শিল্পকলায় চারুকলা প্রদর্শনী

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী দেশের চারুশিল্পের বৃহত্তম উৎসব। ১৯৭৪ সালে সমকালীন চিত্রকলা প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শিল্পকলা একাডেমির চারুকলাবিষয়ক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এ কর্মকাণ্ডের সূত্র ধরে ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর শুরু। প্রতি দুই বছর পর পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে এ প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ১ জুলাই ২০১৯ শুরু হয়েছে ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী।

প্রদর্শনী উদ্বোধন অনুষ্ঠান গত ১ জুলাই বিকেল ৫টায় একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে একাডেমির যন্ত্রশিল্পীরা অর্কেস্ট্রা পরিবেশন করেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন ও বিজয়ী শিল্পীদের পুরস্কার দেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে অংশগ্রহণকারী সব শিল্পীকে অভিনন্দন জানিয়ে এইচটি ইমাম বলেন, ‘এটি চমৎকার একটি প্রদর্শনী হবে। দেশ-বিদেশে আমাদের শিল্পীদের যথেষ্ট মর্যাদা আছে। সবাইকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে শিল্পকর্ম ক্রয় করার আহ্বান জানাই।’

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি এবং বরেণ্য চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দিয়েছেন চারুকলা বিভাগের পরিচালক শিল্পী আশরাফুল আলম পপলু। বিচারকমণ্ডলীর পক্ষ থেকে বক্তব্য দিয়েছেন শিল্পী আব্দুস শাকুর শাহ।

এবারের প্রদর্শনীতে ৩১০ জন শিল্পীর ৩২২টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। চিত্রকলা, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, কারুশিল্প, স্থাপনা ও ভিডিও আর্ট মাধ্যমের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এছাড়াও ছিল কৃৎকলা (পারফরম্যান্স আর্ট)। আবেদনকারী ৮৫০ জন শিল্পী থেকে বাছাইকৃত ৩১০ জন শিল্পীর ৩২২টি শিল্পকর্মের মধ্যে ১৫৯টি চিত্রকলা, ৪৫টি ভাস্কর্য, ৫০টি ছাপচিত্র, ১৭টি কারুশিল্প, ৮টি মৃৎশিল্প, ৩৭টি স্থাপনা ও ভিডিও আর্ট, ৭টি কৃৎকলা (পারফরম্যান্স আর্ট)।

প্রাথমিক পর্যায়ে শিল্পকর্ম বাছাই কমিটিতে ছিলেন শিল্পী নাসরিন বেগম, শিল্পী মোস্তাফিজুল হক, শিল্পী শেখ সাদী ভূইয়া, শিল্পী ড. মোহাম্মদ ইকবাল ও শিল্পী আনিসুজ্জামান। পুরস্কারের জন্য সেরা শিল্পকর্ম বাছাইয়ে বিচারক হিসেবে ছিলেন শিল্পী আব্দুস শাকুর শাহ, স্থপতি শামসুল ওয়ারেস, শিল্পী রণজিৎ দাস, শিল্পী ড. ফরিদা জামান ও শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস ।

জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে মোট ৮টি পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন শিল্পী কামরুজ্জামান, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ টাকা। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, স্থাপনা- এই চারটি বিভাগে সম্মানসূচক পুরস্কার পেয়েছেন যথাক্রমে শিল্পী রাফাত আহমেদ বাঁধন, শিল্পী তানভীর মাহমুদ, শিল্পী রুহুল করিম রুমী, শিল্পী সহিদ কাজী। প্রতিটির আর্থিক মূল্যমান ১ লাখ টাকা। এছাড়াও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন পুরস্কার পেয়েছেন শিল্পী উত্তম কুমার তালুকদার, যার মূল্যমান ১ লাখ টাকা। দীপা হক এবং সুমন ওয়াহিদ পুরস্কার পেয়েছেন, যার মূল্যমান ২০ হাজার টাকা ও চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ান হোসেন এবং শিল্পী ফারিয়া খানম তুলি পুরস্কার পেয়েছেন, যার মূল্যমান ৫০ হাজার টাকা।

প্রদর্শনীটি ১ জুলাই শুরু হয়ে ২১ জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা ও শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলেছে। গত ৩০ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় নাট্যশালা সেমিনার কক্ষে ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর বিস্তারিত তুলে ধরেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন একাডেমির সচিব বদরুল আনম ভূঁইয়া, চারুকলা বিভাগের পরিচালকশিল্পী আশরাফুল আলম পপলুসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা। ২১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সমাপনী পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন শিল্পী মোস্তফা জামান ও শিল্পী শাওন আকন্দ। সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক মোস্তাফিজুল হক। আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারী সবাইকে সনদপত্র প্রদান করা হয়।

 

লিয়াকত আলী লাকী

মহাপরিচালক

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগ শুরু থেকেই দ্বিবার্ষিক ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চারুকলাবিষয়ক প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছে, যার মধ্যে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী অন্যতম। বাংলাদেশি শিল্পীদের মেধার পরিচয় ও চারুশিল্পী হিসেবে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা অর্জনে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর ভূমিকা অপরিসীম। ১৯৭৫ সাল থেকে যাত্রা করে এ পর্যন্ত ২২টি প্রদর্শনী সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। এ বছর ২৩তম আয়োজন করতে পেরে আমরা আনন্দিত। চিত্রকলা, ছাপচিত্র ও ভাস্কর্য- এই তিনটি মাধ্যমের শিল্পকর্ম দিয়ে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী শুরু হলেও সমকালীন ভাবধারায় শিল্পীরা বিশেষ করে নবীনরা নিত্যনতুন মাধ্যম ও কৌশল অবলম্বন করে শিল্পচর্চাকে করেছে আরো শক্তিশালী ও প্রগতিশীল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রদর্শনীগুলোতে স্থাপনাশিল্প, আলোকচিত্র, কৃৎশিল্প, ভিডিও আর্ট ও আরো অনেক নতুন মাধ্যম পরিলক্ষিত হয়।

২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী ২০১৯-এ অংশগ্রহণের জন্য সর্বমোট ৮৫০ জন শিল্পী আবেদন করেছিলেন। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণে আগ্রহী আবেদনকারী শিল্পীদের আবেদনের সঙ্গে জমাকৃত শিল্পকর্মের আলোকচিত্র এবং ধারণা বিচার-বিশ্লেষণ করে শিল্পকর্ম নির্বাচন কমিটি ৩১০ জন শিল্পীর ৩২২টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচন করেন, যার মধ্যে চিত্রকলা ১৫৯টি, ছাপচিত্র ৫০টি, ভাস্কর্য ৪৫টি, কারুশিল্প ১৭টি, স্থাপনাশিল্প ৩৭টি, মৃৎশিল্প ৭টি এবং কৃৎশিল্প ৭টি। প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত শিল্পকর্ম দেখে মনে হয়েছে শিল্পীরা সমকালীন বাস্তবতা, সামাজিক জটিলতা ও অসংগতি এবং এসবের মাঝে প্রকৃত সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়াসকেই তাদের শিল্পচর্চায় প্রাধান্য দিয়েছেন। শিল্পকর্মের মাধ্যম এবং ব্যবহৃত উপাদানেও কৌশলগত নতুনত্বের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।

আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের, সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে তাদের শিল্পচর্চার এই নিত্যনতুন প্রয়াসকে লালন করার জন্য এবং প্রদর্শনীর মাধ্যমে লুকিয়ে রাখা অনুভূতিমালাকে সম্ভাবনাময় আলোকে প্রকাশ করার জন্য। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেত চাই শিল্পকর্ম নির্বাচন কমিটি এবং জুরি কমিটিকে যারা প্রদর্শনীর জন্য উপযুক্ত এবং শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম নির্বাচন করে সবচেয়ে কঠিন কাজটি সম্পন্ন করেছেন।

আমি কৃতজ্ঞতা জানাই প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে, যিনি আমাদের সবল সৃজনশীল কাজের অনুপ্রেরণা। ধন্যবাদ সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আমাদের পাশে থাকার জন্য। প্রদর্শনী আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য সবার প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

 

 

আশরাফুল আলম পপলু

পরিচালক

চারুকলা বিভাগ

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতি ও দেশ গঠনে যে বিশাল স্বপ্ন দেখেছিলেন সংস্কৃতিচর্চা, সংস্কৃতি বিকাশ তার মধ্যে অন্যতম। শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্যই তিনি নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার মধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি অন্যতম। শিল্পকলা একাডেমি নানামুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চারুশিল্প এবং অন্যান্য পারফর্মিং শিল্পমাধ্যমের কাজ উপস্থাপন করে চলেছে। দেশে চারুশিল্পের বিকাশ বহুমুখী। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে এখানে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটে। পঞ্চাশের দশকে আমাদের আধুনিকতা আরো বিচিত্রমুখী হয় এবং যুদ্ধোত্তরকালে আমরা আরো বেশি ব্যাপ্ত পরিমণ্ডলে বিচিত্র মাধ্যমে এবং বিচিত্র চিন্তায় পুষ্ট করে আমার শিল্পকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত করেছি। দেশের শিল্পচর্চা কতভাবে বিকশিত হচ্ছে, কত বিচিত্র তার রূপ, তা পরিমাপ করার রীতি প্রায় সব দেশেই রয়েছে। দেশে দেশে শিল্পকলা একাডেমির মতো একাডেমিগুলো দু’বছর অন্তর জাতীয়ভাবে চারুশিল্পের প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। দু’বছর অন্তর জাতীয় চারুশিল্প প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দর্শকের কাছে প্রদর্শন করতে চায় এদেশের শিল্পীরা তাদের সৃজন ক্ষমতা প্রয়োগ করে শিল্পকে কত বিচিত্রমুখী করেছেন। ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ঐতিহ্যকে সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত রেখে শিল্পীর কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগ আয়োজিত ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী দেখলে একজন দর্শক সহজেই বুঝতে পারবেন, দেশে শিল্পচর্চা কী রূপ লাভ করেছে। যতই দিন এগোচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে আমাদের শিল্পীরা নানামুখী চিন্তাচেতনায় অগ্রসর হচ্ছেন। চিন্তার ক্ষেত্রে যেমন গভীরতা আসছে এবং সে চিন্তাকে উপস্থাপন করার জন্য প্রথাগত মাধ্যমের পাশাপাশি নতুন নতুন মাধ্যমে আমাদের শিল্পীরা কাজ করছেন। ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে নতুন ধারার কাজের সংখ্যা এবং এর মধ্য দিয়েই আমরা বুঝতে পারি নবীন প্রজন্ম নবীন সময়ের মুখোমুখি হয়ে দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আমাদের শিল্পকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে তার রূপ আমরা পাঠ করতে পারছি, আমাদের দর্শকরাও তা পাঠ করছেন এবং বিশ্ব দরবারে বৈশ্বিক আয়োজনে আমাদের এই শিল্প বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে, সম্মান পাচ্ছে, পুরস্কৃত হচ্ছে।

এই জাতীয় চারুশিল্পের ২৩তম আয়োজনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের চারুশিল্পের চর্চা, গতিপ্রকৃতি, বিকাশ এবং চিন্তার ধারা শিল্পমণ্ডিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে, তা দর্শক অনুভব করতে পেরেছেন বলে আমার বিশ্বাস।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup