সাক্ষাৎকার : যা চেয়েছি তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি

সৈয়দ আলমগীর

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কনজিউমার ব্র্যান্ডস

এসিআই লিমিটেড

‘১০০% হালাল সাবান’। এই কথাটির সঙ্গে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। এই একটি মাত্র কথার মাধ্যমে একটি সাবানের ব্যাপক প্রচারণা হয় পুরো বাংলাদেশে। এছাড়াও একটি নতুন জুতোর প্রতিষ্ঠানকে তিনি মাত্র দুই বছরের মাথায় নিয়ে এসেছিলেন দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে। একটি ছোট প্রতিষ্ঠানকে শত কোটি টাকার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে তার রয়েছে অনেক বড় অবদান। 

আনন্দধারা : আপনার সফলতার গল্পটা অল্প কথায় জানতে চাই?

সৈয়দ আলমগীর : নেত্রকোনার কেন্দুয়াতে আমার বাড়ি, পড়াশোনার শুরুটাও সেখানেই। এসএসসি পাস করে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। ছোটবেলা থেকেই সিভিল সার্ভেন্ট হওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার।স্নাতক শেষ করার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। প্রথম ব্যাচে বিসিএস দেয়া আর হলো না। সেই সঙ্গে সিভিল সার্ভেন্ট হওয়ার ইচ্ছাতেও ঘাটতি পড়ে। কিন্তু প্রশাসনেই থাকার ইচ্ছা ছিল, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-তে ভর্তি হই এমবিএ করতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভর্তির প্রথম ব্যাচ ছিলাম আমরা। পাস করে বের হওয়ার পর একসঙ্গে ৪/৫টি চাকরি পাই, সেখান থেকে আমাকে পছন্দ করতে হয় একটি। ব্যাংকের চাকরি আমাকে টানছিল না। তাই আমি (বর্তমান) সানোফি এভেনটিজে যোগ দিই। আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানটিতে ছিলাম প্রায় ১৬ বছর। অনেক কিছু শিখেছি সেখান থেকে। দেশে-বিদেশে অনেক প্রশিক্ষণ নিতে পেরেছি। ১৬ বছরে সাতটি পদোন্নতি পেয়েও এক সময় মনে হলো আমেরিকা চলে যাব। ৯০ দশকে মাঝের দিকে চলেও গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে ভালো লাগেনি বিধায় তিন মাস পরই চলে আসি দেশের মাটিতে। এসে যোগ দিই যমুনা গ্রুপের গ্রুপ মার্কেটিং ডিরেক্টর হিসেবে। আগের প্রতিষ্ঠানেও আমি অনেক কিছু করেছি। কিন্তু তার কিছুই দৃশ্যমান ছিল না। যমুনাতে এসে আমি কাজের জন্য যেমন সুযোগ পাই, তেমনি তা সবার সামনে তুলে ধরারও সুযোগ হয়। যমুনাতে এসে আমি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান করি, যার মধ্যে প্রথমটি ছিল পেগাসাস সু। এটাতে আমরা বেশ ভালো সফলতা পাই। বাটা তখনো কেডস বা স্নিকারের বাজারটা ধরেনি। আমি বুঝতে পারি এদেশে এগুলো চলবে, তাই শুরু করা। এর পরপরই ৪০টি পণ্য দিয়ে শুরু করি এ্যারোমেটিক কসমেটিকস। এখান থেকেই লেমিনেটেড টিউব আমার হাত ধরে বাংলাদেশে আসে। কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে দেশে এর কারখানা করে প্রথম আমরাই লেমিনেটেড টিউবে টুথপেস্ট বাজারজাত করি। এছাড়াও নিটিং অ্যান্ড ডাইং, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারণে যমুনার বিরাট বিস্তার হয়। সফলতার কারণেই আমার অনেক জায়গা থেকে চাকরির প্রস্তাব আসে। কিন্তু আমার কাছে একটা সময় পর মনে হয়েছে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আমি আরেকটু অন্য পরিসরের প্রতিষ্ঠানে যাই। তখন এই চিন্তা থেকেই আমি এসিআইতে যোগ দিই এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে। এই প্রতিষ্ঠানের তখন মাত্র দুটি পণ্য ছিল স্যাভলন ও এরোসল। বছরে ৮ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করা এই প্রতিষ্ঠানটিতে এখন বিক্রি হয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

আনন্দধারা : কৃষি সরঞ্জামে আপনার প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।

সৈয়দ আলমগীর : বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। একজন কৃষকের যা প্রয়োজন হয় তার সবই আমরা দিতে পারি। এর জন্য আমাদের আলাদা বিভাগই আছে।

আনন্দধারা : বাংলাদেশ থেকে আপনাদের পণ্য রফতানি হচ্ছে কতটা?

সৈয়দ আলমগীর : আমাদের এখন প্রায় ২০টির বেশি দেশে পণ্য যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না। কেননা, দেশের বাইরে বাঙালি যারা আছে, তারাই শুধু আমাদের পণ্য কিনছে। বাংলাদেশের যারা বিভিন্ন দেশে কাজ করছে, তারাই মূলত আমাদের দেশের বিভিন্ন পণ্যের ক্রেতা। বাইরে এমন ক্রেতার সংখ্যা খুব বেশি না। দেশেই ১৬ কোটির বেশি মানুষ। তাদেরই তো আগে দিতে হবে। তাই আমাদের প্রাধান্য বাংলাদেশই।

আনন্দধারা : আপনার অনেক সাফল্যের মধ্যে যদি একটি বলতে বলা হয় তাহলে কোনটা বলবেন?

সৈয়দ আলমগীর : প্রফেসর ফিলিপ কটলারের লেখা বইতে আমার নাম ওঠাটা অনেক বড় অর্জন বলে মনে হয়। এই উপমহাদেশে এভাবে আর কারো নাম আসেনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, ব্যক্তির নাম নয়। আমার হাতে অনেক ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে। সেগুলো হাতে করে মানুষ ফিরছে দেখলেই ভালো লাগে। এই ব্র্যান্ডগুলো আমার সন্তানের মতো।

আনন্দধারা : আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভেতরে চাকরি করাটাই প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে সরকারি চাকরি।

সৈয়দ আলমগীর : এক সময় তো এর উল্টো ছিল। এখন সরকারের বেতনাদি অনেক ভালো করেছে। সেই সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও আছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বেতন ভালো হলেও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তেমন নেই। তবে সরকারি চাকরির জন্যই শুধু চেষ্টা না করে বেসরকারি চাকরির জন্যও চেষ্টা করা উচিত। অনেকেই চাকরির নিশ্চয়তার জন্য সরকারি চাকরিটাকে প্রাধান্য দেয়।

আনন্দধারা : তরুণ প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা প্রয়োজন আছে কি?

সৈয়দ আলমগীর : মন দিয়ে ব্যবসা করতে পারলে ভালো। লেগে থাকতে হবে, মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হবে।

আনন্দধারা : আপনার কি মনে হয়, আপনার কোনো অপ্রাপ্তি আছে?

সৈয়দ আলমগীর : আমার জীবনে চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে অনেক বড় ফারাক। আমি যা চেয়েছি তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছি, সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতায় আমার কাজগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে পেরেছি, পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছি। আমার বাচ্চারা অনেক ভালো করতে পেরেছে। সব মিলিয়ে যা প্রত্যাশা ছিল আল্লাহ তার থেকে আমাকে অনেক বেশিই দিয়েছেন।

আনন্দধারা : ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?

সৈয়দ আলমগীর : এসিআই এরই মধ্যে অনেক এগিয়েছে। আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আরো অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান আসছে। সব মিলিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটিকে অন্য একটি পর্যায়ে নিয়ে যাব। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের ভালো ভালো কোম্পানির পণ্য পাবে। অনেকগুলো যৌথ বিনিয়োগের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করব।

আনন্দধারা : তরুণদের জন্য কোনো পরামর্শ।

সৈয়দ আলমগীর : যখন যে কাজটি করছেন তা সুন্দরভাবে করবেন। এলোমেলো চিন্তা না করে ভালো করে বর্তমান কাজটা আগে শেষ করতে হবে। আড্ডা দিয়ে, ঘুরে সময় নষ্ট না করে বই পড়া উচিত। এসবের জন্য সময় পরেও পাওয়া যাবে, কিন্তু পড়ার জন্য পরে সময় পাওয়া যাবে না। বর্তমানের একনিষ্ঠতার ওপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। বাংলাদেশের মানুষ অনেক বুদ্ধিমান। কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা তাদের মেধা দেখাতে পারে না। তরুণদের কাছে আমার দুটো বিশেষ অনুরোধ থাকবে। প্রথমত, পরিবারের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। বাবা-মায়ের যথেষ্ট পরিমাণ যত্ন নিতে হবে। যার বাড়িতে বাবা আছে তার একটা সূর্য আছে। যার বাড়িতে মা আছে তার চাঁদ আছে। যার দু’জনই আছে তার চাঁদ-সূর্য দুটোই আছে। তাদের হারালে তাদের মর্ম উপলব্ধি করা যায়। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে সন্তাদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

আনন্দধারা : আপনার ব্যবসা সাফল্যের কারণগুলো কি?

সৈয়দ আলমগীর : ১. কোয়ালিটি অর্থাৎ উন্নতমানের পণ্য, উন্নত মোড়ক, গ্রহণযোগ্য মাত্রার মূল্য। ২. উদ্ভাবনী বিপণন ব্যবস্থা ও ৩. সাফল্যজনক বিতরণ ব্যবস্থা সার্ভেন্ট।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup