দশমীর সিঁদুর খেলা

হিন্দু শাস্ত্রের একটি শ্লোক হলো

“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা,

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমোঃ নমোঃ”

শ্লোকটি সংস্কৃত ভাষায়। এর বাংলা করলে দাঁড়ায়- দেবী সর্বপ্রাণীতে শক্তিরূপে অধিষ্ঠিতা, তাহাকে নমস্কার। তাহাকে নমস্কার। তাহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।

দুর্গাপূজা বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। মায়ের আগমনে সব দুঃখ-কষ্ট শেষ হয়ে নতুনভাবে পথচলা শুরু কামনা করে তারা। এদিকে মা দুর্গার আগমনে প্রকৃতিও নিজেকে সাজায় অপরূপ সাজে। এজন্যই কাশফুলে ছেয়ে গেছে প্রকৃতি। আকাশে কখনো মেঘ আবার কখনো রোদ। এ যেন মাকে বরণ করে নিতে প্রকৃতির খোলস বদল।

প্রকৃতির এই নতুন সাজের সঙ্গে বেজে ওঠে ঢাকের তাক ধুম ধুম শব্দ। মুখরোচক খাবার থেকে শুরু করে পরনে লাল শাড়ি সাদা পাড়ে জানান দেয় মা দুর্গার আগমন ঘটে গেছে পৃথিবীর বুকে। মহালয়া থেকে শুরু হয় এই উৎসব। এর পর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও সবশেষে দেবীকে বিদায় জানানোর পালা দশমী। দেবীকে আগমন জানানো শুরু হয় মূলত মহালয়া থেকে।

 দেবী দুর্গার বাহন মূলত সিংহ। তবে পিতার গৃহে আগমন এবং তা ত্যাগ করে কৈলাসে স্বামীগৃহে যেতে উমা একেকবার একেক বাহনে অবতরণ ও গমন করেন। পঞ্জিকামতে এবার মায়ের আগমন ঘোড়ার পিঠে চড়ে আর দেবী দুর্গা বিদায় নেবে নৌকায় করে। মায়ের এই চারদিনের আগমনকে ভক্তকুল স্বাগত জানায় নানাভাবে। তবে বিদায়ের সুর বেজে ওঠে দশমী থেকেই।

মা যেন এই পৃথিবীতে বার বার ফিরে আসে এটিই থাকে তার সন্তানদের কামনা। দশমীর দিনে কেবল মাকে বিদায় জানানোই হয় না এর সঙ্গে থাকে নানা আয়োজন আর একেক দিনকে ঘিরে একেক উৎসবের আমেজের অনুভূতি। যেমনটি আছে দশমীতে। সিঁদুর দান কিংবা সিঁদুর খেলা এই দিনের অন্যতম আকর্ষণ। সকালের পূজার পর থেকে শুরু করে দেবীকে বিদায়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলে এই সিঁদুর দান।

মূলত এটিকে বলা হয় সোহাগের কিংবা বিবাহিত নারীদের সৌভাগ্য কামনাস্বরূপ হিসেবে। এটি মূলত খেলেন বিবাহিত নারীরা। তারা একে অন্যকে লাল রঙের সিঁদুরে রাঙিয়ে দেন। মাথার এক প্রান্ত থেকে শুরু করে পুরো সিঁথিতে থাকে এই সিঁদুর। এই লাল রঙকে ধরা হয় শক্তির প্রতিরূপ হিসেবে। বিবাহিত নারীরা ব্যতীত এটি অবিবাহিত মেয়েরাও খেলে থাকেন।

সেক্ষেত্রে কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দেন বিবাহিত নারীরা। আর নানা রঙ একে অন্যকে মাখিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হয়। অবিবাহিত নারীদের বিবাহিত নারীরা এজন্যই পরিয়ে দেন, যাতে তারা তাদের ভবিষ্যৎ স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করতে পারেন। আর বিবাহিতরা একে অন্যকে সৌভাগ্যবতী আশীর্বাদ করতে পরিয়ে থাকেন। এই দিনে সব নারী লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে থাকেন।

চারিদিকে বাজানো হয় ঢোল আর শোনা যায় উলুধ্বনি। হাতে লাল চুড়ি আর একে অন্যকে মিষ্টি খাইয়ে যেন মায়ের এই বিদায়ের সুরকে আবার আগামী বছরের আগমনী সুরের আনন্দে রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়। তাই একে বিজয়া দশমীও বলা হয়। সন্তানদের কাঁদিয়ে মা বিদায় নেয় কৈলাশের দিকে। আর রয়ে যায় এই কয়দিনের মাকে ঘিরে থাকা নানা স্মৃতি ও ফিরতি বছরে মাকে আবার কাছে পাওয়ার প্রতীক্ষা।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।