আপসহীন মানসিকতা নিয়ে কাজ করেছি, এখনো করছি -অরুণা বিশ্বাস

অভিনেত্রী হিসেবেই বেশি জনপ্রিয় অরুণা বিশ্বাস। তবে নাট্যনির্মাতা হিসেবেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া বর্তমানে সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ অভিনেত্রী। সম্প্রতি তার অভিনীত নতুন ছবি মুক্তি পেয়েছে। বর্তমান কাজ, কাজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, অভিনয় এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আনন্দধারার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

 

আনন্দধারা : সম্প্রতি আপনার অভিনীত ছবি ‘মায়াবতী’ মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ কেমন দেখছেন?

অরুণা বিশ্বাস : গুণী নির্মাতা অরুণ চৌধুরী পরিচালিত এ ছবিতে আমি গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছি। ছবিটি দেখে অনেকেই আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শুনেছি দর্শকও নাকি ছবিটি বেশ আগ্রহ নিয়েই দেখছেন।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয়ের এই ধারা কি অব্যাহত থাকবে?

অরুণা বিশ্বাস : চলচ্চিত্রের জন্যই দর্শক আমাকে বেশি চেনেন ও ভালোবাসেন। এখন পর্যন্ত অনেক সিনেমাতেই কাজ করছি। তাছাড়া এ মাধ্যমের প্রতি আমার আগ্রহও বেশি। বর্তমানে রাহিম পরিচালিত ‘শান’ এবং আবুল কালাম আজাদ পরিচালিত ‘ও মাই লাভ’ নামে দুটি সিনেমার কাজ হাতে রয়েছে। শিগগিরই হয়তো কয়েকটি নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হব।

আনন্দধারা : আপনার অভিনয়ে আসার গল্পটা?

অরুণা বিশ্বাস : আমি এখনো কিছু হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা জানি না। আমাদের সমাজে মেয়েদের বেলায় অনেক ধরনের সমস্যা হয়। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় মেয়েদের। আমার বেলায় সে ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ আমার জন্মই হয়েছে একটি সাংস্কৃতিক পরিবারে এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আমি বেড়ে উঠেছি। আমি যখনই মিডিয়াতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে কাজ শুরু করছিলাম, তখন আমার বাবা আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে যান। সেই সময়টাতে আমাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আমি সবসময় আপসহীন মানসিকতা নিয়ে কাজ করেছি এবং এখনো করছি। তখন আমাকে অভিনয়টা এক প্রকার বাধ্য হয়ে করতে হয়েছিল। কারণ আমার বাবার যে যাত্রা দল ছিল তার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনের পরিবারের খরচ আমাকে বহন করতে হতো। আমি ভালো গান এবং নাচ করতে পারলেও অভিনয়ের কারণে আমার সেগুলো আর করা হয়ে ওঠেনি। এক কথায় কর্তব্যের কারণে তখন আমাকে ভালোবাসার জিনিসগুলো রেখে অভিনয় করতে হয়েছিল। অভিনয়টা এখন আমার আত্মার খোরাক। কারণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছি। হয়তোবা সেটা নাচ কিংবা গানে সম্ভব হতো না বলেই আমার অভিনয়ে আসা।

আনন্দধারা : নাচ, গান না করতে পারায় কি নিজের মাঝে কোনো আক্ষেপ রয়েছে?

অরুণা বিশ্বাস : আমার বাবা-মা সমাজ, দেশ কিংবা সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য যে শ্রম, মেধা, সময় সবকিছু দিয়েছেন, সে হিসেবে রাষ্ট্র তাদের মূল্যায়ন করেনি এবং তাদের কোনো ধরনের দায়িত্বও নেননি। এতে করে আমার মতো অনেক শিল্পীর সন্তানরাই হারিয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ হয়তো কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করেছে। আবার অনেকেই হয়তো ভালো আছে। কিন্তু গুণী শিল্পীদের সঠিক মূল্যায়ন না করা যে কষ্টটা সেটা কিন্তু মারাত্মক। আমার বাবা-মা দেশের জন্য এত কিছু করেও তারা তাদের সঠিক মূল্যায়ন পাননি। আমার বাবা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। সব মিলিয়ে আমাদের বা আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি কিংবা আমরা যদি অর্থনৈতিক চিন্তা না করে এই সময়টা আমাদের মেধায় কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে সমাজ, দেশ কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম জন্য আরো অনেক কিছু করতে পারতাম বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। নাচ, গান না করতে পারায় নিজের মাঝে কোনো আক্ষেপ নেই। অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সবার ভালোবাসা নিয়ে এই তো বেশ ভালো আছি।

আনন্দধারা : চাঁপাডাঙ্গার বউ চলচ্চিত্র দিয়ে আপনার চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু। এত আরো মাধ্যম থাকতে কেন আপনাকে চলচ্চিত্রে আসতে হলো?

অরুণা বিশ্বাস : শখ থেকে আমার চলচ্চিত্রে আসা। চলচ্চিত্রে আসার আগে আমি টেলিভিশন নাটক এবং মঞ্চে কাজ করেছি। তখন থেকে আমি মোটামুটি সবার কাছে পরিচিত। শখের কারণে তখন চলচ্চিত্রে আসা হলেও সে সময় চলচ্চিত্র ছাড়া আমার চলার আর কোনো মাধ্যম ছিল না। আমি যদি তখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত না হতাম হয়তোবা আরো ভালো কাজ করতে পারতাম বা অন্য কোনো পেশায় নিজেকে যুক্ত করতে পারতাম কিন্তু মানুষের এত এত ভালোবাসা কিন্তু আমি পেতাম না।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্রে অভিনয়ে আপনার ভালোলাগার বা পছন্দের চরিত্রের কথা যদি

জানতে চাই?

অরুণা বিশ্বাস : নায়িকা হিসেবে আমি প্রায় একশর মতো ছবি করেছি। পরবর্তী সময়ে চরিত্রনির্ভর কাজ করেছি। আমি কাজকে এবং ইন্ডাস্ট্রিকে ভালোবেসেই কাজ করেছি। আমার ভালোলাগার বিষয় হয়তো অনেকের সঙ্গে মিলবে না। তবে রাজ্জাক সাহেবের চাঁপাডাঙ্গার বউ ছবিটির চরিত্রটি আমার জন্য একটি মাইলফলক। এছাড়া শিবলী সাদিকের ‘দুর্নাম’, ‘মান-সম্মান’, ‘ত্যাগ’, শাহ আলম কিরণের ‘কৈফিয়ৎ’ রাজ্জাক সাহেবের ‘প্রেম শক্তি’সহ আরো অনেক ভালো ভালো ছবিতে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।

আনন্দধারা : একজন জনপ্রিয় শিল্পী হয়েও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পাওয়ায় কি কোনো আক্ষেপ কাজ করে?

অরুণা বিশ্বাস : জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সঙ্গে রাজনীতির বিষয়টা চলে আসে। আর আমার জানামতে আমাদের দেশসহ সারাদেশে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে একটা আপস করা হয়। আমি সেটা কখনোই করিনি এবং সেটা কীভাবে করতে হয় তা আমার জানা নেই। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শিল্পীদের অনুপ্রেরণা। মানুষের ভালোবাসা পাওয়া স্বীকৃত একজন শিল্পী আমি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ রাষ্ট্রের অন্য সব পুরস্কারের শতভাগ যোগ্যতা আমার রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আনন্দধারা : শিল্প-সংস্কৃতির বাইরে অন্য কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন কি?

অরুণা বিশ্বাস : শিল্পীদের দায়বদ্ধতার জায়গায় সামাজিকভাবে অনেক কাজ করতে হয়।

একজন মানুষ যদি মাদকাসক্ত হয়, মাদক বলতে আমি ড্রাগ এডিক্টেডকেই বোঝাচ্ছি না। পান-সুপারি খাওয়া সেটাও কোনো এক প্রকার মাদক। সেটার সচেতনতার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িতা নিয়ে কাজ করা হয়। মনুষ্যত্বটা যে মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম সে বিষয় নিয়েও কাজ করি। রাষ্ট্রের যেকোনো সময় সংকট হলে দলমত নির্বিশেষে আমি দাঁড়াই। দেশ-রাষ্ট্রের কাছে আমার দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা থেকেই আমি কাজ করি এবং ছোটবেলা থেকেই করে আসছি। এই শিক্ষাটা আমি আমার পরিবার থেকেই পেয়েছি।

আনন্দধারা : আপনার বাবা-মায়ের বিষয়ে আপনি বললেন, সে বিষয়ে কি আপনার কোনো আক্ষেপ রয়েছে?

অরুণা বিশ্বাস : আমার বাবাকে আমি দেখেছি যে, মানুষের জন্য কীভাবে কাজ করতে হয়। যে মানুষটি অসহায়, ঠিকভাবে চলতে পারে না আমার বাবা সেই মানুষগুলোকে নিয়ে আসতেন এবং যাত্রা দলের সঙ্গে যুক্ত করতেন। নাচ-গান অভিনয় শিক্ষা দিয়ে তাদের নিয়ে দল করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমার বাবা সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন এবং সে শিক্ষাটা আমার মধ্যেও রয়েছে। এই যে আমার বাবা এবং মা দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য এত কিছু করেছে। কিন্তু সে বিষয়টা কিন্তু তারা শোআপ করতে পারেনি বলেই হয়তো তারা পিছিয়ে পড়েছে। সে ক্ষেত্রে যে জায়গায় তারা তাদের পরিপূর্ণ যোগ্য সম্মানটুকু পাওয়ার কথা সেটা পায়নি। তাদের মতো মানুষজন আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য একটা আশীর্বাদ। আমার বাবা ঠাকুমার গয়না বিক্রি করে অভিনয় করেছেন আর এখন আমরা গয়না কেনার জন্য অভিনয় করি। অভিনয়ের প্রতি যে তাদের ত্যাগ, তা বর্তমান সময়ের সঙ্গে কখনো মিলবে না।

আনন্দধারা : বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে আপনার অভিষেক না হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আপনার কী কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে?

অরুণা বিশ্বাস : আমার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শুরুর দিকে অনেক বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারা বলেছেন, আমাকে দিয়ে বাণিজ্যিক ধারার ছবি হবে না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমি সেই নির্মাতাদের ছবিতেই নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছি। কিন্তু এর পেছনে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। কারণ চলচ্চিত্রে আমার তেমন কেউ ছিল না। আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, দুই নায়িকা নিয়ে  তৈরি সিনেমার গল্পে আমার চরিত্র শুনেছি একরকম এবং শ্যুটিং সেটে গিয়ে দেখি সেটা পুরো পাল্টে গেছে। আবার সিনেমার পোস্টারে আমার ছবিটা ছোট করে দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে নিজেকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে এ রকম অনেক প্রতিবন্ধকতার ভুক্তভোগী আমি। তবে বিষয়গুলো এখন মনে হলে হাসি পায়, কারণ সবকিছু পায়ে মাড়িয়ে মানুষ কিন্তু আমাকে ঠিকই গ্রহণ করেছে এবং তাদের ভালোবাসায় সিক্ত করেছে। তবে কোনো নির্মাতা আমার প্রয়োজনে তাদের সিনেমা আমাকে কাস্টিং করেননি। যখন আমি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছি ঠিক তখনই তাদের প্রয়োজনে বা চরিত্রের প্রয়োজনে আমাকে নিয়ে কাজ করেছে। কারণ আমি সেভাবেই নিজেকে তৈরি করেছি। তবে আমি ক্যামেরাম্যান মাহফুজ ভাই এবং পরিচালক শিবলি সাদিকের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ এবং তাদের প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা। মাহফুজ ভাই মূলত আমাকে একজন বাণিজ্যিক ধারার নায়িকা হিসেবে তৈরি করার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং আমার নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চার করে তুলার উৎসাহ জুগিয়েছেন।

আনন্দধারা : বাবা-মা নাকি নিজের পরিচয়, কোনটাতে পরিচিত হতে ভালো লাগে?

অরুণা বিশ্বাস : এ প্রজন্মতে অনেকেই আমার বাবা-মায়ের কথা বলেন। তারা আমাকে ও আমার বাবা-মা উভয় সম্পর্কেই জানেন। কারণ আমার বাবা-মাকে নিয়ে গর্ব করা যায়। আমি আমার বাবা-মায়ের পরিচয়ে নিজেকে পরিচয় দিতে গৌরববোধ করি।

আনন্দধারা : বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য হয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

অরুণা বিশ্বাস : এখনো হতাশাজনক কোনো অভিজ্ঞতায় পড়িনি। বোর্ডের অন্য সদস্যরা বেশ পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী। পাশাপাশি ইতিবাচক মানসিকতারও। যার কারণে সুন্দর একটি টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছি। যেহেতু ছবি নির্মাণ অনেক কমে গেছে, তাই আমরা সেই বিষয়টিকে মাথায় রেখেই ছবি দেখছি এবং ছাড়পত্র দিচ্ছি। তবে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা ধর্মবিরোধী কোনো ছবিকে আমরা ছাড়পত্র দিই না।

আনন্দধারা : আপনার কী মনে হয় মানসম্মত সিনেমা নির্মিত হচ্ছে এখন, যা দেখে দর্শক হলমুখী হবেন?

অরুণা বিশ্বাস : আমি আগেই বলেছি, সেন্সর বোর্ডের কাজ কী এবং আমরা কোন বিষয়গুলো দেখে ছাড়পত্র দিই। সেখানে দর্শক কী দেখে সিনেমা হলে যাবেন, তা দেখার বিষয় আমাদের নয়। তবু এর মধ্যেও কিছু ছবির গল্প ভালোলাগার মতো। যদি দর্শক বুঝতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই সিনেমা হলে গিয়ে দেখবেন।

আনন্দধারা : আপনার কি মনে হয় আমাদের চলচ্চিত্র কী অবস্থায় আছে বা কোথায় যাচ্ছে?

অরুণা বিশ্বাস : বর্তমানে আমরা আমাদের চলচ্চিত্রে খুবই বাজে সময় পার করছি। এই সময়টা কিন্তু আজকে থেকে শুরু হয়নি। শুধু বর্তমান সময়ের দোষ দিলে হবে না। এই বাজে অবস্থাটা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। আমরা আসলে স্বপ্ন নিয়ে কাজ করি কিন্তু স্বপ্ন দেখি না। স্বপ্ন দেখি না বিধায় কিন্তু আজকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির এ অবস্থা। আমরা অনেক অপ্রয়োজনীয় অযোগ্য শিল্পী এবং টেকনিশিয়ানদের নিয়ে কাজ করেছি। যার ফলে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা করতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা ইন্ডাস্ট্রির কথা ভাবে, চলচ্চিত্র নিয়ে চিন্তা করে, তাদের ইন্ডাস্ট্রি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে না। বর্তমানে এফডিসিতে গেলে মায়া লাগে। বেশির ভাগ সময়ই ফাঁকা দেখা যায়। এখন আর আগের মতো কোনো কাজ নেই। আমি জানি না নির্বাচন করে কী হয়? চলচ্চিত্রের কতটা স্বার্থ উদ্ধার হয়? দেখা গেছে, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রে যারা নির্বাচন করছে, ওরাই বেশি বেশি কাজ করছে, বাকি শিল্পীদের হাতে কোনো কাজ নেই।

আনন্দধারা : আপনার বাবা একজন যাত্রাশিল্পী ছিলেন এবং আপনিও ছোটবেলায় যাত্রায় অভিনয় করেছেন। যাত্রা নিয়ে নতুন করে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

অরুণা বিশ্বাস : ইচ্ছা তো সব সময়ই আছে। আমি যাত্রা পরিবারের সদস্য। আমার বাবা-মা এই শিল্পের পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম। তাদের দেখানো পথ ধরে আমিও যাত্রায় কাজ করেছি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চরম সংকটে নিপতিত হয়েছে এ শিল্পটি। মানিকগঞ্জে যাত্রা নিয়ে নতুনভাবে কাজ করার  পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এখানেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মুখ থুবড়ে আছে পরিকল্পনাটি। যদি কাক্সিক্ষত পৃষ্ঠপোষকতা পাই, তাহলে যাত্রা নিয়ে আবারও কাজ করব। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে আমি কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। একটা শিল্পকে বাঁচাতে আমি একা তো আর চেষ্টা করলে হবে না। আমার ইচ্ছা রয়েছে কিছু স্টুডেন্ট নিয়ে একটা যাত্রা মঞ্চায়ন করার। যদি আমার ভালো লাগে বা ভালো করতে পারি কিংবা সফলতা পাই, তাহলে আমি একটি যাত্রা দল করব এবং এই যাত্রা শিল্পটাকে আরেকটু আধুনিক করে বিভিন্ন জায়গায় শো করার ইচ্ছা রয়েছে।

আনন্দধারা : অভিনয় শিল্পীর পাশাপাশি আপনি একজন নির্মাতা। একজন নারী নির্মাতা হিসেবে আপনাকে কোন ধরনের প্রতিকূলতার শিকার হতে হয়েছে?

অরুণা বিশ্বাস : মিডিয়াতে এবং মিডিয়ার বাইরে অনেকেরই ধারণা থাকে যে, মেয়েরা ইচ্ছা করলে অনেক কাজ করতে পারে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে সব মেয়েই তো আর আত্মসম্মানহীন হয় না। আবার যে কেউ চাইলে গিয়ে কারো পায়ে ধরতে পারেন না। আমি জানি আমি কী কাজ জানি এবং কতটুকু পারি। তাই বলে বলছি না আমি সবার সেরা কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষের সম্মুখীন হতে হয় যে, তাদের সঙ্গে সম্মান নিয়ে কাজ করা যায় না। কারণ কাজের পরিপূর্ণ যে মূল্যায়ন, সেটাই তারা করতে পারে না। অনেক মেয়ে হয়তো ভালো কাজ করতে চায়। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এত প্রতিকূলতা নিয়ে সব সময় কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব না।

আনন্দধারা : নতুন ধারাবাহিক নাটক নির্মাণেরও কথা ছিল আপনার। তার অগ্রগতি কতদূর?

অরুণা বিশ্বাস : ভালো কাজের পরিকল্পনা থাকলেও অর্থনৈতিক কারণেই ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করতে পারছি না। এখানেও সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। যতদিন এ সিন্ডিকেট প্রথা থাকবে, ততদিন আমার মতো মানুষেরা কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

আনন্দধারা : নাটকে তো অভিনয় করছেন নিয়মিতই?

অরুণা বিশ্বাস : অভিনয়ের কাজটি সুচারুভাবেই করে যাচ্ছি। বর্তমানে সাঈদ তারেক ও গোলাম সোহরাব দোদুলের দুটি নতুন ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করছি। মাসের বেশির ভাগ সময় এ নাটক দুটির শ্যুটিং করতে হচ্ছে। এছাড়া আগের শ্যুটিং করা নাটকও টিভিতে প্রচার হচ্ছে। নতুন ধারাবাহিকের কাজ নিয়েও কথা হচ্ছে। নাটকে আমি নিয়মিত আছি।

আনন্দধারা : দীর্ঘ এই অভিনয় ক্যারিয়ারে আপনার মজার কোনো স্মৃতি?

অরুণা বিশ্বাস : সুভাষ দত্তের একটি ছবির শ্যুটিং ছিল তখন। ছবিটির নাম আবদার। খুবই সুন্দর একটি ছবি। শ্যুটিং সেটে উনি আমাকে প্রথম বললেন তুমি কোনো ধরনের মেকআপ করবে না। তুমি অনেক সুন্দর, তোমার মেকআপের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার একটি দুর্বলতা কাজ করত যে মানুষ আমাকে সব সময় বলত তুমি কালো। আমি যে খুব মেকআপ করে তা কিন্তু নয়। পরিচালক সুভাষ দত্তের কথা না শুনে আমি তখন মেকআপম্যানকে বলছিলাম, আমার হাতে একটু মেকআপ করে দাও। হঠাৎ দেখি পেছন থেকে কে যেন এসে আমার পা জড়িয়ে ধরেছে। আমি তাকিয়ে দেখি সুভাষ দত্ত। আমি তো পুরোপুরি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তখন ওনাকে বললাম, ‘এটা আপনি কী করছেন দাদা? আপনি এত বড় একজন মানুষ আর আপনি আমার পায়ে ধরতেছেন।’ তখন উনি বললেন, ‘শোনো তুমি অনেক সুন্দরী, খবরদার তুমি কিন্তু কোনো মেকআপ দেবে না, আমি তোমার সৌন্দর্য দেখেই চরিত্রের জন্য তোমাকে নির্বাচন করেছি।’ এই যে তাদের ভালোবাসা। এছাড়া অনেক গুণী নির্মাতার সঙ্গে আমি কাজ করেছি এবং তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি। তাদের এই ভালোবাসার স্মৃতিগুলো মনে পড়লে এখনো আমি আন্দোলিত হয়ে যাই।

আনন্দধারা : আপনার অবসর সময় কাটে কীভাবে?

অরুণা বিশ্বাস : অবসর সময়টাতে নিউজ দেখা, পড়াশোনা করা, এছাড়া ফেসবুকে যাবতীয় তথ্য কিংবা সংবাদের জন্য সময় দেয়া হয়। কিন্তু আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে প্রথম ফোন করি কানাডায়। আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলি। আমার ভাইয়ের একটা বাচ্চা আছে, ওকে না দেখলে তো আমার দিনের প্রাণটাই পাই না। সবকিছু মিলিয়ে অবসরের একটা সময় জুড়ে থাকে আমার পরিবার।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় অভিনয় শিল্পী?

অরুণা বিশ্বাস : আমার জুলিয়া রবার্টসের অভিনয় খুবই পছন্দের। এছাড়া সারা বিশ্বে যারা ভালো অভিনয় করে, সবার অভিনয় আমার ভালো লাগে। সেভাবে নির্দিষ্ট করে কারো নাম আসলে বলা যায় না। কারণ একেকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী একেক চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করে থাকেন।

আনন্দধারা : অভিনয়ের বাইরে আপনার শখ?

অরুণা বিশ্বাস : অভিনয়ের বাইরে যদি শখের কথা বলতে হয়, তাহলে এক কথায় বলব আমার সংসার। সংসার সামলানো, ঘর গোছানো, শপিং করা, বাগান করা ইত্যাদি। তবে খাওয়ার মধ্যে বলতে গেলে আর কিছু খাই না, কফিটা আমাকে অবশ্যই খেতে হবে।

আনন্দধারা : আপনি অভিনয়শিল্পী না হলে কী হতেন?

অরুণা বিশ্বাস : ছোটবেলা থেকে আমি খুবই মেধাবী ছিলাম। আমার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। যদি অভিনেত্রী না হতাম তাহলে হয়তো একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতাম।

আনন্দধারা : অভিনয়ে আসার ক্ষেত্রে আপনার অনুপ্রেরণা কে বা কারা?

অরুণা বিশ্বাস : আমার মনে হয় প্রকৃতি আমাকে অভিনয়ে নিয়ে এসেছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক তা আসলে বলাবাহুল্য। আমার বাবা-মা তো অবশ্যই আছেনই। তাদের কথা বলতে গেলেও কিন্তু প্রকৃতির কথাই চলে আসে। তাই প্রকৃতিকে আমার অভিনয়ের অনুপ্রেরণা মনে হয়।

আনন্দধারা : ব্যক্তিজীবনে অরুণা বিশ্বাস কেমন?

অরুণা বিশ্বাস : আমি অনেক রাগী। হুট করে রেগে যাই। মিথ্যা একেবারেই অপছন্দ আমার। ন্যাকামি সহ্য করতে পারি না। অযোগ্য মানুষদের নিয়ে নাচানাচি আমার পছন্দ না। যেটা আমাদের বর্তমান সময় খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। আমি খুবই স্পষ্টবাদী, যা বলার সোজাসুজি বলে ফেলি।

আনন্দধারা : ভবিষ্যতে কি আপনার চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা আছে?

অরুণা বিশ্বাস : আমার চলচ্চিত্র নির্মাণের শতভাগ ইচ্ছা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে বসে আছি। তবে শুধু আর্থিক সংস্থানের অভাবে আমার এ মনোবাসনা পূরণ হচ্ছে না। তবে আমি এখনো এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসিনি। আমি যেভাবে চিন্তা করি, যেভাবে দেখি, সেভাবে আমাদের গল্প নিয়েই ছবি বানাতে চাই।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup