্ক।

রাফি হোসেন : যখন সত্যজিৎ রায়কে তার ছবিতে অভিনয়ের আগ্রহের ব্যাপারে বললেন পরে কি তার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়েছিল?

সারাহ কবরী : আমার দেখা হয়নি। অনেক জায়গায় বলেছি তার কথা। আসলে ববিতা যে চরিত্রটি করেছে, এটাই হয়তো আমাকে নিয়ে করার কথা ছিল। কোনো কারণে হয়তো সেটা হয়নি। হয়তো উনি যেভাবে ভেবেছেন, চরিত্রের সঙ্গে আমাকে মানায়নি। তাই হয়তো কাজ করা হয়নি। তাছাড়া কলকাতায় আর যাইনি।

রাফি হোসেন : আপনার ভবিষ্যৎ কাজের পরিকল্পনা এবং দর্শকদের জন্য কিছু বলবেন?

সারাহ কবরী : আমার সব পরিকল্পনা সিনেমাকে নিয়ে, যাতে ভালোভাবে কাজটা শেষ করতে পারি। যাতে কোথাও আটকে না যাই। চলচ্চিত্রের বড় সমস্যা হচ্ছে টাকা। আমার টিমের সবাইকে যদি আমি টাকা-পয়সা দিতে না পারি তারা দুঃখ পাবে। অনুদানের যে টাকাটা পেয়েছি, সেটা খুবই স্বল্প। এটা দিয়ে ছবি বানানো খুবই কষ্টকর। তাছাড়া আমাদের দেশে ছবি বানানোর ক্ষেত্র এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। অর্থ সংকট আর কারিগরি দুর্বলতা সবকিছু এখনো বিশাল প্রতিবন্ধকতা আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য। তাছাড়া বর্তমানে আমাদের নানান প্রযুক্তি থাকলেও তার পরিপূর্ণ ব্যবহারের লোকজন নেই। আমি কবরী দর্শকদের আর দর্শক আমার। কারণ তাদের ভালোবাসায় একাকার হয়েই কবরী হয়েছি।

রাফি হোসেন : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।

সারাহ কবরী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : আখন্দ জাহিদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup