‘আমি আমার স্বপ্নের আকাশ ছুঁয়েছি’

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরুষের সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারীই স্বনির্ভরতার জন্য চাকরিতে যাচ্ছেন। আর কিছু নারী এগিয়ে আসছেন ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ও ব্যবসায়। তেমনই একজন নারী হলেন তৃষা সামিরা। প্রকৌশলবিদ্যা নিয়ে পড়ালেখা করলেও তিনি প্রকৌশলী হননি। হয়েছেন একজন ব্যবসায়ী। গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান দ্রুম। দ্রুম একটি ক্যাফের নাম। যে ক্যাফের মাধ্যমে তিনি স্বপ্নের আকাশ ছুঁয়েছেন বলে আনন্দধারাকে জানান।

দ্রুমের স্বপ্নদ্রষ্টা তৃষা সামিরা বলেন, দ্রুম অর্থ বৃক্ষ। বৃক্ষ মানেই আশ্রয়। তাই এখানে এলেও সেরূপ আনন্দ লাভ করবেন যে কোনো ভোজনরসিক। নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ, সবুজের সমারোহ, চেয়ার-টেবিলে অভিনবত্ব আর শিল্পের যৌথ পরশ, ইচ্ছামতো আড্ডা, পকেটবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার আর স্বাদ- সব মিলিয়ে দ্রুম।

তৃষা সামিরা নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও কাজের সুযোগ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। ইতোমধ্যে দ্রুম মানুষের কাছে ভালো অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। তবে এর পেছনে রয়েছে তার নিজের পরিশ্রম এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে তৃষাকে, তবে কখনোই দমে যাননি তিনি।

নিজের মেধা, মননশীলতা, কর্মনিষ্ঠা এবং একাগ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। আনন্দধারাকে তিনি বলেন, শুরুটা আসলে শখের বশেই হয়েছিল। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন থেকেই রুচিশীল ছিলাম। খাবারের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল। তার মানে এই নয় যে খাদক ছিলাম। আমি দেখেছি ঢাকায় আড্ডা দেয়ার জন্য ভালো ক্যাফে নেই। আবার যেগুলো ছিল, সেগুলো অনেক ব্যয়বহুল। তাই সবসময় সাধারণ মানুষের জন্য একটা ক্যাফে করার কথা ভাবতাম। যেখানে সবাই আড্ডা দিতে পারবে এবং সাধ্যের মধ্যে ভালো কিছু খেতে পারবে। সেই ভাবনা থেকেই দ্রুমের যাত্রা শুরু। পরে দেখলাম, ক্রেতাদের চাহিদা বেশ ভালো এবং তারা অনেক প্রশংসাও করতেন।

তিনি আরো বলেন, ক্রেতাদের চাহিদা ও প্রশংসা দেখে আমার মনোবল এবং কাজ করার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। পরে কয়েকজন কর্মী নিয়োগ দিই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার প্রসার আরো বাড়তে থাকে।

প্রকৌশলী থেকে ব্যবসায়ী হলেন- এতে পারিবারিক কোনো বাধা ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথম দিকে তো একটু বাধা ছিলই। সবাই বলত এত পড়ালেখা করে কেন ক্যাফে দেবে। আমার নিজের কাছেও শুরুতে একটু খারাপ লাগত। কিন্তু সব মানিয়ে নিলাম। কারণ আমার স্বপ্ন স্বাবলম্বী হওয়া। নিজে কিছু করা।

ফুড নিয়ে ব্যবসা করতে হলে এই বিষয়ে পড়ালেখা কী জরুরি- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবসা একটি স্বাধীন পেশা। যে কেউ ব্যবসা শুরু করতে পারে। তবে ফুড নিয়ে কাজ করতে হলে যে এই বিষয়ে পড়ালেখা করে আসতেই হবে বলে আমি মনে করি না। একটু মনোযোগী আর একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করলে এখানে ভালো করা সম্ভব। তবে পড়ালেখা করে আসলে একটু দ্রুত ভালো করা যেতে পারে হয়তো। কারণ তত্ত্বীয় বিষয়গুলো আগে থেকে জানা থাকলে যে কোনো কাজ করতে সুবিধা হয়।

আমাদের দেশে ফুড নিয়ে পড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখনো এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও নিউট্রিশন নিয়ে পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি সেই সিলেবাসের গ-ি একেবারেই সীমাবদ্ধ। সেখানে ফুড বা ফুড বিজনেস বিস্তারিত পড়ালেখার সুযোগ খুব কম।

নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে তিনি বলেন, আমার ভার্সিটি লাইফ খুবই বোরিং ছিল। এখানে আমার ভালো কোনো স্মৃতি নেই। আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি। কিন্তু আমাকে আড্ডা দিতে যেতে হতো টিএসসি বা চারুকলাতে। তখনকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো খুবই ছোট ছিল। রাস্তার পাশে একটি ভবনে কয়েকটি রুম নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়। ঠিক কবুতরের ঘর। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিরাট বড় কিছু। যেখানে গেলে মানুষ উদার হবে। মানুষের স্বপ্ন হবে আকাশের মতো বিশাল। অনেক মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হবে। জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। নিজেদের অভিজ্ঞতার শেয়ার হবে। কিন্তু আমার সময়ে আমি এসবের কিছু নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার কোনো স্মৃতিও নেই। আমি সেখানে ক্লাসে যেতাম আবার ক্লাস শেষে ফিরে আসতাম। আমার সবসময় মনে হতো এটা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি একটি কোচিং সেন্টার।

তৃষা সামিরা আরো বলেন, আমি পড়া শেষ করেই ব্যবসার কার্যক্রম শুরু করি। বর্তমানে ব্যবসার পরিসর খুব বেশি না হলেও অল্প সময়ের মধ্যে অনেক ভালো পর্যায়ে যেতে পেরেছি। দিন দিন ব্যবসার পরিসর বাড়ছে। বর্তমানে আমি অর্থনৈতিকভাবে বেশ স্বাবলম্বী। তাছাড়া অনেকজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছি।

নতুনদের জন্য তার পরামর্শ হলো- স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার সার্থকতাটাই আলাদা। তাই বলব, একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমে পড়তে হবে। প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, তবে ইচ্ছা থাকলে তা ওভারকাম করা সম্ভব। আপনি যে কাজ ভালো পারেন এবং আপনার কাছে যত কম টাকাই থাক না কেন, সেটা দিয়েই শুরু করুন। কারণ কাজ শুরু না করলে কেউ জানবে না যে আপনি কাজ করতে পারেন বা কাজ করতে চান। একজন নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে হলে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। প্রথমেই বাধা আসে পরিবার থেকে। এরপর সমাজ আর রাষ্ট্র তো আছেই। আমার বেলাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাকে। আমি কখনো আত্মবিশ্বাস হারাইনি। লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি। আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, আমি কাজে সফল হবই।

প্রিয় পাঠক সবুজের ছোঁয়ায় ছিমছাম পরিবেশে প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবারের জন্য যেতে পারেন তৃষা সামিরার ক্যাফে দ্রুমে। দ্রুমের একটি শাখা রয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড (৯/এ)-এর ৭৩৬ নম্বর ভবনের ১৩ তলার ওপর। আরেকটি শাখা বনানী ১১ নম্বর রোডে ১১৬ নম্বর ভবনের ১২ তলার ওপর।

খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি মন খুলে আড্ডা দেয়ার জন্যই ক্যাফে দ্রুম। এখানের আকাশে যেন সৃষ্টি হয় আলো-আঁধারের এক অদ্ভুত খেলা। সেই খেলার সঙ্গে যোগ দেয় রেস্তোরাঁর আলো-আঁধারি এক পরিবেশ। আশপাশে এত উঁচু ভবন না থাকায় কাচের দেয়াল পেরিয়ে রেস্তোরাঁটি যেন মিশে গেছে আকাশেরই সঙ্গে। পুরো রেস্তোরাঁ যেমন পরিপাটিভাবে সাজানো, তেমনি কয়েকটি ভাগেও বিভক্ত। রেস্তোরাঁয় প্রতিটি অংশই অন্যটির থেকে ভিন্ন। একটু আয়েশ করে বসার জন্য চেয়ারের সঙ্গে সমন্বয় করেছে কমলা রঙের কুশন। একটু পা ছড়িয়ে আড্ডা আর ঘরোয়া আমেজে বসে খাওয়ার জন্য রয়েছে যোগাসন। প্রকৃতির সঙ্গে আপনাকে বেঁধে রাখতে টেবিলের পাশেই পাবেন টবে রাখা ছোট ছোট গাছ। বাইরের বারান্দায় বসার জন্য চেয়ারের বদলে রাখা হয়েছে পাটের দড়ির মোড়া।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup