কুমারী পূজা

 

আমাদের পুরুষশাষিত সমাজ ব্যবস্থায় ভারতবর্ষে নারী নিগৃহ হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ প্রত্যক্ষ করেন উন্নত বিশ্বে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তিনিও ঠিক করলেন ভারতবর্ষের জন্যও এই স্বীকৃতি খুব প্রয়োজন। এজন্য তিনি অনুসরণ করলেন প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের কুমারীকে মাতৃরূপে পূজার বিধানকে। আর এই চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে শ্রী মা সারদা দেবীর অনুমতি নিয়ে প্রথম শুরু করলেন কুমারী পূজা। তখন থেকেই কুমারী পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যমত শ্রেষ্ঠ পূজা, যা দুর্গাপূজার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু অনেকেই জানেন না কুমারী পূজা কী এবং কী তার রহস্য।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সাধারণত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে কুমারী পূজা করে থাকে। প্রথমে দুর্গাপূজায় কুমারী পূজার নিয়ম বহাল থাকলেও পরবর্তী সময়ে এ পূজার প্রচলন একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। স্বামী বিবেকানন্দ এর পুনঃপ্রচলন করেন বেলুর মঠে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যাকে মহাশক্তিরূপে পূজা করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ যাকে মা ভগবতীর জীবন্ত বিগ্রহ মনে করতেন, তিনি পরম পূজনীয়া শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী। বালিকা প্রতিমায় মহামায়ার পূজা ঈশ্বরের মাতৃভাবে আরাধনার ফলিত রূপ বলা যায় অগ্নি এবং তার দাহিকাশক্তি যেমন অভিন্ন সে রকম ঈশ্বর এবং তার শক্তি অভিন্ন ঈশ্বর করুণাময় সর্বশক্তিমান এবং তার শক্তি সর্ব শক্তিময়ী। শ্রীরামকৃষ্ণ এই শক্তিকে মা বলতেন, আর সবাই এই সত্তাকে ঈশ্বর বলে থাকে। এখানে মানুষে ঈশ্বর বোধ আরোপিত। ঈশ্বরের মানবীয় ভাবনা নিম্নস্তরের সর্বভূতে ঈশ্বরীয় শক্তি বিরাজমান আর এভাবেই দুর্গাপূজাতে কুমারী পূজার বিধান। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, সবস্ত্রী লোক ভগবতীর একেকটি রূপ শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। ইনিই আমাদের মা।

পণ্ডিতদের মতে, স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোয় বিশ্বধর্ম সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে আমেরিকায় গিয়ে সেখানকার নারী স্বাধীনতা দেখে মুগ্ধ হন। এরপর তিনি সংকল্প করলেন দেশে ফিরে মাতৃজাতিকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠার কাজে আরো বস্তুনিষ্ঠভাবে ব্রতী হতে হবে। তাই তিনি রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার পর সেইব্রত পালনে উদ্যোগী হন। তিনি কুমারী পূজার পুনঃপ্রচলন শুরু করেন। তার মতে, আজকের কুমারী ভবিষ্যতের জননী। তাই তারা আমাদের নমস্য, শ্রদ্ধার পাত্রী; আর এটাই কুমারী পূজার প্রতিপাদ্য। তাই কুমারী পূজা পুণ্যজন্ম করে স্বর্গ প্রাপ্তির লক্ষ্যে আরাধনা নয়; বরং নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে পৃথিবীকে স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার প্রয়াস। মহান সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ নারীকে মাতৃশক্তি রূপে পূজা করেছিলেন। আহ্বান করেছিলেন বিদ্যাশক্তিকে জগতের কল্যাণের জন্য। তারই পথ ধরে স্বামী বিবেকানন্দ কুমারী পূজার প্রবর্তন করেন।

কুমারী পূজা হচ্ছে ধর্মীয় সৌরভে নারী জাতির মর্যাদা সমুন্নত করার সামাজিক আন্দোলন। স্বামীজীর এই কর্মটি তার গুরুভক্তির নিদর্শন। এজন্য স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে জিতেন্দ্রিয় বলে অভিহিত করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের মাতৃবন্দনা বা পূজার সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত শ্রী মা সারদা দেবীকে শ্রীরামকৃষ্ণ শঙ্খ জননীরূপে অধিষ্ঠিতা করে তাকে জগজ্জননী জ্ঞানে ‘জ্যান্ত দুর্গা’ বলে বন্দনা করা।

স্বামীজীর এই কুমারী পূজা নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। যেগুলো মানুষকে এখনো অবাক করে। তিনি একবার তার মানসকন্যা নিবেদিতাসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে কাশ্মীর ঘুরতে গিয়ে এক মাঝির শিশুকন্যাকে কুমারী পূজা করেন, যা দেখে নিবেদিতাসহ তার অন্যান্য পাশ্চাত্য শিষ্যরাও বিস্মিত হন। পরিব্রাজক অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে তিনি আরো কিছু শিশুকন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করেছিলেন। সর্বশেষে বেলুর মঠে প্রথম দুর্গাপূজায় (১৯০১ সালে) নয়জন কুমারীকে পূজা করা এবং তাদের মধ্যে একজনকে তিনি নিজেই পূজা করেন।

তবে কুমারী পূজা সম্পর্কে আমরা সাধারণত জানি যে গিরিরাজ বাহিমালয় কন্যা অসুরদের বিনাশ করতে এসেছিলেন মহিষাসুর নিধন এবং ভক্তদের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে পৃথিবীতে দুর্গার আগমন। মা দুর্গা শিবকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিয়ে কৈলাসে ঘর-সংসার পেতেছেন। প্রতি বছর শরৎকালে ছেলে-মেয়ে নিয়ে মা দুর্গা আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে চারদিনের জন্য বাবার ঘরে অর্থাৎ পৃথিবীতে আসেন। ভক্তদের পূজা গ্রহণ করার জন্য এই চারদিনের একদিন তাকে কুমারী রূপেও পূজা করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো- একটি কুমারীকে প্রতীক হিসেবে বসিয়ে মা হয়েও তিনি কী করে কুমারী হলেন? পুরাণে বলা হয়েছে, দেবীদুর্গার প্রাচীন নাম ছিল কুমারী। শাস্ত্রমতে, হে দুর্গা তুমি কন্যা ও কুমারী সেজন্য তোমাকে ধ্যান করি। তুমি আমাদের শুভকাজে প্রেরণা দাও তন্ত্রসারে ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত ব্রাহ্মণ বালিকাদের কুমারী পূজার জন্য নির্বাচিত করা যেতে পারে। অন্য জাতি কন্যাকেও কুমারী রূপে পূজা করতে বাধা নেই। কুমারী মাত্রই সর্ববিদ্যা স্বরূপা। একেক বছরের কুমারীদের একেক রকম নাম। নামগুলো হলো- এক বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘সন্ধ্যা’, দু’বছরের কন্যাকে ‘সরস্বতী’, তিন বছরের কন্যা ‘ত্রিধামূর্তি’, চার বছরের কন্যা ‘কালিকা’, পাঁচ বছরের কন্যা ‘সুভগা’, ছয় বছরের কন্যা ‘উমা’, সাত বছরের কন্যা ‘মালিনী’, আট বছরে কন্যা ‘কুব্জিকা’, নয় বছরের কন্যা ‘কাল সন্দর্ভ’, দশ বছরের কুমারীকে ‘অপরাজিতা’, এগারো বছরের কুমারীকে ‘রুদ্রানী’, বারো বছরের কুমারীকে ‘ভৈরবী’, তের বছরের কুমারীকে ‘মহালক্ষ্মী’, চৌদ্দ বছরের কুমারীকে ‘পীঠ নায়িকা’, পনেরো বছরের কুমারীকে ‘ক্ষেত্রজ্ঞ’, ষোল বছরের কুমারীকে ‘অম্বিকা’।

শ্রী শ্রী দুর্গাদেবীর মহাষ্টমীর পূজা শেষে কুমারী পূজা হয়ে থাকে। সাধারণত একজন কুমারীকে একাধিকবার কুমারী পূজার জন্য মনোনীত করা হয় না। কুমারী পূজার জন্য মনোনীত বালিকা পরবর্তী সময়ে অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে এ ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup