দুর্গাকথন

স্যাঁতসেঁতে বর্ষার বিদায়ে প্রকৃতি এখন অপরূপা। কৃষ্ণঘন মেঘের বদলে আকাশে খেলা করছে শুভ্র মেঘের দল। প্রকৃতিতে শরতের আগমন ঘটেছে। কাশফুলের শুভ্রতা সেই বার্তা পৌঁছে দিয়ে গ্রাম থেকে শহরে। কাশফুলের দোলনায় দুলতে দুলতে মা দুর্গার আগমনী বার্তা শোনা যাচ্ছে। ঠিক এমন সময় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় প্রস্তুত থাকে দুর্গাকে বরণ করে নিতে। প্রতি বছরই এই সময়ে উদযাপিত হয় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।

 

যেভাবে তিনি দুর্গা হলেন

পুরাণে বলা হয়েছে, মহিষাসুর নামক অসুর স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়িত করে স্বর্গ অধিকার করলে দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা এর প্রতিকারের জন্য মহাদেব ও অন্য দেবতাদের নিয়ে বিষ্ণুর কাছে উপস্থিত হন। মহিষাসুর পুরুষের অবাধ্য ছিলেন বলে বিষ্ণু দেবতাদের পরামর্শ দেন যে, প্রত্যেক দেবতা নিজ নিজ ক্ষমতা ত্যাগ করে একটি নারীমূর্তি সৃষ্টি করবেন। এরপর সব দেবতা ক্ষমতা ত্যাগ করতে আরম্ভ করেন। সমবেত দেবতাদের শক্তি থেকে তৈরি হয় এই নারী মূর্তির শরীরের বিভিন্ন অংশ। পুরাণমতে, মহাদেবের শক্তিতে মুখ, যমের শক্তিতে চুল, বিষ্ণুর শক্তিতে বাহু, চন্দ্রের শক্তিতে স্তন, ইন্দ্রের শক্তিতে কটিদেশ, বরুণের শক্তিতে জঙ্ঘা ও উরু, পৃথিবীর শক্তিতে নিতম্ব, ব্রহ্মার শক্তিতে পদযুগল, সূর্যের শক্তিতে পায়ের আঙুল, বসুগণের শক্তিতে হাতের আঙুল, কুবেরের শক্তিতে নাসিকা, প্রজাপতির শক্তিতে দাঁত, অগ্নির শক্তিতে ত্রিনয়ন, সন্ধ্যার শক্তিতে ভ্রু, বায়ুর শক্তিতে কান এবং অন্যান্য দেবতার শক্তিতে দুর্গার সৃষ্টি হলো। এরপর দেবতারা তাকে বস্ত্র, পোশাক ও অস্ত্র দান করলেন। মহাদেব দিলেন শূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনু ও বাণপূর্ণ তূণীর, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, ঐরাবত দিলেন ঘণ্টা, যম দিলেন কালদ-, বরুণ দিলেন পাশ, ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা, সূর্য দিলেন রশ্মি, কালখক্ষ ও নির্মল চর্ম, ক্ষিরোদ সাগর দিলেন অক্ষয়বস্ত্রসহ বিভিন্ন অলঙ্কার ও আভরণ, বিশ্বকর্মা দিলেন পরশুসহ নানাবিধ অস্ত্র, হিমালয় দিলেন সিংহ, কুবের দিলেন অমৃতের পান পাত্র, শেষ নাগ দিলেন নাগহার ও অন্যান্য দেবতা তাদের সাধ্যমতো বিষয় উপহার দিলেন। এভাবে তিনি হয়ে উঠলেন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রতিরূপ দেবীদুর্গা।

 

দুর্গাপূজা এলো যেভাবে

পুরাণমতে সত্যযুগে দুর্গাদেবীর পূজার প্রথম প্রচলন শুরু হয়। পুরাণে বলা হয়, তখনকার রাজা ও সমাধি বৈশ্য দুর্গামূর্তি তৈরি করে তিন বছর পূজা করেন। এর পরের যুগে ত্রেতায় রাবণ চৈত্রমাসে (বসন্তকালে) দুর্গাদেবীর পূজা করতেন। তখন এই পূজাকে বলা হতো বাসন্তী পূজা। কিন্তু রামচন্দ্র রাবণের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে বাংলা সনের আশ্বিন মাসে (শরৎকাল) দুর্গাদেবীর পূজার আয়োজন করেন। রামচন্দ্র অকালে পূজা করার কারণে এ পূজাকে দুর্গার অকালবোধন বলা হয়। তখন থেকেই বাংলাদেশে রামচন্দ্রের অনুসরণে এই পূজা পালিত হয় শারদীয়া দুর্গাপূজা হিসেবে।

 

দুর্গা দুর্গতিনাশিনী

দুর্গা এই নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দেবীমূর্তি। তার ১০ হাতে ১০ রকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাকে ঘিরে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক। কিন্তু দুর্গার কেন ১০ হাত? ১০ হাতে কী ধরনের অস্ত্র তিনি ধারণ করেন? সেসব অস্ত্রের বৈশিষ্ট্য কী? দুর্গাদর্শনের সময় এমন কত সাধারণ প্রশ্ন জেগে উঠতে পারে একটি শিশুর কৌতূহলী মনেও। শাস্ত্র মতে, মূল প্রকৃতিকে ঈশ্বরের সৃষ্টিশক্তি বা মায়াশক্তি বলে দুর্গার ১০ হাত। আর দুর্গা হলেন মূল প্রকৃতির একটি অংশ। ব্রহ্মা-ব্যাপী ও দুর্গতিনাশকারী এই অর্থে ঈশ্বরের নাম দুর্গা। যে দেবী অগম্যা, দুষ্প্রাপ্যা বা যাকে সহজে পাওয়া যায় না এই অর্থেও তিনি দুর্গা। দুর্গ নামক দৈত্যকে দমন করে ইনি দুর্গা নাম প্রাপ্ত হন। হিন্দু ধর্মমতে, পরমাপ্রকৃতি স্বরূপা মহাদেবী, মহাদেবের পত্নী। পুরাণের মতে, দুর্গা মহামায়া, পরমবিদ্যা, নিত্যস্বরূপা, যোগনিদ্রা। তিনি জন্মমৃত্যু-রহিতা। মহাশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অর্থেও ঈশ্বরকে দুর্গা বলে বর্ণনা করা হয়। দেবীর ১০ হাত সেই অর্থে মহাশক্তির পরিচায়ক। পরাক্রমাধিষ্ঠাত্রী দেবতার সিংহই উপযুক্ত বাহন। দুর্জন বা অসুররাই জগতের দুর্গতির প্রধান কারণ, অতএব দুর্গা অসুরনাশিনী বলে বর্ণিত হয়েই একপ্রকারে দুর্গতিনাশিনী বলে বর্ণিত হয়েছেন।

 

দুর্গার বিভিন্ন রূপ

হিন্দুশাস্ত্রে বিভিন্ন রকমের দুর্গাদেবীর কথা উল্লেখ রয়েছে। সাধারণত সনাতনধর্মী বাঙালিরা দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয়া উৎসবে পূজা করে থাকেন, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রী নাম মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা। তবে বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে মহিষাসুরমর্দিনীর একটু আলাদা রকমের বর্ণনা আমরা পাই। চণ্ডিকা নামে উল্লিখিত এই দুর্গার দশের জায়গায় কুড়িটি হাত। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মীর কথা আছে, এর হাত তার থেকেও দুটি বেশি। ডান দিকের ১০ হাতে থাকে শূল, খক্ষ, শঙ্খ, চক্র, বাণ, শক্তি, বজ্র, অভয়, ডমরু, ছাতা; আর বাঁদিকের ১০ হাতে থাকে নাগপাশ, খেটক, পরশু, অঙ্কুশ, ধনুক, ঘণ্টা, পতাকা, গদা, আয়না ও মুগুর। দেবী কাত্যায়নী-দুর্গার মূর্তিটিও দশভুজা-দুর্গার অনুরূপ।

 

নানা রকম দুর্গা

হিন্দু শাস্ত্র ও পুরাণে আরো কয়েকজন দুর্গা-নামধারিণী দেবীর সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা, বনদুর্গা, অগ্নিদুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী-দুর্গা, রিপুমারি-দুর্গা, অপরাজিতা-দুর্গা। শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে। তারা হলেন ব্রহ্মাণী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, নারসিংহী, বারাহী, ইন্দ্রাণী, চামুণ্ডা, কাত্যায়নী ও চণ্ডিকা। দুর্গাপূজার সময় দেবীদুর্গার আবরণদেবতা হিসেবে এদের পূজা করা হয়। বনদুর্গার আট হাত। অস্ত্রশস্ত্র মহিষমর্দিনীর অনুরূপ। বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেবীর গায়ের রঙে তিনি ঘাসের মতো সবুজ। অগ্নিদুর্গাও অষ্টভুজা। তার আট হাতে থাকে খক্ষ, চক্র, খেটক, বাণ, পাশ, অঙ্কুশ, বরদা মুদ্রা ও তর্জনী মুদ্রা। দেবী সিংহবাহিনী, ভীষণা এবং কপালে অর্ধচন্দ্রধারিণী। দুই পাশে ঢাল-তলোয়ার ধরে থাকেন দেবীর দুই সহচরী। বিন্ধ্যবাসিনী-দুর্গা পদ্মাসনা, ত্রিনয়না ও চতুর্ভুজা। তার চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, বর ও অভয় মুদ্রা। তারও কপালে অর্ধচন্দ্র। সালঙ্কারা এই দেবীকে ঘিরে স্তব করেন ইন্দ্রাণি দেবতারা। দেবীর বাহন সিংহ পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। রিপুমারি-দুর্গা আবার দ্বিভুজা। তার দুই হাতে থাকে ত্রিশূল ও তর্জনী মুদ্রা। এছাড়া, অপরাজিতা-দুর্গার পূজা বিজয়াদশমীর দিন বিসর্জনান্তে কুলাচার অনুসারে হয়ে থাকে। এই দেবী সিংহবাহিনী ও ত্রিনয়না। তার চার হাতে থাকে পিনাক, বাণ, খক্ষ ও খেটক। তার মাথায় জটাজুট ও অর্ধচন্দ্র; কোমরে বাসুকি নাগের বেল্ট। তন্ত্রে দুর্গার যে দুটি রূপ বর্ণিত সে দুটি দেবী জগদ্ধাত্রীর রূপ। তার একটিতে অবশ্য সিংহের পায়ের তলায় হাতি থাকে না। অপর রূপটির মন্ত্র অনুসারে জগদ্ধাত্রী পূজা হয়।

 

১০ হাত

দুর্গার ১০ হাত ১০ দিক রক্ষা করার প্রতীক। ১০ দিক হলো- পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঈশাণ, বায়ু, অগ্নি, নৈঋত, ঊর্ধ্ব এবং অধঃ। এই ১০ প্রহরণ নিয়ে প্রতিআক্রমণ করছে মহিষাসুরকে। অনেক পণ্ডিতের মতে, মানবজাতির সব অশুভ বিনাশ করার জন্যই তিনি ১০ প্রহরধারিণী।

 

দুর্গার সঙ্গী

দুর্গার বাহন সিংহ। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে সিংহকে মহাসিংহ, বাহনকেশরী, ধূতসট ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। মহিষাসুর অসুর, দেবদ্রোহী। তাই দেবী দুর্গার পদতলে দলিত এই অসুর ‘সু’ এবং ‘কু’-এর মধ্যকার দ্বন্দ্বের অশুভ শক্তির ওপর শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। গণেশ কার্যসিদ্ধির দেবতা। হিন্দু পুরাণের নিয়ম অনুসারে, অন্যান্য দেবতার আগে গণেশের পূজা করতে হয়। গণেশের পূজা আগে না করে অন্য কোনো দেবতার পূজা করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। গণেশের বাহন মূষিক বা ইঁদুর। লক্ষ্মী শ্রী, সমৃদ্ধি, বিকাশ ও অভ্যুদয়ের প্রতীক। শুধু ধন নয়, লক্ষ্মী চরিত্রধনেরও প্রতীক। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। সরস্বতী বাণীরূপিণী বাগদেবী; তিনি জ্ঞানশক্তির প্রতীক। সরস্বতীর বাহন হংস। দেবসেনাপতি কার্তিক সৌন্দর্য ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক। কার্তিকের বাহন ময়ূর। দেবী দুর্গা ত্রিনয়না বলে তাকে ‘ত্রৈম্বক্যে’ বলা হয়। তার বাম চোখ হলো বাসনা (চন্দ্র), ডান চোখ কর্ম (সূর্য) ও মাঝখানের চোখ হলো জ্ঞান (অগ্নি)।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।